ঢাকা, শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯, || ভাদ্র ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

‘কোমরে থাকা পিস্তলের বাটে গুলি লাগায় বেঁচে যাই’

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২৩:৪৬ ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ১৯:৪৬ ৭ ডিসেম্বর ২০১৭

আজ ৬ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার দাবিতে সংগ্রামরত বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি দেয় ভারত। এরপরেই স্বীকৃতি দেয় ভূটান এবং অন্যরা। মূলত ভারতের স্বীকৃতিই ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতির সূচনা। এর আগে ৪ ডিসেম্বর থেকে স্বাধীনতার দাবিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধরত পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেয় ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী।

সেসময় মুক্তিযুদ্ধের এস-ফোর্সের অধিনায়ক এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাবাহিনী প্রধান কাজী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বীর উত্তম। কে এম শফিউল্লাহ নামেই বেশি পরিচিত যিনি। সেসময় আখাউড়া অঞ্চলে যুদ্ধরত এই বীর যোদ্ধা এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে যুদ্ধকালীন নানা ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন ইটিভি অনলাইনের কাছে। তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো আজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইটিভি অনলাইনের সহ-সম্পাদক সোলায়মান হোসেন শাওন

ইটিভি অনলাইন: কেমন আছেন আপনি?

কে এম শফিউল্লাহ: জ্বী আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?

ইটিভি অনলাইন: জ্বী আমিও ভাল আছি। আপনার কাছে শুরুতেই জানতে চাইব ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিককার ঘটনাগুলো সম্পর্কে।

কে এম শফিউল্লাহ: ডিসেম্বরের শুরুতে প্রথম টার্নিং পয়েন্ট আসে ২ ডিসেম্বর। এদিন আমার নেতৃত্বাধীন এস-ফোর্সের নেতৃত্বে আখাউড়া স্বাধীন হয়। আখাউড়া ও এর আশেপাশ থেকে পাক বাহিনীদের সরিয়ে দিতে সক্ষম হই আমরা। আর ৪ ডিসেম্বর আমরা দখল করে নিই আখাউড়া রেল জংশন।

আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এদিন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়। এর কারণ হচ্ছে এদিন ভারতীয় বাহিনী আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। ভারতের ৫৭ মাউন্টেনারি ডিভিশন এর দায়িত্ব পায়। মূলত এর আগের দিন পাক বাহিনী ভারতের ভূখণ্ডে বিমান হামলা শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে চলমান যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া এবং সবার মনযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা। তারা বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে, এটা স্বাধীনতার জন্য কোনো জাতির যুদ্ধ না বরং এটা ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন। কিন্তু সত্য কথা হচ্ছে, এর আগে ভারত আমাদেরকে নানারকম সাহায্য-সহযোগিতা করলেও যুদ্ধে তারা অংশ নেয়নি।

মজার কথা হচ্ছে, পাক বাহিনীর এই কূট চাল তাদের বিরুদ্ধেই যায়। ভারতীয় বাহিনী সম্মুখভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়। কোণঠাসা হয়ে যায় পাক বাহিনী।

ইটিভি অনলাইন: ততক্ষণে শুধু ময়দানেই না; জাতিসংঘেও যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়...

কে এম শফিউল্লাহ: হ্যাঁ। জাতিসংঘে পাকিস্তান সরকারের পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘অস্ত্রবিরতি’র প্রস্তাব উত্থাপন করেন। হেনরি কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদে এ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু স্থায়ী সদস্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ভেটো’ প্রদানের কারণে অস্ত্র বিরতির প্রস্তাব আর পাস হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়াও পোল্যান্ড প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, যদি অস্ত্রবিরতি প্রস্তাব পাস হতো তাহলে আজকের ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। আমাদের যুদ্ধ হয়ত থেমে যেতো। স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে সরে যেতাম আমরা। নিরাপত্তা পরিষদে ব্যর্থ হয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার কাগজপত্র ছিড়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। এর ভিডিওটি আমরা দেখেছি। তার অভিব্যক্তি থেকেই বোঝা যায় যে, অস্ত্রবিরতি পেতে তারা কতটা মরিয়া ছিলো।

ইটিভি অনলাইন: আপনি জীবনে অনেকবারই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বলে আমরা জেনেছি। এমন একটি ঘটনার কথা যদি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেন?

কে এম শফিউল্লাহ: ৫ ডিসেম্বরের ঘটনা। আমি আমার এস-ফোর্সের ৩ ব্রিগেড সৈন্য নিয়ে ৩টি আলাদা আলাদা পথে আখাউড়া থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে আমার ব্রিগেড নিয়ে যাচ্ছিলাম। সরাইল মাধবপুরে আসার পরপর উল্টো দিক থেকে একটি ট্রাক আসতে দেখি। আমাদের নিজেদের ট্রাক মনে করে আমরা সেটিকে থামাই। কিন্তু থামানোর পর বুঝতে পারি যে, সেটা ছিল পাকিস্তানিদের ট্রাক। সেখানে তখন আমরা অপ্রস্তুত অবস্থায় পরে যাই।

ট্রাকটির ড্রাইভার বের হয়ে আমাকে জাপটে ধরে। জাপটাজাপ্টির মধ্যেই আমি আমার কোমরের অস্ত্র বের করার চেষ্টা করছিলাম, সে তার অস্ত্র বের করতে চেষ্টা করছিল। এদিকে আমার দেহরক্ষীও কিছুই করতে পারছিল না। সে ওই পাকিস্তানি সৈন্যকে ঘায়েল করার জন্য রাইফেল তাক করলেও রাইফেলের সামনে একবার আমি একবার ওই সৈন্য এসে পরে। একপর্যায়ে ওই সৈন্য তার অস্ত্র দিয়ে কোমরের কাছে থেকেই গুলি করে বসে। আমি শুধু ‘ঠাস ঠাস’ দুটি গুলি বের হওয়ার শব্দ শুনলাম। আমি মনে করেছি আমি আহত হয়েছি। এরপর সর্বশক্তি দিয়ে তার অস্ত্রের বাট দিয়ে তাকে তার মাথায় আঘাত করে কোনরকমে আলাদা হয়ে একটি নালার মধ্যে গিয়ে পরি। পরে দেখি যে, গুলি দুটো আমার কোমরে থাকা পিস্তলের বাটে লাগে। পিস্তলের বাট ভেঙ্গে গেলেও সে যাত্রা বেঁচে যাই আমি। ভাঙ্গা সে পিস্তলটি মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে দিয়েছি আমি।

সে অপারেশনে আমাদের ২জন সহযোদ্ধা শহীদ হন। আর শত্রুপক্ষের ৪৭জন নিহত হয়।

চলবে...

এএ / এআর /

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি