ঢাকা, রবিবার   ১৭ মে ২০২৬

ইরানের ইকোনমিক জিহাদ

ইরান: নিষেধাজ্ঞার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিক্রেট সুপারপাওয়ার

জাহিদ আল আসাদ

প্রকাশিত : ১৭:১৮, ১৭ মে ২০২৬ | আপডেট: ১৮:১৫, ১৭ মে ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

কবি সুকান্ত বলেছিলেন, জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। এ যেন অধুনা ইরানের বর্ণনা দিচ্ছে। হাজার হাজার পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আমেরিকার সর্বাত্মক আক্রমণের মুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম দেশটি আসলেই মাথা নোয়াবার নয়। হাজার হাজার আঘাতের বিপরীতে ইরান শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এ যেন এক নিরব পরাশক্তি।

যেমনটি বলা হয়, ইরান মানেই তেল, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার শিকার একটি দেশ। কিন্তু এই পরিচিত ছবির বাইরে ইরানের ভেতরে গড়ে উঠছে এক ভিন্ন অর্থনৈতিক জগৎ বা 'অলটারনেটিভ ইকোনমিক ইউনিভার্স'। আর ইরানের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তিলে তিলে গড়া ইরানি Resistance Economy বা প্রতিরোধী অর্থনীতির গভীরে।

২০১৪ সালে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির নির্দেশে প্রণীত ২৪-দফা General Policy of Resistance Economy-র মাধ্যমে ইরান তার অর্থনীতিকে প্রবল ঘাতসহনীয় হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। Brookings Institution-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো আমদানি-বিকল্প উৎপাদন এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশীয় বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়ে পশ্চিমা অর্থনীতির উপর নির্ভরতা কমানো। ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরান ১,৩০০-এরও বেশি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে এবং স্থানীয় উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে।

Gulf States Analytics (AGSI)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, খামেনির ২০১১ থেকে ২০২০ সালের ভাষণগুলোতে "knowledge-based" শব্দটি বারবার উঠে এসেছে এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে "ইকোনমিক জিহাদ" ধারণাটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। লক্ষ্য ছিলো একটাই — কাঁচামাল রফতানিকারক থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি উৎপাদনকারী দেশে রূপান্তর। আর এই রুপান্তরের গভীরে লুকিয়ে আছে ইরানের টিকে থাকার রহস্য।

ইরানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তেল নয় — মানুষ। Center for Security and Emerging Technology (CSET)-এর তথ্য অনুযায়ী, World Economic Forum মোট স্নাতকদের মধ্যে STEM ডিগ্রিধারীদের অনুপাতে ইরানকে রাশিয়া ও জার্মানির সঙ্গে একই স্তরে রেখেছে, যেখানে ৩০ শতাংশেরও বেশি স্নাতক বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে ডিগ্রি অর্জন করেন। ইরানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার মাত্র ২০ শতাংশ।

 

ইরানি প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নালে ব্যাপকভাবে প্রকাশনা করছেন এবং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নিয়মিত ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন। সদ্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কতৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত Sharif University of Technology এবং Tehran University-র মতো প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া গ্র্যাজুয়েটরা ন্যানোটেকনোলজি, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং AI গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন।

 বিশ্লেষনে দেখা যাচ্ছে, ইরানের আছে ১০,২০০ কোম্পানির 'আলটারনেটিভ ইউনিভার্স'! 

পশ্চিমা ব্র্যান্ডের অনুপস্থিতিতে ইরান গড়ে তুলেছে নিজস্ব প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখন ১০,২০০টি সার্টিফাইড Knowledge-Based Company (KBC) রয়েছে। এই কোম্পানিগুলো ফার্মাসিউটিক্যাল, ন্যানোটেকনোলজি, মহাকাশ এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ কৌশলগত খাতে দেশীয় বিকল্প তৈরিতে কাজ করছে। এছাড়া ৬,০০০-এরও বেশি স্টার্টআপ আর্থিক সেবা থেকে কৃষি প্রযুক্তি পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে সক্রিয় রয়েছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে ইরানের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইরান এখন বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বায়োটেকনোলজিক্যাল ওষুধ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে স্থান পেয়েছে এবং দেশটি ৯৭ শতাংশ ওষুধ নিজেই উৎপাদন করে। ২০২৪ সালে ইরানের ফার্মাসিউটিক্যাল রফতানি প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ইরানি ওষুধ এখন ওমান, ইরাক, রাশিয়া ও আফগানিস্তানসহ ৪০টিরও বেশি দেশে বিক্রি হচ্ছে।

 

ইরানের 'কয়েলড স্প্রিং' তত্ত্ব

ইরানের অর্থনীতিকে অনেক বিশ্লেষক "কয়েলড স্প্রিং" বলছেন — যার মানে হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা উঠলেই যা বিস্ফোরণের মতো প্রসারিত হবে। তাত্ত্বিকভাবে যুক্তিটি শক্তিশালী — ইরানের আশেপাশে ৫৫ কোটি ভোক্তার আঞ্চলিক বাজার রয়েছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স এর ব্ল্যাকলিস্ট থেকে বের হতে পারলে এবং বিশাল বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ হলে ইরানের হাইটেক খাত বৈশ্বিক বাজার কাঁপিয়ে দিতে পারে।

 

তবে বাস্তবতা জটিল। Council on Foreign Relations (CFR)-এর সিনিয়র ফেলো Ray Takeyh এর মতে, সম্প্রতি চলমান যুক্ত্রাষ্ট্রের সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ ইরানিদের জন্য বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে এবং ইরান নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যুক্তরাজ্যের House of Commons Library-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে ইরানের মুদ্রা রিয়াল তার মূল্যের অর্ধেক হারিয়েছে এবং ২০২৫ সালে খাদ্যমূল্য স্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

AGSI-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের সামনে মূল প্রশ্ন হলো — অর্থনৈতিক টিকে থাকার প্রয়োজনীয়তা শেষ পর্যন্ত আদর্শগত আপসকে বাধ্য করবে কিনা। তবে আজকের ইরান মার্কিন যুদ্ধের বাস্তবতা বলছে, ইরান আদর্শকে বিসর্জন দিবে না বরং আদর্শকে সমুন্নত রেখে কিভাবে টিকে থাকা যায় তা ইরান শিখে গিয়েছে, আর তার প্রমাণও ইতোমধ্যে সারা বিশ্ব দেখেছে।

 

লেখকঃ

জাহিদ আল আসাদ।

শিক্ষক, কলামিস্ট, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক।


** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।
Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি