ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট, ২০১৮ ০:১৭:২৪

‘বঙ্গবন্ধু আগেই জিয়াউর রহমানকে চিনতে পেরেছিলেন’   

‘বঙ্গবন্ধু আগেই জিয়াউর রহমানকে চিনতে পেরেছিলেন’   

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নৃশংস হত্যাকান্ডের আগেই জিয়াউর রহমানকে চিনতে এবং তার উচ্চাভিলাসী মনোভাব সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। আর এ কারণেই, জেনারেল সফিউল্লাহকে দ্বিতীয় দফায় সেনা বাহিনীর প্রধান করায় ক্ষিপ্ত হয়ে জিয়া পদত্যাগ করতে চাইলে বঙ্গবন্ধু তৎকালীন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরীকে তার পদত্যাগপত্র গ্রহন করতে বলেছিলেন।  প্রয়াত নুরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৯৪ সালের ২৬ মার্চ দৈনিক আজাদী পত্রিকার ‘নৃশংস পনেরই আগস্টের পূর্বাপর’ শীর্ষক এক নিবন্ধে এই তথ্য প্রকাশ করেন।    নুরুল ইসলাম চৌধুরী লেখেন ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের নৃশংস ঘটনার কয়েকদিন আগে জেনারেল সফিউল্লাহকে দ্বিতীয় দফায় সেনা বাহিনীর প্রধান করায় ক্ষিপ্ত হয়ে জিয়াউর রহমান তার সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনী থেকে পদত্যাগ করার কথা জানান। নুরুল ইসলাম এই ঘটনা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানালে তিনি জিয়াকে একজন উচ্চাভিলাষী ও ধৈর্যহীন ব্যক্তি বলে উল্লেখ করেন এবং জিয়ার পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করতে বলেন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ১৯৭৫ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর থেকে তার পদত্যাগ পত্র গৃহীত হত। জিয়াউর রহমানের ক্ষিপ্ততা সম্পর্কে নিবন্ধে আরো বলা হয়, বাকশালের সদস্যপদ না পেয়ে এবং জেনারেল সফিউল্লাহকে সেনা বাহিনীর প্রধান করায় জিয়া ক্রমেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রীর কাছে নানা অসন্তোষের কথা জানান। নুরুল ইসলাম চৌধুরী তার নিবন্ধে বলেন, ‘স্বাধীনতা লাভের পরে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসাবে নাখালপাড়া সংসদ হোষ্টেলে ১৯৭২ সালে আমাকে প্রায় ৭/৮ মাস থাকতে হয়। তখন জেনারেল জিয়া আমার হেষ্টেলে চা পানের মাধ্যমে অনেক আলোচনাই করতেন। জিয়া দুঃখ করতেন তার কার্যকলাপোর সঠিক মূল্যায়ন হয়নি। জিয়া নাকি জনাব সফিউল্লাহর ব্যাচমেট হিসেবে উপরের দিকে ছিলেন এবং এই আইনত সেনাবাহিনী প্রধানের বাহিনীর পদটি তার পাওয়া উচিত ছিল।’ নিবন্ধে নুরুল ইসলাম চৌধুরী আরো বলেন, জেনারেল শফিউল্লাহকে তিন বৎসর মেয়াদান্তে আরও তিন বৎসরের জন্য সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করায় জিয়া অত্যন্ত দুঃখিত ও বিপর্যস্ত হয়ে আমাকে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করতে বলেন ও প্রতিরক্ষা সচিবকেও তা জানান। আমি তাকে ২/১ দিন অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। পরে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে জিয়ার পদত্যাগের ইচ্ছা ব্যক্ত করলাম। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে আমাকে বললেন ‘তুমি এখনই তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। তুমি জানো না জিয়া অত্যন্ত উচ্চাভিলাসী। ও আরও অনেককে দিয়ে বাকশালের সদস্য হবার জন্য আমার কাছে সুপারিশ করেছে। সে ধৈর্য ধরতে জানে না। আমি বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদেরই সদস্য করেছি। পরে তাকেও হয়তো করবো। এই কথা বলার পর আমি বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করেছিলাম জিয়াকে পদাতিক বাহিনীর কাঠামো বিন্যাস করার জন্য আমার আরো কিছুদিন দরকার এবং ১লা সেপ্টেম্বর ‘৭৫-এ তার পদত্যাগ গ্রহণ করে আপনার আদেশের জন্য পাঠিয়ে দেব। বঙ্গবন্ধু আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তিনি বললেন, তুমি যা ভালো বুঝো তাই করো। এটি ছিল আগষ্টের প্রথম দিকের ঘটনা।’ নূরুল ইসলাম বলেন ‘বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলে জিয়াকে আমি আমাদের কথোপকথনের সব কথা না বলে তাকে বললাম, রাষ্ট্রপতি শফিউল্লাহর নিযুক্তির ব্যাপারে বর্তমানে কিছু করতে চান না। আমি জিয়াকে জানালাম -তার পদত্যাগপত্র ১ সেপ্টেম্বর গ্রহণ করা হবে এবং পদত্যাগের পূর্বে পদাতিক বাহিনীর কাঠামো বিন্যাস চূড়ান্ত করার জন্য সহযোগিতা কামনা করি। জিয়া সাহেব আমাকে বললেন যে তার কোন জমানো টাকা নেই। সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করার পর যে টাকা পাবেন তা দিয়ে ছোটখাটো ব্যবসা করতে চান।’ তিনি বলেন, জিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতিকে কলুষিত করার পরিকল্পনা ছিল। তিনি বলেতেন, ‘আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি অত্যন্ত কঠিন করে দিবো’ এবং পরবর্তীতে তিনি তাই করেছিলেন। নূরুল ইসলাম তার নিবন্ধে বলেন, ‘জিয়া উচ্চাভিলাসী ছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে সৎ বলেও তার গর্বও ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়- তিনি মনের দিকে থেকে সম্পূর্ণ বিবেকবান ছিলেন না। আমাদের দল আওয়ামী লীগের প্রতি জেনারেল জিয়ার বিদ্বেষ ছিল। আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপর জেল-জুলুম চলে এবং আমরা যারা মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য ছিলাম তাদের সম্পত্তির হিসাব দাখিল করতে হয়। রাজনীতি ও ছাত্ররাজনীতি সম্পূর্ণ কলুষিত করার জন্য তিনি দায়ী।’ সূত্র: বাসস এসি   
১৫ আগস্ট: ইতিহাসের অন্ধকারতম অধ্যায় 

১৫ আগস্ট জাতীয় শোকের দিন। বাংলার আকাশ-বাতাস আর প্রকৃতিও অশ্রুসিক্ত হওয়ার দিন। কেননা পঁচাত্তরের এই দিনে আগস্ট আর শ্রাবণ মিলেমিশে একাকার হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত আর আকাশের মর্মছেঁড়া অশ্রুর প্লাবনে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সুবেহ সাদিকের সময় যখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে নিজ বাসভবনে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে বুলেটের বৃষ্টিতে ঘাতকরা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল, তখন যে বৃষ্টি ঝরছিল, তা যেন ছিল প্রকৃতিরই অশ্রুপাত। ভেজা বাতাস কেঁদেছে সমগ্র বাংলায়। ঘাতকদের উদ্যত অস্ত্রের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর অভাবিত ঘটনার আকস্মিকতায়। কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে এ শোকের আগুন। ১৫ আগস্ট শোকার্দ্র বাণী পাঠের দিন, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৩তম শাহাদাতবার্ষিকী। সেই কালো রাতে শহীদ হয়েছিলেন যারা   ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্টের কালরাতে ঘাতকের হাতে নিহত হন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছা, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খান। জাতি আজ গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে সকল শহীদকে। বঙ্গবন্ধুকে দৈহিকভাবে হত্যা করা হলেও তার মৃত্যু নেই। তিনি চিরঞ্জীব। কেননা একটি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনিই। যতদিন এ রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর তিনি। সমগ্র জাতিকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় প্রস্তুত করেছিলেন ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তাই চিরঞ্জীব তিনি এ জাতির চেতনায়। বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ব্যক্তি নন, এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনে দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। শোষক আর শোষিতে বিভক্ত সেদিনের বিশ্ববাস্তবতায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন শোষিতের পক্ষে। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন তা অবিস্মরণীয়। সেদিন তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই অমর আহ্বানেই স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নিপীড়িত কোটি বাঙালি। সেই মন্ত্রপূত ঘোষণায় বাঙালি হয়ে উঠেছিল লড়াকু এক বীরের জাতি। আবার ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেও বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠেই জাতি শুনেছিল মহান স্বাধীনতার অমর ঘোষণা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ওই রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তাকে বন্দি থাকতে হয় পাকিস্তানের কারাগারে। তার আহ্বানেই চলে মুক্তিযুদ্ধ। বন্দিদশায় মৃত্যুর খবর মাথায় ঝুললেও স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করেননি অকুতোভয় এ মহান নেতা। মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান। বীরের বেশে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। দেশে ফিরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখার পাশাপাশি দেশের মানুষকে উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করেন বঙ্গবন্ধু। দেশগড়ার এই সংগ্রামে চলার পথে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তার দেশের মানুষ কখনও তার ত্যাগ ও অবদানকে ভুলে যাবে না। অকৃতজ্ঞ হবে না। নবগঠিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু তাই সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের সাধারণ বাড়িটিতেই বাস করতেন। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা একের পর এক চক্রান্তের ফাঁদ পেতেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর বিপথগামী উচ্চাভিলাষী কয়েকজন সদস্যকে ষড়যন্ত্রকারীরা ব্যবহার করেছে ওই চক্রান্তেরই বাস্তব রূপ দিতে। এরাই স্বাধীনতার সূতিকাগার বলে পরিচিত ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিতে হামলা চালায় গভীর রাতে। হত্যা করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারকে। বিশ্ব ও মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেদিন তারা কেবল বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার সঙ্গে বাঙালির হাজার বছরের প্রত্যাশার অর্জন স্বাধীনতার আদর্শগুলোকেও হত্যা করতে চেয়েছিল। মুছে ফেলতে অপপ্রয়াস চালিয়েছিল বাঙালির বীরত্বগাথার ইতিহাসও। বঙ্গবন্ধুর নৃশংসতম হত্যাকান্ড বাঙালি জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাথা হলেও ভয়ঙ্কর ওই হত্যাকাণ্ডে খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত না করে বরং দীর্ঘ সময় ধরে তাদের আড়াল করার অপচেষ্টা হয়েছে। এমনকি খুনিরা পুরস্কৃতও হয়েছে নানাভাবে। হত্যার বিচার ঠেকাতে কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করেছিল বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার মোশতাক সরকার। ১৯৭৬ সালের ৮ জুন ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকার দায়ে অভিযুক্ত হত্যাকারী গোষ্ঠীর ১২ জনকে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া হয়েছিল ১. লে. কর্নেল শরিফুল হককে (ডালিম) চীনে প্রথম সচিব,২. লে. কর্নেল আজিজ পাশাকে আর্জেন্টিনায় প্রথম সচিব,৩. মেজর এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকে আলজেরিয়ায় প্রথম সচিব,৪. মেজর বজলুল হুদাকে পাকিস্তানে দ্বিতীয় সচিব,৫. মেজর শাহরিয়ার রশিদকে ইন্দোনেশিয়ায় দ্বিতীয় সচিব,৬. মেজর রাশেদ চৌধুরীকে সৌদি আরবে দ্বিতীয় সচিব,৭. মেজর নূর চৌধুরীকে ইরানে দ্বিতীয় সচিব,৮. মেজর শরিফুল হোসেনকে কুয়েতে দ্বিতীয় সচিব,৯. কর্নেল কিসমত হাশেমকে আবুধাবিতে তৃতীয় সচিব,১০. লে. খায়রুজ্জামানকে মিসরে তৃতীয় সচিব,১১. লে. নাজমুল হোসেনকে কানাডায় তৃতীয় সচিব,১২. লে. আবদুল মাজেদকে সেনেগালে তৃতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় মতায় আসীন হলে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ উন্মুক্ত করা এবং নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বিচার সম্পন্ন হয়। জোট শাসনের পাঁচ বছর এই রায় কার্যকরের পথে বাধা সৃষ্টি করে রাখা হলেও বর্তমান মহাজোট সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের পাঁচজনের রায় কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। দণ্ড প্রাপ্ত কয়েক খুনি বিভিন্ন দেশে পালিয়ে রয়েছেন। সেই কালো রাতে যা ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী (রেসিডেন্ট পি এ) জনাব আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম এর এজাহারে বর্ননানুসারে) ১৯৭৫ সালে তিনি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে কর্মরত ছিলেন। ১৪ আগষ্ট (১৯৭৫) রাত আটটা থেকে ১৫ আগষ্ট সকাল আটটা পর্যন্ত তিনি ডিউটিতে ছিলেন ওই বাড়িতে। ১৪ আগষ্ট রাত বারোটার পর ১৫ আগষ্ট রাত একটায় তিনি তাঁর নির্ধারিত বিছানায় শুতে যান। মামলার এজাহারে জনাব মোহিতুল উল্লেখ করে বলেন, ‘তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম তা খেয়াল নেই। হঠাৎ টেলিফোন মিস্ত্রি আমাকে উঠিয়ে (জাগিয়ে তুলে) বলেন, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে ডাকছেন। তখন সময় ভোর সাড়ে চারটা কী পাঁচটা। চারদিকে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধু ফোনে আমাকে বললেন, সেরনিয়াতের বাসায় দুষ্কৃতকারী আক্রমণ করেছে। আমি জলদি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলাম। অনেক চেষ্টার পরও পুলিশ কন্ট্রোল রুমে লাইন পাচ্ছিলাম না। তারপর গণভবন এক্সচেঞ্জে লাইন লাগানোর চেষ্টা করলাম। এরপর বঙ্গবন্ধু ওপর থেকে নিচে নেমে এসে আমার কাছে জানতে চান পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন কেউ ফোন ধরছে না। এসময় আমি ফোন ধরে হ্যালো হ্যালো বলে চিৎকার করছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু আমার হাত থেকে রিসিভার নিয়ে বললেন আমি প্রেসিডেন্ট বলছি। এসময় দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে একঝাঁক গুলি এসে ওই কক্ষের দেয়ালে লাগল। তখন অন্য ফোনে চিফ সিকিউরিটি মহিউদ্দিন কথা বলার চেষ্টা করছিলেন। গুলির তান্ডবে কাঁচের আঘাতে আমার ডান হাত দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। এসময় জানালা দিয়ে অনর্গল গুলি আসা শুরু হলে বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়েন। আমিও শুয়ে পড়ি। কিছুক্ষণ পর সাময়িকভাবে গুলিবর্ষণ বন্ধ হলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ওপর থেকে কাজের ছেলে সেলিম ওরফে আবদুল বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবী ও চশমা নিয়ে এলো। পাঞ্জাবী ও চশমা পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। তিনি (বঙ্গবন্ধু) বললেন আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে তোমরা কি কর? এসময় শেখ কামাল বলল আর্মি ও পুলিশ ভাই আপনারা আমার সঙ্গে আসুন। কালো পোশাক পরা একদল লোক এসে শেখ কামালের সামনে দাঁড়ালো। আমি (মোহিতুল) ও ডিএসপি নূরুল ইসলাম খান শেখ কামালের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নরুল ইসলাম পেছন দিক থেকে টান দিয়ে আমাকে তার অফিস কক্ষে নিয়ে গেল। আমি ওখান থেকে উঁকি দিয়ে বাইরে দেখতে চেষ্টা করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি গুলির শব্দ শুনলাম। এসময় শেখ কামাল গুলি খেয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়লেন। কামাল ভাই চিৎকার করে বললেন, আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, ভাই ওদেরকে বলেন।’ মোহিতুল ইসলামের এজাহারের বর্ণনায় বলেন, ‘আক্রমণকারীদের মধ্যে কালো পোশাকধারী ও খাকি পোশাকধারী ছিল। এসময় আবার আমরা গুলির শব্দ শোনার পর দেখি ডিএসপি নূরুল ইসলাম খানের পায়ে গুলি লেগেছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম আক্রমণকারীরা আর্মির লোক। হত্যাকান্ডের জন্যই তারা এসেছে। নূরুল ইসলাম যখন আমাদেরকে রুম থেকে বের করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন তখন মেজর বজলুল হুদা এসে আমার চুল টেনে ধরলো। বজলুল হুদা আমাদেরকে নিচে নিয়ে গিয়ে লাইনে দাঁড় করালো। কিছুক্ষণ পর নিচে থেকে আমরা বঙ্গবন্ধুর উচ্চকণ্ঠ শুনলাম। বিকট শব্দে গুলি চলার শব্দ শুনতে পেলাম আমরা। শুনতে পেলাম মেয়েদের আত্মচিৎকার, আহাজারি। এরইমধ্যে শেখ রাসেল ও কাজের মেয়ে রুমাকে নিচে নিয়ে আসা হয়। রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আমাকে মারবেনাতো। আমি বললাম না তোমাকে কিছু বলবে না। আমার ধারণা ছিল অতটুকু বাচ্চাকে তারা কিছু বলবে না। কিছুক্ষণ পর রাসেলকে তার মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে রুমের মধ্যে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরপর মেজর বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে বলে, অল আর ফিনিশড।’ অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ফারুক রহমানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেন, খোন্দকার মোশতাকের নির্দেশে তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট তিনি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অভিযান পরিচালনা করেন। ওই বাসভবনে অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল রশিদ দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গভবনে, অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডালিম ছিলেন বেতার কেন্দ্রে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বন্টন করেছেন তিনি (ফারুক) নিজেই। ছোট্ট রাসেলের শেষ আকুতি টলাতে পারেনি খুনীদের মন “আল্লাহ’র দোহাই আমাকে জানে মেরে ফেলবেন না। আমার হাসু আপা দুলাভাইয়ের সঙ্গে জার্মানীতে আছেন। আমি আপনাদের পায়ে পড়ি, দয়া করে আপনারা আমাকে জার্মানীতে তাদের কাছে পাঠিয়ে দিন” মৃত্যুর আগে খুনীদের কাছে এই আকুতি ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের। তবে সেদিন রাসেলের এই আর্তচিৎকারে খোদার আরশ কেঁপে উঠলেও টলাতে পারেনি খুনী পাষাণদের মন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মত এই নিষ্পাপ শিশুকেও পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছিল। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে রাসেলকে হত্যার এই নৃশংস বর্ণনা দিয়েছেন। এম এ ওয়াজেদ মিয়া তার গ্রন্থে লেখেন বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে হত্যার পর রাসেল দৌড়ে নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো বাড়ির কাজের লোকজনের কাছে আশ্রয় নেয়। রাসেলের দীর্ঘকাল দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা আবদুর রহমান রমা তখন রাসেলের হাত ধরে রেখেছিলেন। একটু পরেই একজন সৈন্য রাসেলকে বাড়ির বাইরে পাঠানোর কথা বলে রমার কাছ থেকে তাকে নিয়ে নেয়। রাসেল তখন ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে তাকে না মারার জন্য আল্লাহ’র দোহাই দেয়। রাসেলের এই মর্মস্পর্শী আর্তিতে একজন সৈন্যের মন গলায় সে তাকে বাড়ির গেটে সেন্ট্রিবক্সে লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এর প্রায় আধ ঘণ্টা পর একজন মেজর সেখানে রাসেলকে দেখতে পেয়ে তাকে দোতলায় নিয়ে ঠান্ড মাথায় রিভলবারের গুলিতে হত্যা করে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র দুরন্তপ্রাণ শেখ রাসেল এমন সময়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন যখন তার পিতার রাজনৈতিক জীবনকে দেখতে শুরু করেছিলেন মাত্র। শেখ রাসেলকে হত্যার আগে ঘাতকরা একে একে পরিবারের অন্য সদস্য বড় ভাই শেখ কামাল, শেখ জামাল, মা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব এবং বাবা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। ১৯৬৪ সালের ১৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট ভাই শেখ রাসেল ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশঃ বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক কালো অধ্যায় খুনিদের বাঁচানোর জন্য ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ (যিনি বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রীসভার বানিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন) ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। সেদিন ছিল শুক্রবার। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর আছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর আধ্যাদেশে তত্কালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দেন। অধ্যাদেশটিতে দুটি ভাগ আছে। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবত্ আইনের পরিপন্থী যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাত্ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। এরপর ক্ষমতায় আসে আর এক সামরিক শাসক মেজর জিয়া। তিনি ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এরপর তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ সহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেন। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছিল, "১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হইতে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল তারিখের (উভয় দিনসহ) মধ্যে প্রণীত সকল ফরমান, ফরমান আদেশ, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ, ও অন্যান্য আইন, এবং উক্ত মেয়াদের মধ্যে অনুরূপ কোনো ফরমান দ্বারা এই সংবিধানের যে সকল সংশোধন, সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন ও বিলোপসাধন করা হইয়াছে তাহা, এবং অনুরূপ কোনো ফরমান, সামরিক আইন প্রবিধান, সামরিক আইন আদেশ বা অন্য কোনো আইন হইতে আহরিত বা আহরিত বলিয়া বিবেচিত ক্ষমতাবলে, অথবা অনুরূপ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে গিয়া বা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত কোনো আদেশ কিংবা প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ কার্যকর বা পালন করিবার জন্য উক্ত মেয়াদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আদেশ, কৃত কাজকর্ম, গৃহীত ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ, অথবা প্রণীত, কৃত, বা গৃহীত বলিয়া বিবেচিত আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ এতদ্বারা অনুমোদিত ও সমর্থিত হইল এবং ঐ সকল আদেশ, কাজকর্ম, ব্যবস্থা বা কার্যধারাসমূহ বৈধভাবে প্রণীত, কৃত বা গৃহীত হইয়াছে বলিয়া ঘোষিত হইল, এবং তত্সম্পর্কে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।" পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্য এবং ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন করেন খন্দকার মোশতাক। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে এ দেশের ইতিহাসে বর্বরতম হত্যার তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করে দেন এবং খুনীদের দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার পাশাপাশি কূটনৈতিক দায়িত্ব প্রদান করেন, যা লন্ডনে গঠিত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টেও বলা হয়েছে। এসব হত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন ও বিচারের প্রক্রিয়াকে যে সমস্ত কারণ বাধাগ্রস্ত করেছে সেগুলোর তদন্ত করার জন্য ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তবে সেই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের অসহযোগিতার কারণে এবং কমিশনের একজন সদস্যকে ভিসা প্রদান না করায় এ উদ্যোগটি সফল হতে পারেনি। সে সময়ে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ছিলেন জিয়াউর রহমান। অধ্যাপক আবু সাইয়িদের ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ফ্যাক্টস এন্ড ডুকমেন্টস’ গ্রন্থে এই কমিশন গঠনের বর্ণনা রয়েছে- এতে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, মনসুর আলীর পুত্র মোহাম্মদ সেলিম এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের পুত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের আবেদনক্রমে স্যার থমাস উইলিয়ামস, কিউ. সি.এমপি’র নেতৃত্বে এই কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়। বাংলাদেশ ও বিদেশে অনুষ্ঠিত জনসভাগুলোতে এ আবেদনটি ব্যাপকভাবে সমর্থিত হয়। ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর স্যার থমাস উইলিয়ামসের সভাপতিত্বে হাউজ অব কমন্সের একটি কমিটি কক্ষে এর প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেফ্রি থমাস এবং সলিসিটর এ্যাব্রো রোজ এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ থেকে ব্যাংকক ত্যাগ করার জন্য যে সমস্থ সামরিক বাহিনীর ব্যক্তিরা আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলেন তাদের তালিকা থেকে জড়িত অফিসারদের সনাক্ত করার কথা বলা হয়। পলায়নকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন লে. কর্নেল ফারুক, লে. কর্নেল আব্দুর রশিদ, মেজর শরিফুল হক (ডালিম)। আপাতদৃষ্টিতে অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয় লে. কর্নেল ফারুক, লে.কর্নেল রশিদ ও মেজর শরিফুল হক ডালিমকে। এর আগে ১৯৭৬ সালের ৩০ আগস্ট লন্ডন সানডে টাইম পত্রিকায় বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্য এবং জেলখানায় ৪ নেতার হত্যার দায় স্বীকার করে কর্নেল ফারুকের একটি সাক্ষাত্কার আমলে নিয়ে তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য সন ম্যাকব্রাইডের নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের এপ্রিলে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিশন বাংলাদেশ পরিদর্শন করে এবং রাষ্ট্রপতিসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় জেলহত্যা সম্পর্কে আলোচনা করে। তখন তাদের বলা হয়, আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায় যে, ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বা তার কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশ থেকে ব্যাংককে পলাতক হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের কূটনৈতিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এসব ঘটনা ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় যে, আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলার পথে কি অন্তরায় রয়েছে সে সম্পর্কে সরেজমিনে তদন্তের উদ্দেশ্যে কমিশনের একজন সদস্যের ঢাকা সফর করা আবশ্যক। সিদ্ধান্ত হয় কমিশনের সদস্য জেফ্রি থমাস, কিউসি একজন সাহায্যকারীসহ সরেজমিনে তদন্ত অনুষ্ঠানের জন্য ১৯৮১ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকা যাবেন। তারা এ লক্ষ্যে ঢাকা গমনের ভিসা লাভের জন্য তদন্ত কমিশনের সচিব ও সলিসিটর এ্যাব্রো রোজের মাধ্যমে দরখাস্ত পেশ করেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সময় মত ভিসা প্রদান করা হবে বলা হয়। উল্লেখিত তারিখে সকালে ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজের সন্ধ্যায় ফ্লাইটের সুযোগ গ্রহণ করতে দেয়ার লক্ষ্যে অনুরোধ জানালে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন জানায় যে, পাসপোর্ট ও ভিসা ওইদিন অপরাহ্নে ফেরত দেয়া হবে। অপরাহ্নে এগুলো চাওয়া হলে কন্স্যুলার বিভাগ বন্ধ বলে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয় যে, তারা জেফ্রি থমাসের ঢাকা ভ্রমণের জন্য ভিসা দিতে রাজি নয়। ভিসা না দেয়ার ঘটনায় কমিশন এ সিদ্ধান্তের উপনীত হয় যে, আইন ও বিচারের প্রক্রিয়া স্বীয় গতিতে চলতে দেয়া হয়নি এবং প্রক্রিয়াটিকে বাধা সৃষ্টি করার জন্য তত্কালীন জিয়াউর রহমানের সরকারকেই দায়ী করা হয়। সূত্র: আওয়ামী লীগ ওয়েবসাইট     এসি  

টুঙ্গিপাড়ায় চট্টগ্রামী মেজবানের আয়োজন করেছেন নওফেল

বাবা নেই, কিন্তু ছেলে তো অাছে। কাজের মধ্য দিয়ে তিনি জীবিত রাখতে চান বাবাকে। অার তাই বাবার দীর্ঘদিনের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। চট্টগ্রামের প্রয়াত রাজনীতিবিদ মহিউদ্দিন চৌধুরীর পুত্র ব্যারিস্টার নওফেলের কথা। যিনি কেন্দ্রীয় অাওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। আশির দশক থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে তার জন্মস্থান টুংগিপাড়ায় চট্টগ্রামী মেজবানের অায়োজন করে থাকেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মাথায় হুলিয়া নিয়ে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায়ও ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সাধ্যমতো সাধারণ মানুষের জন্য আপ্যায়নের আয়োজন করতেন তিনি। এবার তিনি নেই। গত বছর তিনি মারা গেছেন। তবে মহিউদ্দিনের অবর্তমানে তার কাজ থেমে যাক- এমনটি চাননা তার পুত্র ব্যারিস্টার মজিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। তাই কেন্দ্রীয় অাওয়ামী লীগের এই তরুণ নেতা এবার মেজবানের আয়োজন করেছেন। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন মহিউদ্দিন চৌধুরী চ্যারিটেবল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১৫ আগস্ট দুপুরে টুঙ্গিপাড়ায় এ অায়োজন হতে যাচ্ছে। ৪০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানে অংশ নিয়ে খেতে পারবেন বলে জানা যায়। অন্যান্য বছর মহিউদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা টুঙ্গিপাড়ায় যেতেন। এবার নেতাকর্মীরা যাচ্ছেন নওফেলের নেতৃত্বে। তাদের মধ্যে মহিউদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা মহিউদ্দিন, ছোট ছেলে বোরহানুল হাসান চৌধুরী সালেহীনসহ পরিবারের সব সদস্যরাও রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রয়াত মহিউদ্দিন চৌধুরীর একান্ত সহকারী ওসমান গণি। ব্যারিস্টার নওফেল একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, সত্তরের দশকের শেষদিকে আমার বাবা যখন ভারত থেকে দেশে ফেরেন, তখন থেকেই প্রতিবছর তিনি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবসে টুঙ্গিপাড়া যাচ্ছেন। আশির দশকের মাঝামাঝি, সম্ভবত ৮৪ সাল থেকে বাবা টুঙ্গিপাড়ায় মেজবানের আয়োজন করে আসছিলেন। তখন টুঙ্গিপাড়ায় রাস্তাঘাট উন্নত ছিল না। বড়ো আকারের আয়োজন করা যেত না। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় জেলেও ছিলেন। আবার রাজনৈতিক হুলিয়া মাথায় নিয়েও গেছেন। দু’য়ে কবছর ব্যতিক্রম বাদে বাবা প্রতিবছরই টুঙ্গিপাড়া গেছেন। নওফেল অারও বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টুঙ্গিপাড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়। ১৯৯৮ সাল থেকে বাবা প্রতিবছরই টুঙ্গিপাড়ায় বড় আকারের মেজবান আয়োজন করে আসছেন। যারা বঙ্গবন্ধুর মাজারে শ্রদ্ধা জানাতে যান তাদের এবং গ্রামবাসী মিলিয়ে প্রতিবছর প্রায় অর্ধলক্ষ লোককে তিনি খাইয়েছেন। এই কাজটা আমাদের পরিবারের কাছে আমার বাবার স্মৃতি। এই স্মৃতিটুকু আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই। ১৫ আগস্ট দুপুরে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কলেজ ও বালিয়াডাঙ্গা স্কুল মাঠে মেজবান অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। সার্বিক বিষয় তদারকির জন্য মহিউদ্দিনের ছেলে সালেহীন এবং একান্ত সহকারী ওসমান গণি গত শনিবারই টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছে গেছেন। তাদের সঙ্গে গেছেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত বাবুর্চি মোহাম্মদ হোসেন। তার টিমে অার ৪০ জন সহকারী বাবুর্চি কাজ করছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে ওসমান গণি বলেন, এবারও ৪০ হাজার মানুষের জন্য মেজবানের আয়োজন করা হয়েছে। ৩০ হাজার মুসলিম এবং ১০ হাজার অমুসলিমের জন্য খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইতোমধ্যে ২০টি গরু কেনা হয়েছে। ৩ হাজার পিস মুরগিও কেনা হয়েছে। ওসমান গণি বলেন, প্রতিবছর স্যার ( মহিউদ্দিন চৌধুরী) টেলিফোনে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখতেন। বিভিন্ন নির্দেশনা দিতেন। এবার স্যার নেই। স্যারের অভাববোধ করছি। মঙ্গলবার বিকেল তিনটায় নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ ময়দান থেকে দুটি বাস, তিনটি জিপ এবং কয়েকটি মাইক্রোবাসে করে নেতাকর্মীরা টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত এখনো তারা টুঙ্গিপাড়ায় না পৌঁছালেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছাবেন বলে অাসা করা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে জানান, ১৫ আগস্ট সকালে নেতকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। এরপর মেজবান অনুষ্ঠিত হবে।তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর আমাদের নেতা (এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী) নেতৃত্বে আমরা জাতির জনকের মাজারে যেতাম। এবার নেতা নেই। নেতার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর আমরা টুঙ্গিপাড়ায় যাব। প্রতিবছর মেজবানের আয়োজন হবে।’ চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শফিক আদনান ও প্রচার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক, মাহবুবুল হক সুমন, নগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরসহ বিভিন্ন থানা-ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মীরা টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে এর প্রতিবাদে তৎকালীন শ্রমিক নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী দেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। বিষয়টি তৎকালীন সামরিক সরকার জানার পর তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। তখন মহিউদ্দিন নিজের অনুসারীদের নিয়ে ভারতে পাড়ি জমান এবং সেখান থেকে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন।তবে ভারতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন। ১৯৭৭ সালে তিনি টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর কবরটি পাকা করে দেন। এরপর থেকে প্রতিবছর তিনি ১৫ আগস্টে টুঙ্গিপাড়া চলে যান। ১৯৯৮ সালের ১৫ আগস্ট থেকে সেখানে বড় পরিসরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের আয়োজন করে আসছেন মহিউদ্দিন। অা অা// এসএইচ/

বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ ১৯৭৫   

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যারা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছিলেন তাদেরকে নিয়ে একুশে টেলিভিশনের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ ১৯৭৫’।    যারা ওই সময় হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের মধ্যে তৎকালিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অজয় দাশগুপ্ত, ওই সময়ের বরগুনা মহকুমা প্রশাসক সিরাজউদ্দিন আহমেদ, সাবেক আবাহনীর ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু ও ময়মনসিংহ জেলার ছাত্র বিশ্বজিৎ নন্দী। তারা এই অনুষ্ঠানে এসে ওই সময়ের স্মৃতিচারণ করেন।   বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে তারা ওই সময় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে এসে তারা তাদের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। নানা বাধা বিপত্তি জেল মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তারা প্রতিবাদ থেকে পিছুটান দেননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসীম ভালোবাসায় ফাঁসির দণ্ডকেও মাথা পেতে নিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা করেছেন রঞ্জন মল্লিক। ১৫ আগস্ট একুশে টেলিভিশনে বুধবার রাত ১০টায় অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হবে।    এসি     

‘পাকিস্তান জন্মের দিনই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন’

ড. নূহ উল আলম লেনিন। ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে যোগ দেন তার দলে। একে একে তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, প্রচার সম্পাদক, প্রেসিডিয়াম সদস্যের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে আওয়ামী লীগের একমাত্র মুখপত্র `উত্তরন`র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক জীবনে নানা ভাবে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্টতা পেয়েছেন। সাক্ষী হয়েছেন অনেক কিছুর। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত বার্ষিকীতে তাই একুশে টেলিভিশন অনলাইনের পক্ষ থেকে মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে অনেক অপ্রিয় সত্য কথাও। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টেলিভিশন অনলাইন প্রতিবেদক আলী আদনান। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় কবে কীভাবে? ড. নূহ উল আলম লেনিন: বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার পরিচয় দু`ভাবে। প্রথমত তার সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে অনেক অনেক শোনা, দ্বিতীয়ত তার সঙ্গে সরাসরি দেখা সাক্ষাৎ। আমার বাবা আবদুর রহমান মাষ্টার বামপন্থী রাজনীতিতে সরাসরি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সরকারকে যখন ৯২ ( ক) ধারায় ভেঙ্গে দেওয়া হল তখন আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কারাগারে ছিলেন। তখনো তিনি `বঙ্গবন্ধু` হননি। সেই হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের শৈশবের পরিচয় বাবার মাধ্যমে। জেলখানার নানা কাণ্ড কারখানা, গল্প, সাহস, সবাইকে মাতিয়ে রাখা - এসব ছিল বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তখন রাজনীতি নিয়ে আলাপ করার বয়স আমাদের না হলেও আমরা শুনতে শুনতে অনেক কিছু জেনেছিলাম। বিভিন্ন পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপ হতো। ১৯৬২ সালের পরে বিভিন্ন এলাকায় বঙ্কবন্ধু ঘুরে বেড়াতেন। সেসব ছবি পত্রিকায় আসত। আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে চিন্তার জগতে এভাবেই জড়িয়ে যাই। বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি দেখি ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুথানের সময়। ওই বছর তিনি যেদিন জেল থেকে মুক্তি পান সেদিন আমি ঢাকার বাইরে ছিলাম। রাজনীতির কারণে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যেসব নির্বাচনী সভাগুলো করেছিলেন সেগুলোতে কম বেশী আমি বক্তৃতা শুনেছি। কখনো কখনো সঙ্গে ছিলাম। ৭ মার্চের ভাষণ রেসকোর্সে উপস্থিত হয়ে আমরা কয়েকজন একসঙ্গে শুনি। আমি, তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। আমি তখন ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক। এখানে না বললেই নয়, আমার বাবা যদিও বাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তথাপি বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করতেন। আমাদের পরিবারের রাজনৈতিক কূলগুরু বলে খ্যাত কৃষক নেতা জীতেন ঘোষ ( যিনি জীবনে ৩৬ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনেই তার জীবন ব্যয় হয়েছে।) বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নানা সময় প্রশংসা করতেন। তারা দু`জনেই বলতেন বঙ্গবন্ধু ভিন্ন মতাদর্শী হলেও বড়দের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল। ফলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি এক ধরণের সফট কর্ণার আমাদের আগে থেকেই ছিল। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে আপনারা তো ‘মতিয়া গ্রুপে’ ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি মতিয়া গ্রুপের রাজনৈতিক মনোভাব কেমন ছিল? ড. নূহ উল আলম লেনিন: ছয় দফার কারণে বঙ্গবন্ধুর প্রতি মতিয়া গ্রুপের মনোভাব ছিল সমর্থন সূচক। মূলত: সেই সমর্থনের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে নাহিদ- মুজাহিদ- লেনিন পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আপনারা কোন নীতি অনুসরণ করেছিলেন। মুজিব বাহিনীতে যোগ দেওয়ার কোন সুযোগ তো আপনাদের ছিল না। ড. নূহ উল আলম লেনিন: মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের ইন্দিরা সরকার সিদ্ধান্ত নেয় মুজিব নগরে যেই অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছে ( বঙ্গবন্ধু যে সরকারের রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দিন যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী) সেই সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও শরনার্থীদের আশ্রয় দেবে। প্রথমদিকে আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ব্যতীত অন্য দলের সমর্থক বা কর্মীদের মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে অস্থায়ী সরকারের প্রবল আপত্তি ছিল। মার্কসবাদী দর্শনে দিক্ষিত ছেলেদের হাতে অস্ত্র আসুক সেটা কেউ তখন চায়নি। একটা সন্দেহ ছিল, ভয় ছিল। তবে পরে সেই পলিসি চেঞ্জ করে। যখন ছয় জনের একটা উপদেষ্টা পরিষদ করা হয়। সেই উপদেষ্টা পরিষদে ন্যাপের মোজাফফর আহমদ যেমন ছিলেন তেমনি কম্যুনিস্ট পার্টির মণি সিংও ছিলেন। এর আগ পর্যন্ত আমরা ট্রেনিং এর সুযোগ পাই নাই। ইন্দিরা সরকার, মুজিব নগর সরকার ও আমাদের মধ্যে মতামতের ঐক্য স্থাপিত হওয়ার পরেই আমরা সুযোগটা পাই। আমরা আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাদের ছেলেদের কোনো পরিচয় ছাড়া যুদ্ধে যোগদান করানো। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী নয়; ছাত্র হিসেবে যোগদান করা। অবশ্য পরে যখন সরকার পলিসি পরিবর্তন করে তখন ন্যাপ- ছাত্র ইউনিয়ন- সিপিবি নিয়ে যৌথ কমান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। আমাদের সামরিক শাখার প্রধান ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ। আমাকে দেশের ভেতরে রাখা হয়েছিল রিক্রুট করার জন্য। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাম রাজনৈতিক কর্মীরা কী যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছিলেন? নাকি কোনো বৈষম্যের শিকার হয়েছেন? ড. নূহ উল আলম লেনিন: ছাত্র ইউনিয়ন করলেও পরে এফএফ ( FF) করেছে, সাহসী ভূমিকা রেখেছে তারা স্বীকৃতি পেয়েছে। হাতের কাছেই অন্যতম উদাহরণ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। তিনি ছাত্র ইউনিয়ন করতেন। কিন্তু বীর বিক্রম উপাধি পেয়েছেন। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আমরা আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আপনার পরিচয় নিয়ে কথা বলছিলাম। ড. নূহ উল আলম লেনিন: বঙ্গবন্ধু যেদিন স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলেন সেদিন আমরা সেখানে ছিলাম। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতি, আমি সহ সভাপতি, কাইয়ুম মুকুল ( প্রথম অালোর কাইয়ুম মুকুল) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরবর্তী সম্মেলন অর্থাৎ ১৯৭৩ সালের নভেম্বরের সম্মেলনেও বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথি ছিলেন। সেই সম্মেলনে আমি সভাপতি ও মাহবুব জামান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৭২-এর সম্মেলনের পর থেকে আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। তার কোনো লেখা জোখা হিসেব নেই। হিসেব করা সম্ভবও নয়। আমাদের চার জনের জন্য গণভবনে পাস লাগতো না। আমি, সাধারন সম্পাদক কাইয়ুম মুকুল, ডাকসু ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ডাকসু জিএস মাহবুব জামান। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: আপনাদের ঘনিষ্টতা নিয়ে বলতে পারেন। ড. নূহ উল আলম লেনিন: এখনো মনে উঠলে নিজে নিজে হাসি, কত ছেলেমানুষি করেছি আমরা। জগন্নাথ হলে খাওয়ার টেবিলে ছাত্রলীগ - ছাত্রইউনিয়নে বাকবিতন্ডা হচ্ছে। মারামারি হওয়ার উপক্রম। আমি গিয়ে ফোন করে ফেললাম ৩২ নম্বরে। তিনি বললেন, তুই আয়। আমি গেলাম। তিনি তোফায়েল ভাইকে ডাকলেন। তোফায়েল ভাইকে বললেন, এসব গন্ডগোল থামা। এখন ভাবি, জাতির জনককে আমি খাওয়ার টেবিলের ঝগড়া থামানোর জন্য ফোন করতাম!! আজকের দিনে কেউ এমন কথা কল্পনা করতে পারবে!! একুশে টেলিভিশন অনলাইন: অন্য মতাদর্শের রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি তাঁর স্নেহসুলভ যে মনোভাব- তা এখনকার সময়ে ভাবা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই পরিবর্তনের পেছনে কারণ কী? ড. নূহ উল আলম লেনিন: পাকিস্তান আমলে বিপরীত মতাদর্শের লোকদের প্রতি রাজনৈতিক মতানৈক্য ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল খুবই সহনশীল। মূল্যবোধের জায়গাটা খুব স্ট্রং ছিল। মুক্তুযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও এটা ছিল। চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ( ফাঁসিতে দন্ডিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাবা) কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর ছাত্র জীবনে বঙ্গবন্ধুর নেতা ছিলেন। `অসমাপ্ত আত্মজীবনী`তে তার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অনেক পজিটিভ কথা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী জেলখানায়। বঙ্গবন্ধু জানতেন ফজলুল কাদের চৌধুরী হাভানা চুরুট খায়। কিন্তু জেলখানায় হাভানা চুরুট কে দেবে? বঙ্গবন্ধু জেলখানায় হাভানা চুরুট পাঠাতেন। সবুর খাঁ জেলখানায় থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু তার খোঁজ খবর নিতেন। মোহাম্মদ তোহা। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। সশস্ত্র সংগ্রাম করার চেষ্টা করছে। বঙ্গবন্ধু খবর নিলেন তোহার পরিবার খেয়ে আছে নাকি না খেয়ে আছে। গণভবন থেকে বের হয়ে গোপনে নওয়াবপুর রোডে তার পরিবারকে অর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছেন। বঙ্গবন্ধু যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন ওই পরিবারকে আর্থিক সহায়তা করেছেন। তোহাকে গোপনে ডেকে এনে বলেছেন, তোহা, কেন পাগলামি করছিস? তোরা কিছুই করতে পারবি না। মজার বিষয় হচ্ছে তোহাকে যখন ডেকে এনে বুঝিয়েছেন তখনো তোহার মাথার উপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। কিন্তু তাঁকে এ্যারেস্ট করান নাই। এই হচ্ছে বঙ্গবন্ধু। অন্য দশজন সাধারন মানুষের সাথে তাঁকে তুলনা করা যায় না। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: কিন্তু ইতিহাস তোহার কথা মনে রাখেনি। মনে রেখেছে সিরাজ শিকদারের কথা। ড. নূহ উল আলম লেনিন: সিরাজ শিকদার সমস্ত পরিস্থিতিটা ঘোলাটে করে ফেলেছিল। ছাত্রলীগ যুবলীগের শত শত নেতাকর্মীকে হত্যা করেছে। সিরাজ শিকদারের অপকর্মের প্রধান এলাকা ছিল লৌহজং- শ্রী নগর এসব অঞ্চল। সিরাজ শিকদার কীভাবে মানুষকে ধরে নিয়ে অত্যাচার করেছে তা আমরা জানি। সুতরাং সিরাজ শিকদার ভিন্ন বিষয়। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ওই সময়ে ওই প্রেক্ষাপটে টুঙ্গিপাড়া থেকে আসা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে বঙ্গবন্ধু। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ ( পরবর্তীতে যা চার মূলনীতি হয়ে সংবিধানে প্রতিস্থাপিত হয়) তাঁর মধ্যে কীভাবে এলো? ড. নূহ উল আলম লেনিন: পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে দুটো ধারা স্পষ্ট ছিল। নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক বলয় যেমন ছিল তেমনি আবুল হাসিমদের ( বদরুদ্দীন উমরের বাবা) প্রগতিশীল বলয়ও ছিল। প্রগতিশীল বলয়টি নানা কারণে পাকিস্তান দাবি করেছে সত্য কিন্তু গোঁড়ামিকে কোন প্রশ্রয় দেয়নি। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে যুক্ত বাংলা (অভিন্ন বাংলা) করার যে প্রস্তাব ছিল সেই আন্দোলনেও কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন। সুতরাং বেসিক্যালি তিনি অসাম্প্রদায়িক। ১৯৪৭ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে তিনি বাঙালি ছেলেদের একটি সভা ডেকেছিলেন। সেখানে অনেক বামপন্থী ছিলেন। যেমন সৈয়দ নুরুদ্দীন, শহীদুল্লাহ কায়সার এরকম আরও অনেকে। বঙ্গবন্ধু তাদের বললেন, `পাকিস্তান তো হইয়া যাইতাছে। যাইতাছি তো ঢাকায়। কিন্তু কী করব গিয়া? আমার কথা পরিষ্কার। ওদের সঙ্গে থাকা যাবে না। অর্থাৎ পাকিস্তানের জন্মলগ্নেই তিনি বুঝেছিলেন, ওদের সঙ্গে আমাদের হবেনা। বিদেশী সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে অন্নদাশঙ্কর রায় সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। দু`জনে একই প্রশ্ন করেছিলেন। প্রশ্নটি হলো, আপনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন কবে প্রথম দেখেছিলেন? দু`জনকেই তিনি বলেছেন যেদিন পাকিস্তান হয়েছে সেদিন থেকে অামি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি। অতএব অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনা তার মনে, মগজে নিহিত ছিল। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ১৫ আগস্ট কী দেশ-বিদেশের ষড়যন্ত্রের অনিবার‌্য বাস্তবতা ছিল? ড. নূহ উল আলম লেনিন: ১৫ আগস্ট অনিবার্য ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা চক্রান্ত অনিবার্য ছিল এবং তা হয়েছেও বটে। ১৫ আগস্টে শত্রুরা সফল না হলে পরে আবার সফল হওয়ার চেষ্টা তারা করত। দীর্ঘদিন ধরে চলা চক্রান্তে মোস্তাক গং সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তবে ১৫ আগস্টের জন্য বঙ্গবন্ধুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, দলের লোকদের প্রতি অন্ধবিশ্বাসও দায়ী। শত্রুরাও জানত বঙ্গবন্ধু তাদের অন্ধবিশ্বাস করে। দেশী বিদেশী নানা রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, ইন্দিরা গান্ধী, ভারতীয় র`এর চীফ, আমাদের তখনকার বাম নেতৃবৃন্দ সবাই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু অন্ধ স্নেহ, আবেগ কাল হয়ে দাঁড়াল। একুশে টেলিভিশন অনলাইন: ১৫ আগস্টে আপনাদের ভূমিকা কেমন ছিল। ড. নূহ উল আলম লেনিন: ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আচার্য হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে আসার কথা। তার আগের রাতে আমরা সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাজগোজের কাজে ব্যস্ত। শেখ কামাল অনেক রাত পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে ছিলেন। যেহেতু তিনি নববিবাহিত তাই আমরা তাকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করছিলাম। তিনি যেতে চাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত চা খেয়ে অনেক রাতে বিদায় নেয়। পরের দিন ভোরে যখন রেডিওতে মেজর ডালিমের সেই স্পর্ধিত কন্ঠ শুনি - ` শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে` তখন আমরা তাৎক্ষণিক করনীয় জানতে জাতীয় ছাত্রলীগের কনভেনর শেখ শহীদুল ইসলামের বাসায় ছুটে যাই। তিনি তখন থরথর করে কাঁপছিলেন। বললেন, আমার পক্ষে এখন কোনো নির্দেশ দেওয়া সম্ভব নয়। তখন আমরা দু`ভাগে ভাগ হয়ে যাই। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমরা যান কম্যুনিস্ট পার্টির নেতাদের কাছে। আর আমি ও চন্দন চৌধুরী যাই ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের কাছে। ওই বাসা থেকে আমি তোফায়েল ভাই সহ কয়েকজনকে ফোন করি। কিন্তু কাউকে পাইনা। মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই বললেন, তোমরা আপাতত ধৈর্য্য ধর। দেখি পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। এরপর আমরা ছাত্র ইউনিয়ন নেতা পঙ্কজদা`র বাসায় যাই। সেখানে বসে আমরা নতুন সরকারের শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান শুনি। / এআর /

আজ থেকে সর্বনিম্ন কলরেট চালু

বাংলাদেশে আজ থেকে শুরু হচ্ছে সর্বনিম্ন মোবাইল কলরেট। এখন থেকে সব অপারেটরে কলরেট হসেবে ৪৫ পয়সা করে কাটা হবে। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য অনেক গবেষণা করে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক কমিশন বা বিটিআরসির দাবি। বিটিআরসি`র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জহুরুল হক বলছিলেন,উদাহরণ হিসেবে এতোদিন একজন গ্রাহক গ্রামীণফোন থেকে অন্য অপারেটরে কথা বললে কলরেট ছিল অনেক বেশি। এখন যার সাথেই কথা বলা হোক কলরেট ৪৫ পয়সা কাটা হবে। তিনি বলে এতে করে একটা সুবিধা হবে। যেমন যারা একটু দুর্বল অপারেটর তারা একটু শক্তিশালী হতে পারবে। তিনি জানান, আগে গ্রামীণ টু বাংলালিংক নাম্বারে কথা বললে ৬০ থেকে ৭০ পয়সা হতো। আর গ্রামীণফোন থেকে গ্রামীণফোনে কথা বললে ২৫ পয়সা হতো। সারা বিশ্বে মোবাইল কলরেটের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। আমরা অনেক দিন ধরে স্টাডি করছিলাম, এর ফলে এখন অন্য অপারেটরগুলো ব্যবসা করতে পারবে। ফলে এখন যেকোন অপারেটরে ফোন করলে প্রতি মিনিট রাত-দিন ৪৫ পয়সা কলরেট হবে। এতে সার্বিকভাবে গ্রাহকের সুবিধেই হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। সূত্র-বিবিসি আরকে//

সাড়ে ৮ লাখ প্রি-পেমেন্ট মিটার বসছে ঢাকায় 

বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আট লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের জন্য একটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।   এই স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের জন্য প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে ৬৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নে হবে ৬০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা। সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে ব্যয় হবে ৫০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। মঙ্গলবার (১৪ আগস্ট) শেরে বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়। সভা শেষে প্রকল্পগুলো নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা সচিব জিয়াউল ইসলাম, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম প্রমুখ। পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় আট লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে খরচ হবে ৬৫৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৬০৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৫০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচ হবে। মন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে বিদ্যুতের উৎপাদন ২০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে তা ১৯ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। চলতি বছর শেষে ২০ হাজার মেগাওয়াটের উপরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবো। প্রকল্পটির মাধ্যমে ঢাকা জেলার রমনা, জিগাতলা, ধানমন্ডি, আদাবর, পরিবাগ, কাকরাইল, বনশ্রী, মগবাজার, শ্যামলী, কামারাঙ্গীরচর, বাংলাবাজার, নারিন্দা, পোস্তগোলা ও ডেমরা এবং নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা, শীতলক্ষ্যা ও সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলায় প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন করা হবে। ফলে বর্তমান পোস্ট পেইড মিটারিং সিস্টেমে প্রচুর কারিগরি ও অকারিগরি সিস্টেম লস হতো এবং বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকতো। এখন সেটি আর থাকবে না। এসি     

রাইফার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ কেন নয়: হাইকোর্ট

শিশু রাইফা খানের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় মারা যাওয়া রাইফার বাবার করা এক রিট আবেদনে প্রাথমিক শুনানি নিয়ে এ রুল জারি করা হয়। মঙ্গলবার বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ এনাম। গত বৃহস্পতিবার রাইফার বাবা দৈনিক সমকালের সাংবাদিক মোহাম্মদ রুবেল খান এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন। ব্যারিস্টার এনাম জানান, চট্টগ্রামের বেসরকারি ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসকের অবহেলায় শিশু রাইফা খানের মৃত্যর ঘটনায় তার পরিবারকে কেন যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না, অবহেলায় হাসপাতালসহ জড়িত ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কেন যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে না এবং চিকিৎসার অবহেলায় বা ভুল চিকিৎসায় মারা গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য কেন নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। চার সপ্তাহের মধ্যে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল), বাংলাদেশ মেডিকেল এবং ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি, ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ৩ চিকিৎসককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। আরকে//  

© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি