ঢাকা, রবিবার   ১১ এপ্রিল ২০২১, || চৈত্র ২৮ ১৪২৭

তরুণ প্রজন্মই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে

অধ্যাপক ড: খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী

প্রকাশিত : ১৪:৪৭, ১৯ মার্চ ২০২১

আমি পিএইচডি করেছি ইংল্যান্ডে। সেই ১৯৭৪ সালেই দেখেছি প্রযুক্তিগতভাবে ওরা অত্যন্ত উন্নত দেশ। সবাই কোনো না কোনোভাবে ওখানে প্রযুক্তির সাথে জড়িত। এমনকি যিনি আর্টসের শিক্ষক তিনিও পারতপক্ষে গাড়ির ইঞ্জিনটা নিজেই সারিয়ে নেন। এক শিক্ষককে একদিন দেখি বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে বাড়ির ছাদটা নিজেই মেরামত করে তুললেন। এভাবে প্রযুক্তি ওখানে ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।

ফলে কী হচ্ছে? কোনো একজনের মনে হলো, এ-কাজটা এই জিনিসের সাহায্যে সহজ হয় এবং এটা তো আরো ১০ জনের কাজে লাগতে পারে। তিনি ছেড়ে দিলেন ওটা বাজারে। এভাবেই কিন্তু তাদের বাজারে বিভিন্ন পণ্য ছড়িয়েছে, ওদের জীবনমান উন্নত হয়েছে। বিজ্ঞানকে ওরা কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-গবেষণাগারের ঘেরাটোপে বন্দি করে রাখে নি, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের জন্যে ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে।

তখন থেকেই আমার এ চিন্তাটা হতো আমার দেশের মানুষের জীবনের মান উন্নত করার জন্যেও প্রযুক্তি দরকার। কিন্তু সেটা আমাদের কে দেবে? পাশ্চাত্যের লোকেরা এসে সেটা তৈরি করে দেবে না। করতে চাইলেও পারবে না, কারণ আমাদের আর ওদের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কাজের ধরন ভিন্ন। এটা করতে হবে আমাদেরই।

একটা কথা ছাত্রদের আমি প্রায়ই বলি। যেমন, গ্রামের দরিদ্র কোনো পরিবারের একটি ছেলে বা মেয়ে হয়তো মেধাবী। পরিবারের বাকিরা আধাপেটা খেয়ে, না খেয়ে তাকে পড়ায়। তাদের আশা সে একদিন পুরো পরিবারকে টেনে তুলবে। তেমনি এদেশের মানুষও আমাদের একইভাবে খাইয়েছে, পড়িয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিয়েছে। 

তারপর আমরা কী করছি? আমরা বলছি দেশে তো আমার কাজের সুযোগ নেই। এখানে আমাকে যথেষ্ট মূল্য দেয়া হচ্ছে না। বিদেশে যে অর্থ পেতাম, আরামে থাকতাম, এখানে তা পাচ্ছি না। কিন্তু একথা বলার নৈতিক যুক্তি আমাদের আসলে থাকে কি? আমরা লেখাপড়া করছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করছি, সেজন্যে যে অর্থসম্পদ দরকার সেটা কোত্থেকে এসেছে? আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করছি, এর ব্যয়ভার বহন করছে কে? সবটাই এসেছে এদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কাছ থেকে।

তাই আমরা বিশেষত যারা প্রযুক্তির শিক্ষা পেয়েছি, তারা যদি দেশে ফিরে এদের জন্যে কাজ না করি তাহলে তা হবে অত্যন্ত অনৈতিক কাজ। এ বোধটা তখন থেকেই আমার মধ্যে একটা তাড়না সৃষ্টি করল। মনে হয়েছিল, মানুষ হিসেবে আমার জীবন একটাই। জীবনটা যেন অর্থবহ হয়। তাই একটাই চিন্তা তাড়া করে ফিরত আমাকে কবে দেশে ফিরে যাব।

কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম। দেশে তখন কোনো চাকরিও ছিল না আমার। একরকম ঝুঁকি নিয়েই ফিরে এসেছিলাম। অনেকে একে পাগলামিও বলেছেন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের আগ্রহে একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। প্রথমেই বুঝতে চাইলাম কী ধরনের গবেষণা করলে মানুষের কাছে এর সুফল পৌঁছে দেয়া সম্ভব। কারণ সামর্থ্যরে মধ্যে না হলে সবাই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না। তাই পথ খুঁজছিলাম, যে উদ্দেশ্য নিয়ে ফিরে এসেছি কোন ক্ষেত্রে কাজ করলে তা পূরণ হবে। প্রযুক্তি-গবেষণায় এই দিকগুলো বিবেচনায় রাখা জরুরি বলে আমি মনে করি।

প্রথম পর্যায়ে শিক্ষকদের সাথে ও পরবর্তীকালে ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-উপকরণ তৈরি করি, যা এদেশে প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বেশ ভালো ফল পান। যেমন, ভাঙা হাড় জোড়া দিতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক স্টিমুলেটর, স্নায়ু-কার্যকারিতা পরীক্ষার যন্ত্র, স্বয়ংক্রিয় শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র, ডায়াবেটিস রোগীর চিকিৎসায় ডায়নামিক পেডোগ্রাফ, অতিরিক্ত হাত-পা ঘামা রোগীদের জন্যে প্রয়োজনীয় এন্টি-সোয়েট আয়োন্টোফোরেসিস, কৃত্রিম হাত ইত্যাদি। যেটুকু করতে পেরেছি সেজন্যে সৃষ্টিকর্তার কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।

এসব উদ্ভাবন বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক সেমিনার-কনফারেন্সে আমরা উপস্থাপন করেছি। উন্নত দেশগুলো বেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। একবার এক কনফারেন্সে আমাদের উদ্ভাবিত একটি যন্ত্রের নমুনা দেখে একটি সুইস কোম্পানির ডিরেক্টর এসে বলেন, আমরা তোমাদের এই যন্ত্রটিতে বিনিয়োগ করতে চাই, তবে তার আগে তোমাদের এটা পেটেন্ট করতে হবে। তাকে বললাম, আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা পেটেন্ট করব না।

মালয়েশিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানও আমাদের গবেষণায় অর্থায়ন করতে চেয়েছিল। তাদেরও দাবি একটা যন্ত্র পেটেন্ট করতে হবে এবং এর স্বত্ব তাদের দিতে হবে। আমরা যথারীতি রাজি হই নি। 

আজকের পৃথিবীতে বৈষম্যের মূলে রয়েছে এই পেটেন্ট। যার ফলে কিছু লোক প্রযুক্তি কুক্ষিগত করে প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে গেছে, আর অধিকাংশই বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষের মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন মানুষই আজ বঞ্চিত। এজন্যে আমরা পেটেন্ট করতে চাই না। প্রযুক্তিকে আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই মানবতার কল্যাণে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমরা হয়তো লোকসান করছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য বহুদূর। আমরা বিশ্বাস করিÑআমরা পারব। আমাদের প্রচুর মেধাবী ছেলেমেয়ে রয়েছে। ওদের উদ্যম আছে, ওরা কাজ করতে চায়। এদের অনেকেই এসে বলে, স্যার, আপনার সাথে কাজের সুযোগ পেলে বিদেশে যাব না। এখানেই গবেষণা-পিএইচডি করতে চাই। 

প্রথমদিকে আমি বলতাম পয়সা তো দিতে পারব না, চলবে কী করে? ওরা বলত, টিউশনি করে চলব। এজন্যে পরিবার থেকে অনেক কথাও শুনতে হয়েছে ওদের‘তুমি একজন মেধাবী ছাত্র। সুযোগ থাকতেও কেন ইউরোপ-আমেরিকায় যাবে না?’ কিন্তু এমন অনেক ঝড়ঝঞ্ঝা পাড়ি দিয়েও তারা আজ দেশেই কাজ করছে, গবেষণায় ভালো করছে।

নিঃস্বার্থ তরুণ প্রজন্মের উদ্যম দেখে আমার একটা কথাই মনে হয় আমরা অগ্রজরা যদি এদের পথ দেখাতে পারি, তবে এরাই একদিন নিজেদের স্বপ্ন ও কাজ দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি