ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২১ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা অর্জনে দরকার দক্ষ জনবল : হুমায়ুন রশীদ

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৩:৫৬ ৩ ডিসেম্বর ২০১৭

এনার্জি প্যাক। বিদ্যুৎ খাতে এক পরিচিত নাম। ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ইটিভি অনলাইনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে দেশের বিদ্যুৎ খাতের সমস্যা, সম্ভাবনা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং এ খাতে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যাণ্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হুমায়ুন রশীদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইটিভি অনলাইনের সহ-সম্পাদক সোলায়মান শাওন

ইটিভি অনলাইন : ইটিভি অনলাইনে আপনাকে স্বাগতম। কেমন আছেন?

হুমায়ুন রশীদ : আপনাকে ধন্যবাদ। ভালো আছি।

ইটিভি অনলাইন : শুরুতেই আলাপ করতে চাই দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে। বর্তমান পরিস্থিতিকে ব্যবসার জন্য কেমন মনে করছেন?

হুমায়ুন রশীদ : আমি বর্তমান পরিস্থিতিকে ভালো বলবো। বর্তমান সময়ে কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। রাস্তাঘাটে কোনো ঝামেলা নেই। নতুন মৌসুম শীত আসছে। ঘরে ঘরে নতুন ধান, নতুন ফসল উঠছে। আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো।

ইটিভি অনলাইন : দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ কেমন হচ্ছে? শুধু সরকারি বিনিয়োগই চোখে পড়ছে। সেই তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগ তেমন একটা হচ্ছে না, কেন?

হুমায়ুন রশীদ : আসলে আমাদের কাছে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে আমার উপলব্ধিতে দেশে ব্যবসায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি থেমে নেই। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি থেকে করা এক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ।

যদি শুধু এনার্জি প্যাকের কথাই বলি, আমরা গত দেড় বছরে এলপিজি খাতে ৩০০ কোটি টাকা, স্টিল স্ট্রাকচার ভবনে ৫০ কোটি টাকা এবং গার্মেন্টস খাতে ১২০ কোটি বিনিয়োগ করি। নতুন করে ৬০০০ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে এসব খাতে।

ইটিভি অনলাইন : আমরা কী ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব?

হুমায়ুন রশীদ : আমাদের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল বা লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৬ হাজার মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। তারই অংশ হিসেবে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। তবে আমাদের দেশের অবকাঠামো এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুকূলে নয়। এসব অবকাঠামো উন্নয়ন না হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে।

ইটিভি অনলাইন : কী করতে হবে?

হুমায়ুন রশীদ : প্রথমত প্রাইমারি এনার্জির নিরবিচ্ছিন্ন যোগান নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশে দেখবেন পানি বা সড়ক পথে কোনো পণ্য আনতে অনেক সময় লাগে। এ সময়কে কমিয়ে আনতে হবে। প্রাইমারি এনার্জি হচ্ছে গ্যাস, কয়লা বা এ ধরনের জ্বালানী। দেখেন, কোনো একটি পাওয়ার প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানীর প্রয়োজন হয়। এগুলোর যোগান নিশ্চিত করতে হবে।

ইটিভি অনলাইন : কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আমরা কতটুকু বিদ্যুৎ পাচ্ছি?

হুমায়ুন রশীদ : দুর্ভাগ্য যে আমাদের দেশে বেস লোড পাওয়ার প্ল্যান্ট সেভাবে আসছে না। বেস লোড পাওয়ার প্ল্যান্ট যতদিন না আসবে, ততদিন আমরা যেসব স্বপ্ন দেখছি, তা কিন্তু পূরণ হবে না। আমাদের দেশে এখন যেসব ছোট ছোট পাওয়ার প্ল্যান্ট আছে, তা দিয়ে এখন আমাদের সামনে যে চ্যালেঞ্জ আছে বা সামনে ছোট ছোট যেসব চ্যালেঞ্জ আসবে তা মোকাবেলা করা যাবে। সরকার কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে কাজ করে যাচ্ছে। তবে বড় বড় বেস লোড পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু না হলে আমাদের মূল যে লক্ষ্য এসডিজি অর্জন- তার থেকে কিন্তু আমরা পিছিয়ে পরবো। তাই সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব দেশে বড় বড় প্রজেক্টের বেস লোড ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা।

ইটিভি অনলাইন : আমাদের জন্য সুখবর যে দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন হতে যাচ্ছে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পরমাণু কেন্দ্রের মূল অবকাঠামোর কাজের উদ্বোধন করেছেন। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

হুমায়ুন রশীদ : আমি বলবো, এটা একটি মহৎ উদ্যোগ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুবই দূরদর্শী চিন্তাভাবনা করেন। এনার্জি খাতে শুধু একটি মাত্র জ্বালানীর ওপর নির্ভরশীল হওয়া যাবে না। আমরা এখনও জ্বালানী হিসেবে রুপান্তরিত গ্যাসের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এর জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উত্তম এক বিকল্প হতে পারে।

ইটিভি অনলাইন : বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে কীভাবে সক্ষমতা বাড়ানো যায়?

হুমায়ুন রশীদ : দেখেন আমাদের দেশে দক্ষ জনবল এখনও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। যাও বা আছে তা বিদেশে চলে যায়। প্রতি বছর ৫-৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের শ্রম বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমি বলব, বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা অর্জনে আমাদেরকে দক্ষ জনবল তৈরিতে কাজ করতে হবে।

এক্ষেত্রে বলে রাখি, আমাদের এনার্জি প্যাকে প্রায় ৮০০ স্নাতক প্রকৌশলী আছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৮ শতাংশ নারী প্রকৌশলী। আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে নারী প্রকৌশলীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

ইটিভি অনলাইন : দক্ষ জনবল তৈরিতে কী করা যেতে পারে?

হুমায়ুন রশীদ : আমাদেরকে কর্মমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদেরকে টেকনিশিয়ান বা কারিগরি খাতে কাজ করতে পারবে এমন জনবল তৈরি করতে হবে। এখনও আমরা এসব খাতে কাজের জন্য বাইরে থেকে টেকনিশিয়ান নিয়ে আসি। আর তাদের বেতনও হয় চড়া। আগামীর বাংলাদেশ গড়তে হলে দক্ষ জনবল দরকার। দক্ষ জনবল তৈরি করতে না পারলে পর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে। বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সাপোর্টিং সিস্টেমের জন্য যদি আমরা জনবল তৈরি করতে পারি, তাহলে আর বিদেশিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হবে না। ৫-৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাবে না। আমরা বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।

ইটিভি অনলাইন : বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কী কী তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে?

হুমায়ুন রশীদ : আপনি যদি বিওপি বা ব্যালেন্স অব দ্যা প্ল্যান্ট এর কথা বলেন, তাহলে এর অনেক কিছু আমরা তৈরি করতে পারি। আপনি যদি দেখেন, একটা পাওয়ার জেনারেশনের যদি একটা টার্বাইন লাগে, সেটা আমরা তৈরি করতে পারি না। কিন্তু এর যে নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রপাতি আছে সেগুলো আমরা তৈরি করতে পারি।

যেমন ধরেন, ১০০ মেগা ওয়াট জ্বালানী নির্ভর পাওয়ার প্ল্যান্টের শুধু ইঞ্জিন, অলটারেটর শুধু আমরা আমদানি করি; তবে কেবলগুলো স্থানীয় এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি আমাদের নিজেদের। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সফর্মার এবং সুইচ গিয়ার বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। আইপিপি প্রজেক্টের প্রায় ৯০ শতাংশ প্ল্যান্টে দেখবেন দেশে তৈরি ট্রান্সফর্মার ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বর্তমানে প্ল্যান্টগুলোতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত যন্ত্রপাতির ব্যবহার গুরুত্ব পাচ্ছে।

ইটিভি অনলাইন : একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। বিদ্যুৎ জেনারেশন, প্রোডাকশন এবং বন্টনে এনার্জি প্যাকের ভূমিকা কতটুকু?

হুমায়ুন রশীদ : আমরা একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। কমপ্ল্যায়েন্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করি। আমরা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রজেক্টে কাজ করি। আমরা পাওয়ার জেনারেশন এবং ট্রান্সমিশন ডিস্ট্রিবিউশনে কাজ করি। আমরা সাব স্টেশন যন্ত্রপাতি, ট্রান্সফর্মার, সুইচ গিয়ার, ডিসকানেক্টিং সুইং এসব বানাই। ১৩২ কিলো ভোল্ট থেকে ২৩০ কিলো ভোল্ট পর্যন্ত কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে আমাদের।

যদি জেনারেশনের প্রসঙ্গে আসি তাহলে বলতে পারি আমরাই প্রথম দেশিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে আন্তর্জাতিক টেন্ডারে বিডিং করে কাজ পেয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। গোপালগঞ্জে ১০৮ মেগা ওয়াট এবং ফরিদপুরে ৫৪ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন দুইটি প্ল্যান্ট আমরা সফলভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে সরকারকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছি। প্ল্যান্ট দুটি এখনও বাংলাদেশের জাতীয় গ্রীডে সব থেকে বেশি শক্তি নিরবিচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করছে।

তাহলে আমাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের ইপিসিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। আর এনার্জি প্যাক এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ইটিভি অনলাইন : ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

হুমায়ুন রশীদ : বিশ্ব বাজারে আপনি দেখবেন বিদ্যুতের দাম ওঠা-নামা করে। আমাদের দেশে বিদ্যুতের দাম নামতে দেখা যায় না; শুধু উঠতে দেখা যায়। মাঝে মাঝে দাম নামা উচিত। বিদ্যুতের দাম বাড়লে ভোক্তা পর্যায়ে এর প্রভাব পরবে। তবে এর জন্য বিশেষত আমরা যারা শিল্প উদ্যোক্তা, আমাদের ‘কস্ট অব বিজনেস’ বেড়ে যাবে। বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এটাকে মেনে নিতে হবে। তবে বলব, এটাকে যদি অল্প অল্প করে বাড়ানো যায়, সহনশীল করে বাড়ানো যায়, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব কম দেখা যাবে।

ইটিভি অনলাইন : বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা কী কী সমস্যার মুখোমুখি হন?

হুমায়ুন রশীদ : আমাদের দেশের সমস্যা একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে। আমাদের দেশে নতুন কোনো প্রজেক্টে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে সব থেকে বেশি সময় লাগে। প্রায় ১৪২ দিন। এমনটা আর কোনো দেশে নেই। এদেশে জমির স্বল্পতা। বিনিয়োগ করার জন্য দরকার পর্যাপ্ত জমি। এখন নতুন করে ১০০টি শিল্পাঞ্চল করা হবে। এটা ভালো উদ্যোগ। এছাড়া অন্যান্য বিষয় যেমন গ্যাস, পানি- এসবের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাও অন্যতম সমস্যা। সেই সঙ্গে দুর্বল অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে।

ইটিভি অনলাইন : বিদ্যুৎ খাতে যারা বিনিয়োগ করছে তারা পুঁজিবাজার থেকে মূলধন পেতে পারেন কি না?

হুমায়ুন রশীদ : দেখেন যত অবকাঠামোগত প্রজেক্ট আছে তার জন্য পুঁজিবাজার ছাড়া কোনভাবেই এমন বড় প্রজেক্ট করা সম্ভব নয়। ফলে এই পুঁজিবাজারটিকে আমাদের বড় করতেই হবে। আমাদের দেশের বাজারে প্রচুর ভালো ভালো প্রতিষ্ঠান আসছে। তাদের পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত হওয়ার যোগ্যতা আছে। তাদেরকে পুঁজিবাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। এরজন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তারা যখন পুঁজিবাজার থেকে মূলধন পাবে, তখন এমন অবকাঠামোগত ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে।

ইটিভি অনলাইন : আমাদেরকে সময় দেওয়র জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

হুমায়ুন রশীদ : আপনাকে এবং একুশে টেলিভিশন ও ইটিভি অনলাইনকে আন্তরিক ধন্যবাদ।

 

/ডিডি/ এআর

     

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি