সাভার এখন শান্ত, সাংবাদিকসহ আহত ৫০
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, ৪ নভেম্বর ২০২৬
দেশের পোশাক শিল্পঅঞ্চলে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও অন্যায়ভাবে ছাঁটাই বাতিলের দাবিতে উত্তাল সাভারের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই শান্ত।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাক শ্রমিকরা।
এসময় হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড়, হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড ও উলাইল এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং পাঁচ সাংবাদিকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
শ্রমিকদের অবরোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন হাজারো যাত্রী।
শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় হেমায়েতপুর, পদ্মার মোড় ও উলাইলসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলের প্রায় শতাধিক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্পাঞ্চলে বিজিবির তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
যদিও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের শক্ত অবস্থানের মুখে দুপুরের দিকে পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত হয়ে এসেছে। বিকেল ৩টার পর থেকে সাভার ও আশুলিয়ার কোথাও কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল নয়টার দিকে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের পদ্মার মোড় ও হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হতে শুরু করেন। পরে তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। সকাল ৯টা ৫ মিনিটের দিকে একদল শ্রমিক পদ্মার মোড় এলাকায় এবং আরেক দল হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান নেন। সকাল ৯টা ১০ মিনিটের দিকে তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন।
এর আগে সকাল সোয়া আটটার দিকে পদ্মার মোড় এলাকায় স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের সামনে শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
এসময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নেয়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, পদ্মার মোড় এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকালে বিক্ষোভে অংশ নেন। একেএইচ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা প্রথমে কাজে যোগ দিলেও কিছুক্ষণ পর কারখানা থেকে বেরিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের গাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। শ্রমিকরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষে সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলমসহ পুলিশ সদস্য, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারী মিলিয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, সকালে পদ্মার মোড় এলাকায় একসঙ্গে ৩০ থেকে ৪০ হাজার শ্রমিক দুই পাশ থেকে জড়ো হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলে পুলিশ প্রতিরোধ করে। এ সময় আন্দোলনকারীরা সাভার মডেল থানার ওসির গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেন। আন্দোলনকারীদের হামলায় ওসি গুরুতর আহত হন।
পদ্মার মোড়ের পাশাপাশি সকাল নয়টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকার আল-মুসলিম পোশাক কারখানার সামনেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। শ্রমিকরা দাবি আদায়ে সড়কে অবস্থান নিলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
পুলিশ আন্দোলনকারী শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে ওই এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের কারণে প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহের সময় হেমায়েতপুরে পাঁচ সাংবাদিক হামলা ও মারধরের শিকার হয়েছেন। বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে পদ্মার মোড় এলাকায় স্টার নিউজের ঢাকা জেলা প্রতিনিধি আহমাদ সোহান সিরাজী, একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিনিধি রাইয়ান বিন আমিন এবং একই টেলিভিশনের ক্যামেরাপারসন উজ্জ্বল হোসেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
একই দিন দুপুর ১২টার দিকে হেমায়েতপুরে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ে সরাসরি সম্প্রচার চলাকালে নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদক নাজমুল হুদা ও ক্যামেরাপারসন ইমদাদুল হকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় পদ্মার মোড় বাসস্ট্যান্ড, হেমায়েতপুর, উলাইলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্পাঞ্চলের প্রায় শতাধিক কারখানা বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
বুধবার দুপুরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, সকালে সব গার্মেন্টস কারখানায় কাজ শুরু হয়েছিল। শ্রমিকরাও কাজে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্য এলাকা থেকে আসা কিছু বহিরাগত লোকজনের ইন্ধনে শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে কারখানার ভেতরে অবস্থান নেন। পরে দীর্ঘ সময় কাজ না হওয়ায় কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ছুটি দিয়ে দেয়। এরপর শ্রমিকরা ধীরে ধীরে কারখানা থেকে বের হয়ে চলে যান।
মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘এই মুহূর্তে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-১ ঢাকার আওতাধীন সব এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। কোথাও যান চলাচলে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। গার্মেন্টস এলাকাগুলোর পরিবেশও শান্ত রয়েছে।’
সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির বিষয়ে তিনি বলেন, সাভার এলাকায় আল মুসলিম কারখানা থেকে পদ্মার মোড় পর্যন্ত শ্রমিকরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। তবে দ্রুততম সময়ে সড়কের প্রতিবন্ধকতা দূর করা হয়েছে। এই মুহূর্তে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-১ ঢাকার আওতাধীন এলাকাগুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা জেলা পুলিশ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ একযোগে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আজকের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবিও মোতায়েন করা হয়েছে।
অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
সাভারে দায়িত্ব পালনরত বিজিবি ঢাকা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাইমুন বলেন, এখানে আমাদের তিন প্লাটুনের মতো সদস্য মোতায়েন হয়েছে। আশুলিয়াতেও আছে, সাভারেও আছে। যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে, তাদের আসলে কোনো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নেই, তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে।
আমার কাছে মনে হচ্ছে, এখানে খুব বেশি শ্রমিক নেই। অধিকাংশই মিসক্রিয়েটর, যারা সমস্যা সৃষ্টি করছে। যারা সমস্যা করছে, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বুধবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে জানান, শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান নূর বলেন, শ্রমিকরা তিন দফা দাবি নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এমএইচ
আরও পড়ুন










