ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬

৩৫ রুপি মাসিক আয়ে শুরু প্রতিভার এক ব্যতিক্রমী নানা পাটেকার

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৫৬, ৮ অক্টোবর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

ভারতীয় সিনেমায় তার সংলাপ বলার ধরন আলাদা, অভিনয়ের তীব্রতা আলাদা। কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, কখনো ভয়ংকর খলনায়ক, আবার কখনো হাস্যরসের চরিত্র সব ভূমিকাতেই নিজের ছাপ রেখেছেন নানা পাটেকার। কিন্তু পর্দার বাইরের তার জীবনটাও ছিল কম নাটকীয় নয়। 

মাত্র ১৩ বছর বয়সে আয় শুরু করা এই অভিনেতা একসময় মাসে মাত্র ৩৫ রুপি উপার্জন করতেন। জীবনের কঠিন সময় পার করে শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেন জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা। এমনকি যুক্ত ছিলেন ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গেও।

৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হলো কয়েক দশকের এই বর্ণিল ক্যারিয়ার। গোয়ার বাড়িতে গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। 

এএনআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সাড়া দেননি তিনি।

একসময় মাসে আয় ছিল মাত্র ৩৫ রুপি

নানা পাটেকরের শৈশব কেটেছে আর্থিক সংকটের মধ্যে। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তাকে উপার্জন শুরু করতে হয়। এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা জানিয়েছিলেন, জীবনের এমন সময়ও গেছে যখন দিনে একবার খাবার খেয়েই থাকতে হয়েছে। অভাবের মধ্যেও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছাড়েননি নানা। সেই সংগ্রামই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় চলচ্চিত্রের জগতে।

খলনায়ক দিয়ে শুরু, ‘অঙ্কুশ’ দিয়েই পরিচিতি

‘গমন’ সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তার। তবে ১৯৮৬ সালের ‘অঙ্কুশ’ তাকে দর্শকের কাছে আলাদা করে পরিচিত করে তোলে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নি সাক্ষী’, ‘তিরঙ্গা’, ‘খামোশি’ ও ‘ভূত’-এর মতো সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মনে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে শক্তিশালী সংলাপ, তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তি এবং কর্তৃত্বপূর্ণ চরিত্রে তার অভিনয় তাকে বলিউডের অন্যতম স্বতন্ত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ভয়ংকর চরিত্র থেকে ‘ওয়েলকাম’-এর উদয় শেঠি

নানা পাটেকরকে অনেকেই গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রের অভিনেতা হিসেবেই চিনতেন। কিন্তু ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেঠি চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়ে দেন, কমেডিতেও তিনি সমান দক্ষ।

‘উদয় শেঠি’ চরিত্রটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠে। এরপর ‘শাগির্দ’, ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ ও ‘অ্যাব টক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমাতেও ভিন্নধর্মী চরিত্রে দেখা যায় তাকে।

অভিনয়ের পাশাপাশি ছিলেন সেনাবাহিনীতেও

নানা পাটেকরের জীবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ অধ্যায়গুলোর একটি হলো তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক। ১৯৯০ সালে তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দেন। ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’ সিনেমায় মেজর চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতির জন্য তিনি প্রায় তিন বছর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। এই সময় তিনি জেনারেল ভি কে সিংয়ের সঙ্গেও কাজ করেন।

১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়ও তার সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানা যায়। সে সময় অভিনয় থেকে দূরে গিয়ে তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘নাটসম্রাট’-এ আবারও মুগ্ধ করেছিলেন দর্শককে

হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি মারাঠি চলচ্চিত্রেও নানা পাটেকরের শক্ত অবস্থান ছিল। ২০১৬ সালের ‘নাটসম্রাট’ তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় কাজ। সিনেমাটিতে অবসর নেয়া এক মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। থিয়েটারের জগৎ ছেড়ে দেয়ার পর তার জীবনে যে পরিবর্তন আসে, সেই আবেগঘন গল্পকে অসাধারণ অভিনয়ে ফুটিয়ে তোলেন নানা।

চরিত্রটির আবেগ, একাকিত্ব ও ভাঙনের সঙ্গে নিজের অভিনয় দক্ষতা মিশিয়ে ‘নাটসম্রাট’-এ তিনি আবারও প্রমাণ করেন কেন তাঁকে ভারতের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেতা বলা হয়।

তিনবার জাতীয় পুরস্কার

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকরের ঝুলিতে রয়েছে তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। কয়েক দশক ধরে হিন্দি ও মারাঠি সিনেমায় তাঁর অভিনয় তাকে একাধিক প্রজন্মের দর্শকের কাছে পরিচিত করে রেখেছে। ক্যারিয়ারের শেষ দিকেও অভিনয় চালিয়ে গেছেন তিনি। ২০২৬ সালের শুরুতে মুক্তি পাওয়া ‘সুবেদার’ ও ‘ও রোমিও’ ছিল তার শেষ দিকের সিনেমাগুলোর মধ্যে।

মাত্র ৩৫ রুপি মাসিক আয় থেকে শুরু করে জাতীয় পুরস্কার, জনপ্রিয়তা এবং সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা নানা পাটেকরের জীবন যেন সংগ্রাম, শৃঙ্খলা ও অভিনয় প্রতিভার এক ব্যতিক্রমী গল্প। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ভারতীয় সিনেমা হারাল এমন এক অভিনেতাকে, যাঁর অভিনয়ের তীব্রতা এবং স্বতন্ত্র উপস্থিতি দীর্ঘদিন দর্শকের মনে থেকে যাবে।  

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি