ভারতে গুগলের ডেটা সেন্টার নির্মাণকে ঘিরে তীব্র বিরোধিতা
প্রকাশিত : ১৪:৫০, ১১ অক্টোবর ২০২৬
ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যে গুগলের বিশাল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনাকে ঘিরে তীব্র বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তি খাতের এই বৃহৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ডেটা সেন্টারটি পানি ও বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে, পরিবেশের ক্ষতি করবে এবং সে তুলনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে খুবই কম।
ভারতের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত বিশাখাপত্তনমে ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এটিই হবে গুগলের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টার। প্রকল্পের জন্য বনভূমি ও কৃষিজমি পরিষ্কার করতে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি সরানোর কাজ চলছে।
বন্দরনগরী বিশাখাপত্তনম, যা স্থানীয়ভাবে ‘ভিজাগ’ নামেও পরিচিত, সেখানে এ প্রকল্পকে ভারতের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশটির সরকার।
তবে স্থানীয়দের একাংশের আশঙ্কা, শহরটিতে পরিকল্পিত একাধিক বৃহৎ প্রযুক্তি স্থাপনার মধ্যে গুগলের এই প্রকল্পও পানি ও বিদ্যুতের সংকট বাড়াবে এবং পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
স্থানীয় কৃষক চন্দলা সদাম্মা এএফপিকে জানান, নিজের আম ও কাজুবাদামের গাছ থাকা জমিতে এখন লাল মাটির ক্ষতচিহ্ন দেখলে তার কান্না পায়। দুই একর বা প্রায় শূন্য দশমিক আট হেক্টর জমির বিনিময়ে তিনি ৮২ হাজার ডলারের বেশি পেয়েছেন। তবে জমি বিক্রির অভিজ্ঞতা তার মনে তিক্ততা তৈরি করেছে।
৫০ বছর বয়সী সদাম্মা বলেন, ‘কোনো একটি কোম্পানি এসে আমাদের প্রতি সামান্য সম্মানও না দেখিয়ে জমি নিয়ে নিল, আর আমরাও তা মেনে নিলাম।’
বিশাখাপত্তনম থেকে সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবল সমুদ্রতল থেকে উপকূলে উঠে এসেছে। এ কারণে শহরটি ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির আয়তন ৬০০ একর, যা ৩৪০টিরও বেশি ফুটবল মাঠের সমান।
গুগলের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামো ও জ্বালানি বিভাগের প্রধান আলেকজান্ডার স্মিথ বলেন, ‘এআই হাবে বিনিয়োগ বহু দশকের প্রতিশ্রুতি। এর সঙ্গে প্রতিবেশী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্বশীল থাকার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের স্থাপনার আশপাশের পানির উৎস, বিদ্যুৎব্যবস্থা ও জনগোষ্ঠীর অবস্থা আমাদের উপস্থিতির কারণে আরও ভালো হওয়া উচিত।’
অন্ধ্র প্রদেশ সরকার এএফপিকে জানিয়েছে, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় আগে বসবাস করতেন এমন মানুষের জন্য নতুন আবাসন তৈরি করা হচ্ছে এবং সেগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
‘এখানেই কেন?’
বিশ্বজুড়ে সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। এসব স্থাপনায় সারি সারি কম্পিউটার সার্ভার থাকে, যেগুলো বিভিন্ন অ্যাপ, অনলাইন সেবা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি পরিচালনায় প্রয়োজনীয় তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে।
তবে এসব প্রকল্প নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিরোধিতাও বাড়ছে। সম্প্রতি ফিনল্যান্ডের একটি কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক পরিবেশগত মূল্যায়ন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত গুগলের দুটি ডেটা সেন্টারের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
অন্ধ্র প্রদেশের পরিবেশকর্মীরাও রাজ্যজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক স্থগিতাদেশের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এসব প্রকল্পের স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের প্রতিবেদন প্রকাশ না করা পর্যন্ত নতুন স্থাপনার অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়।
স্থানীয় সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফোরামের সদস্য গুট্টা রোহিত এএফপিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল উপকূলীয় এলাকা রয়েছে। তারা চাইলে সেখানেই এসব স্থাপনা তৈরি করতে পারে। তাহলে এখানে আসছে কেন?’
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে ডেটা সেন্টারবিরোধী আন্দোলনে স্থানীয় পানিসম্পদের ব্যবহার একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। সার্ভার অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া ঠেকাতে প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রচুর পানি প্রয়োজন হতে পারে।
গুগল জানিয়েছে, ভারতের এই এআই হাবে পানি ব্যবহার করে শীতলীকরণের পরিবর্তে ‘উন্নত’ বায়ু-শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।
এদিকে, বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় অন্ধ্র প্রদেশ সরকার ১ দশমিক ২ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ছয়টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে।
তবু পানির ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ কাটেনি। বিশেষ করে বিশাখাপত্তনমকে বড় প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টারকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা তাদের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
স্থানীয় দোকানি গুব্বালা রামানাম্মা বলেন, ‘তারা বলছেন, আমাদের সন্তানদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য গুগল এখানে তাদের ডাটা সেন্টার স্থাপন করছে।’
তবে ৫৭ বছর বয়সী এই নারী একটি শুকনো কূপের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমরা তো আগে থেকেই পানির সংকটে ভুগছি।’
গুগলের দাবি, তাদের ডেটা সেন্টার থেকে প্রতিবছর স্থানীয় অর্থনীতিতে ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। নির্মাণকাজ চলাকালে প্রায় ৪ হাজার ২০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ২০২৮ সালে কেন্দ্রটি চালু হলে কয়েকশ বিশেষায়িত পদেও লোক নিয়োগ দেওয়া হবে।
অন্ধ্র প্রদেশ সরকার জানিয়েছে, রাজ্যটিতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ লাখ ৮৮ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।
তবে রোহিতের মতে, বিশাল গুদামঘরের মতো দেখতে এসব স্থাপনা থেকে অর্জিত অর্থনৈতিক সুবিধা স্থানীয় জনগণের কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।তিনি বলেন, ‘আমাদের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান দরকার। দরকার শ্রমনির্ভর শিল্প, বিপুল পুঁজিনির্ভর শিল্প নয়।’
বিশাখাপত্তনমে শুধু গুগলই বিনিয়োগ করছে না। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, ব্রুকফিল্ড ও ডিজিটাল রিয়েলটির যৌথ উদ্যোগেও সেখানে আরও একটি এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে ১১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
ভারতের রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের সংগঠন কনফেডারেশন অব রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারস অ্যাসোসিয়েশনস অব ইন্ডিয়ার বিশাখাপত্তনম শাখার প্রধান ই. অশোক কুমার বলেন, শহরটির উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকে জমির দাম গড়ে ৪৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে ভারতের উদ্যোগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়তে থাকায় বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে কর ছাড়সহ বিভিন্ন প্রণোদনা দিচ্ছে।
দেশটিতে ইন্টারনেট ও অ্যাপের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ডিজিটাল তথ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ডেটা সেন্টার সক্ষমতার মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ ভারতের দখলে।
অন্ধ্র প্রদেশের প্রযুক্তিমন্ত্রী নারা লোকেশ গত ফেব্রুয়ারিতে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ৭৬০টি প্রকল্পে ১৭৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে নজিরবিহীন গতি আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন তিনি।
লোকেশ আরও জোর দিয়ে বলেছেন, ডেটা সেন্টারের চেয়ে আবাসিক এলাকার পানির চাহিদাকে সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমাদের মানুষের পানির চাহিদাই সব সময় প্রথমে বিবেচনা করা হবে।’
বিশাখাপত্তনমের পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ই.এ.এস. শর্মা পানির ব্যবহার নিয়ে একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে নিরীক্ষা চালানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বিদ্যুৎ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করা সাবেক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা।
পানির সংকটের কারণে বহু সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এএইচ
আরও পড়ুন










