ঢাকা, শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:৩৩:২৩

মন চলো রূপের নগরে

মন চলো রূপের নগরে

বাংলাদেশের মানুষের কাছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলা। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়া জেলা শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে করেছে সমৃদ্ধ। এখানে জন্ম গ্রহণ করেছেন বাউল সম্রাট লালন, সুরকার ও কবি আজিজুর রহমান, কবি দাদ আলী, লেখিকা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আবু জাফরসহ বহু বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব। প্রতিবছর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে ছুটে আসেন হাজারো পর্যটক।   ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে কুষ্টিয়ার বিশেষ আকর্ষণ বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের মাজার। তিনি এই কুষ্টিয়া জেলায়-ই জীবন কাটিয়েছেন। তার মাজার বর্তমানে বাউলদের আখড়া হিসেবে পরিচিত। লালন ভক্তের কাছে তাই অঞ্চলটি পুণ্যভূমি হিসেবে পরিচিত। শিলাইদহ কুঠিবাড়ি বহুদিন ধরেই মনে বড় ইচ্ছে ছিল রূপের নগর কুষ্টিয়া ভ্রমণের। তাই ঢাকা থেকে রওয়ানা হলাম। আমরা প্রথমে যাই শিলাইদহের কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। এখানে কবিগুরু অনেক গান ও কবিতা রচনা করেছেন। কবিপ্রেমীরা এখানে এসে কবির বহু স্মৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। এটি বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কুষ্টিয়া শহরের একপাশে অবস্থিত ঘোড়ার ঘাট পার হয়ে রিক্সা/ভ্যান/অটোযোগে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি পৌছানো যায়। ঘোড়ার ঘাটের অন্য পাড় হতে কুঠিবাড়ি পৌছাতে সময় লাগে প্রায় ৩৫ মিনিট। ৩২ বিঘা জমি নিয়ে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি আঙিনা। আড়াইতলা এ বাড়িটিতে রয়েছে ১৭টি কক্ষ। বাড়িটির কক্ষ ও বারান্দাজুড়ে প্রদর্শনীর জন্য রয়েছে কবির ব্যবহৃত ১টি পালঙ্ক, লেখার টেবিল, ইজি চেয়ার, নদীতে চলাচলের দুটি বোট `চঞ্চল`-`চপলা`, ৬ বিহারা ও ৮ বিহারার ২টি পালকি, লোহার সিন্দুক ১টি, খাজনা আদায়ের টেবিল ১টি, রোলার ১টি, আটকোনা টেবিল ১টি, গদি চেয়ার ২টি, সোফা ২টি, আলনা ১টি, কাঠের আলমিরা ৪টি, ফাইল কেবিনেট ১টি ঘাষকাটা যন্ত্র, পানি শোধন যন্ত্র ১টি, বিভিন্ন সময়ে কবিকে ঘিরে তোলা আলোকচিত্র, কবির নিজের আকা ছবি ইত্যাদি। মশাররফের বাস্তুভিটা আমরা সেখান থেকে গেলাম মীর মশাররফ হেসেনের বাস্তুভিটায়। কুষ্টিয়া শহরের অদূরে লাহিনীপাড়াতে মীর মশাররফ হেসেনের বাস্তুভিটা অবস্থিত। মীর মশাররফ হেসেনের ঘর-বাড়ি কিছুই নেই, আছে শুধু পৈত্রিক ভিটে। কুষ্টিয়া শহর থেকে রিক্সাযোগে সেখানে যাওয়া যায়। সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। আমরা কুঠিরবাড়ি হয়ে সেখানে গিয়েছি ব্যাটারিচালিত অটোতে করে। লালন শাহের মাজার মশরারফ হোসেনের বাস্তুভিটা থেকে গেলাম বাউল সম্রাট মরমি সাধক গুরু লালন ফকিরের মাজারে। ১৭ শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাউল মতের উন্মেষ ঘটলেও এই মত ও পথকে জনপ্রিয় করে তোলেন মরমি সাধক গুরু লালন ফকির। বাউল সম্রাট লালন ফকিরই বাউল ধারণার একটি স্বতন্ত্র ধর্ম সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কথা ছিল কুষ্টিয়া নেমে প্রথমে হোটেল যাবো। তারপর বিশ্রাম ও খাওয়া-দাওয়া। এরপর ঘুম। পরদিন সকালে সোজা সাঁইজীর মাজারে যাবো। কিন্তু কিছু অনিবার‌্য বাস্তবতায় সেটি আর হয়ে উঠেনি। এর একটি কারণ হচ্ছে আমরা ট্রেনে গিয়েছি। রাতের ট্রেনে গেলে পোড়াদহ নামিয়ে দিবে রাত ২টায়। তখন কুষ্টিয়া শহরে যাওয়া কষ্টকর। তাই ওখানেই রাত্রি যাপন করতে হয়েছে। অপরদিকে লালন উৎসবের সময় এ এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। তাই হোটেলও পাওয়া কষ্টকর। তবে আমরা পেয়েছিলাম কিন্তু সে জন্য ভাড়া গুনতে হয়েছে বেশি। সাধারণ সময় হোটেল দুই বেড পাওয়া যায় চারশ’ টাকার মধ্যে। এ সময় তা আটশ’ নেওয়া হয়। যাই হোক- ফিরে আসি লালন শাহর মাজারে। তার মাজার প্রাঙ্গণে যাওয়ার আগেই মনে মনে বেজে উঠল লালনের গান। তারপর তো একের পর এক গান চলে। গলা ছেড়ে না গেয়ে থাকতে পারলাম না। ভ্যানে করে গান গাইতে গাইতে চলে আসি সাইজির আখড়ায়। মাজার গেটের সামনে নেমেই ডানপাশে ছোট্ট একটা বাজার লক্ষ্য করলাম। প্রায় সব দোকানেই একতারা, দোতারা, লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সমাহার। ভাবছিলাম আগে কিছু কিনব কিনা। শেষে ঠিক করলাম আগে গুরুর মাজার দেখা তারপর কেনাকাটা। গেট দিয়ে মাজার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই আপনা-আপনিই একটা শ্রদ্ধাবোধ কাজ করছিল নিজের মধ্যে। চারদিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বেশ গোছালো। সামনে মাজার যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছে মরমী সাধক গুরু লালন সাঁইজী। আরও কিছু সমাধী। বেশকিছু লালনভক্ত চেখে পড়ল। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে যে বকশিস পায় তা দিয়েই তাদের চলে। মাজারের পাশে রয়েছে অডিটরিয়াম। বেশ উন্নত। পাশে একটা পাঠাগার ও জাদুঘরও রয়েছে। জাদুঘরে বেশকিছু লোকজ সংগ্রহশালার নিদর্শনসহ রয়েছে লালন ফকিরের ব্যবহৃত একটি একতারা। আমরা যখন গিয়েছিলাম তখন লালন উৎসব চলছিলো। সমাধির বাইরে বিশাল জায়গা নিয়ে চলছে লালন মেলা। ভক্তদের উপস্থিতি প্রচুর। স্টেজে চলছে গান। আমরা রাতে সেখানে গান শুনে আবার ফিরে আসলাম হোটেলে। রাতেই টিকেট কেটে রাখলাম বাসের। ঢাকায় আসার অসংখ্য গাড়ি আছে মজমপুর নামক স্থানে। সেখানেই আবাসিক হোটেলগুলো গড়ে উঠেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তবে যারা কুষ্টিয়া বেড়াতে আসবেন তারা একটু সময় হাতে নিয়ে আসবেন। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু, পাকশী রেল সেতু কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত। হার্ডিঞ্জ ব্রীজ সেতুর একটি স্প্যান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিমানের গোলায় ধ্বংস হয়ে যায়। কুষ্টিয়া এলে ইতিহাসের সাক্ষী এই রেলসেতুটি একবার স্বচক্ষে দেখে যেতে ভুলবেন না। রয়েছে লালন শাহ সেতু। বাংলাদেশের একটি গুরত্বপূর্ণ সেতু। সেতুটি কুষ্টিয়া জেলার পদ্মা নদীর উপর অবস্থিত। সেতুটি বাংলাদেশ ও জাপান যৌথভাবে নির্মাণ করে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতার পর মুক্ত বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত প্রথম সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। মুক্ত বাংলা ভাষ্কর্যটি এ বিশ্ববিদ্যালয়ে-ই অবস্থিত। কুষ্টিয়া শহর থেকে যশোর/খুলনা অভিমুখী যেকোন বাসে উঠলেই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে নামা যাবে। পৌছাতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘন্টা। বিশাল জায়গা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি একবার ঘুরে দেখতে দেখলাম। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করে। শাহী মসজিদ কুষ্টিয়ার আরও একটি দৃষ্টিনন্দন ঐতিহ্য শাহী মসজিদ। মোঘল আমলে নির্মিত এ মসজিদটি এই অঞ্চলের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতীক। কুষ্টিয়া শহর থেকে ঝাউদিয়া অভিমুখী মিনিবাস চলাচল করে। মিনিবাস থেকে ঝাউদিয়া বাজারে নেমে পাঁচ-সাত মিনিট পথ হাঁটলেই শাহী মসজিদ। পৌছাতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘন্টা। পাঠক কুষ্টিয়া আসলে এসব স্থানগুলো দেখতে ভুল করবেন না। সেই সঙ্গে কুষ্টিয়ার বিখ্যাত কুলফি মালাইতো আছেই। অসাধারণ স্বাদের এ মালাই একটি খেলে আরও খেতে ইচ্ছে জাগবে। আসার সময় বাড়ির সবার জন্য নিয়ে আসতে পারেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত তিলের খাজা। আরও বলে রাখি। কুষ্টিয়ায় বেশকিছু মিষ্টির দোকান আছে। মজাদার এসব মিষ্টির দোকানে ঢুকে মিষ্টির স্বাদটাও নিতে পারেন। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, লালন একটি মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন। নাম ‘প্যারা’। যা এখনও পাওয়া যায়। খেয়ে দেখতে পারেন। তবে ভালো মিষ্টির দোকান থেকে চিনে খেতে হবে। এজন্য স্থানীদের কাছ থেকে শুনে নিতে পারেন কোন দোকানের মিষ্টি বেশি ভালো। আমরা খুব সকালে নাস্তা খেয়ে বাসে উঠে বসলাম। ঠিক সময় বাস ছেড়ে দিলো। দুই পাশের প্রকৃতি আমাদের বিদায় জানালো। অপরূপ সবুজের এই প্রকৃতি আপনার চেখের কোন ক্লান্তি আনবে না। দুপুরের মধ্যে পৌছে গেলাম ঢাকায়। কীভাবে যাবেন ঢাকার কমলাপুর রেলষ্টেশন থেকে যমুনা সেতু  হয়ে কুষ্টিয়া ট্রেনযোগে ভ্রমণ করা যায়। এই রুটের ট্রেনগুলোর মধ্যে চিত্রা, তূর্ণা ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস এর মধ্যে অন্যতম। ঢাকা থেকে ট্রেনে পোড়াদহ। সেখান থেকে অটো বা সিএনজিতে কুষ্টিয়া শহর। এরপর রিক্সাযোগে যাওয়া যায় লালনের মাজারে। সময় লাগে প্রায় ১৫ মিনিট। তবে বাসেও যাওয়া যায়। //এস//এআর
রবীন্দ্রনাথের খোঁজে পতিসরে

বর্ষায় নওগাঁর আত্রাইয়ের পতিসর ভ্রমণের মজাই আলাদা। এসময়টা পতিসর নবরূপে পর্যটককে আকৃষ্ট করে। আপনি যে প্রান্ত দিয়েই পতিসরে যান না কেন, প্রতিমুহূর্তে প্রকৃতির হাতছানি আপনাকে অনাবিল আনন্দে মাতিয়ে তুলবে। পতিসরের পরতে-পরতে মিশে আছেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কর্মময় সময় কাটে এ পরগনায়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর কালিগ্রাম পরগনার সদর কাচারি পতিসরে আবারও আসেন তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন `পতিসর কৃষি ব্যাংক`। আর সেসব আকর্ষণের খোঁজে আজও দর্শনার্থীরা যান পতিসরে। যান্ত্রিক নগরী ছেড়ে পতিসরে যেতে হলে ঢাকা থেকে ট্রেনযোগে আত্রাই স্টেশনে যেতে হবে। আত্রাই স্টেশনটি বেশ পুরনো ও ছিমছাম। ইতিহাসখ্যাত আত্রাই নদীর কারণে এই স্টেশনের নামকরণ। প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ট্রেনে কলকাতা থেকে সরাসরি এখানে এসে নামতেন। এর পর তিনি তার বিখ্যাত `পদ্মা বোট`-এ নদীপথে সোজা চলে যেতেন পতিসরের কাচারিবাড়িতে। কখনও কখনও পালকি ব্যবহার করতেন কবি। কিন্তু এখন না আছে পদ্মাবোট, না আছে পালকি। তাই সময় বাঁচাতে দ্রুতযান সিএনজি অটোরিকশাই বেছে নিতে হবে আপনাকে। রাস্তায় চলতে আপনাকে স্বাগত জানাবে প্রকৃতি। পতিসরের প্রবেশপথে এক জোড়া সিংহমূর্তি আপনাকে স্বাগত জানাবে। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই মাঝের ফাঁকা জায়গায় গুরুদেবের কংক্রিটের ভাস্কর্য। দরজার দু`পাশে আছে মার্বেল পাথরে খোদিত পতিসরে সৃষ্ট রবীন্দ্র রচনার কিছু কথা। কবির স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে লেখা চিঠি থেকে জানা যায়, পতিসর যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল কবির জমিদারি দেখাশোনা নয়, স্বাস্থ্যোদ্ধার। স্ত্রীকে লিখেছিলেন, `একদিন জলের পরিপূর্ণ নির্জনতার মধ্যে নিঃশব্দে বাস করে আমার শরীরের অনেক উপকার হয়েছে। আমি বুঝেছি আমার হতভাগা ভাঙ্গা শরীরটা শোধরাতে গেলে একলা জলের উপর আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমার কোন উপায় নেই। এখানে রয়েছে মিউজিয়াম। রবীন্দ্রনাথের চেনা-অচেনা বিভিন্ন ছবি দিয়ে তিনটি ঘর সুন্দর করে সাজানো। রবীন্দ্রনাথের অন্য দুটি কুঠিবাড়ি শিলাইদহ ও শাহজাদপুরের চেয়ে এটি অনেক বেশি গোছানো। এখানে রবীন্দ্র ব্যবহৃত আরাম কেদারা, লোহার সিন্দুক, গ্গ্নোব, বাথটাব, চিঠিপত্রের অনুলিপি, পদ্মা বোটের নোঙর, জানালার কাচ প্রভৃতি সামগ্রী পরম যত্নে সংরক্ষিত। দেখা মিলবে রবীন্দ্রনাথ মাথা উঁচু করে যেন দাঁড়িয়ে অভয়বাণী দিচ্ছেন। কাচারিবাড়ির সামনে রয়েছে রবীন্দ্র সরোবর, ফাঁকা মাঠ এবং মাঠ সংলগ্ন নাগর নদী। কাচারিবাড়ির উত্তরদিকে খননকৃত বিরাট দীঘি। দক্ষিণ দিকে রয়েছে কবির হাতে গড়া স্কুল `কালিগ্রাম রবীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন`। সেখানে রয়েছে মাটির দেয়াল ও টালির ছাউনিতে তৈরি স্কুলের প্রথম ভবন। নদীপারের দিকে যেতে চোখে পড়বে আহমদ রফিক গ্রন্থাগারের। স্থানীয় বাসিন্দা রফিকসহ কয়েকজন রবীন্দ্রপ্রেমিক মিলে বছরপাঁচেক ধরে গড়ে তুলেছেন লাইব্রেরিটি। অজ-পাড়াগাঁয়ে এ ধরনের লাইব্রেরির কথা ভাবাই যায় না। প্রচুর সংগ্রহ; অধিকাংশই রবীন্দ্র বিষয়ক। যেভাবে যাবেন: নওগাঁর আত্রাইয়ের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ খুবই ভালো। তাই আত্রাইয়ে যেতে হলে ট্রেনই উত্তম। ঢাকা থেকে আন্তঃনগর ট্রেন নীলসাগর এক্সপ্রেসে চড়ে প্রথমে আত্রাই যেতে পারেন। এ ছাড়াও নওগাঁ ও নাটোরের সঙ্গে আত্রাইয়ের যোগযোগ ভালো। দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাস কিংবা ট্রেনে নওগাঁ/সান্তাহার বা নাটোর এসে পরে আত্রাই যেতে পারেন। নাটোর ও নওগাঁ থেকে বাস, ট্রেন ও নদীপথে নৌকায় আত্রাই যাওয়া যায়। আত্রাই থেকে পতিসর কাচারিবাড়ি যেতে হবে নছিমনে চড়ে, যা পর্যটকদের ভ্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ট্রেন স্টেশনের নিচেই রয়েছে নছিমন/ভটভটি স্ট্যান্ড। আত্রাই থেকে পতিসরের দূরত্ব ১৪ কিমি। পতিসরে রাত্রিযাপনের জন্য কোনো হোটেল না থাকলেও সরকারি একটি ডাকবাংলো আছে। পূর্ব অনুমতি থাকলে এখানে রাত্রি যাপন করা যায়। তা না হলে নওগাঁ শহরের যে কোনো আবাসিক হোটেলই ভরসা।   //আর//এআর

বর্ষায় হাওরবিলাস

সবুজ পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ভেসে চলা কার্পাস তুলোর মতো মেঘ। সঙ্গে রয়েছে ঝর্ণার পানিতে এলিয়ে দেয়া ক্লান্ত শরীর, বৃষ্টিস্নাত চা বাগানে গজিয়ে ওঠা নতুন কুঁড়ি। প্রকৃতির এমন মোহনীয় অপরূপ দৃশ্য রয়েছে মৌলভীবাজারে। আর বর্ষাকালে হাকালুকি হাওরের বিল ও নদীগুলো একীভূত হয়ে রূপ ধারণ করে সাগরের ন্যায়। যা আপনাকে দেয় নতুন এক অনুভূতি। বর্ষাকালে হাওরের পার ও জলাভূমি, বন পানির নিচে ডুবে সৃষ্টি করে ডুবন্ত বন। যা ব্যবহৃত হয় মাছের আশ্রয়স্থল হিসেবে। জেলেরা মেতে ওঠে মাছ ধরার উৎসবে। হাওরপারে বসবাসরত মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা হয় সহজ। সৃষ্টি হয় অন্য রকম উন্মাদনা। যোগাযোগের বাহন হিসেবে স্থান করে নেয় দেশীয় দাঁড়বাহী ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা। বিভিন্ন প্রকার সামাজিক অনুষ্ঠান এই সময় অনুষ্ঠিত হয়। হাওরের জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারও অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ ও প্রাণী পাওয়া যায় এই হাওরে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ হাওরে নানা প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্ষায় থইথই পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু স্থানগুলোতে অনেক পাখি আশ্রয় নেয়। আর শীতের সময়ে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখিমেলা বসে হাওরের বুকে।  এরপর আপনি হয়তো এগিয়ে চলছেন বৃষ্টিস্নাত মহাসড়ক বেয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে, পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ভেসে চলা কার্পাস তুলোর মতো মেঘ, বৃষ্টির জলে এলিয়ে দেওয়া নাগরিক জঞ্জালে ক্লান্ত শরীরে স্নেহের পরশ বুলিয়ে যাবে আপনার শরীর। হাকালুকি হাওর মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার পাঁচটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। ২৩৮টি বিল ও নদী মিলে তৈরি হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার একরের এ হাওর। হাওরের ৪০ শতাংশ অংশ বড়লেখা, ৩০ শতাংশ কুলাউড়া, ১৫ শতাংশ ফেঞ্চুগঞ্জ, ১০ শতাংশ গোলাপগঞ্জ ও ৫ শতাংশ বিয়ানীবাজার উপজেলার অন্তর্গত। হাওরের আয়তন ২০ হাজার ৪০০ হেক্টর। ২৪০টি বিল নিয়ে গঠিত হাকালুকি হাওরের বিলগুলোতে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পানির মধ্যে ও চারিধারে জেগে থাকা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া কিঞ্চিৎ উঁচুভূমি বিলের পানির প্রতিচ্ছবি ফেলে সৃষ্টি করেছে অপরূপ দৃশ্যের। পড়ন্ত বিকেলে রক্তিম সূর্যের আলো আরেক দিকে ত্রিপুরা রাজ্যের ছোট-বড় পাহাড়ের ঢালে লালচে আকাশ। রাখালিয়ারা গরু নিয়ে বাড়ি ফেরা। কোথাও জেলেরা তীরে নৌকা ভিড়াচ্ছে। একদল জেলে নৌকার বৈঠা কাঁধে একপ্রান্তে জাল, অন্যপ্রান্তে মাছের ঝুড়ি বেঁধে গাঁয়ের বাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। পাখির দল এ প্রান্ত হতে ও প্রান্তে ছুটোছুটি। আর কিছুক্ষণ পরেই ডুবে যাবে লাল সূর্য। ঘনিয়ে আসবে সন্ধ্যা। আর আমাদের ঘরে ফেরার সময় হয়ে এলো। যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ট্রেনে করে সরাসরি ঢাকা থেকে মাইজগাঁও চলে আশা। জনপ্রতি ৩৪০ টাকা দিয়ে চলে আসতে পারবেন। আর সেখান থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, এর পরেই পাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের ঠিকানা। হাকালুকি যাওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো রাত ৯টা ৫০ মিনিটে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া উপবন এক্সপ্রেস উঠে যাওয়া। নামতে হবে মাইজগাঁও স্টেশনে। এটি সিলেটের ঠিক আগের স্টেশন। ভাড়া নেবে ৩৪০ টাকা। মাইজগাঁও থেকে দুটি উপায়ে যাওয়া যায় হাকালুকি। ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার  হয়ে মাইজগাঁও থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার, বাজারে নেমেই আল মুমিন রেস্টুরেন্টে বসে যাবেন। সেখানে ফ্রেশ হয়ে, হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করে সামনের নৌকাঘাটে চলে আসুন। এখান থেকে নৌকা দরদাম করে উঠে পড়ুন সারা দিনের জন্য। বড় গ্রুপ হলে (১০/১৫ জন) বড় ছইওয়ালা ট্রলার দিন। দিনপ্রতি ভাড়া নিতে পারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা । কিছু খাবার এবং পানি কিনে নিন, কারণ হাওরে কোনো দোকানপাট পাবেন না। এবার নৌকায় উঠে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিয়ে হাওরে ঘুরে বেড়ান। কুশিয়ারা পাড়ি দিতে প্রায় ৪০ মিনিট লাগবে। খাবার-দাবার আপনি ফেঞ্চুগঞ্জ বাজারে নেমে আল মুমিন রেস্টুরেন্টে বসে গরম গরম পরোটা আর ডিম ভাজি দিয়ে নাশতা করতে পারেন। আর দূরের বন্ধুদের জন্য রয়েছে খুব কম খরচে পেট পূজার ব্যবস্থা। ৫০ টাকার ভেতরে ডাল, সবজি, মাছ (হাওরের টাটকা মাছ) অথবা মাংস দিয়ে সেরে নিতে পারেন আপনার আহার ক্রিয়া। খাবার শেষ করে আপনি চলে যেতে পারেন নৌকাঘাটে। তার পরে বড় ছইওয়ালা ট্রলার নিন।   //আর//এআর  

গ্রামীণ ঐহিত্যে ভরপুর জল ও জঙ্গলের কাব্য

শহরের যান্ত্রিকতা থেকে ক্ষণিকের জন্য প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন ‘জল ও জঙ্গলের কাব্য’ থেকে। এখানে রয়েছে পাখ-পাখালি দুরন্তপনা, বাড়ন্ত স্বাধীনতায় নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য গ্রামীণ ব্যবস্থাপনা। তার ওপর রয়েছে অফুরান সবুজের মাঠ, মাঁচা করা কুটির। যে দিকে দু’চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। পাশের খালে কচুরিপানার মাঝ দিয়ে ছোট্ট ডিঙি নৌকার মৃদু দোলুনি। এর ওপর বাড়তি পাওনা গ্রামবাংলার বারোয়াড়ি ভর্তা, পুকুরের টাটকা মাছ থেকে শুরু করে নানা স্বাদের সব মেন্যু। শুনতে পারবেন গ্রামীণ লোকশিল্পীদের কণ্ঠে মন উজাড় করা আবহমান বাংলার জারি-সারি-ভাটিয়ালি গান। শহর থেকে একটু দূরে এই গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি ‘জল ও জঙ্গলের কাব্য ২০০৫ সালে বিমান বাহিনী থেকে অবসর নেওয়া এক বৈমানিক শখের বসে গড়ে তোলেন। তার ইচ্ছে ছিল প্রকৃতির কাব্যে নিজেই ঘুরে বেড়াবেন একা একা। আর শুনবেন পাখির মিষ্টি কলতান। তিনিই একদিন ভাবলেন, এর স্বাদ কেন আমি শুধু একা নেব? কেন পাবে না আর সবাই? যেই ভাবা সেই কাজ। আনন্দ ভাগাভাগির জন্য উন্মুক্ত হলো সবার। গ্রামীণ পরিবেশে তৈরি পুরোটা এলাকাজুড়ে ১০-১২টা শেড রয়েছে। এর এক একটি শেডের আলাদা আলাদা নাম আর সাইজ, বকুল তলা, বট তলা ইত্যাদি। মাঝে মাঝে তার মেঠো পথ। একপাশে ঢেঁকিতে চাল গুড়ো হচ্ছে; চালের আটা দিয়ে রুটি আর চিতই পিঠা তৈরি হচ্ছে। আরেক পাশে বিশাল হেসেলে পুরোদমে চলছে খাবারের প্রস্তুতি। একদিকে চা-ঘর, দু’ পা ছড়িয়ে বাঁশের বেঞ্চে বসে চা খাওয়া। চোখে সবুজ আর হাতে গরম চায়ের মগ, অমৃত এই সুখের অফুরান আস্বাদন একদম ফ্রি। আবার কারো মন চাইলে একটু নৌকা ভ্রমণ করতে পারেন। রয়েছে বেশ কয়েকটা ছোট্ট ডিঙি। বিলের শাপলার পথ মাড়িয়ে আসতেও কোনো বাঁধা নেই। মাত্র ৭৫ বিঘা জমির সঙ্গে বিস্তীর্ণ বিলে সাজানো এই কাব্যের পরতে পরতে স্বস্তির স্বাদ। আর যদি একটু ঝুম বৃষ্টি থাকে তাহলে তো কথাই নেই! কীভাবে যাবেন: পুবাইল কলেজ গেট থেকে জল-জঙ্গলের কাব্য মাত্র ৩ কিলোমিটার আবার জয়দেবপুর রাজবাড়ির পাশ দিয়েও যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে গেলে টঙ্গী স্টেশন রোড বা ৩০০ ফিট দিয়ে যাওয়া যায়। জল-জঙ্গলের কাব্য পুবাইল, ডেমুরপাড়াতে অবস্থিত। এছাড়া মহাখালী থেকে নরসিংদী বা কালীগঞ্জগামী যেকোনো বাসে উঠুন। ১ ঘণ্টা পর পুবাইল কলেজ গেট এলাকায় নেমে পড়ুন। ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। এরপর একটা ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে পাইলট বাড়ি। তবে অবশ্যই আগে বুকিং থাকতে হবে। অথবা ঢাকার সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, আজিমপুর, মহাখালী থেকে গাজীপুর পরিবহন, ঢাকা পরিবহন, ভিআইপি পরিবহন ও বলাকা পরিবহনে শিববাড়ী চলে যাবেন। ভাড়া ৭০ টাকা। শিববাড়ী থেকে অটোরিকশায় ভাদুন (ইছালি) জল-জঙ্গলের কাব্য রিসোর্ট। ভাড়া ৮০-১০০ টাকা। খরচাপাতি: এখানে জনপ্রতি নেওয়া হয় ২,০০০ টাকা। নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ। খরচটা একটু বেশি মনে হতে পারে। তবে খাবারের বহরা দেখলে তা আর মনে হবে না। সারাদিনের জন্য ১,৫০০ টাকা জনপ্রতি (সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর বিকেলে হালকা নাস্তা)। শিশু (৫-১০ বছর), কাজের লোক ও ড্রাইভার জনপ্রতি ৬০০ টাকা। আর/ডব্লিউএন

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য জিন্দাপার্ক

ইট কাঠের শহরের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে অথবা ছুটির দিনে শহরের বাইরে একটু নির্জন এলাকা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। ধুলোয় মোড়ানো শহরের আশপাশেই রয়েছে এমন কয়েকটি সবুজে ঢাকা স্থান, যেখানে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই যাওয়া সম্ভব। নির্জন এলাকায় একদিন বা একবেলা নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে কাটাতে চাইলে চলে যেতে পারেন জিন্দাপার্ক।   নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার পূর্বাচল উপশহরে অবস্থিত জিন্দাপার্ক। ১৯৮১ সালে ১৫০ বিঘা জমির ওপর অগ্রপথিক পল্লী সমবায় সমিতির পাঁচ হাজার সদস্য জিন্দাপার্কটি গড়ে তোলেন। স্থানীয় যুবকেরা তাদের পৈতৃক টিলা ও বনজ জমি সম্বল করে এলাকাটিকে পার্কের আদলে গড়ে তোলেন।   মোট ১৫০ একর জায়গাজুড়ে গঠিত জিন্দাপার্ক যেন একটি সবুজরাজ্য। পার্কের ভেতরে বিশাল জলাশয়, প্রায় আড়াই শ’ প্রজাতির বনজ, ফলদ ও ঔষধিসহ কয়েক লাখ গাছ রয়েছে। রয়েছে স্কুল-কলেজ, মসজিদ, পাঠাগার, কটেজ ও অফিসসহ কয়েকটি স্থাপনা। এসব নির্মাণে দেয়া হয় দৃষ্টিনন্দন নৈসর্গিক রূপ, যা সবারই নজর কাড়ে।   রাজধানী থেকে প্রতিদিনই ছুটে যান প্রকৃতিপ্রেমী অনেকে। সাতসকালে শিশির ভেজা ঘাসে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে এসব প্রকৃতিপ্রেমী চিনে নেন কাঠমেধা, পাকুড়, নীলমণি লতা, গর্জন, হরীতকী, বহেরা, পবনঝাউ, গর্জন, শ্যাওড়া, পীতরাজ, বাজনা গাছ, দেশী গাবসহ আরো নানান জাতের গাছ। শহর থেকে যেন গা বাঁচিয়ে গড়ে ওঠা সবুজ এ পার্কে বুক ভরে নেয়া যাবে বিশুদ্ধ বাতাস। গাছ, ঘাসের বিছানা, মাটির রাস্তা, প্লাস্টিক ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান সাঁকো, বাগান, হ্রদ, লাইব্রেরি ও আধুনিক পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এ পার্ক। যেভাবে যাবেন: জিন্দাপার্ক যাওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে বাসযোগে কুড়িল বিশ্বরোড পৌঁছানো। সেখান থেকে পূর্বাচল হাইওয়ে দিয়ে কাঞ্চন ব্রিজ, তারপর সেখান থেকে রিকশা নিয়ে যাওয়া যাবে জিন্দাপার্ক। এছাড়া কাঁচপুর ব্রিজ দিয়েও যাওয়া যায়। যাত্রাবাড়ি বা নারায়ণগঞ্জ থেকে এ পথ সহজ। সেক্ষেত্রে কাঁচপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ও পরে শীতলক্ষ্যা পার হয়ে কাঞ্চন ব্রিজে আসতে হবে। জিন্দাপার্কের প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ১শ’ টাকা। যদি পার্কের ভেতরে প্যাডেল বোট চালাতে চান, তাহলে ঘণ্টায় পড়বে ৮০-১০০ টাকা। //আর//এআর

ঘুরে আসুন মিনি কক্সবাজার খ্যাত মৈনট ঘাট

ছুটির দিনে অথবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে একটু ঘুরতে যেতে পারেন ঢাকার কাছেই পদ্মা নদীতে মিনি কক্সবাজার খ্যাত মৈনট ঘাট। ঢাকার কাছে নবাবগঞ্জের  দোহারের পদ্মার পাড়ের এই এলাকা এরই মধ্যে বেড়ানোর জায়গা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এখানে আপনার মনকে নিমিষেই শীতল করে তুলবে পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউ আর নৌকা ভ্রমণ। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবেন পদ্মার অপরূপ জলরাশি দেখে। বিস্তীর্ণ জলরাশি আর নদীর বুকে জেলেদের সারি সারি নৌকা দেখলে মনে হবে আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে আছেন। নানা কারণে মৈনট ঘাট এখন রাজধানীর মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এর প্রধান কারণ হলো ঘাটের আশপাশে বিশেষ করে পূর্ব পাশে বিশাল চর আর সামনে বিস্তীর্ণ পদ্মা। এখান থেকে পদ্মা নদীতে নৌকায় ঘুরেও বেড়ানো যায় পাড় ধরে। তাছাড়া এ মৌসুমে প্রচুর রংবেরংয়ের পালের নৌকাও দেখা যায়। পদ্মায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য আছে স্পিড বোট। আটজনের চড়ার উপযোগী একটি বোটের ভাড়া ত্রিশ মিটিটের জন্য দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। এছাড়া ছোট বড় নানান আকারের ইঞ্জিন নৌকাও আছে। আড়াইশ থেকে ৮শ’ টাকা ঘণ্টায় এসব ইঞ্জিন নৌকায় চার থেকে ২০/২৫ জন একসঙ্গে ঘুরে বেড়ানো যায়। পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে দু’তিন ঘণ্টার জন্য ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে মৈনট ঘাটের কোলাহল ছেড়ে একটু দূর থেকে ঘুরে আসাই ভালো।  মৈনট ঘাটে বেড়াতে গিয়ে পদ্মার মাছও কেনার সুযোগ আছে। নৌকা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখা হওয়া জেলে নৌকা থেকে মাছ কিনতে পারবেন আপনি। তবে পদ্মার সেই টাটকা মাছের স্বাদ নিতে হলে দাম বেশ কিছুটা বেশিই গুনতে হবে আপনাকে। এটাতো আপনি দেখলেন দিনের প্রথম ভাগ। মৈনট ঘাট ও পদ্মার সৌন্দর্য উপভোগের জন্য দিনের দ্বিতীয়ভাগই ভালো। সেখানে সূর্যাস্ত না দেখে ফেরা উচিৎ হবে না। প্রাচীন স্থাপনা: ঢাকা থেকে সকালের দিকে বের হয়ে আপনি দেখতে পারেন নবাবগঞ্জের প্রাচীন স্থাপনা ও স্থানগুলোতে। দেখে নিন নবাবগঞ্জের কলাকোপার ঐতিহাসিক গান্ধী মাঠ, প্রাচীন প্রাসাদ, এন হাউজ, জগবন্ধু সাহা হাউজ এবং খেলারাম দাতার বাড়ি। এছাড়া নবাবগঞ্জের দৃষ্টিনন্দন জজ বাড়ি ও উকিলবাড়ি দেখতেও ভুল করবেন না। ঢুঁ মারতে পারেন বান্দুরার জপমালা রাণীর গির্জায়ও। সচেতনতা: মৈনট ঘাটে সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে সচেষ্ট থাকতে হবে। সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পদ্মার বেশি গভীরে না যাওয়াই ভালো। কীভাবে আসবেন: ঢাকা থেকে মৈনট ঘাটে আসার সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়টি হচ্ছে গুলিস্তানের গোলাপ শাহ’র মাজারের সামনে থেকে সরাসরি মৈনট ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাস। ৯০ টাকা ভাড়া আর দেড় থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন মৈনট ঘাট। মৈনট থেকে ঢাকার উদ্দেশে শেষ বাসটি ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬টায়। যারা প্রাইভেট কার অথবা বাইক নিয়ে আসতে চাচ্ছেন, তারা এই বাসের রুটটাকে ব্যবহার করতে পারেন। আসতে সুবিধা হবে। আর/ডব্লিউএন  

ঘুরে আসুন ভিমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার

ঝালকাঠি, বরিশাল আর পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকার ২৬ গ্রামের প্রায় ৩১ হাজার একর জমির উপর গড়ে ওঠেছে পেয়ারা বাগান। আর এ পেয়ারা চাষের সঙ্গে প্রায় ২০ হাজার পরিবার সরাসরি জড়িত। তাদের এ পেয়ারা বিক্রির জন্য বিখ্যাত ভীমরুলি ভাসমান পেয়ারা বাজার। ঝালকাঠী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলি গ্রামের আঁকাবাঁকা ছোট্ট খালজুড়ে সপ্তাহের প্রতিদিনই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। হাটটি সারা বছর বসলেও প্রাণ ফিরে পায় পেয়ারা মৌসুমে৷   ভিমরুলি হাট খালের একটি মোহনায় বসে। তিন দিক থেকে তিনটি খাল এসে মিশেছে এখানে। ভিমরুলির আশপাশের সব গ্রামেই অসংখ্য পেয়ারা বাগান। এসব গ্রামে দৃষ্টিপথে ধরা দেবে সবুজের সমারহ। এসব সবুজের বেশিরভাগ হোগলা, সুপারি, আমড়া আর পেয়ারার বন। এসব বাগান থেকে চাষীরা নৌকায় করে সরাসরি এই বাজারে নিয়ে আসেন। এখানে প্রতিদিন পেয়ারা বোঝাই শত শত নৌকা নিয়ে বিক্রেতারা খুঁজে বেড়ায় ক্রেতা। আর ক্রেতাদের বেশিরভাগই হল পাইকার। বড় ইঞ্জিন নৌকা নিয়ে তারা বাজারে আসেন। ছোট ছোট নৌকা থেকে পেয়ারা কিনে তার ঢাকা শহরে বিক্রি করেন। আকর্ষণীয় দিক হল, ভাসমান বাজারের উত্তর প্রান্তে খালের উপরের থাকা ছোট একটি সেতু। সেখান থেকে বাজারটি খুব ভালো করে দেখা যায়। এখানে আসা সব নৌকাগুলোর আকার আর ডিজাইন প্রায় একই রকম। মনে হবে যেন, একই কারিগরের তৈরি সব নৌকা। ভিমরুলির বাজারের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় হল দুপর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা। এ সময়ে নৌকার সংখ্যা কয়েকশ ছাড়িয়ে যায়।  বাসে যেতে চাইলে ঢাকার গাবতলী থেকে সাকুরা পরিবহনের এসি বাস যায় ঝালকাঠী। ভাড়া ৮শ’ টাকা। এছাড়া, ‘দ্রুতি’, ‘ঈগল’, ‘সুরভী’ ও ‘সাকুরা’ পরিবহনের নন এসি বাসও যায়, ভাড়া ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা। এছাড়া ঢাকার সায়দাবাদ থেকে ঝালকাঠী সদরে যাওয়ার জন্য রয়েছে ‘সুগন্ধা’ পরিবহনের বাস। ঝালকাঠী জেলা সদর থেকে মোটরবাইকে এই হাটে যেতে সময় লাগে প্রায় আধাঘণ্টা। আর ইঞ্জিন নৌকায় গেলে সময় লাগে এক ঘণ্টা। ঝালকাঠী লঞ্চঘাট কিংবা কাঠপট্টি থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। ১০ জনের চলার উপযোগী একটি নৌকার সারাদিনের ভাড়া ১৫শ’ থেকে ২ হাজার টাকা। কোথায় থাকবেন: সারাদিন ঘুরে সন্ধ্যায় আবার ঝালকাঠী থেকে ফিরে আসতে পারেন। থাকতে চাইলে জেলা শহরের সাধারণ মানের হোটেলই একমাত্র ভরসা। এ শহরের দু’একটি হোটেল হল কালিবাড়ি রোডে ‘ধানসিঁড়ি রেস্ট হাউস’, বাতাসা পট্টিতে ‘আরাফাত বোর্ডিং’, সদর রোডে ‘হালিমা বোর্ডিং’ ইত্যাদি। ভাড়া ১শ’ থেকে ২৫০ টাকা। এছাড়া স্বরূপকাঠির মিয়ার হাটে হোটেল ইফতিতে থাকতে পারেন। একদম নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠা সাধারণ মানের এ হোটেলটিতে থাকাও হবে একটা অভিজ্ঞতা। তবে ভালো কোনো হোটেলে থাকতে চাইলে যেতে হবে বরিশাল সদরে। ঝালকাঠী থেকে যার দূরত্ব প্রায় বিশ কিলোমিটার। যখন যাবেন:  জুলাই, আগষ্ট, সেপ্টেম্বর মাস পেয়ারার মৌসুম। পেয়ারার মৌসুম শেষ হলে আসে আমড়ার মৌসুম। এ অঞ্চলে আমড়ার ফলনও সর্বত্র। আর সবশেষে আসে সুপারি।   আর/ডব্লিউএন

হুমায়ূন আহমেদের নুহাশপল্লী যেন মায়াপুরী

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ব্যক্তিজীবনে একজন সফল ও রুচিশীল মানুষ।  লেখালেখির ভুবনে অন্যান্য লেখকদের চেয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর আর্থিক অবস্থা ছিল অনেক ভালো। তাঁর শৈল্পিক চিন্তার ফসল হল গাজীপুরের পিরুজ আলী গ্রামের নুহাশপল্লী। হুমায়ূন আহমেদের বড় ছেলে নুহাশ হুমায়ূনের নামানুসারে পল্লীটির নাম রাখা হয় ‘নুহাশপল্লী’। চল্লিশ একর জমিতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিশাল এই পল্লী। গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এক দুর্গম এলাকায় তিনি নুহাশপল্লীর গড়ে তোলেন। যেখানে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শ্যুটিংস্পট, দীঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো বাড়ি। একটিতে  নিজে থাকতেন আর বাকি দুটি ছিল তার শৈল্পিক চিন্তাধারার প্রতিফলন। নুহাশপল্লীর উদ্যানের পূর্বদিকের খেজুর বাগানের পাশে ‘বৃষ্টিবিলাস’ নামে একটি অত্যাধুনিক ঘর রয়েছে। এর ছাদ টিনের তৈরি; যেন বৃষ্টি হলে শব্দ উপভোগ করা যায়। বৃষ্টির শব্দ শুনতে এই আয়োজন। সুন্দর নকশা, ফলস সিলিং দেওয়া ঘরটি অনেক সুন্দর। একটু ভেতরে আরেকটি বাংলো রয়েছে যার নাম ‘ভূতবিলাস’। দুই কক্ষের আধুনিক বাংলোটির পেছনে ছোট পুকুর রয়েছে। যার চারিদিক সুন্দর ঘাসে মোড়া ঢাল দিয়ে ঘেরা, এই ঢালের চারিদিকে রয়েছে গাছ-গাছালি। ভূতবিলাসের পাশ দিয়ে একটি নড়বড়ে কাঠের সাঁকো রয়েছে। যেটার ওপর দিয়ে হেঁটে পুকুরের মাঝখানের ছোট্ট এক টুকরো দ্বীপাকারের ভূখণ্ডে যাওয়া যায়। দুর্লভ সব ওষুধি গাছ নিয়ে যে বাগান তৈরি করা হয়েছে; তার পেছনেই রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষস রয়েছে। আরো রয়েছে পদ্মপুকুর, অর্গানিক ফর্মে ডিজাইন করা অমসৃণ সুইমিং পুল। নুহাশপল্লী যেন সবুজের সমারোহে একখণ্ড নিটোল চিত্র।  প্রাকৃতির এমন সৌন্দর্যের মাঝেও তিনি কৃত্রিম সৌন্দর্য দিয়ে আরো মোহনীয় করে তুলেছেন। যা ঘুরে দেখতে পারলে ভালোই লাগবে। যে কারো মনে আনন্দ দিতে পারবে এই নুহাশ পল্লী। কেআই/ডব্লিউএন

সবুজ প্রকৃতি ও স্বচ্ছ জলের মধুচন্দ্রিমা

কয়েকদিন ধরে আলোচনা হচ্ছিল একটা ভ্রমণের। ভ্রমণে আগ্রহী আমরা কয়েক বন্ধু। জায়গা ঠিক না হলেও সবাই একমত কোনো এক পাহাড়ি ঝর্ণা দেখতে যাব। কারন চিরসবুজের পাহাড়ের বুক চিড়ে স্বচ্ছ জলরাশির ঝর্ণাধারা ভ্রমণপিপাসুর মনের তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির আপন মহিমায় গড়ে ওঠা এসব জায়গায় গেলে বিষাদে ভরা মন নিমিষেই ভালো হয়ে যায়। সবাই মিলে ঠিক করলাম সিলেটের জাফলং যাব। দিন ঠিক হলো, তবে শর্ত হলো রাতে যাব। কারণ রাতের বেলায় গাড়িতে ঘুম, দিনে বেড়ানোর পরিকল্পনা। রাতেই যাবার জন্য প্রস্তুত আমরা। জুলাইয়ের ১ তারিখ। দিনের বেলায় কিছু কেনা-কাটা করে ভ্রমণের একটা প্রস্তুতি নিয়ে রাখলাম। কারণ রাত ১১টায় আমাদের সিলেট যাওয়ার কথা। রাতের খাবার এখনও শেষ করতে পারিনি। এরই মাঝে বন্ধু মাসুমের ফোন। রেডি, মনে আছে, গাড়ী কিন্তু সময় মতো… ইত্যাদি। ঝটপট খেয়ে রেডি হলাম। সবাই মিলে নিদির্ষ্ট সময়ে ফকিরাপুল বাসস্টান্ডে যাই। বাস ছাড়ল, তিন ঘন্টা হয়েছে বসে আছি বাসের মধ্যে। আর বসে থাকতে মন চাইছে না ঝর্ণা দেখার নেশায়। সকাল ৭টায় গাড়িতে চেপে শহরের বন্দরবাজার হয়ে মিরাবাজার, শিবগঞ্জ, এমসি কলেজ, সরকারি কলেজ পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চলছি। মাসুম আর সুমনের আর তর সইছে না। প্রচন্ড ক্ষুদ্রায় বেচার দুজনের অস্থিরতা ভাব। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমরা হালকা নাস্তা করলাম। এরই মধ্যে জাফলংয়ের কাছাকাছি এসে পড়েছি। কাছে পৌঁছাতেই দেখা মিলল পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলা ঝর্ণা। দূর থেকে মনে হবে, আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তুলার মতো ভেসে বেড়ানো মেঘরাশি। পার্শ্ববর্তী ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড় সবুজে ভরে উঠেছে। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে সীমান্তঘেঁষা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই জনপদকে। জাফলং বল্লাঘাটে থেকে নৌকায় নদী পার হয়ে এগিয়ে চললাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। পথে খাসিয়াদের গ্রাম, গ্রামকে বলা হয় পুঞ্জি। এই পুঞ্জিগুলোতে দেখা যাবে ৩-৪ ফুট উঁচুতে বিশেষভাবে তৈরি খাসিয়াদের ঘর আর পানের বরজ। মাতৃতান্ত্রিক খাসিয়া সম্প্রদায়ের পুরুষরা গাছ বেয়ে বরজ থেকে পান পাতা সংগ্রহ করে আর নারীরা পান পাতা ভাঁজ করে খাঁচা ভর্তি করে। পান পাতা ভাঁজ করার দৃশ্য সবারই নজর কাড়ে। মেঘালয় রাজ্যের উংশিং পুঞ্জির পাশ দিয়ে অঝোর ধারায় ঝরছে এই মায়াবতি ঝর্ণাধারা। যেখানে মাথার ওপর চেপে ধরা আকাশ অনেক উঁচুতে আর ছাই বরণ মেঘমালা একটু পরপর রঙ বদলাচ্ছে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তারা ছুটে চলেছে অজানা গন্তব্যের দিকে। আমরা ঝর্ণার একদম কাছে গিয়ে মনের তৃষ্ণা মেটাতে থাকলাম। পর্যটকের বেশ আনাগোনা দেখলাম। প্রকৃতির সুনিপুণ হাতের তৈরি ছায়া-সুনিবিড় শান্তিময় তরুচ্ছায়া। ঘন, গাঢ় চিরসবুজের পাহাড়ের বুক থেকে স্বচ্ছ জলরাশির ঝর্ণাধারা ভ্রমণপিপাসুদের মনের তৃষ্ণা আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতির আপন মহিমায় গড়ে ওঠা এই জায়গায় গেলে শত পরিশ্রান্ত, ক্লান্ত ও বিষাদে ভরা মন-প্রাণ যেন নিমিষেই জুড়িয়ে যায়। যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাস/ট্রেনে সিলেট; ভাড়া ২৫০ থেকে ১২শ` টাকা। সিলেট থেকে লোকাল বাসে জাফলং মামার বাজার; ভাড়া ৬০ টাকা। জাফলং বল্লাঘাট থেকে ১০ টাকা দিয়ে পিয়াইন নদী পার হয়ে খাসিয়া পুঞ্জি। দেখা যাবে মায়াবী ঝর্ণার হাতছানি। অথবা জাফলং বল্লাঘাট থেকে ট্যুরিস্ট নৌকায় যাওয়া যায়। //আর//এআর  

ঘুরে আসুন অ্যান্টার্কটিকা

বিশ্বের দক্ষিণের মহাদেশের  নাম অ্যান্টার্কটিকা। এর  আয়তন অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের প্রায় দ্বিগুণ, যার ৯৮ শতাংশই বরফে মোড়া। বরফের এ মহাদেশ ঘিরে মানুষের কৌতুহলের শেষ নেই। তবে ভ্রমণ পিপাসুদের তালিকায় অ্যান্টার্কটিকার নাম নেই। এর একমাত্র কারণ এখানকার প্রতিকূল আবহাওয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতি । যে  কেউ চাইলেই বরফের  মহাদেশে পৌঁছাতে পারবেন না । পাশাপাশি এই ট্যুরও হবে খুব ব্যয়বহুল। কিন্তু এবার মুম্বাই থেকে আপনি চাইলে সাধ্যের মধ্যে থাকা খরচে পাড়ি দিতে পারবেন বরফের এ রাজ্যে। মুম্বাইয়ের এক লাক্সারি ট্রাভেল কোম্পানি সম্প্রতি নতুন এ ট্যুর প্ল্যান ঘোষণা করেছে। আর এ প্ল্যানের জন্য নামানো হচ্ছে নতুন এক লাক্সারি জাহাজ। এটি চলতি বছরের ৯ ডিসেম্বর মুম্বাই থেকে যাত্রা করবে। এ জাহাজে সবমিলিয়ে ২০০ জন যাত্রী হতে পারবেন। জাহাজটিতে থাকছে সুস্বাদু খাবারের লম্বা মেনু। আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেন থেকে জাহাজে সঙ্গী হবেন দুই বিশ্বখ্যাত শেফ। আমেরিকান ও ব্রিটিশ খাবারের পাশাপাশি ক্রুজে থাকছে `রাজমা চাওয়ালের` মতো বিখ্যাত সব ভারতীয় ডিশও। এজন্য থাকছেন ভারতের স্বনামখ্যাত শেফ অতুল কোচার। দক্ষিণ মেরুর এ মহাদেশ যাত্রাকে আরও উপভোগ্য করে তুলতে থাকছে রিসার্চারদের টিম ও ট্যুর গাইড। তবে এতোসব সেবা পেতে সবমিলিয়ে মাথা পিছু খরচ করতে হবে সাত লাখ রুপি। যাত্রাপথে কোনো বাধা না এলে ১০ দিনেই সম্পন্ন হবে রোমাঞ্চকর এ সফর। কেআই/ডব্লিউএন

স্বচ্ছ পানি আর সবুজাভ প্রকৃতির মাখামাখি

সবুজ গাছ-গাছালি নিথর পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এক নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য নিয়ে। দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে সবুজ পত্র-পল্লবে ঢাকা ‘রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট’। এটি বিশ্বের ২২টি সোয়াম্প ফরেস্টের মধ্যে একটি। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা রাতারগুল একটি নজরকাড়া পর্যটন কেন্দ্র।   ছুটি পেলেই প্রচুর পর্যটক ছুটে আসেন এখানে। চাইলে আপনি ঘুরে আসতে পারেন স্ব-পরিবার অথবা বন্ধুদের নিয়ে।   কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বনের গাছগুলো দেখতে পর্যটকরা ভিড় জমায় বর্ষা মৌসুমে। তখন অবশ্য ডিঙ্গি নৌকায় করে ঘুরতে হয়। ডিঙিতে চড়ে বনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে দেখা যাবে প্রকৃতির রূপসুধা। জলমগ্ন বলে এই বনে সাপের আবাসটাই বেশি। তবে ভাগ্য ভালো হলে দেখা হয়ে যেতে পারে দু-একটা বানরের সঙ্গে।   এছাড়া চোখে পরার মত বনে সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, পানকৌড়ি, ঢুপি, ঘুঘু, চিলসহ নানা জাতের পাখিতো আছেই।   যেভাবে যাবেন ঢাকা থেকে সরাসরি প্রতিদিন গ্রীণলাইন, হানিফ, শ্যামলীসহ অনেক বাস যায় মহাখালি, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল থেকে। চাইলে ট্রেনেও যেতে পারেন। কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে রোজ একাধিক ট্রেন সিলেটের উদ্দেশ্য ছেড়ে যায়।   ঢাকা – সিলেট রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলো হলো- কালনী এক্সপ্রেস, পারাবত এক্সপ্রেস জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস উপবন এক্সপ্রেস। সিলেট নগরীতে নামার পর নগরী থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলায় রাতারগুলের অবস্থান।   আম্বরখানা-বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে সাহেব বাজার হয়ে আবার সিলেট-তামাবিল সড়ক হয়ে হরিপুর সড়ক দিয়ে রাতারগুল যাওয়া যায়।  অথবা জাফলং রোডেও যেতে পারেন। তবে যেতে হবে সিলেট থেকেই।   যাইহোক, মানুষ ৬-৮ জন হলে প্রথমেই সিলেট শহরে ‘চৌহাট্টা থেকে একটা মাইক্রোবাস ঠিক করে নিন। আসা-যাওয়ার বাবদ খরচ পরবে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মত। মাইক্রোবাসে করে প্রায় ঘণ্টাখানেক যাওয়ার পর পৌছে যাবেন গোয়াইন নদীর তীরে।   এখানে নেমেই ড্রাইভারের মোবাইল নাম্বার নিয়ে নিন, যাতে পরে এসে খুঁজে পেতে সমস্যা না হয়। তারপর চলে যান সোজা নদীর ঘাট। সেখান থেকে যেতে হবে প্রায় আধঘণ্টা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে। খরচ পরবে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার মত।   মনে রাখবেন এই নৌকা কিন্তু বনের ভেতর ঢুকবে না। বনে ঢুকতে হবে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে। এই নৌকা আপনাকে বনের পাশে নামিয়ে দেবে। বনে নামার পর কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে ডিঙ্গি নৌকা। কথাবার্তা বলে একটা ঠিক করে নিন। ডিঙ্গি নৌকার ভাড়া পরবে ৬০০ থেকে ১২০০ টাকার মত।   সর্তকতা বর্ষায় বনে জোঁক আর সাপের প্রকোপ বেশি থাকে। তাই সতর্ক থাকবেন। যাঁরা সাঁতার জানেন না, সঙ্গে লাইফ জ্যাকেট রাখতে পারেন। তাছাড়া বনে ঢুকে পানিতে হাত না দেয়াই ভালো। কারণ বিষাক্ত সব সাঁপ এখানে ঘুরে বেড়ায়! নৌকায় বসে কোন গাছের ডালে হাত দিতেও সতর্ক থাকুন।   রাতারগুল থাকা-খাওয়ার কোন ব্যাবস্থা নেই। যাওয়ার শুকনো খাবার (চিপস, বিস্কিট, পানি ইত্যাদি) সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারেন। আর থাকার জন্য ফিরে আসতে হবে সিলেটেই।   থাকার ব্যবস্থা জেলা পরিষদের একটি রেস্ট হাউস আছে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের তত্ত্বাবধানে। থাকতে হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিতে হয়। এ ছাড়া ভোলাগঞ্জ বা কোম্পানিগঞ্জ উপজেলায় থাকার জন্য তেমন কোন ভাল ব্যবস্থা নাই। ভোলাগঞ্জ দর্শন শেষ করে সিলেটে এসে অবস্থান করতে পারবেন।   //আর//এআর

ঘুরে আসুন বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক

ঢাকা থেকে ঐতিহ্যবাহী ভাওয়াল গড়ের দূরত্ব মাত্র ৪০ কি.মি.। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এই স্থানটি সব সময়ই পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। এমন একটি জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। পশু-পাখির অনেকটা কাছাকাছি আসার অনুভূতি পাবেন বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। গাড়ির ভেতর বসে দেখতে পাবেন নানান রকম পশু-পাখি। ইচ্ছে করলে আপনি যে কোনো দিন পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন গাজীপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক থেকে। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়ার বৃহত্তম সাফারি পার্ক। উন্নত বিশ্বের আধুনিক সাফারি পার্কের ন্যায় ৩৬৯০ একর জায়গা নিয়ে এটি তৈরি করা হয়েছে। পার্কে ১২২৫ একর জায়গা নিয়ে স্থাপন করা হয়েছে কোর সাফারি, ৫৬৬ একর জায়গা নিয়ে সাফারি কিংডম, ৮২০ একর জায়গা নিয়ে বায়োডাইভার্সিটি, ৭৬৯ একর এলাকা নিয়ে এক্সটেন্সিভ এশিয়ান সাফারি এবং ৩৮ একর এলাকা নিয়ে বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। পার্কে বন ও অবমুক্ত প্রাণির নিরাপত্তার জন্য ২৬ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটক গাড়িতে বসে বিচরণ অবস্থায় বন্যপ্রাণী দেখতে পারবেন। পার্কে অবমুক্ত করা হয়েছে বাঘ, সিংহ, ভালুক চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, জেব্রা, জিরাফ, ওয়াইল্ডবিষ্ট, ব্লেসবক, উটপাখি, ইমু প্রভৃতি। এ পার্কে স্থাপন করা হয়েছে আন্তর্জাতিকমানের প্রকৃতিবীক্ষণ কেন্দ্র। এখান থেকে বন ও প্রাণী বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। এছাড়া তথ্য ও শিক্ষাকেন্দ্র, নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম, পার্ক অফিস, বিশ্রামাগার, ডরমেটরি, বন্যপ্রাণী হাসপাতাল, কুমিরপার্ক, লিজার্ড পার্কসহ ঝুলন্ত ব্রিজ, বাঘ পর্যবেক্ষণ রেস্তরাঁ, সিংহ পর্যবেক্ষণ রেস্তরাঁ, কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্র, ইকো রিসোর্ট, ফুডকোর্টসহ আরও অনেক কিছু। পর্যটকদের সুবিধার জন্য রয়েছে বাস ও সাফারি জীপ। সাফারি বাস ও জীপে পর্যটকরা প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণরত বাঘ, সিংহ ও ভালুক দেখতে পারবেন। এছাড়াও দেখা যাবে জিরাফ, জেব্রা, ব্লু ওয়াইল্ডবিস্ট, ব্ল্যাক ওয়াইল্ডবিস্ট, ব্লেস বকসহ বিভিন্ন প্রাণি। পার্কে প্রবেশ ফি   প্রবেশ ফি বয়স্কদের জন্য ৫০ টাকা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ২০ টাকা, শিক্ষার্থীদের ১০ টাকা, শিক্ষা সফরে আসা শিক্ষার্থী গ্রুপ ৪০ থেকে ১০০ জন ৪০০ টাকা, আর যদি শিক্ষার্থী গ্রুপ ১০০ জনের বেশি হয় তাহলে ৮০০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য পাঁচ ইউএস ডলার। এই প্রবেশ ফি দিয়ে পার্কে ঢুকলেই আপনি সব দেখতে পাবেন না। পার্কে প্রবেশের পর সবকিছু দেখার জন্য আলাদা টিকেট কাটতে হবে। যেমন গাড়িতে সাফারি পার্ক পরিদর্শন করতে চাইলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লাগবে ৫০ টাকা, বড়দের ১০০ টাকা। এছাড়া ক্রাউন্ড ফিজ্যান্ট এভিয়ারি পরিদর্শন ১০ টাকা, ধনেশ এভিয়ারি ১০ টাকা, প্যারট এভিয়ারি ১০ টাকা। যেভাবে যাবেন মহাখালী থেকে ভালুকা, ময়মনসিংহ বা শ্রীপুরের বাসে উঠে গাজীপুরের বাঘের বাজার নামতে হবে। যানজট বিবেচনা সাপেক্ষে ২ ঘণ্টা লাগবে এ বাজারে যেতে। এরপর বাস থেকে নেমে রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় পার্কে যাওয়া যাবে। মাত্র ২০ মিনিট পরই আপনি পৌঁছে যানে এ পার্কে। আর/ডব্লিউএন    

এ বিভাগে আপনাদের মতামত ও লেখা পাঠান [email protected]

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি