ঢাকা, সোমবার   ১৯ অক্টোবর ২০২০, || কার্তিক ৫ ১৪২৭

Ekushey Television Ltd.

ভালোবাসার ‘অপরাধে’ ২৫ বছর ধরে তালাবদ্ধ, অতঃপর...!

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৮:০২ ২১ জুলাই ২০২০

মনিয়ের ব্ল্যাঞ্চ, ২৫ বছর আগে ও পরে...

মনিয়ের ব্ল্যাঞ্চ, ২৫ বছর আগে ও পরে...

১৮৪৯ সালের ১ মার্চ। ফরাসী এক ধনী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেয় ফুটফুটে এক মেয়ে। মনিয়ের পরিবার তাদের পদবী অনুসারে মেয়ের নাম রাখেন ব্ল্যাঞ্চ মনিয়ের। ম্যাডাম মনিয়েরের দানশীলতার জন্য এলাকায় বেশ নাম-ডাক ছিল মনিয়ের পরিবারের। এমনকি তার উদারতার জন্য সে একটি কম্যিউনিটি এওয়ার্ড পর্যন্ত পেয়েছিল স্বীকৃতিস্বরুপ। মেয়ে ব্ল্যাঞ্চ মনিয়ের ছাড়াও এক ছেলে ছিল তার। নাম- মারসেল মনিয়ের, পেশায় একজন স্বনামধন্য উকিল। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সুখের পরিবার মনিয়েরদের।

ব্ল্যাঞ্চ ছোটবেলায় যত না সুন্দর ছিল, বড় হবার সাথে সাথে তার রূপ যেন সমানুপাতিক হারে বাড়তে থাকে। মেয়ের রূপ নিয়ে অহংকারের শেষ নেই যেন মায়ের। মেয়ে তখন পূর্ণ যুবতী। ২৫ বছর বয়স। মা তার পছন্দ করা অভিজাত পরিবারের এক পাত্রের সাথে বিয়ে ঠিক করলো ব্ল্যাঞ্চের। কিন্তু ততদিনে ব্ল্যাঞ্চ মন দিয়ে বসে আছে অন্য একজনকে। পেশায় সে সাধারণ একজন উকিল। পরিবারও সাদামাটা একদম।

ব্ল্যাঞ্চ তার পছন্দের মানুষটিকে মায়ের সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু পারিবারিকভাবে অভিজাত ও স্বনামধন্য না হওয়ায় তার সাথে বিয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান মা মনিয়ের। তার পছন্দ করা পাত্রকেই বিয়ে কর‍তে হবে ব্ল্যাঞ্চকে- এ কথা জানিয়ে দেন তিনি। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মানতে রাজি না হলে ব্ল্যাঞ্চকে একটি ছোট রুমে আটকে রাখেন তার মা। 
সেইসঙ্গে কড়াভাবে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে- ব্ল্যাঞ্চ সেদিনই এ ঘর থেকে মুক্তি পাবে, যেদিন তার মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নিবে সে। কিন্তু মায়ের মতো মেয়েও তার সিদ্ধান্তে অটল। বিয়ে যদি করতেই হয়, ভালোবাসার মানুষটিকেই করবে সে, অন্য কাউকে নয়!

দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর চলে যায়। ব্ল্যাঞ্চ তবুও তার সিদ্ধান্তে থাকে অনড়। মায়ের অহংকারী-জেদী মনও গলে না একটুও। ফলে মুক্তিও আর মেলে না। ১৮৮৫ সালে, ব্ল্যাঞ্চের ভালোবাসার মানুষটি মারা যায়, এর পরও তাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়! 

এদিকে ব্ল্যাঞ্চের মা আর ভাই সমাজে এমন ভান করে থাকে যেন, ব্ল্যাঞ্চকে হারিয়ে তারা শোকে কাতর! বাড়ির কাজের লোকেরা এই ব্যাপারে জানলেও কাউকে জানাতে ভয় পেত মনিয়েরদের সামাজিক প্রভাবের কারণে। এইভাবে কেটে যায় পঁচিশটি বছর!

অতঃপর, ২৫ বছর পর, ১৯০১ সালে, প্যারিসের এটর্নি জেনারেলের কাছে বেনামে একটি চিঠি পৌঁছে। কে বা কারা চিঠিটি পাঠিয়েছে, কখনোই তা জানা যায়নি। সে চিঠিতে লেখা থাকে- মনিয়ের পরিবার বহু বছর ধরে তাদের বাড়িতে আটকে রেখেছে এক ব্যক্তিকে। মনিয়ের পরিবারের সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে প্রথমে না চাইলেও পরে তদন্ত চালাতে নির্দেশ দেন জেনারেল।

বাড়িতে তল্লাসি চালিয়ে কিছুই খুঁজে না পেয়ে যখন ফিরে যাবে সৈন্যরা, তখনই একজন সেনার নাকে আসে বোটকা এক পঁচা গন্ধ। সেই গন্ধ অনুসরণ করে চিলেকোঠায় পৌঁছালে সেখানে একটি অন্ধকার তালাবদ্ধ রুম দেখতে পায় তারা। রুমটিতে কেবলমাত্র একটি বন্ধ ছোট জানালা ছিল, তাও মোটা পর্দা দেওয়া। কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না বাইরে থেকে। সন্দেহ হওয়ায় জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলে ওই সেনা। অতঃপর ভাঙা কাঁচের ভেতর দিয়ে সেনারা দেখতে পায় রুমের এক কোনায় শেকলাবদ্ধ এক নারী! তাকে দেখে সেনারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখতে পায় বীভৎস এক দৃশ্য।

ছোট একটি বিছানায় পঁচা খাবার আর কোটি কোটি কীটের মধ্যে শুয়ে আছে মনিয়ের ব্ল্যাঞ্চ। এই ২৫ বছরে বাইরের আলো-বাতাস থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিল সে। চেহারাও বিদঘুটে হয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সে সময় তার ওজন ছিল মাত্র ২২ কেজি! কিন্তু বিগত ২৫ বছরের ভয়াবহ স্মৃতি মাথা থেকে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারেনি ব্ল্যাঞ্চ। ফলে, গুরুতর মানসিক সমস্যা দেখা দেয় তার। তাকে ভর্তি করা হয় ফ্রান্সের এক সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে। 

১৯১৩ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত, জীবনের বাকিটা সময় এখানেই কাটে তার। ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করতে চাওয়ার ‘অপরাধে’ এই শাস্তি পেতে হলো ব্ল্যাঞ্চকে।

আর ব্ল্যাঞ্চের মা আর তার ভাই-এর পরিণাম? ব্ল্যাঞ্চকে উদ্ধারের পর গ্রেফতার করা হয় তার মা ও ভাইকে। মা অসুস্থ হয়ে গেলে জামিন পেয়ে বাসায় চলে আসেন। কিন্তু ততদিনে সবাই কাহিনী জেনে গেছে। ব্ল্যাঞ্চ উদ্ধার হওয়ার ১৫ দিনের মাথায় বিক্ষুব্ধ জনতা ভিড় করে তাদের বাসার সামনে। আতঙ্কিত হয়ে হার্ট এ্যাটাক করে সেদিনই মারা যায় ম্যাডাম মনিয়ের। অতিরিক্ত অহংকার আর ইগো এভাবেই শেষ করে দেয় একটি সাজানো গোছানো সংসারকে।

এনএস/


New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি