ঢাকা, রবিবার   ০৮ নভেম্বর ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ে ৩১সার ডিলারের মধ্যে ২৮ জনই বিএনপির

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৬:১১, ৮ নভেম্বর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন করে সার ডিলারে নিয়োগ পাওয়া ৩১ জনের মধ্যে ২৮ জনই বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের মধ্যে বিএনপি নেতাদের নয়জনের স্ত্রী, চারজনের সন্তান ও দুজনের ভাই রয়েছেন। 

তাছাড়া নেতাদের অন্যান্য স্বজন ও রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও ডিলারশিপ পেয়েছেন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যবসায়ী আবেদন করেও ডিলার হতে পারেননি।

জেলার চারটি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় এসব ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মনোনীত ব্যক্তিদের অনেকের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি কয়েকজনের নির্ধারিত ধারণক্ষমতার গুদামও নেই। তবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিএনপি নেতা ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অনিয়ম ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

গত ৪ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার এক চিঠিতে বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, হরিপুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় নতুন সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির চারজন পদধারী নেতা, একজন সাবেক নেতা, একজন সমর্থক, ছাত্রদলের সাবেক দুই নেতা, মহিলা দলের একজন নেত্রী এবং তাঁতী দল ও ওলামা দলের একজন করে নেতা রয়েছেন। 

এ ছাড়া নয়জন বিএনপি নেতার স্ত্রী, চারজনের সন্তান, দুজনের ভাই এবং অন্য নেতাদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনেরা ডিলারশিপ পেয়েছেন। তালিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড নেতাও রয়েছেন। মাত্র দুজনের কোনও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানা গেছে।

পীরগঞ্জ পৌরসভায় ডিলার হয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজওয়ানূল হকের স্ত্রী শ্যামলী আক্তার। একই উপজেলার ভোমরাদহ ইউনিয়নে বিএনপি সভাপতি আবুল হোসেনের স্ত্রী রেনুয়ারা বেগম, খনগাঁও ইউনিয়নে বিএনপি সভাপতি রুস্তম আলীর স্ত্রী মিরা আক্তার এবং পীরগঞ্জ ইউনিয়নে বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদের মেয়ে শবনম মুস্তারী সিনথিয়া ডিলারশিপ পেয়েছেন।

এ ছাড়া হাজীপুর ইউনিয়নে বিএনপি সভাপতি আমিনুল ইসলামের স্ত্রী ফেরদৌসি বেগম এবং পারিয়া ইউনিয়নে বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক আরফান আলীর স্ত্রী নাজনীন বেগম ডিলার হয়েছেন।

রানীশংকৈল পৌরসভায় ডিলার হয়েছেন পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলীর স্ত্রী পারুল বেগম। কাশিপুর ইউনিয়নে যুবদল সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী ময়না আক্তার এবং লেহেম্বা ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থিত সাবেক চেয়ারম্যান মো. হাসানের মেয়ে মিথিলা সানজিদা সিমি ডিলারশিপ পেয়েছেন।

অন্যদিকে রানীশংকৈলের রাতোর ইউনিয়নে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিলন মাহমুদের বড় ভাই সিঙ্গাপুরপ্রবাসী জাহাঙ্গীর আলমের প্রতিষ্ঠান মেসার্স জিএস ট্রেডার্স ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। তিনি গত ৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে ছোট ভাইয়ের পরামর্শে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেন।

হরিপুর উপজেলার আমগাঁও ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু তাহেরের ছেলে মশিউর রহমান এবং ভাতুরিয়া ইউনিয়নে জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক নাজমা পারভীন ডিলার হয়েছেন।

রানীশংকৈল উপজেলার বটতলী বাজারের সার ব্যবসায়ী জয়নাল আলী অভিযোগ করেন, দলীয় বিবেচনায় অনেক অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাদের কারও কারও প্রয়োজনীয় গুদামও নেই। এতে দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভানোর ইউনিয়নে ২৭ বছর ধরে সার ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাননি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আবদুল ওহাব। 

তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। যার টাকা নেই, তার ডিলারশিপও নেই।’

হরিপুর উপজেলার গেদুরা ইউনিয়নে ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেও মনোনীত হননি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম। তার অভিযোগ, ডিলার হওয়ার জন্য টাকা দিয়েও তিনি নিয়োগ পাননি।

জাতীয় কৃষক শক্তির সদস্যসচিব গোলাম মর্তুজা সেলিম বলেন, কৃষিপ্রধান দেশে ফসল উৎপাদন নিশ্চিত করতে সারের সরবরাহ সহজলভ্য করা জরুরি। 

কিন্তু সারের ডিলার নিয়োগেও দলীয়করণের অভিযোগ উঠছে। এতে কৃষিব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি সার সরবরাহব্যবস্থা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন দলের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। 

এখন তাদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগ দিচ্ছেন। এ কারণে সারের ডিলারের জন্য আবেদন করেছেন। তবে ডিলার নিয়োগে দলের কোনও প্রভাব ছিল না।’

রানীশংকৈল পৌরসভার ডিলার পারুল বেগমের স্বামী মহসিন আলীও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যথাযথ কাগজপত্র জমা দিয়েই তার স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনা করা হয়নি।

হরিপুরের ভাতুরিয়া ইউনিয়নের ডিলার নাজমা পারভীন জানান, তার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি আবেদন করেন এবং যাচাই-বাছাই শেষে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। 

অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায় নিতে হবে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একজন নেতা ডিলার হয়েছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখে নীতিমালার বাইরে নিয়োগ হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হবে।

জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছে। 

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নীতিমালা অনুযায়ী সুপারিশ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন সেই তালিকায় কোনও পরিবর্তন আনেনি। পরে তালিকাটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তারা কোনও অভিযোগও পাননি।

এমএইচ 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি