ঢাকা, মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

অনুতাপে অঝোরে কেঁদেছিলেন স্যার

লুৎফর হাসান

প্রকাশিত : ১৩:১৭ ৫ অক্টোবর ২০১৯

আমার শিক্ষক? এটা শুনতেই আমার মনে পড়ে উনিশশ ছিয়াশি। ঘাটাইলের পাকুটিয়া প্রাইমারি স্কুল। স্যারের নাম ভুলে গেছি। তবে সবাই ডাকতো পাগলা স্যার নামে। একদিন আমাদের গৌতম কী যেন এক ভুল করেছিল। স্যার কিছু একটা বলেছিলেন। ফিকফিক করে হেসেছিলাম সকলেই।

জীবন ক্রিডি, জাহানারা, মনির, পরিতোষ, গৌরাঙ্গ, অনুরাধা আর কে কে যেন ছিল, সবার কথা মনে পড়ে না। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছি আমরা। প্রত্যেককে বাইশখানা করে বেতের আঘাত করলেন পাগলা স্যার। অনুরাধা ঢলে পড়েছিল মনে আছে। মনে আছে গৌরাঙ্গ সেই স্যারের বেত কেড়ে নিয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল। 

জানা যায়, গৌরাঙ্গ সেই থেকে স্কুলে যায় নাই আর। গৌরাঙ্গ কোথায় আছে, কেউ জানে না। জীবনের সাথে দুই বছর আগে দেখা হয়েছিল। অনুরাধার সাথে নতুন পরিচয় হয়েছিল তার মেয়ের বিয়ের দিন ময়মনসিংহে। বন্ধুদের আর কারো কথা মনে পড়ে না। স্যারের কথা মনে পড়ে। স্যার পরদিন বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। অঝোরে কেঁদেছিলেন অনুতাপে। স্যার আজ বেঁচে নেই।

নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলের শাহাদাৎ স্যার ছিলেন হেড মাস্টার। তাঁর কথা ভুলে যাবার উপায় নেই। বেলুয়া গ্রামে ছিলেন হুমায়ূন স্যার। খুব রাগী একজন মানুষ। এদিক সেদিক তাকালে সপাং সপাং মারতেন। হুমায়ূন স্যারকে ডাকা হতো তাঁর গ্রামের নামে। বেলুয়া স্যার। গোপালপুর থানা শহর থেকে পান চিবুতে চিবুতে এক স্যার আসতেন। জীবন চন্দ্র নামে জানতাম। তাঁর লাল কালির ফাউন্টেন পেনের সেই লেখা এখনও চোখে জ্বলজ্বল করছে।

নানারা চার ভাই। বড় যিনি, তার বড় মেয়ের বড় ছেলে আমি। নানার ছোট যিনি, তিনি ছিলেন ডাক্তার। তার স্ত্রী, মানে আমার মেজো নানী ছিলেন পরিবারের অন্যতম শিক্ষিত মানুষ। তিনি ছিলেন অংকে খুব পাকা। আর আমি যেহেতু অংকের কিছুই বুঝতাম না, তাই আমাকে নানীর কাছে পাঠানো হলো। আমাদের বাড়ির সাথে নানীর বাড়ির দূরত্ব দেড় মিনিটের রাস্তা। আমি পড়তে যেতাম নিয়মিত। বীজগণিত পড়াতেন। বলা যায়, নানীই আমার অন্যতম শিক্ষক। রান্না ঘরে বসে পড়তাম। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি আমাকে অংক শেখাতেন।

বড় চাচার ছেলে সাইফুল ভাই পড়াতে আসতেন। এ কেমন শিক্ষক আমার, দুজন মিলে খালি সিনেমা দেখতাম। কাকলি হল। মানসী হল। সাইফুল ভাইর সাথে নিশ্চিন্তে সিনেমা দেখার সুযোগ আসে তার কাছে প্রাইভেট পড়ার নামে।

আকবর স্যার আসতেন সেই পাথাইলা গ্রাম থেকে। এখন যে দুইশ এক গম্বুজ মসজিদের গ্রাম। সেই গ্রামের আকবর স্যার। স্যারের হাতে থাকতো বিড়ির প্যাকেট। কখনও সিগারেটও থাকতো। তিনি পড়াতেন সাধারণ গনিত। পরিতোষ স্যার পড়াতেন উচ্চতর গণিত। তিনি আসতেন আলমনগর থেকে। বেলুয়া গ্রাম থেকে আসতেন ইদ্রিস স্যার। আমার ভীষণ পছন্দের একজন স্যার। তিনি ইংরেজি পড়াতেন। সেই তিনজন শিক্ষক ছিলেন নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের। আমি যেহেতু এই গ্রামের ছেলে, গোপালপুর আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র হলেও আমি প্রাইভেট পড়তাম এই তিন স্যারের কাছে। তিনজনই আমাদের পড়াতেন স্কুলের বারান্দায়। বকুল গাছের তলায়। সে বিরাট এক বকুল গাছ। তবে বকুলের ঘ্রাণ ম্লান হয়ে যেতো তিন স্যারের ধারাবাহিক সিগারেটের ধোঁয়ায়। অপূর্ব সেই ধোঁয়া। সেই তো লুকিয়ে সিগারেট খেতে শুরু করলাম। সেই উনিশশ বিরানব্বই।

মাদ্রাসায় জয়নাল স্যার ছাড়া আমার পছন্দের কোনও শিক্ষক পাই নাই। কারণ সবাই ওই যে পাঞ্জাবি টুপির জন্য কেমন কেমন করতেন। কিন্তু জয়নাল স্যার ছিলেন আলাদা। ইংরেজি পড়াতেন। অনর্গল ইংরেজি কবিতা আর তার দারুণ অনুবাদ বলে যেতেন। স্যার বলেছিলেন ‘ওরা সকলে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আর অধ্যাপক হবে, তুই আলাদা কিছু হবি। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার আর ডাক্তার তো পাড়ায় পাড়ায় আছে। তোকে পাড়ায় পাড়ায় পাওয়া যাবে না। পুরো অঞ্চলে একজন থাকবি’। 

আমি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক হতে পারি নাই। হ্যাঁ, আমি যা করি তা আমার অঞ্চলে বিরলই বলা চলে। কিন্তু এই জীবন তো ভয়াবহ। সবার টাকা আছে, আমার টাকা নাই। কারো অভাব আসে না। আমার যখন আসে তখন দুমড়ে মুচড়ে দেয়। কী জানি কী ভেবে স্যার বলেছিলেন সেসব। জয়নাল স্যারকে আমি ভুলতে পারি না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ইয়ারে ইসলামের ইতিহাস পড়াতেন খায়ের স্যার। খায়ের স্যার ছাড়া আর কোনও স্যারের কিছুই আমি বুঝতাম না। ক্লাসে আমার ঘুম আসতো। আমি আগাগোড়া পাগলাটে মানুষ। আমার তো ইসলামিক স্টাডিজ প্রিয় বিষয় না। আব্বা জোর করে এই পথে রেখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ, আমিও ওসব ভুলে গেছি। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের বাইরের জীবনটাই পছন্দের এখনও। আমার ডিপার্টমেন্টের কোনও শিক্ষকই আমার ভালো লাগে নাই।

অ্যাকাডেমিক শিক্ষার যে জীবন, তার বাইরে এক শিক্ষা জীবন আছে। সেটা আরও বিস্তৃত। নানান সময়ে আমরা সেখান থেকে শিখি। শিক্ষক দিবসে এটা মনে পড়ে যে, আজকাল শিক্ষক না হয়েও শিক্ষার্থীদের অনেকেই শিক্ষকের আচরণে ব্যস্ত। সবাই আজকাল জ্ঞান দেয়। কোনও বিষয়ে মিনিমাম ধারণা না থাকা ছেলেমেয়েরাও যেচে এসে বলে বসে ‘এটা এরকম না, ওরকম’।

আজ শিক্ষক দিবস। দুই একজন ছাড়া তো কারো কথা মনে পড়ছে না। যাদের কথা মনে পড়ছে, মনে পড়ে বুকে ব্যথা লাগছে। প্রিয় স্যারদের কেউ বেঁচে নেই।

লেখক-সংবাদিক, সাহিত্যিক ও শিল্পী

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি