ঢাকা, শনিবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ১৭:১৫:২৬

জুমআর দিন সকল দিনের সরদার

জুমআর দিন সকল দিনের সরদার

মহান আল্লাহতায়ালা মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্ণতা দান করেছিলেন শুক্রবারে। এই দিনেই জান্নাতে একত্র করেছিলেন জাতির পিতা হযরত আদম আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হাওয়া আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। এই দিনে ইবাদতের জন্য মসজিদে একত্র হয় মুসলিম উম্মাহ। এই দিনটির অশেষ ফজিলতের কারণে দিনটিকে মুসলিম উম্মাহ’র সাপ্তাহিত ঈদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। হযরত আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযির (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, জুমআর দিন সকল দিনের সরদার। মহান আল্লাহর নিকট সকল ‍দিনের চেয়ে মর্যাদাবান জুমআর দিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুমআর দিন সর্বোত্তম। এই দিন আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিন তাকে জান্নাত থেকে বের করে দেয়া হয়েছে, জুমার দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (মুসলিম, তিরমিজি, নাসাঈ, আবু দাউদ) হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি জুমআর দিন জানাবত (ফরজ) গোসলের মত গোসল করে সালাতের জন্য আগমন করে, সে যেনো একটি উট কুরবানী করলো। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমন করে, সে যেন একটি গাভী কুরবানী করলো। যে ব্যক্তি তৃতীয় পর্যায়ে যে আগমন করে, সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করলো। চতুর্থ পর্যায়ে যে আগমণ করে সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করলো। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমণ করলো সে যেন একটি ডিম কুরবানী করলো। পরে ইমাম যখন খুতবা প্রদানের জন্য বের হয় তখন ফেরেশতাগণ জিকির শোনার জন্য হাজির হয়ে থাকেন। পবিত্র এই দিনটির ফজর থেকে মাগরীবের মধ্যবর্তী সময়ে সূরা ইয়াছিন, সূরা হুদ, সূরা কাহাফ এবং সূরা দোখান তেলাওয়াত করলে বিশেষ ফজিলত পাওয়া যায় বলে হাদিস শরিফের বর্ণিত আছে। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, জুমার দিন সূরা হুদ পাঠ করো। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে তার জন্য এক জুমআর থেকে অন্য জুমআ পর্যন্ত বিশেষ নূরের বাতি জ্বালানো হবে। তিবরানি শরিফে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি জুমআর দিনে বা রাতে সূরা দোখান তেলাওয়াত করে আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য জান্নাতে একটা বিশেষ মহল বানাবেন। জুমআর দিনের ফজিলত শেষ নবীর উম্মতের জন্য অত্যান্ত বড় নেয়ামত। চলুন, এই দিনে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, হাদিস অধ্যয়ন, তাসবিহ তাহলিলসহ ইবাদত বন্দেগিতে মনযোগ দিই।   লেখক : শিক্ষার্থী, এমবিবিএস ( ৩য় বর্ষ), রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ।   //এমআর
শেষ হলো জোড় ইজতেমা

আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হলো চারদিনের জোড় ইজতেমা। সোমবার বিকালে টঙ্গীর তুরাগ তীরে অনুষ্ঠিত আসরের নামাজের পর বাংলাদেশের মাওলানা মোহাম্মদ যোবায়ের জোড় ইজতেমার মোনাজাত পরিচালনা করেন। বিশ্ব ইজতেমার মুরুব্বি গিয়াস উদ্দিন জানান, শুক্রবার বাদ ফজর মাওলানা রবিউল হকের আম বয়ানের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় জোড় ইজতেমা। বিশ্ব ইজতেমা সুন্দর ও সফলভাবে সম্পন্ন করতে প্রতি বছর বিশ্ব ইজতেমার ময়দানে পাঁচদিনের জোড় ইজতেমার আয়োজন করা হয়। তিনি বলেন, এবারও পাঁচ দিনব্যাপী জোড় ইজতেমা হওয়ার কথা থাকলেও তা চার দিনব্যাপী হয়। সোমবার আসরের নামাজের পর আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে জোড় ইজতেমার আনুষ্ঠানিকতা। জোড় ইজতেমায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় পৌনে দুই লাখ মুসল্লি অংশ নেন।   আর/টিকে  

ভোলার আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন নিজাম-হাসিনা মসজিদ

মানবতার কল্যাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন। সমাজসেবক ও সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদ এ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। অসহায়, অনাথ, এতিম ও নিঃস্বদের যাহায্য করাই এ ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য। ফাউন্ডেশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হচ্ছে নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন মসজিদ। সমজিদটি ভোলায় নির্মিত হয়েছে। এ মসজিদটিকে দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ আধুনিক মসজিদ হিসেবে মনে করা হয়।  জানা গেছে, মানবতার কল্যাণে নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশন একটি চক্ষু হাসপাতাল, ১৫টি মসজিদ, এতিমখানা, একটি বৃদ্ধাশ্রম এবং একাধিক  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাসহ অসংখ্য সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেছে। এগুলোর মধ্যে নিজাম-হাসিনা মসজিদটি প্রায় দেড় একর জমির ওপর নির্মিত ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহযোগিতায়। বাহারি কারুকাজ আর সৌর্ন্দযমণ্ডিত মসজিদটি দেখতে রোজ হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান এখানে। মারবেল পাথরসহ বিভিন্ন পাথরে কারুকাজে নির্মিত দ্বিতল এই মসজিদে রয়েছে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা অজুখানা ও নামাজের স্থান। ২০১৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর,শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের মাধ্যমে এ  মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু। ফাউন্ডেশন সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ১ লা জুন মাসে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৫২ হাজার শ্রমিকের মসজিদটি নির্মাণ করতে সময় লেগেছে প্রায় সাত বছর। আর্কিটেক্ট ফোরামের ডিজাইনার কামরুজ্জামান লিটন মসজিদটির নকশা করেন। ১২০ ফুট উচ্চতার মিনার এবং প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতার গম্বুজ রয়েছে মসজিটিতে। মসজিদের ভেতরে রয়েছে লাইব্রেরি, হিফজখানা, ক্যালিগ্রাফি ও আল্লাহু ডিজাইনের ফোয়ারা। এ ছাড়া মসজিদের চার পাশে ফুলের বাগান তৈরি করা হয়েছে। মসজিদে একসঙ্গে দুই হাজার পাঁচশ’ জন মুসল্লি একই সময়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও পানির সুবিধার পাশাপাশি রয়েছে নিজস্ব জেনারেটরব্যবস্থা। রয়েছে এসি ও ফ্যান। এছাড়া বিছানো হয়েছে শ্বেত পাথরের টাইলস ও কার্পেট। রাতের বিভিন্ন রং ও বর্ণের আলোকসজ্জা মসজিদটির সৌন্দর‌্য বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুন। স্থানীয়রা জানান, দক্ষিণাঞ্চলে এটি প্রথম কোনো আধুনিক মসজিদ, যা দ্বীপজেলা ভোলা শহরের প্রাণকেন্দ্র উকিলপাড়ায় অবস্থিত। দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটিকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। নিজাম-হাসিনা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট সমাজ সেবক, নিজাম উদ্দিন আহমেদ মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে বলেন- ‘পরিচিতির জন্য নয়, আল্লাহর সন্তুটির জন্যই এ সেবামূলক কাজটি করেছি।’ / এম / এআর

হাদিসের অপব্যাখ্যা রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সৌদি

হযরত মোহাম্মদ (স.) এর বাণী (হাদিস) ব্যবহার করে কোনো জঙ্গী গোষ্ঠী যেন সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দিতে না পারে এজন্য সৌদি সরকার নতুন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে। বাদশাহ সালমান পবিত্র মদিনা নগরী থেকে এ ফরমান ঘোষণা করেন। বিশ্বের নামকরা ইসলামী চিন্তাবিদদের এই প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা হবে বলেও জানান তিনি। দেশটির তথ্য মন্ত্রণালয় জানায়, সহিংসতা এবং অপরাধের পক্ষে সাফাই হিসেবে যেসব ভুয়া ইসলামী লেখার বরাত দেয়া হয়, সেগুলো নির্মূল করাই হবে এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। উল্লেখ্য, আল কায়েদা এবং ইসলামিক স্টেটের (আইএস) মতো জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো নবী মোহাম্মদ (স.) এর হাদিস এবং অন্যান্য ধর্মীয় লেখার অপব্যাখ্যা করে তাদের কার্যক্রমের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। মোহাম্মদ (স.) এর যেসব বাণী সংকলন করা হয়েছে, সেগুলি `হাদিস` হিসেবে পরিচিত। ইসলামে কোরআনের পর এই হাদিসকেই বিভিন্ন বিষয়ে ধর্মীয় নীতি বা ব্যাখ্যার জন্য নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় । সৌদি কর্তৃপক্ষ মনে করছে, জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়ে সন্ত্রাসবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করে সেটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা দরকার। সূত্র: বিবিসি।   আর/এআর

আজ লক্ষ্মীপূজা

আজ বৃহস্পতিবার সৌভাগ্য ও ধন সম্পদের দেবী কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা। ধর্মীয় মর্যাদায় বিভিন্ন মঠ-মন্দির ছাড়াও হিন্দুদের প্রতিটি ঘরে ঘরে নানা আয়োজনে পালিত হবে কোজাগরী লক্ষী পূজা। কোজাগরী শব্দটি এসেছে `কো জাগর্তী` থেকে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে দেবী লক্ষ্মী ধন-ধান্যে ভরিয়ে দিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে আসেন। আর ধন-ধান্যের আশায় এই পূজার আয়োজন করে হিন্দু সম্প্রদায়। শাস্ত্রমতে, দেবী লক্ষ্মী ধন-সম্পদ তথা ঐশ্বর্যের প্রতীক। এ ছাড়া আধ্যাত্মিক ও পার্থিক উন্নতি, আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা, দানশীলতা, সাহস ও সৌন্দর্যের দেবীও তিনি। শারদীয় দুর্গোৎসব শেষে প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে এই পূজা করে থাকেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, লক্ষ্মী দেবী সন্তুষ্ট থাকলে সংসারে অর্থকষ্ট থাকবে না। ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে এদিন লক্ষ্মী মর্ত্যে নেমে আসেন। বাঙালি বিশ্বাসে লক্ষ্মীদেবী দ্বিভূজা ও তার বাহন পেঁচা এবং হাতে থাকে শস্যের ভাণ্ডার। প্রায় প্রতিটি বাঙালি হিন্দুর ঘরে লক্ষ্মীপূজা করা হয়। এ উপলক্ষে হিন্দু নারীরা উপবাস ব্রত পালন করেন।   /আর/এআর

বিশ্বে রাষ্ট্রধর্ম আছে ৪৩টি দেশে

গোটা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে ২০ ভাগ দেশের রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে। মাত্র ৪৩ টি দেশে ধর্মকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ টি দেশে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। হিন্দুধর্ম কোনো দেশেরই স্বীকৃত রাষ্ট্রধর্ম নয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক জনমত জরিপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বিশ্বের প্রতি পাঁচটি দেশের মধ্যে একটি দেশে রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে। এ দেশগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম রাষ্ট্র। ৫৩ ভাগ দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধর্মের কথা উল্লেখ নেই। গবেষণামতে, বিশ্বের মোট ১০টি দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুব কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং সেখানে খুব সক্রিয়ভাবে ধর্মকে প্রতিহত করা হয়। এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া, ভিয়েতনাম এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কিছু দেশ। পিউ রিসার্চের মতে, এসব দেশে সরকারি কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় প্রার্থনা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া জনসম্মুখে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বিষয় প্রচারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া ১০টি দেশ (৫ ভাগ) কোনো ধর্মকেই স্বীকৃতি দেয়নি। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং উত্তর ইউরোপের ৪৩টি দেশে অফিসিয়ালি রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে এশিয়া, সাব-সাহারা আফ্রিকা, উত্তর আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ২৭টি দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এদিকে ইউরোপের ৯টি দেশসহ বিশ্বের ১৩টি দেশের রাষ্ট্রধর্ম খ্রিস্টান। ভুটান ও কম্বোডিয়ায় রাষ্ট্রধর্ম হল বৌদ্ধ এবং ইসরাইলের রাষ্ট্রধর্ম ইহুদি। তবে সারাবিশ্বের কোনো দেশেই হিন্দুধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।   পিউ রিসার্চের রিপোর্টে বলা হয়, বেশকিছু ক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনেক নিয়মনীতি থাকে। কিন্তু আইনি বা করসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা, রিয়েল এস্টেট বা সম্পত্তির মালিকানা এবং রাষ্ট্রকর্তৃক আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। এছাড়া দেখা যায়, রাষ্ট্রকর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস ও ধর্মচর্চার বাধ্যবাধকতার কারণে সংখ্যালঘু ধর্মীয়গোষ্ঠীগুলোর ওপর বিধি-নিষিধ আরোপ করা হয় বা নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। রিপোর্টে আরও বলা হয়, আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক দেশই তাদের ইতিহাসের প্রথম দিকে রাষ্ট্রধর্মকে স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু বর্তমানে আংশিকভাবে এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে। অন্যদিকে স্বল্প কিছু দেশ আবার উল্টো পথে হাঁটে। তারা তাদের প্রতিটি নাগরিকের জন্য রাষ্ট্রধর্ম পালন বাধ্যতামূলক করেছে। বিশ্বের ৪০টি দেশের মধ্যে ২৮টি দেশ খ্রিস্টান ধর্ম বিশ্বাসকে পছন্দ করে থাকে।   সূত্র : রয়টার্স। //এআর

আশুরার তাৎপর্য ও শিক্ষা

আশুরা মানে হচ্ছে দশ। আশুরা শব্দটি যেহেতু মহররম মাসের জন্যই ব্যবহৃত হয় তাই ১০ই মহররমকে আশুরা দিবস বলা হয়। আশুরা তথা ১০ই মহররম-এর কথা কমবেশি আমরা সবাই জানি। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক দিবস। শুধু ঐতিহাসিক বললেই যথেষ্ট হবে না; বরং ইসলামের ইতিহাসে যতগুলো ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস আছে তার মধ্যে আশুরা হচ্ছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী এবং অতি স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে দেখব এই ঐতিহাসিক ১০ই মহররম বিভিন্ন কারণে স্মরণীয়। এ তারিখে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বড় ঘটনা ঘটিয়েছেন। এর মধ্যে দশটি ঘটনা খুবই প্রণিধানযোগ্য। এ দশটি ঘটনার মধ্যে দু’চারটির উদ্ধৃতি এভাবে দেয়া যায়। যেমন এ তারিখে হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল। এ তারিখে হযরত ইউনুস (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা মাছের পেট থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ দিনেই হযরত আইয়ুব (আ.)কে আল্লাহ তায়ালা কুষ্ঠ রোগ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। এদিনে হযরত নূহ (আ.) আল্লাহ পাকের নির্দেশে মহাপ্লাবন নামক গজব থেকে বাঁচার জন্য কিশ্তিতে আরোহণ করেছিলেন। এই দিনেই হযরত ইবরাহীম (আ.) নমরূদের আগুন থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এমনিভাবে খুবই উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ দশটি ঘটনা এদিন ঘটেছিল বলেই এ দিবসটির নামকরণ আশুরা করা হয়েছে। কিন্তু যে কারণে উম্মতে মুহাম্মদীর নিকট এ দিনটা আরও স্মরণীয় ও গুরুত্বের দাবী রাখে, তা হলো কারবালার সে মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক করুণ ঘটনা বা কাহিনী। সে ঘটনার কথা বলতে গেলে কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে আসে, লিখতে গেলে কলম পর্যন্ত থমকে দাঁড়ায়। আর সে ঘটনার শিকার হয়েছিলেন দুনিয়ার ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল আল্লাহর হাবীব স্বয়ং জনাব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৌহিত্র, কলিজার টুকরা। নামাজের সিজদা দিতে গেলে নানাজীর কাঁধ বা পিঠ মোবারকে সওয়ার হয়ে চড়ে বসতেন এবং সেই হযরত আলী ও মা ফাতেমার আদরের দুলালী হযরত হোসাইন (রা.)। এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট সীমিত কলেবরের বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব হয়নি। কেবল সেদিন হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁর পুরো পরিবারের লোকজনকে একত্রিত করে পরামর্শের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন সেটুকু পাঠকদের সামনে তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছি। হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) তাঁবুতে ফিরে এসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন। এ ছিল এক অদ্ভূত বৈঠক। এর এজেন্ডা মাত্র একটি- অর্থাৎ বাঁচতে চাই নাকি মরতে চাই। পরিবারের সবার কাছে প্রস্তাব রাখলেন- তোমরা কি ইয়াজিদকে খলীফা বলে স্বীকার করতে চাও, নাকি চাও না? যদি চাও তবে তার দুটো পরিণতি আছে আর যদি স্বীকার না কর তারও দুটো পরিণতি আছে। যদি তাকে স্বীকৃতি দাও তাহলে- ১. আমরা সবাই বেঁচে যাব এবং ২. ইসলামের মধ্যে এমন এক মারাত্মক অন্যায় বা বিদায়াত ঢুকে যাবে যা কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামকে কলুষিত করে রাখবে। ইসলামে রাজতন্ত্র বৈধ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী যুগের লোকেরা বুঝতেই পারবে না আল্লাহর রাসূল কোন ইসলাম রেখে গেছেন। আর যদি ইয়াজিদের খেলাফতের স্বীকৃতি না দাও তাহলে তার পরিণতিও হবে দুটি। ১. ইসলাম চির কলংকমুক্ত অবস্থায় টিকে থাকতে পারবে এবং ২. আমরা একজনও বেঁচে থাকতে পারব না। এখন বল তোমরা কি করবে? যদি বাঁচার সিদ্ধান্ত কর তাহলে ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যদি মরার সিদ্ধান্ত নাও তাহলে ইসলাম তার স্বস্থানে স্বমহিমায় টিকে থাকবে। এখন ভেবে দেখ জীবনকে কুরবানী করে ইসলাম বা দীনকে টিকাবে না-কি ইসলামকে কুরবানী করে জীবনকে রক্ষা করবে? সবার কাছ থেকে জবাব এল যেহেতু ইসলামের জন্যই জীবন তাই ইসলামের জন্যই জীবনকে বিসর্জন দিতে চাই। ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের লোকজন দেখলেন যে, এ মুহূর্তে জান বাঁচানো ফরয নয়; বরং জান বা জীবন দান করাই ফরয হয়ে পড়েছে। তাই তাঁরা সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, আমরা ইসলাম রক্ষার জন্য মরতে চাই। দশই মহররম অর্থাৎ আশুরার এই রাতে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তা ছিল এক অভিনব সিদ্ধান্ত যার কোনো উদাহরণ ইতোপূর্বেও কোন দিন সৃষ্টি হয়নি, পরেও কোন দিন হবে না। এরপর ইমাম হুসাইন (রা.)সহ তাঁর পরিবারের লোকজনকে কিভাবে শহীদ করা হলো সে করুণ ইতিহাস সবারই কমবেশি জানা। তাই সেদিকে না গিয়ে এতটুকু বলতে চাই- ইয়াজিদ ছিলেন আল্লাহর রাসূলের জলিলে কদর এক সাহাবীর ছেলে। তিনি অন্যায়ভাবে অর্থাৎ স্বৈরাচারী কায়দায় ক্ষমতায় আরোহণ করতে চেয়েছিলেন। এটুকু অন্যায়কে প্রশ্রয় না দেওয়ার জন্য আল্লাহ পাক তাঁর হাবীবের কলিজার টুকরার আত্মাহুতির মাধ্যমে দুনিয়ার বুকে এক অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখালেন যে কোন অবস্থায়ই অন্যায়কে সমর্থন করা যাবে না, সে যত বড় শক্তিধর বা ক্ষমতাধরই হোক না কেন। অথচ বর্তমান যুগে আমরা কত হাজার প্রকার অন্যায় ও জুলুম নির্যাতন নীরবে সয়ে যাচ্ছি বা প্রশ্রয় দিচ্ছি- তা কি একবারও ভেবে দেখেছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র কালামে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন- তোমাদের কি হলো, তোমরা আল্লাহর পথে অসহায় নর-নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করবে না, যারা দুর্বলতার কারণে নির্যাতিত হচ্ছে এবং ফরিয়াদ করছে- হে আমাদের রব! এ জনপদ থেকে আমাদেরকে বের করে নিয়ে যাও, যার অধিবাসীগণ জালেম এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের কোন বন্ধু, অভিভাবক ও সাহায্যকারী তৈরি করে দাও। [আন্-নিসা] উল্লিখিত আয়াতে এমন সব মজলুম শিশু, নারী ও পুরুষদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যারা মক্কায় ও আরবের অন্যান্য গোত্রের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এ অপরাধে তাদের উপর অমানুষিক অন্যায় ও জুলুম নির্যাতন চালানো হয়েছিল কিন্তু তাদের হিজরত করার কিংবা কাফেরদের জুলুম থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতাও ছিল না। অথচ বর্তমান সময়টাও সে অবস্থার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এ অবস্থা দেখেও যদি আমরা চুপচাপ বসে থাকি তাহলে আর যাই হোক, আমরা বেহেশতি মুসলমানদের দলভুক্ত হতে পারব না এবং আল্লাহর পাকড়াও থেকে আমরা রক্ষা পাব না।লেখক: ব্যাংকার।//এআর

পবিত্র আশুরা আজ

আজ রোববার। মহররমের দশ তারিখ, পবিত্র আশুরা। পৃথিবী সৃষ্টির সূচনা থেকে এ যাবৎ অসংখ্য বিস্ময়কর ঘটনার দিন আজ। ইতিহাসে বিশাল জায়গা করে আছে পবিত্র আশুরা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এ দিনটি মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।  ৬১ হিজরি সালের এই দিনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসেইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার ও অনুসারীরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে শহীদ হন। কারবালার এই শোকাবহ ঘটনা ও পবিত্র আশুরার শাশ্বত বাণী সবাইকে অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা যোগায়। এ ছাড়া ১০ মহররম আশুরার দিন মহান আল্লাহতায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আবার এদিন কেয়ামত হবে। এর বাইরে এদিন হযরত ইব্রাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পেয়েছেন, হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পান। পবিত্র আশুরার দিন মুসলিম জাহানের জন্য যে কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটা  হলো, এদিনে স্বৈরাচারী ইয়াজিদ বাহিনী হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) কে সপরিবারে কারবালার মরু প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করে। হযরত ইমাম হোসাইন ক্ষমতার জন্য ইয়াজিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি। বরং তিনি লড়াই করেছিলেন ইয়াজিদের ইসলাম বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে। সত্যের পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য তিনি সপরিবারে জীবন দিয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন। পবিত্র আশুরার মিছিল উপলক্ষে  ডিএমপি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ এর ২৮ ও ২৯ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে তাজিয়া মিছিলে দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি, লাঠি ইত্যাদি বহন এবং আতশবাজি ও পটকা ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। /এম/এআর  

দেশে ফিরেছেন ৯৪ হাজার হাজী

পবিত্র হজ পালন শেষে দেশে ফিরেছেন ৯৪ হাজার ২২৬ জন হাজী। গতকাল শনিবার পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১৩২টি ও সৌদি এয়ারলাইন্সের ১৪৫টিসহ মোট ২৭৭টি ফ্লাইটের মাধ্যমে হাজিরা দেশে ফেরেন। হজ বুলেটিন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। হজ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ফিরতি হজ ফ্লাইটে হাজিরা দেশে ফিরতে শুরু করেন। আগামী ৫ অক্টোবরের মধ্যে সব হাজী দেশে ফিরবেন বলেও জানায় তারা। শনিবার রাতে বাংলাদেশ হজ অফিস মক্কার কনফারেন্স কক্ষে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (হজ) মো. হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে হজের সার্বিক বিষয় নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় মক্কাস্থ কাউন্সিলর (হজ), কনসাল (হজ) সহ প্রশাসনিক, চিকিৎসক এবং আইটি দলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। চলতি বছর হজ করতে গিয়ে ১৫১ জন হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১৯ জন পুরুষ ও ৩২ জন মহিলা। এর মধ্যে ১০৫ জন মক্কায়, ২৪ জন মদিনায়, ৬ জন জেদ্দায় ও মিনায় ১৬ জন মারা যান। বাংলাদেশ থেকে চলতি বছর মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ২২৯ জন হজে যান। গত ৩১ আগস্ট পবিত্র হজ পালিত হয়। /আর/এআর

শারদীয় দুর্গোৎসব ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ষড়ঋতুর চক্রাবর্তে ঘুরে আসে শরৎ আর শরতের আগমনী সুর জানান দেয় শারদীয় দুর্গোৎসবের কথা। আবহমান বাংলার শ্বাশত সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় সনাতনী ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। এ পূজোকে ঘিরে যখন ঢাক-ঢোলের আওয়াজ কানে ভেসে আসে তখন বাল্যকালের কথা মনে পড়ে যায়। মায়ের হাত ধরে জেলেপাড়ার দুর্গোৎসব উপভোগের স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে মনে। চারযুগ আগের কথা। উত্তর-পশ্চিম সৈয়দপুর গ্রামের বাড়ির পাশে জেলেপাড়ায় পূজোমণ্ডপে উৎসবের আয়োজন হতো। তিন-চার দিন ধরে ঢোলবাদ্যের আওয়াজ, আলোকসজ্জা আর নাচগানের মাধ্যমে আনন্দ-উল্লাসের ঢেউ বয়ে যেতো জেলেপাড়ায়। তৈরি হতো উৎসবের অন্য রকম এক আবহ। গ্রামে তখন বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না বলে বিশেষ ব্যবস্থার সেই দুর্গোৎসবের আলোঝলকানিতে মুসলিম নর-নারীরাও একাকার হয়ে যেতো। দুর্গোৎসব পরিণত হতো সামাজিক মহোৎসবে। বেশ ক’বছর ধরে অবশ্য জেলেরা অর্থাভাবে পূজামণ্ডপ তৈরি করতে পারে না। এখন জেলেরা হিন্দুপাড়ায় আয়োজিত বিভিন্ন পূজোমণ্ডপ পরিভ্রমণ করে দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়। ঈদ-পূজোপার্বনসহ বিভিন্ন ধর্মীয়উৎসব সিংহভাগ মানুষের জীবনে আনন্দের বদলে বেদনা, আর্শিবাদের পরিবর্তে অভিশাপ হয়ে আসে। ধর্মীয় এসব উৎসব কালক্রমে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে নিছক সামাজিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। ঈদ-পূজোর কেনাকাটার সময় বেশিরভাগ অভিভাবকের বিমর্ষ চেহারা, সন্তানদের যৌক্তিক দাবী পূরণ করতে না পারার মানসিক যাতনার কারণে ধর্মীয় উৎসবগুলো সবার জন্যে সমানভাবে আনন্দ বয়ে আনতে পারে না। প্রতিটি ধর্মীয় উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সবকিছুর মূলে আর্থিক সামর্থই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে ও রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক যে বৈষম্য রয়েছে, ধর্মীয় উৎসবগুলোতে তার  প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়। ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ যদি সবাই কমবেশি ভাগাভাগি করতে না পারে, তাহলে তখন কোনো ধর্মীয় উৎসব সর্বজনীন হয়ে ওঠে না। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য; তাহার উপরে নাই’- চণ্ডীদাসের এ উক্তি ধর্মীয় চেতনাই মানুষকে সেবাধর্মে অনুপ্রাণিত করে। জগতের ধর্মপ্রবক্তা ও ধর্মগুরুরা সেবাধর্মকে জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলেছেন। ধর্মীয় চেতনাই মানুষকে সেবাধর্মে অনুপ্রাণিত করে আসছে। বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্রে, বিশেষ করে কুরআন, রামায়ণ-মহাভারত, মহাকাব্যে, পুরাণে জনসেবা-ই শ্রেষ্ঠধর্মের মর্যাদায় ভ‚ষিত হয়েছে। মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিহিত রয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দের কণ্ঠে তাই উচ্চারিত হয়েছেÑ ‘জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’। পরের তরে জীবন উৎসর্গ করার মাধ্যমে মানবজীবন সার্থকতায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অপরের কল্যাণে নিজকে নিয়োজিত করতে পারলেই জীবন সুখ-শান্তিতে ভরে ওঠে। বিশ্বের সব ধর্ম শান্তির কথা বলে। যা কিছু ভালো, সুন্দর, সর্বজনীন তাই মূলত ধর্মের মর্মবাণী। সব ধর্মই মানুষের কল্যাণের কথা বলে। প্রতিটি ধর্মের শ্লোগান, হিংসা, ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। সকল প্রকার অপকর্ম, অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে ধর্মগুরুরা প্রচারণা চালান। কোরআন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক থেকে শুরু করে বিশ্বে যত ধর্মগ্রন্থ আছে, সবখানে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে, সাম্যের কথা বলা হয়েছে। কাউকে খুন করা, কারো ক্ষতি করা, মসজিদ-মন্দির- গীর্জা-পেগোডা ধ্বংস করার কথা কোনো ধর্মগ্রন্থে নেই। সব ধর্মের মূলকথা পারস্পরিক সহাবস্থান, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সুশৃঙ্খলভাবে জীবনযাপন করা। মিথ্যা কথা না বলা, চুরি-ডাকাতি না করা। সকল প্রকার অন্যায়, অত্যাচার ও অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। সত্যিকার ভাবে মনেপ্রাণে যদি আমরা যার যার ধর্ম পালন করি, শতভাগ পালন করার দরকার নেই, শতকরা ২০ ভাগও যদি পালন করি তাহলে তো দুনিয়াটা ‘স্বর্গ’ হয়ে যায়। পুলিশ-র‌্যাবের দরকার হতো না। শান্তির সুবাতাস বইতো সর্বত্র। মানুষরূপী জানোয়ারগুলোর কুৎসিত চেহারা আমাদের দেখতে হতো না নানা ভঙ্গিমায়। সংখ্যালঘু ধর্মালম্বীরা নানাভাবে নির্যাতিত হতো না। আমরা ধর্মীয় চেতনাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করি না। ধর্মগ্রন্থ ভালোভাবে অনুধাবন ও আত্মস্থ করি না। ধর্মজ্ঞান অর্জন করার তেমন কোনো আগ্রহবোধ আমাদের নেই। ধর্মনিষ্ঠার চেয়ে ধর্মান্ধতার পাল্লা ভারী। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। আবহমানকাল থেকে দেশে দেশে ধর্ম শাসন-শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মিশরীয় সভ্যতাসহ বিভিন্ন সভ্যতার যুগে ধর্মকে ঘিরে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালিত হতো। এখনও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে নানা কৌশলে ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’- স্বাধীনতার চার দশক পরেও এই কথাটি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ধর্ম একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু ধর্মকে রাজনীতির সাথে গুলিয়ে ফেলে রাষ্ট্রে এমন এক জটিল অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যে, রাজনীতিতে সহিংসতা, অস্থিরতা, অস্থিতিশীলতা, মারামারি, খুনোখুনি এসব লেগেই আছে। রাজনীতির সাথে ধর্ম একাকার হয়ে যাওয়ায় রাজনীতি বৃহত্তর জনগোষ্ঠির উপকারে আসছে না, ধর্মেরও বারোটা বাজছে। ধর্মকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছে ধর্মব্যবসায়ীরা। ধর্মের লেবাসধারী তথাকথিত নেতারা ধর্মের মানমর্যাদা নিয়ে ছিনিমিনি খেললেও প্রকৃত ধর্মচর্চাকারীরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার নন। আবার ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে সেটাকে ধর্মবিদ্বেষী কিংবা ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে আখ্যায়িত করার প্রয়াস চালানো হয়। কোনো ব্যক্তি, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যা-ই হোন না কেন, তিনি যদি প্রকৃত ধার্মিক হন, ধর্ম সম্পর্কে যদি তার পরিষ্কার ধারণা থাকে, ধর্মীয় বিধিবিধান আন্তরিকতার সাথে পালন করেন, তাহলে তিনি হবেন একজন প্রকৃত ধার্মিক মানুষ। সব ধর্মে মানবীয় গুণাবলী সম্পন্ন ধার্মিক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে না বলেই বকধার্মিকরাই হাঁকডাক করে বেড়ায় সর্বত্র। ধর্ম নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা ও চর্চা কোনো ধর্মেই পরিলক্ষিত হয় না। গতানুগতিক ধারায় চলছে ধর্ম-কর্ম সবকিছুই। এ চলার শেষ কোথায় জানি না। ধর্ম সচেতন ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের সংখ্যা কবে নাগাদ কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছাবে- তা বলা খুবই মুশকিল। ধর্মীয় নানা কুসংস্কার ও মৌলবাদের রাহুগ্রাস থেকে আমাদের আদৌ মুক্তি মিলবে কিনা তা-ও বলা যাচ্ছে না। দুর্গোৎসব নিয়ে লিখতে গিয়ে ধর্ম নিয়ে গল্প জুড়ে দেয়ার জন্যে দুঃখিত। প্রতিবছরের মতো এবারও ক্যালেন্ডারের পাতায় শারদীয় দুর্গোৎসব ফিরে এসেছে। দুর্গোৎসব হয়ে ওঠুক প্রাণের উৎসব, জীবনের উৎসব ও পূণ্যার্জনের মহোৎসব। সনাতনী জনগোষ্ঠির এই প্রধান ধর্মীয় উৎসব শুধু উৎসবে সীমিত না থেকে চিন্তাচেতনায় ও সাহসিকতায় সংশ্লিষ্টদের আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে সকল দানবীয় অপশক্তির বিরুদ্ধে। দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে সবার প্রতি রইল প্রাণঢালা অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা।লেখক: প্রধানসম্পাদক, চাটগাঁর বাণী।

প্রতিমা বিসর্জন আজ

আজ বিজয়া দশমী। পূজামণ্ডপ ঘিরে শুধুই বিষাদের ছায়া। বিদায়ের সুর বাজছে মণ্ডপগুলোতে। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটবে। এর আগে গত মঙ্গলবার ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল দুর্গাপূজা। দেবীকে বিদায় দিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শেষ মুহূর্তের পূজা-অর্চনা সম্পন্ন করছেন। এদিন ঢাকঢোল, কাসর-শঙ্খ বাজিয়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুর্গার বিদায়ের আয়োজন সম্পন্ন করা হবে। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে বিকেল ৩টায় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হবে। এবার সারা দেশে ৩০ হাজার ৭৭টিৃ মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ঢাকায় ২৩১ মণ্ডপে পূজা হচ্ছে এবার।   আর/টিকে  

প্রেক্ষিত : শারদীয় দুর্গোৎসব

এ মহাবিশ্ব এক অপার বিস্ময়। আমাদের এ সৌরমণ্ডলটিতে কেবল সূর্যই নক্ষত্র এবং অন্যসব গ্রহ ও উপগ্রহ। বিজ্ঞানীগণ বলেছেন, আমাদের পৃথিবীটার মত ১৩ লক্ষটি পৃথিবীর সমান হচ্ছে এ সূর্যটা। আর সূর্যটার মত অজস্র নক্ষত্র ধূলিকণাসম বিদ্যমান রয়েছে এ ছায়াপথে। আর আমাদের নিকটতম একটি নক্ষত্রপুঞ্জ বা ছায়াপথে এক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। সেখানে অর্ধেক নক্ষত্র খেয়ে ফেলেছে একটি অন্ধকুপ। বাকি অর্ধেক খেয়ে ফেলার পরে সেটি হবে এক ঘন কুয়াশা। এটি নাকি আমাদের পৃথিবী থেকে পাঁচ কোটি আলোকবর্ষ দূরে। চোখের পলকে বা এক সেকেন্ডে যে আলো চলে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, সে হিসাবে পাঁচ কোটি বছরে আলো যেখানে পৌঁছে, সেখানে ঐ নক্ষত্র পুঞ্জটি অবস্থান করছে। এটি যদি নিকটতম হয়, তাহলে দূরতমটি কোথায়Ñ কত দূরে? আর পৃথিবীটার আয়ুষ্কাল সম্পর্কে এক বিজ্ঞানী বলেছেনÑ এর বয়স অন্তত দুইশ কোটি বছর। সনাতনী শাস্ত্রমতে কল্প, মন্বন্তর ও যুগ বিন্যাসে কাল নির্ধারণ করা হয়েছে। একটি কল্পকালের আয়ুষ্কাল মনুষ্য পরিমিত ৮৬৪ কোটি বছর যা ১৪ (চৌদ্দ) টি মন্বন্তর এবং সহস্র চতুর্যুগে (সত্য, ক্রেতা, দ্বাপর ও কলি) বিন্যস্ত হয়েছে। এখন চলছে শ্বেত বরাহ কল্প এবং ৭ম (বৈবস্বত) মন্বন্তর। একটি মন্বন্তরে প্রায় ৭২টি চতুর্যুগ বা মহাযুগ। একটি চতুর্যুগের আয়ুষ্কাল হলোÑ ৪৩,২০,০০০ বছর। আমার এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্যে হলো একবার ভেবে দেখা কত বিস্তৃত ও দীর্ঘবয়স্ক এ মহাবিশ্ব এবং সৃষ্টি-রহস্য কতটা গভীর অনুধ্যানের বিয়ষ। আর এ থেকে অনুমেয় যে, সীমাহীন পরিব্যাপ্ত এবং অনন্ত দীর্ঘ বয়স্ক এ মহাবিশ্ব মাঝে আমাদের এ পৃথিবীটা কত ক্ষুদ্র। সেই পৃথিবীতেই বিদ্যমান বিশাল সমুদ্র, প্রবল ঊর্মিমালায় উত্তাল নদনদী, সুউচ্চ পাহাড়-পর্বত, গহীন অরণ্য আর নিঃসীম নীলাকাশসহ তাবৎ সৃষ্টি-রহস্যের সামান্য অংশ দেখে-শুনেই মানুষ ভীত, বিস্মিত আর বিমুগ্ধ হয়ে ভাবতে শুরু করেÑ কে এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেনÑ কোথায় তিনি থাকেনÑ কি তার রূপাবয়ব ইত্যাকার নানা প্রসঙ্গে। আর, এ ভাবনা থেকেই একদিন শুরু হয়েছিল উপাসনা তথা সাধনার। মানুষ যেদিন থেকে ভাবতে শিখেছে সেদিন থেকেই প্রকৃতপক্ষে বর্তমান সভ্যতারও শুরু হয়েছে। স্থান, কাল ও সীমানাভেদে আবার উপাসনার পথ ও পদ্ধতি হয়েছে বিভিন্ন। আর, এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে আধ্যাত্মিক তথা ধর্মীয় বিভিন্ন মত পথের। যেমনÑ সনাতন ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম ইত্যাদি। সব মত-পথেই সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজা, জানা এবং সৃষ্টি রহস্যকে বোঝার চেষ্টা পরিদৃষ্ট। প্রকৃতপক্ষে, মানুষের ধর্ম একটাই, তা হলো মানবধর্ম বা মনুষ্যত্ব। আর সৃষ্টিকর্তাও একজনই। তাঁকে যে যেনাম ধরে ডাকে তিনি তাই। সৃষ্টিকর্তা আলাদা আলাদা হলে কোন একজন সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্ট মানুষদের পেছনে আরও দু’টো চোখ দিয়ে দিতে পারতেন। একেক ধর্মমতের মানুষের রক্তের রং একেক রকম হতে পারত। তাই, বলা যায় আমাদের উৎস এক এবং গন্তব্যও এক। কেবল পথ ও পাথেয়র ভিন্নতা। যেমন : পটুয়াখালী থেকে কেউ ঢাকা আসতে চাইলে যেমন পারবেন, দিনাজপুর থেকে অথবা চট্টগ্রাম থেকে কেউ আসতে চাইলে তিনিও পারবেন। তবে, পটুয়াখালী থেকে কেউ ট্রেনে আসতে চাইলে যেমন ভুল করবেন, তেমনি দিনাজপুর থেকে কেউ লঞ্চে আসতে চাইলেও ভুল করবেন। তাই, প্রত্যেককে যার যার পথের উপযুক্ত যানবাহনটি বেছে নিতে হবে এবং সঠিক পাথেয় নিয়ে আসতে হবে। সে যাই হোক, পৃথিবীর বড় ধর্মমতগুলোর একটি অন্যতম ধর্মমত হলো সনাতন ধর্ম। এই সনাতন ধর্মে সাধনার প্রধান ৫টি ধারা বা শাখা সৃষ্টি হয়েছে। যথাÑ বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, সৌর ও গাণপত্য। এই পাঁচটি শাখার অনুসারীগণই আবার সনাতন ধর্মের বড় বড় ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানসমূহে কমবেশি একাকার হয়েই উৎসবাদি পালন করেন। আমাদের আজকের প্রেক্ষিত হলো শারদীয় দুর্গোৎসব। এই শারদীয় দুর্গোৎসব-এর পূর্বাপর উৎসব হিসেবে মহালয়া উৎসব, লক্ষ্মীপূজা ও শ্যামাপূজা সমন্বয়েই এখন শারদোৎসব উদযাপিত হয়; বিশেষত বাঙালি সনাতনী সমাজে। প্রকৃতপক্ষে মহালয়া দিয়ে শুভারম্ভ এবং দীপাবলি ও শ্যামাপূজা দিয়ে শারদোৎসবের সমাপন। শ্যামাপূজা হেমন্ত ঋতুর প্রারম্ভে হলেও বিন্যাসটি শারদীয় উৎসবেরই অন্তর্ভুক্ত বলে পরিগণিত হয় (যদিও শাস্ত্র বলছেনÑ ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের প্রতিপদ থেকে অগ্রহায়ন মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা পর্যন্তই মহালয়ার কাল। সুতরাং এর ব্যাপ্তি আরও বিস্তৃত)। কেননা, মহালয়া অমাবস্যায় (পার্বণ শ্রাদ্ধে) যে পূর্ব পুরুষগণকে শ্রদ্ধা সহকারে আমন্ত্রণ জানিয়ে মহাশক্তি দেবী দুর্গার জাগরণ তথা বোধন করা হয় তাদেরকেই আবার দীপান্বিতা আমাবস্যায় দীপাবলি উৎসবের মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় বলে প্রথাগত অনুসৃতি রয়েছে। আর, দীপান্বিতা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতায় আবাহনের মধ্য দিয়ে শ্যামামায়ের পূজা সেদিন কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি অমাবস্যায় সম্পন্ন হয়। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক মা দুর্গার চালচিত্রের শিরোভাগে দেবাদিদেব শিব; আবার কালী বা শ্যামা মায়ের বিগ্রহচিত্রে দেখা যায় শিবের বক্ষোপরি পদস্থাপিতা মহামাতা কালী এবং শিবকে কালীমায়েরও স্বামী বলা হচ্ছে, আবার মা দুর্গারও স্বামী বলা হচ্ছে। তাহলে কি দেবীদুর্গা এবং কালী-দু’জনেরই একই স্বামী? বিষয়টি অনুধ্যানে না আসলে বোধভ্রান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। শিব হচ্ছেন বিশ্বের স্বামীÑব্রহ্মেরই একরূপ। মা দুর্গা এবং কালী তারই মহাশক্তির ভিন্ন রূপ মাত্র। নিরাকার পরব্রহ্ম সম্পর্কে পবিত্র মহাগ্রন্থ বেদে বিধৃত রয়েছেÑ ব্রহ্ম এক এবং অদ্বিতীয় (একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম)। এই নিরাকার ব্রহ্মের সাধনা কেবল সাধকই করতে পারেন, সাধারণের পক্ষে সম্ভব নয়। উপনিষদের ঋঝিপ্রোক্ত মন্ত্রোচ্চারণে তাই ভক্ত বলেছেনÑ  ‘‘অসতোমা সদগময় তমসোমা জ্যোতির্গময় মৃত্যোর্ম্মাহমৃতং গময় আবিরাবির্মএধি।’’ আমাকে অসত্য থেকে সত্যের পথে নিয়ে চলো, অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে চলো, মৃত্যু থেকে অমৃতত্বে নিয়ে চলো; হে সপ্রকাশ ব্রহ্ম! তুমি আবির্ভূত হও। ভক্তের এরূপ আকিঞ্চনে সেই অঘনঘটনপটিয়সী সর্বশক্তিমান এক থেকে বহু হতে চাইলেনÑ  ‘‘একোহহং বহুস্যাম প্রজায়েম।’’ তিনি স্বয়ং বিভাজিত হয়ে পুরুষ ও প্রকৃতিরূপে আত্মপ্রকাশ করলেনÑ সেই পুরুষ থেকে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-শিব রূপে প্রকটিত হলেন। আর তিনিই ব্রহ্মারূপে সৃজন করেন, বিষ্ণুরূপে পালন করেন এবং শিবরূপে প্রলয় করেন। আর তার প্রকৃতিই সেই আদিশক্তি বা আদ্যাশক্তি। শক্তিমানের শক্তি। অর্থাৎ, বিশ্বের স্বামীও একজনই এবং তাঁর মহাশক্তিও একই। শক্তিমান ছাড়া শক্তি থাকে না এবং শক্তি ছাড়া শক্তিমান হয় না। যুগে যুগে- বারে বারে তিনি নানারূপে প্রকাটিতা-বিরাজিতা। সেই একই মহাশক্তি সমরে সিংহবাহিনী-ভোগে ভবানী-জগৎপালনে জগদ্ধাত্রীÑঅসুর নিধনে করালী কালীÑসম্পদে লক্ষ্মী এবং জ্ঞানে সরস্বতী। চণ্ডমুণ্ড বধে মহাদেবী দুর্গার ভ্রুকুটি থেকে নির্গতা হলেন ভয়ঙ্করী ভীষণবদনা ভীষণকায়া মহাকালীরূপে, যিনি চামুন্ডা নামে অভিহিতা হলেন। এভাবে তিনি নানারূপে প্রকাশিতা হন যুগে যুগে। যখন অনন্বীকার্য তখনই কেবল তার মহিমা এবং শক্তিমানতা প্রয়োজনমত প্রয়োগ করেন। সেই অখণ্ড মহাশক্তি মহামাতা দেবীদুর্গা শ্রীশ্রীচণ্ডীগ্রন্থের প্রথম চরিতে মহাকালিকা, মধ্যম চরিতে মহালক্ষ্মী এবং উত্তর চরিতে মহাসরস্বতী। আবার তিনি অষ্টশক্তির প্রকাশে রক্তবীজ অসুরকে নিধন করেন। এই অষ্টশক্তি হলেনÑ ব্রাহ্মণী, মহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, ঐন্দ্রী, যজ্ঞবারাহী, নারসিংহী ও চণ্ডিকা। নবদুর্গারূপে তিনি শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী (উমা/হৈমবতী), চণ্ডঘণ্টা, (হিমালয় দুহিতা), কুষ্মাণ্ডা, কাত্যায়নী, স্কন্দমাতা, কালরাত্রি, মহাগৌরী ও সিদ্ধিদাত্রীরূপে অভিহিতা। দশমহাবিদ্যারূপে তিনি কালী, তারা, ছিন্নমস্তা, ভুবনেশ্বরী, বগলা, ধুমাবতী, কমলা, মাতঙ্গী, ষোড়শী ও ভৈরবী। দেবী দুর্গা দশভূজারূপেই মূলত পূজিতা হন। তবে, অষ্টভূজা, অষ্টাদশভূজা, শতভূজা এমনকি সহস্রভূজা রূপেও অঞ্চলভেদে পূজিতা হন। এর প্রত্যেকটিরই এক একেকটি তাৎপর্য রয়েছে। তবে, মা যে সবদিকই দেখছেন এবং নিয়ন্ত্রণ করছেন সেটাই এর মাধ্যমে নির্দেশিত হচ্ছে। তাঁর দশহাতে দশ প্রহরণের যেমন ব্যাখ্যা রয়েছে, তেমনি তাৎপর্য বিমণ্ডিত রয়েছে মহামাতার চালচিত্রে বিন্যস্ত সত্ত্ব, রজঃ ও তমোগুণের প্রতীক সমাহার এবং সকল বর্ণের প্রতীকের সম্মিলন। প্রকৃতি প্রতিনিধি নয়টি গাছের চারা (কদলী, কচু, হরিদ্রা, বেল, দাড়িম্ব, অশোক, মান ও ধান) দিয়ে নবপত্রিকা বা কলাবৌ সাজিয়ে মঞ্চশোভিত করা হয় যা একাধারে প্রকৃতি পূজার প্রতীক। এভাবে দুর্গাপূজায় বিবিধ উপচার ও বিষয়ের সমন্বয় ও সমাহারে পূজার সর্বতোমুখী আয়োজনে দুর্গোৎসব সার্বজনীন এক মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। তাইতো, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে উৎসারিত হয়েছেÑ  ‘‘মার অভিষেক এসো এসো ত্বরা মঙ্গল ঘট হয়নি ভরা সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে।’’ দুর্গোৎসব বছরে দু’টি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। একটি শরৎকালে এবং অন্যটি বসন্তকালে। শরৎকালের পূজা অকালের পূজা। কেননা, শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস (সূর্য যখন বিষুবরেখার দক্ষিণ অয়ন বা দিকে) বা দক্ষিণায়নে থাকে তখন দেবতাদের রাত্রিকাল। তাই, এ সময়ে দেবীর জাগরণের জন্যে বোধন করতে হয়। আর, মাঘ থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত ছয় মাস সূর্য বিষুবরেখার উত্তরে থাকে বলে এ সময়কে উত্তরায়ণ বলা হয়। দেবতাগণ এ সময়ে জাগ্রত থাকেন। উল্লেখ্য যে, দেবতাদের এক দিবারাত্র মনুষ্য পরিমিত এক বছর। তাই, বসন্তকালের পূজায় বোধন করতে হয় না। তবে, উভয় ক্ষেত্রেই দেবীপূজার বিগ্রহ বিন্যাস সম্বলিত চালচিত্র একই রকম হয়েছে কালক্রমে। তবে, শরৎকালে পূজা মূলত ত্রেতাযুগের অবতার শ্রীরামচন্দ্রের পূজা বিধি বা রীতি অনুসরণে চলছে যার একটি অতিসুন্দর তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে (পরিসর সীমাবদ্ধতায় কারণে বর্ণনা পরিহার করা হলো)। আর, বাসন্তী পূজা হচ্ছে সুরথ রাজা ও সমাধি বৈশ্য কর্তৃক অনুষ্ঠিত দেবী পূজার রীতিতে যা স্বারোচিষ মন্বন্তরে করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, একটি মন্বন্তরে প্রায় ৭২টি চতুর্যুগ (সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি) থাকে এবং একটি চতুর্যুগ বা মহাযুগেরই আয়ুষ্কাল হচ্ছে ৪৩,২০,০০০ বছর। সুতরাং, বহুকাল পূর্ব থেকে যে পূজার ইতিহাস তাতে যুগে যুগে কিছুটা সমন্বয়, সংস্কৃতিচেতনা ও যুগ ভাবনা প্রযুক্ত হয়েছে। যেমন দুর্গাপূজার বিগ্রহ বিন্যাসাদিতে একাধারে একটি যুদ্ধচিত্র এবং একটি পারিবারিক বিন্যাস সম্বলিত চিত্র পরিদৃষ্ট হচ্ছে। এখানে দেবীদুর্গা কর্তৃক মহিষাসুর বধের যুদ্ধ চিত্রটি প্রযুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি পরিলক্ষিত যে, দেবী দুর্গা যেন সন্তানদের নিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে পিত্রালয়ে বছরান্তে নাইয়র এসছেন। তাই, বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে যেন কন্যার আগমনে অনেক আয়োজন করা হয়। মা মেনকার মাতৃভাব যেন সকল মায়ের হৃদয়ে বাজে। যেমন করে মা মেনকা তাঁর স্বামী গিরিরাজকে বলেছেনÑ  ‘‘যাও যাও গিরি আনগে উমায়, উমা যেন কেঁদে ডাকিছে আমায়।’’ পরিশেষে, প্রাণিধানযোগ্য সংবাদটি হলো এই যে, যুগে যুগে যখনই প্রয়োজন দুর্গতিনাশিনী মহামাতা দেবী দুর্গা আবির্ভূতা হয়ে অসুর তথা দানবীয় শক্তির বিনাশ সাধন করেন। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবী ভগবতী তাই বললেনÑ  ‘‘ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি তদাতদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরি সংক্ষয়ম।’’ (যখন যখন দানবের অত্যাচার সংঘটিত হবে তখন তখন আমি অবতীর্ণ হয়ে অসুরদেরকে বিনাশ করব।) দেবী দুর্গা যুগে যুগে অসুরদের অত্যাচার যখনই দুর্যোগের সৃষ্টি করেছে তখনই আবির্ভূতা হয়ে মহিষাসুর, চন্ডমুণ্ড, ধূম্রালোচন, রক্তবীজ, শুম্ভ-নিশুম্ভ প্রভৃতি অসুরদেরকে বধ করেছেন। আজ আবার দুর্যোগের কালো মেঘরাশি যেন আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাইছে দিকচক্রকাল। প্রমত্ত মেঘের গগন বিদারী গর্জন আর বজ্র বিদ্যুৎ সম্পাতে পৃথিবী আজ কম্পমান। অশুভ শক্তির দোর্দণ্ড প্রতাপেÑ দানবের পাষাণ কঠিন পদভারে ত্রস্ত সভ্যতা। তবে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়, অশুভ শক্তি যতই দোর্দণ্ড হোক না কেন, শুভ শক্তির কাছে অশুভ শক্তিকে পরাভব মানতেই হবে। কেননা, সৎসাধকের শিরায় শিরায় যে অমিতবীর্যের তেজ প্রবহমান, তার সম্মিলিত স্রোতধারায় চূর্ণিত হবে বাধার বিন্ধ্যাচল। তাই, আজ শারদীয় দুর্গোৎসবের এ শুভক্ষণে অসুর বিনাশিনী দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা সকাশে আমাদের প্রার্থনাÑ এসো হে জগৎজননী! দুর্যোগ-পীড়িত আজকের এ সমাজ ও সভ্যতার দুর্যোগ কাটিয়ে শান্তি ও কল্যাণের দীপ্র আলোয় ভরিয়ে দাও পৃথিবীকে। জয় হোক শুভশক্তিরÑ জয় হোক তাবৎ শুভবাদী মানুষের। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি।

দিল্লির বাঙালিপাড়ার পূজায় বিরিয়ানি চিকেন নিষিদ্ধ

দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ভারতের পূর্ব দিল্লির একটি পুরনো বারোয়ারি পুজা প্রাঙ্গণে বিরিয়ানি, চিকেন রোল, কাবাব বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সব খাওয়াকে অনেক বাঙালিই দুর্গাপুজার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বলে মনে করেন। কিন্তু একই সময়ই উত্তর ও পশ্চিম ভারতে হিন্দুরা অনেকে `নবরাত্রি` উদযাপন করেন। নবরাত্রিতে আমিষ খাওয়া নিষিদ্ধ। আমিষ-নিরামিষের জেরে এখন ভারতে অনেক বাঙালিকেই দুর্গাপূজার সময় তাদের প্রিয় আমিষ পদগুলো বর্জন করতে হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানা গেছে, পূর্ব দিল্লির পূর্বাচল সমিতিতে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে গত সাতাশ বছর ধরে। আর পুজো উপলক্ষে প্রতি বছর এ চত্বরে কাবাব, বিরিয়ানি খেতে ভিড় জমান অনেক মানুষ। কিন্তু এবার নবরাত্রি-র সময় এভাবে পুজাপ্রাঙ্গণে মাংস খাওয়ার বিরোধিতা করে ফেসবুকে প্রচার চালিয়েছিলেন স্থানীয় কিছু মানুষ। এর ফলে পুজোমন্ডপ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে এসব দোকান। পূজা কমিটির সচিব অশোক সামন্ত বলেন, আমরা সব সময় পুজার ভোগে প্রতিটা দিনেই সম্পূর্ণ নিরামিষ খাইয়ে এসেছি। আজও সবাইকে খিচুড়ি খাওয়ালাম। তবে ফুড হিস্টোরিয়ান অধ্যাপক পুষ্পেশ পন্থ বলেন, দুর্গাপুজোয় আমিষের চল ছিল আবহমান কাল থেকেই। হিন্দু কিন্তু কখনওই নিরামিষাশীদের ধর্ম ছিল না, এটা জৈনধর্ম নয়। ভারতে ক্ষত্রিয়-রাজপুত-বৈশ্য-শূদ্ররা এবং অনেক ব্রাহ্মণও চিরকাল মাংস খেতেন বলেও জানান তিনি।     /আর/এআর  

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি