ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৯ জুলাই ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশের শিশুরা

রিয়াজ উদ্দীন

প্রকাশিত : ২১:৪২, ৮ জুলাই ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন কিংবা খরার বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু এসব দুর্যোগের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির শিকার বাংলাদেশের শিশুরা। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী নয়, অথচ এর সবচেয়ে কঠিন মূল্য তারাই দিচ্ছে।

শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার ঝুঁকি
বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় বা জলাবদ্ধতায় বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। অনেক পরিবার স্থানান্তরিত হওয়ায় শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘদিন পড়াশোনা বন্ধ থাকলে অনেকেই আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসে না।

অপুষ্টি ও খাদ্য সংকট
খরা, লবণাক্ততা, বন্যা ও ফসলহানির কারণে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। দরিদ্র পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, খর্বাকৃতি এবং শারীরিক বিকাশে বাধা তৈরি হয়।

নিরাপদ পানির সংকট
উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা এবং উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমিয়ে দিচ্ছে। দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে শিশুদের ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি
অতিরিক্ত তাপমাত্রা, দূষণ এবং জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের কারণে ডেঙ্গু, শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হিট স্ট্রেস এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি
ঘরবাড়ি হারানো, বারবার স্থানান্তর, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা দুর্যোগের ভয় অনেক শিশুর মধ্যে উদ্বেগ, ট্রমা ও মানসিক চাপ তৈরি করে। অথচ শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এখনো খুব সীমিত।

শিশুশ্রমের ঝুঁকি
প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিবার জীবিকা হারালে অনেক শিশু বিদ্যালয় ছেড়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। এতে তাদের শিক্ষা ও শৈশব দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক সংকটে পড়া অনেক পরিবার মেয়েশিশুদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দারিদ্র্য অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

বাস্তুচ্যুতি ও নিরাপত্তাহীনতা
নদীভাঙন, উপকূলীয় ক্ষয় কিংবা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে অনেক পরিবার শহর বা অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়। বাস্তুচ্যুত শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।

প্রতিবন্ধী শিশুদের অতিরিক্ত ঝুঁকি
দুর্যোগের সময় প্রতিবন্ধী শিশুদের সরিয়ে নেওয়া, চিকিৎসা দেওয়া কিংবা আশ্রয় নিশ্চিত করা তুলনামূলক বেশি কঠিন হয়। ফলে তারা দ্বিগুণ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

মেয়েশিশুর জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ
দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, স্বাস্থ্যবিধি, মাসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তার অভাব মেয়েশিশুদের জন্য অতিরিক্ত সমস্যা তৈরি করে।

শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে
দুর্যোগের সময় পরিবার বিচ্ছিন্নতা, মানবপাচার, সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে শিশু সুরক্ষাকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত
আজ যে শিশু অপুষ্টি, শিক্ষাবঞ্চনা বা মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছে, আগামী দিনে সেই শিশুই দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অংশ হবে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও মানবসম্পদ উন্নয়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

জরুরি ভিত্তিতে করণীয়
•    জলবায়ু সহনশীল স্কুল নির্মাণ।
•    নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত করা।
•    দুর্যোগ-পরবর্তী শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা।
•    জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা।
•    শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ।
•    জলবায়ু অর্থায়নের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিশুদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষায় বরাদ্দ করা।
•    স্থানীয় সরকার, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং করপোরেট খাতের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা।

পরিশেষে
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের সংকট নয়; এটি শিশু অধিকার, মানবিক মর্যাদা এবং টেকসই উন্নয়নেরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের জলবায়ু নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে শিশুদের রাখতে হবে। কারণ, আজকের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তবেই আগামী দিনের বাংলাদেশ হবে আরও সহনশীল, মানবিক এবং টেকসই।

রিয়াজ উদ্দীন: নিউজ এডিটর, একুশে টেলিভিশন


** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।
Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি