ঢাকা, শুক্রবার   ২৮ জানুয়ারি ২০২২, || মাঘ ১৪ ১৪২৮

শতবর্ষে বিদ্রোহী কবিতা

আনোয়ারুল কাইয়ূম কাজল

প্রকাশিত : ১৫:৫৬, ৬ ডিসেম্বর ২০২১ | আপডেট: ১৫:৫৯, ৬ ডিসেম্বর ২০২১

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬ইং) বাংলা সাহিত্য, সমাজ ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনন্য ধীমান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতজ্ঞ ও দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন; পাশাপাশি তাঁর ভাবনা বিকশিত হয়েছিল সাহিত্যের সব শাখাতে। সঙ্গীত ভুবনেও তিনি উন্মুক্ত করেছেন একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত দুয়ার।

একদিকে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে বর্ষার আগমনী বার্তাবাহী ঝিরিঝিরি ইলশেগুঁড়ি; একদিকে কালবৈশাখীর প্রচণ্ড মাতম, অন্যদিকে জ্যৈষ্ঠের রসালো ফল আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু- আনারসের মিষ্টি সুগন্ধ- এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ২৫ মে ১৮৯৯ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামের বিখ্যাত কাজী পরিবারে দুঃখু মিয়া হয়ে জন্মগ্রহণ করে নানা চড়াই-উৎড়াই মাড়িয়ে দেশপ্রেম ও মহজাগরণের মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ-দীক্ষিত হয়ে পরিগণিত হয়েছেন জাতি সত্তার মুক্তির মহানায়কে। রণতুর্যবাদক হিসাবে সবর্দাই লড়েছেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। 

তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও সৈনিক জীবনের পাশাপাশি সোচ্চার ছিলেন তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে। তার লেখায় ফুটে উঠেছিল বিদ্রোহী আত্মার প্রতিচ্ছবি। তাই তিনি বিশ্ব দরবারে বিদ্রোহী কবি বলে পরিচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত। তার কবিতার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার, সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার কালজ্য়ী সাক্ষী স্বাধীন জাতিসত্ত্বার অগ্রসেনানী দ্রোহ, প্রেম, সাম্য, মানবতার কবি কাজী নজরুল সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ বেনিয়াদের উপনেবেশিক শাসন, শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা আর পরাধীনতার শিকলে বাঁধা ভারতবাসীর জাতীয়তার প্রশ্নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন বলে তাঁর কবিতায় এদের বিরোধিতা ছিল স্বাভাবিক প্রকাশ। 

ভারতবষের্র মুক্তির আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন এবং আবেগকে স্পর্শ করেছেন তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় দিয়ে, সেই অভিজ্ঞতার রূপান্তর ঘটিয়েছেন তাঁর দ্যুতিময় প্রতিভার বিচ্ছুরণে শব্দসমবায়ে। ক্রোধ-ঘৃণা-প্রতিশোধস্পৃহা, ভালোবাসা,¯স্নেহ-মমতা এবং মুক্তির বাসনা ব্যক্ত করেছেন বিদ্রোহী কবিতায়। ১৯২১ সালের দিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধত্তর বিশ্বের অভিঘাতে বিশ্বব্যাপী অবক্ষয়, নৈরাজ্য, ব্যক্তির একাকিত্ব এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা তাঁকে তীব্রভাবে আলোড়িত করে। আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে তখন সামষ্টিকের পরিবর্তে ব্যক্তি পর্যায়ে আত্মউন্মোচনের প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠে। ঠিক ওই সময়েই ধূমকেতুর মতো কাজী নজরুল ইসলামের অতুলনীয় প্রতিভার প্রকাশ। সময়ও তার জন্য প্রস্তুত ছিল। ফলে তিনি মিটিয়েছেন সে সময়ের সবচেয়ে কঠিন দাবি। 

দু'হাজার চার সালে বিবিসি বাংলা শ্রোতা জরিপে নির্বাচিত তৃতীয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি-মহাজাগরণের বংশীবাদক কবি কাজী নজরুল ইসলামের ২০২১ সালে ১২২তম জন্মজয়ন্তী ও একই সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যের বিপুল প্রভাব বিস্তারকারী কবিতা বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ পূর্তি। এ নিবন্ধে বাংলা সাহিত্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বি বহুমত্রিক প্রতিভার উজ্জ্বল নক্ষত্রের সমাজ-বদলের বৈপ্লবিক চেতনায় দারুণভাবে আন্দোলিত-উজ্জীবিত বিদ্রোহী কবিতা ও প্রাসঙ্গিক বিষয়াবলী নিয়ে আলোচনা তুলে ধরব।

শতবর্ষে বিদ্রোহী কবিতা
দেড়শ বছরের অধিককালের উপনিবেশবাদী শাসন বাঙালি মুসলমানকে করে তুলেছিল সীমাহীন শোষণ-বঞ্চনা-অত্যাচার-নিপীড়নে কাতর ও অধঃপতিত। সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘুর অমর্যাদা নিয়ে তাকে জীবন নির্বাহ করতে হতো। সাহিত্য-সমাজ-সংস্কৃতি সর্বত্রই তার অবস্থান ছিল নিম্নবর্গের, ব্রাত্যের, ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে। তৎকালীন সমাজ থেকে লেখক হিসেবে যাদেরই আগমন ঘটেছে,বাংলা সাহিত্যের মূল আসরে তাদের আসন মেলেনি। এ ক্ষেত্রে ভাষাও একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অনুকূলতায় উনিশ শতকজুড়ে বাংলা ভাষার লেখ্যরূপে যে সংস্কৃতায়ন ঘটে, তা বাঙালি মুসলমানকে সাহিত্যের মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার ক্ষেত্রে অব্যর্থ ভূমিকা পালন করে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর তারুণ্যের উদ্দামতা, চিন্তার বৈশ্বিক ঔদার্য, অসাম্প্রদায়িকতা, আন্তরিকতা, মানবিকতা, বিশ্বপ্রসারিত দৃষ্টিকোণ, সর্বোপরি স্বকীয় ভাষাভঙ্গি দিয়ে নিঃসংকোচে বাংলা সাহিত্যের মূল আসরে গিয়ে নিজ শক্তিবলেই আসন করে নেন। কারও আহ্বানের অপেক্ষা তাঁকে করতে হয়নি। বিদ্রোহী কবিতার ভূমিকা এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বর্গি শাসন-শোষণে বাঙালি মুসলিম মানসে যে দৈন্য ও হীনমন্যতা জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল; কাজী নজরুল ইসলামের উদ্দীপ্ত আবির্ভাবে তার অবসান ঘটল। দূর হলো সংকোচপরায়ণ ভীরু স্বভাবের; এভাবে বাঙালি মুসলমানের মধ্যে দেখা দিল আস্থাশীলতার এক অভূতপূর্ব জাগরণ। এই জাগরণের শতবর্ষ পূরণ হতে চলছে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে। একটি কবিতা কী শক্তিধর হতে পারে, তা ভাবলেও বিস্মিত হতে হয়। তার অন্তর্গত কাব্যিক-নান্দনিক আর বিষয়-বৈভবসহ বক্তব্যগত শক্তি তো আছেই, কিন্তু তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রভাববিস্তারী শক্তি আরও বিপুল ও ব্যাপক। শোষণ-অত্যাচার-নির্যাতন আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে বঞ্চিত অবহেলিত মানুষের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিকল্পে এ এক অসামান্য বিদ্রোহ। 

বিদ্রোহী কবিতার ও আঁতুড়ঘর রচনা কাল 
মাত্র ২২ বছরের যুবক সেনাবাহিনীর কর্ম শেষে কলকাতায় ফিরেছেন দুই বছরও হয়নি। যুদ্ধফেরত এই যুবকের মনে তখন প্রবলভাবে বহমান উপনিবেশবাদের শোষণ ও সাম্প্রদায়িক বিভেদনাশী এক সুগভীর প্রতিবাদী চেতনা। ১৯২০-এর মার্চে কলকাতায় ফেরার পর বিপুল উদ্যমে তারুণ্যের তুমুল আবেগ-উচ্ছ্বাস নিয়ে তখন তিনি সাহিত্য সৃষ্টিতে আকণ্ঠ নিমগ্ন। সমানে লিখে চলেছেন গল্প-উপন্যাস-কবিতা-গান ও প্রবন্ধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো: গল্প- ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘রাক্ষসী’; উপন্যাস- বাঁধনহারা; কবিতা ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘আগমনী’, ‘রণভেরী’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি।
বৃটিশের মসনদ কাঁপানো বাংলা কবিতা-বিদ্রোহী কবিতার দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই এর মধ্যে অনেকগুলো তাৎপর্যই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে এ সবকিছুকে ছাড়িয়ে বিদ্রোহী কবিতায় ঘটেছিল তাঁর কবিত্বশক্তির সর্বোত্তম প্রকাশ। বিভিন্ন পুরাণের নির্যাসকে এ কবিতায় যে অসীম দক্ষতায় সৃষ্টিশীলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার আঁতুড়ঘর। ১৯২১ সালে দ্বিতল এই বাড়িটিতে বসে কবি লিখেছিলেন রক্তে দোলা জাগানিয়া ‘বল বীর.. চীর উন্নত মম শির’।

বিদ্রোহী কবিতা রচনাকাল এবং সময় নিয়ে যদিও বিস্তার বিতর্ক আছে। কিংবা বিদ্রোহী কবিতা প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল সে বিষয়েও মতভেদ আছে আজও। তবে বিতর্ক যাই থাকুক, কলকাতার তলতলা লেনের ৩/৪ সি লেনের বাড়িটির কোনো এক অন্ধকার ঘরে লণ্ঠন জ্বালিয়ে কবি তাঁর চিন্তার ভ্রূণ কলমের কালির মধ্য দিয়ে সাদা পৃষ্ঠায় ঢেলে গিয়েছিলেন, বর্ণমালায় একে একে গেঁথে গিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের নজরুল গবেষক আহমদ কবিরের একটি প্রবন্ধে বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে ২০১১ সালে। বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে বিতর্কে অংশ নেওয়া নজরুল ইসলামের সমসাময়িক প্রায় সবাই একমত রয়েছেন।  প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ওই লেখার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে দেওয়া হলো এখানে-

মুজফফর আহমদের দেওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, বিদ্রোহী কবিতা কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেন বাড়িতে রচিত হয়েছিল। ১৯২০ সালে ঊনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে নজরুল প্রথমে তাঁর সতীর্থ কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাসায় ওঠেন, সেখানে কয়েক দিন থেকে আরেকটি বাসস্থানে, পরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে উঠলেন। সেখানে তাঁর বন্ধু মুজফফর আহমদ থাকেন। তাঁর সঙ্গে নজরুল একত্র বসবাস করেছেন আরও কয়েকটি বাসায়, শেষে ৩/৪ সি তালতলা লেনে। মুজফফর আহমদ স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন- পুরো বাড়ি পশ্চিমগাঁর নওয়াব ফয়জুন্নিসা চৌধুরানীর নাতিরা ভাড়া নিয়েছিল। বাড়ির নিচতলার দক্ষিণ-পূর্ব ঘরটি নজরুল ও মুজফফর আহমদ ভাড়া নিয়েছিলেন।

কবিতাটি কোথায়, কখন রচিত হয়েছিল সে প্রসঙ্গে মুজফফর আহমেদ লিখেছেন- ‘এই ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর বিদ্রোহী কবিতা লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানিনে। রাত ১০টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলেম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে আমি বসেছি এমন সময় নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনাল। বিদ্রোহী কবিতার আমিই প্রথম শ্রোতা’। 

মুজফফর আহমদ জানিয়েছেন, নিজের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই কবিতাটি শুনে তিনি কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেননি। এতে নজরুল মনে মনে আহত হয়েছেন নিশ্চয়ই। কবিতাটির রচনার সময় নিয়ে মুজফফর আহমদ আবার বলেছেন, ‘আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তাঁর ঘুম সাধারণত দেরীতেই ভাঙত, আমার মতো তাড়াতাড়ি তাঁর খুব ভাঙত না’। মুজফফর আহমদ আরও জানিয়েছেন, নজরুল সম্ভবত প্রথমে কবিতাটি পেনসিলে লিখেছিলেন। 

বিদ্রোহী কবিতা প্রথম প্রকাশ
নজরুল গবেষক আহমদ কবির লিখেন... বিদ্রোহী কোন পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয়েছিল সে নিয়েও বিতর্ক আছে। বাংলা একাডেমির নজরুল রচনাবলীর সম্পাদক আবদুল কাদির প্রথম খণ্ডের গ্রন্থ পরিচয়ে জানিয়েছেন- ‘বিদ্রোহী ১৩২৮ কার্তিকে ২য় বর্ষের ৩য় সংখ্যক মোসলেম ভারত-এ বাহির হইয়াছিল। ১৩২৮ সালের ২২শে পৌষের সাপ্তাহিক বিজলীতে এবং ১৩২৮ মাঘের প্রবাসীতে উহা সংকলিত হইয়াছিল’। আবদুল কাদির এ তথ্যও জানিয়েছেন যে, ‘মোসলেম ভারতে প্রকাশিত বিদ্রোহী কবিতায় আরও কয়েকটি চরণ ছিল, যেগুলো পরে পরিত্যক্ত হয়েছে’। 
কিন্তু মুজফফর আহমদ বলেছেন- বিদ্রোহী প্রথমে সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ১৯২১ সালের ৬ জানুয়ারি, ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ। মুজফফর আহমদের কথায়, ‘বিদ্রোহী প্রথম ছাপানোর সম্মান বিজলীরই প্রাপ্য’। এ কথা অবশ্য ঠিক যে ‘মোসলেম ভারতে’ প্রকাশের জন্য নজরুল বিদ্রোহী কবিতা সম্পাদক আফজালুল হককে প্রথমে দিয়েছিলেন। কিন্তু মোসলেম ভারতে’র কথিত সংখ্যাটি বের হতে দেরি হয়ে গিয়েছিল’।

বিদ্রোহী কবিতা বাঙালির আত্ম-জাগরণেরমন্ত্র
১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাতে সাংবাদিক হিসেবে মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম দু’জনই উপস্থিত ছিলেন। এরপর অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের যূথবদ্ধতায় স্বরাজের দাবিতে যখন ভারতবর্ষ প্রকম্পিত, তখন কবিও তার সঙ্গে একাত্ম হয়েছেন, মিছিলে সক্রিয় থেকেছেন। বিদ্রোহী রচনার মাসটিতেই গ্রেপ্তার হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ; পরের মাসেই তিনি এক বসায় লিখে ফেলেন সাড়া জাগানো সংগীত ‘কারার ঐ লৌহ কপাট...’। অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই ইউরোপীয় ধনলোভী উন্মাদনার বিপরীতে সংঘটিত হয় রুশ বিপ্লবের মতো শোষণমুক্তির দুনিয়া কাঁপানো ঘটনা ইত্যাদি বিদ্রোহী কবিতা রচনার সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক পটভূমি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনবোধ ও জীবনাচারের কিছু বৈশিষ্ট্য।

যথার্থ অর্থেই কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সর্বহারা, ‘কলমপেষা মজুর’; তাঁর ছিল না কোনো পিছুটান তথা মধ্যবিত্তসুলভ দ্বিধার দোলাচলতা। বরং বেপরোয়া যৌবনের বিপুলতম উদ্দামতা নিয়ে শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে সততাতাড়িত প্রতিবাদে তিনি ছিলেন দুঃসাহসী, পরিণাম ভয়শূন্য। শাসক-শোষক আর ক্ষমতাবানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রাণাবেগময় দ্রোহের কথাই উচ্চ কণ্ঠে ব্যক্ত হয়েছে এই কবিতায়। ফলে তা বিপুলভাবে পাঠকচিত্তকে আকৃষ্ট করেছে। এ কবিতাটি বাঙালির আত্মজাগরণের মূলমন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির বাঙালির আবেগের জায়গায় তীব্র আঘাত দেয়। এভাবে একটি জাতির বিশুদ্ধ আবেগকে আত্মীকরণ করে কবিতাটি হয়ে ওঠে জাতির আত্মজাগরণের মন্ত্র। 

বিদ্রোহের স্বরূপ ও সমকালের-সর্বকালের বাঙালির ভাষার প্রতিধব্বনি
বিদ্রোহের সংজ্ঞা-বয়ানে নজরুলের বিদ্রোহী আজ শুধু একটি কাব্যভাষ্য নয়, বরং একটি সচল নমুনা। সচল এ কারণে যে, এই নমুনাকে ব্যাখ্যাকারী আবার নিজের মতো করে আত্মস্থ করে পুনর্বিন্যাস করতে পারে। এখানে কবির আত্ম-উপলব্ধি ও সত্যান্বেষণের পথও দৃশ্যমান। তবে এই কাব্যভাষ্যের আলোকে নজরুলের বিদ্রোহের স্বরূপ নির্ণয়ের আগে আমরা কবির আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় জবানবন্দীর শরণ নিতে পারি, যেখানে কবি স্বয়ং তাঁর বিদ্রোহ সম্পর্কে অকপট স্বীকারোক্তি করেছেন। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামক এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে তিনি তাঁর নিজের বিদ্রোহ সম্পর্কে পূর্ণরূপে সচেতন ছিলেন। কবির কাজ তাঁর ভিতর যে জাগ্রত স্রষ্টা বা সৃষ্টি কর্তা আছেন, তাঁর আদেশ মান্য করে ‘সত্য’ প্রকাশ করা।

বিদ্রোহ স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বতোৎসারিত, সর্বগ্রাসী ও সংক্রামক। প্রচলের বিপরীতে প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদই বড় কথা নয়, আসল কথা নিজেকে ভেতর ও বাহির থেকে মুক্ত করে আপন শক্তির মহিমায় অবলোকন করা, তারপর ব্যক্তি ও সমষ্টির জন্য সেই আত্মশক্তিকে ইতিবাচকভাবে প্রয়োগ করা। এইভাবে একটি সফল বিদ্রোহ সময়ের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে কালক্রমে এমন একটি কর্মপদ্ধতিতে বিবর্তিত হয়ে যায়, যা নিজেকে ও অন্যকে মানুষের সামগ্রিক প্রয়োজনে ইতিবাচক সক্রিয়তায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করে। বিদ্রোহেরও শুরু আছে, অগ্রগমন আছে, বিবর্তন আছে আর পরিণতি আছে। প্রতিটি বিদ্রোহ পরিণতির পর আবার আরেকটি প্রচলের জন্ম দেয়, যা কালক্রমে আরেকটি বিদ্রোহের বীজকে সঙ্গোপনে লালন করে। অর্থাৎ বিদ্রোহ কেবল একবার ঘটে না, বার বার ঘটে। জীবন নবায়িত হয়, নবায়িত হয় চাহিদা, নবায়িত হয় নতুন সময়ের নতুন দ্রোহের সম্ভাবনা। নজরুলের ভাষা-বিদ্রোহ ও নান্দনিক বিদ্রোহ অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত। কবিতায় ও গদ্যে নজরল যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শৈলীর অধিকারী ছিলেন, তার কারণ তিনি প্রচলিত অপ্রচলিত বিদেশি শব্দের পাশাপাশি বাঙালির সর্বগোত্রের ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মিক স্বাতন্ত্রসূচক শব্দও বাকবিধিকেও সমন্বিত করেছিলেন। এ কবিতায় তাঁর ভাষা সমকালের ও সর্বকালের বাঙালির সমগ্রেরও ভাষা। 

বিদ্রোহী কবিতার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও শিল্পমান
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবিতার শব্দ নির্বাচন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে নির্বিচারী ছিলেন এবং এর কারণগুলো যৌক্তিক ও স্পষ্ট। কবিতার প্রতিটি পঙক্তি যেন শরীরের রক্ত শুদ্ধ করে আওয়াজ তোলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বিদ্রোহের দামামা বাজায় প্রতি মুহূর্তে, আজও এই কবিতার গ্রহণযোগ্যতা, শিল্পমান ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। কোনও বিতর্ক নেই। কবির কলমের আচড়ে-আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি/আমি পথ-সমুখে যাহা পাই; যাই চূর্ণি/ আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ/ আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ/ আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল/ আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি ছমকি/পথে যেতে যেতে চকিত চমকি-

এ কবিতার ভাব-ভাষা ও শব্দব্যবহার নিয়ে কবিতাটি প্রকাশের পর থেকে অনেক আলোচকই নানাভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কবিতাটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নতুন শৈল্পিক দুয়ারের সুউচ্চ সৌধ। কবিতাটির গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নাতীত।
কবিতাটির শুরু
বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত
শির ওই শিখর হিমাদ্রীর!
বল বীর
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া,
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি
বিশ্ব-বিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র-ভগবান
জ্বলে রাজ-রাগটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর
আমি চির-উন্নত শির!

চরম অবিন্যস্ততার মধ্যে সৃষ্টিকর্ম সাধিত হয় বিদ্রোহীর শুরুর স্তবক তারই সাক্ষ্যবহ এবং ধীরে ধীরে মানবজীবনে নানা অব্যবস্থিতি ও অস্থিরতা এবং কারণের প্রতি কবির সংক্ষুব্ধ মনোভাব ফুটে ওঠে। এরই মধ্যে মানবজীবনের প্রেম ভালোবাসা, ঘৃণা, আশা-নিরাশা এবং চিত্তের চাঞ্চল্য প্রকাশিত। অর্থনৈতিকভাবে মানুষে মানুষে যে বৈষম্য তার পেছনে কবি, কেবল মানুষকেই দায়ী করেন না সঙ্গে প্রকৃতির প্রতিও তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফলে নিজেকে ‘চিরদুর্দ্দম’ ‘দুবির্নীত’ ‘এলোকেশে ঝড়’ এর মতো নানা অভিধায় অভিষিক্ত করে বিধাতার প্রতিও ক্রোধ প্রকাশ করেন। এক সময় মনে হয়, অনেক দীর্ঘ মন্ত্রোচ্চারণ শেষে কবি কণ্ঠে নেমে আসে শান্তির আমেজ। কবি উচ্চারণ করেন,
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়নের
ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে
ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না 


বাঙালি মনীষার অনন্য নিদর্শন বিদ্রোহী কবির শেষ উচ্চারণেও নিজেকে অন্য সবার চেয়ে উচ্চাসনের সত্তা বলে ঘোষণা করেন। পুরো কবিতাটি অসম পঙক্তির মাত্রাবৃত্তের, যে তান কবিতার ভেতর ভেতর সুরের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে, এ কবিতায় তা নেই। বিপরীতে আছে ভাষার প্রবাহমানতা এবং বক্তব্যের প্রয়োজনে ভরাট উচ্চারণ ভঙ্গি। এর ভারকেন্দ্রে রয়েছে একজন সাধারণ আমির বিশেষ আমিতে উত্তরণচেষ্টা। বাঙালি জাতিকে মুক্তির আলো দেখাতে, বাঙালির মনে স্বাধীনতার বীজ বপন করতে, জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে আপসহীন রণনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কাজী নজরুল ইসলাম।

‘বিদ্রোহী’র বিপুল জনপ্রিয়তা কারণ
বিদ্রোহী কবিতার তুমুল জনপ্রিয়তার কারণ-সমকালীন মুক্তিকামী মানুষের প্রতিবাদী আবেগ কবিতাটি যথার্থভাবে ধারণ করে। আর এতে প্রতিফলিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিভার সর্বময় দীপ্তিশিখা। সীমাহীন প্রাণাবেগে উচ্ছ্বল তারুণ্যদীপ্ত বাসনার বিস্তারে ‘বিদ্রোহী’র প্রতিটি উচ্চারণ হয়ে উঠেছে আবেদনময়, চিত্তাকর্ষী ও নির্ভীকতার ইঙ্গিতবাহী। এখানে তাঁর শিল্পীসত্তার মৌল প্রবণতা হিসেবে রোমান্টিকতার দুই প্রধান দিকও স্পষ্ট। ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণ-তূর্য!’ এই পঙ্ক্তিতে পৌরাণিক আখ্যানের চরিত্র কৃষ্ণের দুই রূপের কথা বলা হলেও এর ভেতরে রোমান্টিসিজমের দুই বৈশিষ্ট্যই প্রোথিত; প্রেম আর মুক্তির সংগ্রাম। ‘আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!’ এই শক্তিকে কবি খুঁজেছেন পুরাণে। শুধু ভারতীয় পুরাণ নয়, তিনি অনুসন্ধান করেছেন পশ্চিম এশীয় ও গ্রিক পুরাণও। অবগাহন করেছেন ইসলামিক ঐতিহ্যেও। আর এই পুরাণ অনুসন্ধান ও তা আশ্রয় করে আত্মশক্তির অনুসন্ধানই নজরুলের শিল্পীসত্তার এক মৌল বৈশিষ্ট্য। মানুষের মধ্যেকার শুভবোধতাড়িত শক্তির সন্ধান করেছেন; আর সেই শক্তির সব কল্যাণকর উপাদান একত্র করে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছেন শোষক ও শাসক শ্রেণির অপশক্তির বিরুদ্ধে। বিপ্লবী, শোষণমুক্তি আর স্বাধীনতার চেতনা-প্রবাহী কবিতার প্রকৃত রূপ কী হতে পারে বাংলায় তার একটি মৌলিক ও অনন্য সাধারণ উদাহরণ ‘বিদ্রোহী’র ভেতর দিয়ে কবি নজরুল উপস্থাপন করেন। 

উপনিবেশবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে, তাদের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে কবিতার ভাষায় এমন বাঙ্ময় ও স্পষ্ট উচ্চারণ ছিল অভূতপূর্ব। বাংলা কবিতার পাঠকদের কাছে এ ভাষা আর এ কণ্ঠস্বর ছিল একেবারেই নতুন; কালের স্পন্দনকে ধারণ করে এ-ভাষা কালজয়ী। ফলে বাংলা কবিতার ভাষা বদলেও ‘বিদ্রোহী’র ভূমিকা বাঁক বদলকারী তো বটেই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিপুল জনপ্রিয়।

বিদ্রোহী কবিতার অনন্যতা ও ‘আমি’র প্রতীকের ব্যঞ্জনা
আমরা বিদ্রোহী কবিতায় দৃষ্টি ফেরালে দেখতে পাই; এখানে নজরুল তার বিদ্রোহকে সঙ্গতকারণেই ‘আমি’ প্রতীকে ব্যঞ্জনাময় করেছেন এবং নিজেকে অজেয় বলে উপলব্ধি করেছেন। কবিতাটিতে ১৪৭ বার ‘আমি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। ‘আমি কে’? এই প্রশ্ন সৃষ্টির শুরু থেকেই। ‘আমি’র মধ্যেই সকল শক্তির উপস্থিতি এ-কথা নজরুল জানতেন। ব্যাপারটা হচ্ছে নিজেকে চেনা। বৃহৎ সত্তায় নিজেকে দেখতে পাওয়া। তাঁর প্রতিভার মৌল প্রবণতার উৎসবিন্দুও বিদ্রোহী। তাইতো বিদ্রোহী আত্মশক্তিকে উদ্বোধিত করার লক্ষ্যে প্রথমেই কবির সরব ঘোষণা: ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির!’

‘বীর’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মদর্শন, আত্মউপলব্ধি, আত্মশক্তি, আত্মজয়, আত্মস্বীকৃতি, আত্মসম্মান ইত্যাকার বহুমাত্রিক আত্ম-প্রসঙ্গ বলয়িত হতে থাকে। আর তার প্রত্যাশিত অনুষঙ্গ হয়ে আসে ‘আমি’ সর্বনাম, যা এই সৃষ্টিবিশ্বের প্রতিটি প্রাণী ও অপ্রাণীর জন্যে প্রযোজ্য। আসলে এই সৃষ্টিবিশ্ব অসংখ্য ‘আমি’-র যোগফল হয়ে একটি সামষ্টিক আমি। তাই ‘আমি’র মৌলার্থ যে কোনো সচেতন সত্তা। এই সচেতনতা আমার সঙ্গে তোমার বা তার সঙ্গে আমার দূরত্ব বিলীন করে সকল ব্যক্তিসত্তাকে একটি ভারসাম্যময় সূত্রে গ্রথিত করে। সকল সচেতন শক্তিসত্তার মধ্যে ‘আমি’র এই সর্বব্যাপী একরৈখিকতা আপাত-অদৃশ্য; যা দৃশ্যমান তা হলো এই ‘আমি’র বহুরূপতা, যা নানা রূপকে বিভাজিত ও উদ্ভাসিত।

কাজী নজরুল ইসলাম তার কবিতায় ‘আমি’ বা সমগোত্রীয় সর্বনাম ব্যবহার করেছেন, এই ব্যবহার কিন্তু শেষ পঙক্তিতে এসেও থেমে নেই এর পঙক্তি-সংখ্যা; সম্প্রসারণশীল, বিবর্তনশীল ও সংঘর্ষশীল এই কাব্যভাষ্য মূলত প্রান্তমুক্ত; কতকটা সম্প্রসারণশীল এই বিশ্বপ্রকৃতির মতো, যার শুরুও নেই শেষও নেই।

বক্তব্যের অন্তবর্য়িত অনুক্রম অনুযায়ী কবিতাটিকে মোট দশটি স্তবকে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তবকে ‘আমি’র শক্তিময়তার পাশাপাশি বিজয়ের প্রত্যয় নিনাদিত, আর এই বিজয়ের জন্যে প্রয়োজন আঘাতকারীর ‘আমি’র ধ্বংসাত্মক রূপ, যা কবিতাটির ১১ থেকে ২৭ পঙক্তি পর্যন্ত ঘূর্ণিত: ‘আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি/ আমি পথ সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। শক্তির উদ্বোধন ও সংহারচিত্রের পরই হঠাৎ শুরু হলো মিলনের নৃত্য-পাগল ছন্দ। ২৮ থেকে ৩৭ পঙক্তি পর্যন্ত আমি এমন এক মুক্ত জীবনানন্দ, যে শত্রুর সাথে গলাগলি করে, আবার মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে।

কিন্তু মিলনের এই আকাঙ্ক্ষার পরবর্তী দুই পঙক্তিতে ‘আমি’ আবার মহামারী, ভীতি, শাসন-ত্রাসন ও সংহার রূপকে আবির্ভূত। তারপর ৪২ থেকে ৫১ সংখ্যক পঙক্তিতে আবার আছে উদ্দাম ইতিবাচকতা, হোমশিখা, উপাসনা, নিশাবসানের আকাঙ্ক্ষা। আর এই অংশের ৪৯তম পঙক্তিতেই আছে সেই জাদুকরী সরল স্বীকারোক্তি: ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য’। পড়তে পড়তে হঠাৎ মনে হয় কবিতাটি তো এখানেও শেষ হতো পারত।

কেননা সৃষ্টি-ধ্বংস-সৃষ্টির যে দ্বান্দ্বিক স্বতঃশ্চলতার প্রক্রিয়া এই কবিতায় বলয়িত, তার একটি পর্যায় এখানে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। এ পর্যন্ত ‘আমি’ মূলত বিশ্বপ্রকৃতির বিভাজিত ও সংঘর্ষশীল চূর্ণ-চিত্র হিসেবে আবির্ভূত।

সমালোচকের দৃষ্টিতে বিদ্রোহী কবিতা
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাস, বিবর্তনের ইতিহাস। এ বিবর্তন ঘটে প্রধানত আঙ্গিকে। আঙ্গিকে পরিবর্তন ঘটে মূলত ছন্দ-উপমা-চিত্রকল্পের অভিনবত্বে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অক্ষরবৃত্তকে পয়ারের চাল দিয়ে কবিতাকে করে তুলেছিলেন গীতিধর্মী। রবীন্দ্রস্বভাবের বিপরীতে সম্পূর্ণ নতুন স্বাদ মেজাজে স্বমহিমায় স্বাতন্ত্র বৈশিষ্টে কাজী নজরুল ইসলামের তাঁর রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক দ্রোহ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। নজরুলের বজ্রনিনাদপূর্ণ উচ্চারণ রবীন্দ্রস্বভাবের কোমল কণ্ঠের বিপরীতে উজ্জ্বল করে তোলে। নজরুল একদিকে যুগমানস বুঝতে পেরেছিলেন, অন্যদিকে যুগের দাবিও পুরণ করেছিলেন।

কাজী নজরুল ইসলাম প্রথম বিশ্বযোদ্ধত্তর বাঙালির নিজস্ব স্বভাব ও স্বাধীকারের প্রশ্নে আত্ম-উদ্বোধন ঘটালেন বিদ্রোহী কবিতায়। তার কবিতায় বিশেষ সময়ের বিভীষিকা মূর্ত হয়ে উঠলো। এই লক্ষ্যে তিনি শব্দ নির্বাচন ও প্রয়োগে হয়ে উঠলেন নির্বিচারী এবং চেতনায় বিক্ষিপ্ত।

বিদ্রোহীর শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে সৈয়দ আলী আহসান ‘আধুনিক বাংলা কবিতা ভূমিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছেন নজরুল ইসলাম একই সঙ্গে বিক্ষিপ্ত চেতনার অধিকারী। তিনি বাংলা কবিতাকে তার শৃঙ্খলাবদ্ধ রূপাভিব্যক্ত থেকে মুক্ত করে একটি উদ্দামতার মধ্যে হিল্লোলিত করলেন।
বিদ্রোহী কবিতাটির বাচন-ভঙ্গী পরীক্ষা করলে দেখা যাবে যে, শব্দ নির্বাচনে কবির কোনো জাত-বিচার ছিল না। ভেদিয়া ছেদিয়া ভীম ভাসমান মাইন ঠমকি হরদম ভরপুর মদ তুড়ি দিয়া এই সমস্ত শব্দ এবং বাক্যাংশ নির্বিবাদে ব্যবহৃত হয়েছে তা নয় বিশেষ কোনো তাৎপর্যও এই পদগুলোতে নেই, কিন্তু দীর্ঘ কবিতার প্রবল ধ্বনিপ্রবাহে স্বার্থকতা।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল নজরুল-কাব্যে শব্দ ব্যবহারে যে বৈচিত্র তার বিশ্লেষণে আমাদের সমকালীন পঠিত সমাজে দুটি বিশেষ প্রবণতার দ্বারা প্রায়শ উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকেন। ১.ধর্মীয় ২. নন্দনতাত্ত্বিক- এই দৃষ্টিকোণের দূরত্ব এত বেশি যে তাদের সমন্বয়ে কোনো অখণ্ড শিল্পদৃষ্টির উদ্বোধন প্রায় অসম্ভব বলে মনে হয়। একথা সত্য যে নজরুল তার কাব্যে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যতটা নন্দনতাত্ত্বিক ছিলেন তারও বেশি ছিলেন ধর্মচেতনাসঞ্জাত শব্দ ব্যবহারের প্রতি আগ্রহী। এক্ষেত্রে তার কাছে শিল্পমূল্যের চেয়ে আবেগের সারল্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নজরুল নিজেই বলেছিলেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানদের পরিপূর্ণ মিলনে বিশ্বাসী; তাই তাদের এ-সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিয়েছি। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার কাব্যের সৌন্দর্যহানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি’। কিন্তু কাজী নজরুল ইসলাম যতই তার ধর্মীয় চেতনাসঞ্জাত শব্দ সমবায় সম্পর্কে ব্যাখ্যা দাঁড় করান প্রতিক্রিয়াশীলদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাননি। তেমনি একজন ছিলেন মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দিন আহমদ। ‘লোকটা মুসলমান না শয়তান’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘মুসলেম ভারতে বিদ্রোহী কবিতাই কাজির কারামত হাজির হয়েছিল। তার পর ধূমকেতু প্রত্যেক সংখ্যায় পবিত্র ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে গরল উদগীরণ করিতেছে। এ উদ্দাম যুবক যে ইসলামী শিক্ষা আদৌ পায় নাই তাহা ইহার লেখার পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাইতেছে। হিন্দুয়ানী মাদ্দার ইহার মস্তিস্ক পরিপূর্ণ। নরাধম হিন্দু ধর্মের মানে জানে কি? এই রূপ ধর্মদ্রোহী কবিকে বিশ্বাসী মুসলমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না’। 

কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মীয়বোধ সম্পর্কে মুনশি মোহাম্মদ রেয়াজুদ্দিন আহমদ সংশয়ী হলেও তার বিদ্রোহী কবিতায় ভাব-ভাষা এবং যৌক্তিকতা সম্পর্কে তার আস্থা ছিল পরিপূর্ণ। ক্ষোভও ছিল ধর্মীয় কুপমণ্ডুকতায় তাঁর আঘাতে। অন্যদিকে হিন্দু লেখকসমাজও বিদ্রোহীর আরবী, ফার্সি শব্দের সঙ্গে সংস্কৃত শব্দের সমন্বয় সাধনকে সহজভাবে নেননি। ফলে বিদ্রোহী কবিতাটি যে জাতির আত্ম-মুক্তির মন্ত্র হিসাবে উচ্চারিত সে কবিতাটিই ওই জাতির কয়েকজন ধর্মান্ধের গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠে।

শেষ কথা 
বিদ্রোহী কবিতা রচনার শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি, বিদ্রোহী কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অম্লান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর ধনতন্ত্রের শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সবকিছুই বলবৎ আছে। আজও ‘অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণে’র তলে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ এই বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়। অন্যদিকে মানুষের শক্তির প্রতি, তার বীরত্বের প্রতি অনাস্থাও সমানভাবে অটুট। তাই নজরুলের ভাষায়,শান্ত থাকার অবকাশ মিলছে না। চতুষ্পার্শ্বের প্রতিবাদহীন মেরুদণ্ডহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বিপুলভাবে কাম্য হয়ে উঠেছে ‘উন্নত মম শির’-এর বজ্রদীপ্ত ঘোষণা। শোষণ, পীড়ন আর বৈষম্য থেকে মুক্তির সংকল্প নিয়ে মানুষের অপরিমেয় শক্তির উদ্বোধন ঘটিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহের রণে অবতীর্ণ হওয়ার যেন বিকল্প নেই।

বিংশ শতাব্দীর বাংলা মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে নজরুল সর্বদাই ছিলেন সোচ্চার। তার কবিতা ও গানে এই মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে। অগ্নিবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ। যেমন লেখাতে বিদ্রোহী, তেমনই জীবনের কাজেও বিদ্রোহী। 

তথ্যপঞ্জি:
১.‘বিদ্রোহী’ কবিতার আঁতুড়ঘর, সুব্রত আচার্য, কলকাতা।
২.‘বিদ্রোহী’র শতবর্ষ, জাগরণের শতবর্ষ, সৈয়দ আজিজুল হক, দৈনিক প্রথম আলো।
৩. নজরুল-বিদ্রোহের স্বরূপ ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা মুহম্মদ নূরুল হুদা । 
৪. উইকিপিডিয়া 
৫. শতবর্ষে বিদ্রোহী-ইকবাল খোরশেদ- আনন্দ ভূবন । 
৬. সম্পাদক সমীপে: শতবর্ষে ’বিদ্রোহী’ আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত।
৭. ২০২১: বিদ্রোহী কবিতার শতবর্ষ, এ টি এম মোস্তফা কামাল, প্রতিকথা ।
৮. সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি: বিবিসি বাংলার জরিপ, কাজী নজরুল ইসলাম-অসাম্প্রদায়িক মানবতার কবি, বিবিসি নিউজ বাংলা।
 ৯. জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের আত্মার শক্তি, আবুল কাসেম হায়দার, দৈনিক নয়া দিগন্ত।

লেখক : কবি,সাংবাদিক,গণমাধ্যমকর্মী-বার্তা প্রযোজক একুশে টেলিভিশন, ঢাকা।

এসএ/

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি