বিমানবন্দরে পাঁচ বছরে ৪,৭০০ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ
প্রকাশিত : ১০:০৩, ৪ মে ২০২৬
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—দেশের প্রধান আকাশপথ ক্রমেই পরিণত হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের অন্যতম সক্রিয় করিডরে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ বলছে, অভিযানে ধরা পড়া স্বর্ণের পরিমাণ যেমন বিস্ময়কর, তেমনি উদ্বেগজনক হলো—এই জব্দকৃত স্বর্ণই হয়তো মোট চোরাচালানের সামান্য অংশ।
ঢাকা কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে মোট ১,৮৮০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে স্বর্ণবার ও অলংকার থেকে আদায় করা শুল্ক-কর দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা। যা ইঙ্গিত করে, বৈধ ও অবৈধ—দুই ধারাতেই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ প্রবাহিত হচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। পরের বছর ২০২২-২৩-এ উদ্ধার হয় ৫৫৪ কেজি। এরপর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৩ সালে ৪১৭ কেজি, ২০২৪ সালে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ধরা পড়ে ৪৩ কেজির কিছু বেশি।
এই কমার অর্থ চোরাচালান কমে যাওয়া নয়; বরং চক্রগুলো তাদের পদ্ধতি আরও সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিনির্ভর করে ফেলেছে।
সর্বশেষ গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে ১৮ কেজি ওজনের ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার—চক্রগুলোর সাহস ও কৌশলের একটি উদাহরণ। এই চালানের বাজারমূল্য প্রায় ৩৮ কোটি টাকা।
গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চোরাচালানকারীরা এখন বিমানযাত্রীর শরীরের ভেতর বা বিশেষ বেল্টে লুকিয়ে বহন, কার্গো, কেটারিং ট্রলি, এমনকি টয়লেটের ভেতর গোপন কুঠুরি ব্যবহার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং স্টাফ বা ভেতরের লোকজনকে ব্যবহার এবং “ক্যারিয়ার” হিসেবে স্বল্প আয়ের যাত্রীদের কাজে লাগাচ্ছে।
মামলা বাড়ছে, কিন্তু দমন কতটা কার্যকর?
ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানার তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের ৫৩৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে— ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি, ২০২৫-২৬ সালে ৮৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একাধিক সূত্র স্বীকার করেছে, গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশই “ক্যারিয়ার” বা নিম্নস্তরের বাহক। মূল হোতা বা আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সদস্যরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
প্রশ্ন উঠছে নজরদারি নিয়েই
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় পরিমাণ স্বর্ণ বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ বা প্রস্থান করতে পারা মানেই কোথাও না কোথাও নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে স্ক্যানিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, শিফটভিত্তিক দায়িত্বে দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও যোগসাজশ এবং গোয়েন্দা তথ্যের অভাব- এই চক্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
যা ধরা পড়ছে, তা আসল চিত্র নয়
গোপনসূত্র বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ধারণা হলো—চোরাচালানের মাত্র ১০-২০ শতাংশ ধরা পড়ে। সেই হিসেবে গত পাঁচ বছরে জব্দ হওয়া ১,৮৮০ কেজি স্বর্ণ প্রকৃত চোরাচালানের তুলনায় অনেক কম হতে পারে। এ অবস্থায় ১০০% ব্যাগেজ স্ক্যানিং নিশ্চিত করা, এআই-ভিত্তিক রিস্ক প্রোফাইলিং চালু করা,
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমনে জিরো টলারেন্স, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি করা গেলেই স্বর্ণ চলাচলন বন্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যরা।
সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো একটি সুসংগঠিত, বহুজাতিক চোরাচালান নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাঝে মাঝে বড় চালান ধরা পড়লেও, সামগ্রিকভাবে এই স্বর্ণপাচার রোধে এখনো বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে।
এএইচ
আরও পড়ুন










