ঢাকা, ২০১৯-০৪-২৪ ০:৩৯:০৭, বুধবার

Ekushey Television Ltd.

মানুষ শুদ্ধ না হলে কাঠামো পরিবর্তন বৃথা

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী

প্রকাশিত : ০৩:১৮ পিএম, ১০ এপ্রিল ২০১৯ বুধবার

আগামী প্রজন্ম নিয়ে আমাদের অনেক স্বপ্ন। সম্প্রতি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এক পরামর্শমূলক সভার আয়োজন করে দুদক। তরুণ ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে এসেছিল। তারা নিঃশঙ্ক চিত্তে দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করেছে।

তাদের একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রিফাত আরা বৃষ্টি। বলিষ্ঠতার সঙ্গে সে বলেছে, কীভাবে মানুষের মধ্যে দুর্নীতিবিরোধী চেতনা তৈরি করা যায়, সে বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।

অফিসগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর আলোকপাত করে সে জানায়, এমন কাঠামো তৈরি করতে হবে, যার কারণে দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারবে না। বৃষ্টির প্রস্তাবিত কাঠামোগত পরিবর্তন কিংবা সিস্টেম পরিবর্তনের পরও তার সুফল পাওয়া এত সহজ নয়। কারণ এর পশ্চাতে থাকে যে মানুষ, সে মানুষটি সৎ ও শুদ্ধ না হলে সিস্টেম অকার্যকর হয়ে যায়।

বহু প্রতিষ্ঠানে এভাবে পদ্ধতিগত সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু যেসব মানুষ এসব সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন, তারা হয় অদক্ষতায় ব্যর্থ হয়েছেন অথবা দুর্নীতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়েছেন। ফলে দুর্নীতিমুক্ত চেতনা সৃষ্টির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারছি না। একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরি।

২০০৮ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ডেসা নামক এক বিশাল প্রতিষ্ঠান ছিল, যার মূল দায়িত্ব ছিল সমগ্র ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ বিতরণ করা। ওই প্রতিষ্ঠানে বল্কগ্দাহীন দুর্নীতি বন্ধে একটি পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যার নাম ছিল কাঠামোগত সংস্কার। এর আওতায় সরকারি প্রতিষ্ঠান ডেসা ভেঙে সৃষ্টি করা হলো কোম্পানির আদলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

বিশ্বব্যাংকের স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (ঝঅচ)-এর আওতায় এটি ছিল বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ফলে এসব কোম্পানিতে সুশাসনের ঢেউ লেগেছিল। কোম্পানির বেতন-ভাতা হয়ে গেল দ্বিগুণ-তিন গুণ। করপোরেট স্টাইলে অফিস সুসজ্জিত হলো, আইএসও সনদ পেল। এর পরই সৃষ্টি হলো দুর্নীতির ডালপালা। সুতরাং কাঠামোগত পরিবর্তন হলেই দুর্নীতি বন্ধ হয় না।

কাঠামোর ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্তরাই কাঠামো অকার্যকর করে দেয়। আরও দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর লক্ষ্যে চালু হলো অটো সিগন্যাল সিস্টেম। কিন্তু তা আবার ম্যানুয়েলে ফিরে গেছে। কারণ অটো সিগন্যাল বহাল রেখে ১০ মিনিটের জন্য ঢাকা শহর থেকে ট্রাফিক পুলিশ রাস্তা থেকে তুলে নিলে দেখা যাবে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই একযোগে প্রতিযোগিতামূলক আইন ভেঙে সড়কে ভয়ঙ্কর এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি  করে ফেলবে।

একই চিত্র কয়েকটি সেবা সংস্থার, যেখানে অনলাইনে আবেদন গ্রহণ থেকে সার্ভিস ডেলিভারি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই অটোমেটেড। কিন্তু মাঝপথে ব্যাঘাত ঘটছে। সিরিয়াল ভেঙে কেউ কেউ সুবিধা নিচ্ছে।

আরও বিচিত্র গল্প বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। বিদ্যুতের চুরি কমাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটাল মিটার চালু হয়। কিন্তু এর পর শুরু হয় শিল্প-কারখানা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে `সেন্সর` বসিয়ে অদ্ভুত কৌশলে দুর্নীতি। নতুন প্রযুক্তিতে কারচুপির আশ্রয় নিয়ে মিটার থেকে মুছে ফেলা হয় বিশাল অঙ্কের বিদ্যুৎ ইউনিট।

এমনকি সফটওয়্যারে লজিক্যাল মিটার পরিবর্তন দেখিয়ে লাখ লাখ বিদ্যুৎ ইউনিট গায়েব করে ফেলা হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ, এক লাখ ইউনিট বাস্তব রিডিং থাকা সত্ত্বেও ২০ হাজার ইউনিট কনজাম্পশন দেখানো হয়েছে। এমনকি প্রি-পেইড মিটারেও অনৈতিক হস্তক্ষেপ ঘটেছে।

হার্ডওয়্যার ও ডাটা পরিবর্তন করা হয়েছে। একইভাবে মহাসড়কে ভারী যানবাহনের ওভারলোডিং রোধে ওজন স্কেল বসানো হয়েছিল; কিন্তু কেউ মানতে চায় না। এটাও এক ধ্বংসাত্মক দুর্নীতি। কারণ ওভারলোডিংয়ের দুর্নীতির পরিণতিতে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে সড়ক-মহাসড়ক। এভাবে  আঙুল ফুলে বটগাছে পরিণত হয়েছে বিচিত্র সব দুর্নীতির সুফলভোগী।

বিশ্বজুড়ে অটোমেশনের জয়জয়কার। অথচ এর সমান্তরালে চলছে প্রযুক্তির অপব্যবহার। ঘটছে বড় বড় আর্থিক দুর্নীতি। অনলাইনে অভিনব কায়দায় ভারতের সিটি ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে দুই মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়।

সাইবার আক্রমণে কত হাজার ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে, তার হিসাব নেই। ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বড় বড় দুর্নীতি ঘটার দৃষ্টান্তও আছে অজস্র। প্রযুক্তির শক্তিও দুর্নীতির থাবা স্তব্ধ করতে পারছে না। সুপ্ত অন্তরে বাস করা এবং রক্ত-মজ্জায় মিশে যাওয়া এ এক কঠিন ব্যাধি, যার নাম দুর্নীতি। মানুষের সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই দুর্নীতি নামক এ রসায়নের উৎপত্তি। সেই রসায়নের গভীরতা এখন এত বেশি, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মতো সৎ লোক খুঁজে বের করে আনতে হয়।

তাহলে দুর্নীতি বন্ধের উপায় কী? একমাত্র পথ সততায় উজ্জীবিত ও দেশপ্রেমে আলোকিত মানুষ। আমরা নিখুঁত সততার বীজ রোপণ করতে চাই তারুণ্যে। সঞ্চারিত করতে চাই সততার চেতনা তাদের মস্তিস্কে, রক্তে ও নিউরনে। তরুণরাই ভবিষ্যতের জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, প্রকৌশলী এবং সৎ ও সুনাগরিক। এ প্রজন্মের তরুণদের একটা অংশ এখন চাকরি বা পেশায় প্রবেশ করেই অর্থ, ক্যারিয়ার ও ঐশ্বর্যে ভরা জীবনের অমোঘ আকর্ষণে অসহিষুষ্ণ হয়ে ছুটে বেড়ায়।

এমনকি বেতন-ভাতা বাড়িয়েও অনেকের দুর্নীতির চিরায়ত অভ্যাসে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আবার অনেক করপোরেট সেক্টরেও দুর্নীতি ঘটছে অবলীলায়। মেধাবীরাও অনৈতিক অর্থের প্রতিযোগিতায় ছুটছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কয়জন কমিটেড হয়? ব্যক্তিক লাভ, অর্জন ও অভিলাষের স্রোতে চাপা পড়ে যায় রাষ্ট্রস্বার্থ, জনস্বার্থ এবং বৃহৎ স্বার্থ।

তারুণ্য মানে অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ সত্তা, অপরিমেয় শক্তির আধার একজোড়া ডানা। কিন্তু সে তারুণ্য যদি বস্তুবাদিতা, ভোগবাদিতা আর বিপথগামিতার এক মোহনায় মিশে যায়, তাহলে দুর্নীতির নিকষ অন্ধকারে ধাবিত হওয়া জাতিকে আলোর পথ কে দেখাবে? মরচে পড়া সততাকে কে শানিত করবে?

বৃষ্টির মতো তরুণদের বুঝিয়ে সততা শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু বড়দের সততার বোধোদয় জাগাতে হয় ভয় দেখিয়ে, শাস্তি দিয়ে। মানুষের সততার বীজ অঙ্কুরিত হয় পরিবারে এবং বিকশিত হয় স্কুল-জীবনে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মিথোজীবিতা (ঝুসনরড়ংরং) থেকে পাওয়া সৎ জীবনযাপনের রূপরেখা সারাজীবনের পথচলার দীক্ষা।

আমাদের পিতামাতার অল্পে তৃপ্ত এবং শিক্ষকদের স্বল্পে তুষ্ট জীবনগুলো আমাদের জন্য অনির্বাণ আদর্শ। শৈশব ও কৈশোরে সততার যে শিক্ষা; যৌবনে তার চর্চা, প্রৌঢ়ত্বে তার পূর্ণতা। প্রত্যাশা করি, তরুণদের  দিয়েই শুরু হবে শুদ্ধ ও সরল পথে চলা। কাদায় আটকে যাওয়া চাকাকে তুলতে হবে। দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এগিয়ে আসুক তারুণ্য; দেশ এগিয়ে যাবে।

মহাপরিচালক, জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর



© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি