এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসে অনিয়মের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক
জিএম মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মানবপাচারসহ একাধিক দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ
প্রকাশিত : ১৮:৩৬, ১ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩৯, ১ জানুয়ারি ২০২৬
রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস। যাত্রী নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই বিভাগটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অথচ জাতীয় গোয়েন্দা নিরাপত্তা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে এ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা—মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অনিয়ম বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
ক্ষমতার বলয় ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ :
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্যমতে, মো. মনিরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব খাটিয়ে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রাখা হয়েছে। এতে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
হাজিরা ব্যবস্থায় কারসাজি: ফেস ডিটেকশনও প্রশ্নবিদ্ধ :
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জুনিয়র গ্রাউন্ড সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে কর্মরত এক নারী নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন ঘণ্টা পর কর্মস্থলে উপস্থিত হলেও হাজিরা শিটে তাকে আগেভাগেই উপস্থিত দেখানো হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিমানে আধুনিক ফেস ডিটেকশন হাজিরা ব্যবস্থা চালু থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক পর্যায় থেকে হাজিরা তথ্য সম্পাদনার অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরো ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মেডিকেল লিভে নিয়মের বদলে প্রভাব :
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, ওই কর্মচারী দীর্ঘ সময় বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থাকলেও বিধি অনুযায়ী কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং মেডিকেল সার্টিফিকেট ছাড়াই তাকে মেডিকেল লিভ দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই লিভ অনুমোদনের জন্য বিমানের চিফ মেডিকেল অফিসারের ওপর টেলিফোনে চাপ প্রয়োগ করা হয়। বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
রোস্টার বাণিজ্য: ‘সোনালী শিফট’ কার দখলে?
গ্রাউন্ড সার্ভিসে রোস্টার পরিবর্তন নিয়মিত প্রক্রিয়া হলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ৬ থেকে ৮ মাস ধরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিফট একই ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে। অভিযোগ রয়েছে, এসব শিফটে দায়িত্বপ্রাপ্তদের একটি অংশ মানবপাচার, স্বর্ণচোরাচালান ও ব্যাগেজ কাটিংয়ের সঙ্গে জড়িত।
গোপন সূত্রের দাবি, মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব শিফট ‘বিক্রি’ করা হয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়।
জাল ভিসা ও আন্তর্জাতিক সতর্কতা গোপনের অভিযোগ :
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কানাডা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জাল ভিসায় যাত্রী পাচারের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশকে ই-মেইলের মাধ্যমে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই ই-মেইল ও সংশ্লিষ্ট নথি যথাযথ দপ্তরে না পাঠিয়ে গোপন রাখার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের তথ্য গোপন রাখা চাকরিবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বিমানের ভবিষ্যৎ ফ্লাইট অপারেশনের জন্যও হুমকিস্বরূপ।
শোকজ নোটিশ বদলের অভিযোগ :
২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর বিজি–৩৬৬ ফ্লাইটে যাত্রীর ব্যাগেজ ওজন জালিয়াতির ঘটনায় ডিজিএম স্বাক্ষরিত শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে সেই নোটিশের ভাষা পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সূত্রের দাবি, এতে অভিযুক্ত কর্মীদের দায় লঘু করা হয়। শোকজ নোটিশের দুটি ভিন্ন কপি পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অফলোডের পরও বোর্ডিং: কীভাবে সম্ভব?
আরেক ঘটনায় দেখা যায়, যুক্তরাজ্যগামী এক জাল ভিসাধারী যাত্রীকে প্রথমে অফলোড করা হলেও পরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তাকে বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন পার করানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট চেকিং স্টাফের বিরুদ্ধেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের শঙ্কা :
বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসে এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক রুটে বিমান বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যাত্রী নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়বে।
তদন্তের দাবি :
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে জরুরি ভিত্তিতে—ফেস ডিটেকশন হাজিরা ও রোস্টার ডেটার ফরেনসিক অডিট,জাল ভিসা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ যাচাই,শোকজ নোটিশ পরিবর্তনের নথিগত তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদের পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে এয়ারপোর্ট সার্ভিসেসের মহাব্যবস্থাপক মো. মনিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বলেন, সকল অভিযোগ মিথ্যা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিমান কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এয়ারপোর্ট সার্ভিসেস থেকে সরিয়ে অন্য ডিপার্টমেন্ট দায়িত্বের দেওয়া হয়েছে।
এমআর//
আরও পড়ুন










