সাবেক সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ-গুলশান আরা গ্রেপ্তারের নেপথ্যে কী
প্রকাশিত : ১০:৩৪, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৪৭, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
গ্রেপ্তার অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রসহ কয়েকটি অভিযোগ এনেছে পুলিশ। এর মধ্যে দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তহবিল সংগ্রহ ও উসকানিমূলক প্রচারের অভিযোগ। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও এসেছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
রোববার দিবাগত রাতে রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল (৪৭) ও লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে (৪৩) ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করে। পরে সোমবার তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। এ সময় প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
অভিযান–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং পুলিশের করা মামলার এজাহার ও আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদন পর্যালোচনা করে এ ঘটনার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি কারণ পাওয়া গেছে।
তাতে দেখা গেছে, সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মূলত সরকারবিরোধী প্রচার, অর্থায়ন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং সংগঠিত তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরেই গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরেই তাঁরা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের হয়ে তৎপরতা চালিয়ে আসছিলেন। এ ছাড়া দেশের ও বিদেশের ‘গুপ্তচরদের’ সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ রয়েছে বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন। এসব কারণেই তাঁদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্লবী থানায় করা মামলায় আরও ১০১ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
দুই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘিরে অভিযোগ
গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং তাঁদের সহযোগীরা ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাপোর্টার্স আলফা নম্বর # ১’ ও ‘বিবিএম ট্রান্সপারেন্সি’ নামের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশের অভিযোগ, এসব গ্রুপের মাধ্যমে দেবাশীষ ও গুলশান আরা সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য তহবিল সংগ্রহ করতেন। পাশাপাশি সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করতেন।
এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইউনিটি কেয়ার’ ও ‘পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের দুটি প্ল্যাটফর্মের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এসব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পলাতক শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী সংগঠিত তৎপরতা পরিচালনা করা।
ফেসবুক পেজ ও অনলাইন প্রচার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার দেবাশীষ ও গুলশান আরাকে গ্রেপ্তারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। পুলিশের রিমান্ড আবেদনেও বলা হয়েছে, ‘কালআজকাল.কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতায় উসকানি দেওয়ার মতো কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা হচ্ছিল।
এ ছাড়া কাজী গুলশান আরার নামে থাকা একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা উল্লেখ করে সেখান থেকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গ্রেপ্তার দুই অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা সরকার এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক ও কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।
২০১৮ সালের গণভবনের ঘটনা কেন সামনে
গ্রেপ্তার দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তার অতীত রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়ে রিমান্ড আবেদনে ২০১৮ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একাত্মতা ও আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন কাজী গুলশান আরা।
ওই দিন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের গণভবনে গিয়ে শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর ঘটনা সে সময় সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল। পুলিশের দাবি, পরবর্তী সময়ে ১০১ জন সহযোগীকে নিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ সংগঠনের কার্যক্রমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে সংগঠনটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন টক শোতে অংশ নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রকাশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পল্লবী থানায় করা মামলায় দেবাশীষ ও গুলশান আরা ছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ১০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি করেছেন ডিবির পল্লবী জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আলী আকবর। এতে দণ্ডবিধি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালতে দেওয়া রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচটি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো সহযোগী আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত, রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজে নিয়োজিত দেশি-বিদেশি ‘গুপ্তচরদের’ শনাক্ত, ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহৃত অন্য ওয়েবসাইট ও পেজ শনাক্ত এবং মামলার মূল ঘটনা উদ্ঘাটন।
এ ছাড়া অবৈধ অর্থায়নের উৎস অনুসন্ধানের কথাও বলা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আদালতে অভিযোগ অস্বীকার
আদালতে রিমান্ড শুনানির সময় পুলিশের অভিযোগের বিরোধিতা করেন অবসরপ্রাপ্ত দুই সেনা কর্মকর্তা দেবাশীষ ও গুলশান আরার আইনজীবীরা।
গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, একটি টক শোতে গিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু টক শোতে তিনি (গুলশান আরা) কী এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যাতে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে গেল, তা বলা হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কী পাওয়া গেছে, রিমান্ড আবেদনে সেটিও উল্লেখ নেই।
দেবাশীষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর বলেন, তাঁর (দেবাশীষ) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হলেও কী কারণে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁর অপরাধ কী—এসবের কোনো ব্যাখ্যা রিমান্ড আবেদনে নেই।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, আসামিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পতিত সরকারের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলেন। তাঁদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদেরও যোগাযোগ রয়েছে। রিমান্ডে নিলে তাঁদের সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য জানা যাবে।
সূত্র: প্রথম আলো
এএইচ
আরও পড়ুন










