ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২৬

সড়কে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, প্রতিকার কোথায়?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:০৭, ২২ অক্টোবর ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রতিদিনের যাতায়াত যেন অনেক মানুষের জন্য হয়ে উঠছে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতার মধ্যে বাড়ছে প্রাণহানি। শিশু থেকে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ কেউই যেন সড়কে পুরোপুরি নিরাপদ নয়। দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির এই চিত্র সামনে এলেও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন। 

সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ১২ বছরের এই সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। 

আজ ২২ অক্টোবর জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে এই পরিসংখ্যান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিশ্রুতি আর দিবস পালনের বাইরে সড়ক নিরাপদ করার বাস্তব পরিকল্পনা কতটা এগিয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে পরিবহন খাতের নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা, অনিয়ম-দুর্নীতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক এবং বেপরোয়া গতির মতো বিষয়গুলোকে দায়ী করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এ ছাড়া মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ এবং সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনার অভাবও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। রেল ও নৌপথের তুলনায় সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিবহনব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে বলেও তাদের বক্তব্য।

 শিশুদের মৃত্যুর পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক

সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের প্রাণহানির চিত্র পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৫১৩ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া বা সেখান থেকে ফেরার পথে প্রাণ হারিয়েছে। নিহত শিশুদের মধ্যে ২ হাজার ৯৫৮ জন মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী ছিল, আর ২ হাজার ৮১২ শিশু পথচারী হিসেবে যানবাহনের ধাক্কায় মারা গেছে। বয়সভিত্তিক হিসাবে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ৫৪৭ জন। এ ছাড়া বাড়ির আশপাশের সড়কে খেলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এই পরিসংখ্যান বলছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত থেকে শুরু করে বাড়ির আশপাশে চলাফেরার সময়ও শিশুদের সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে।

 সড়ক যেন প্রতিদিনের আতঙ্ক

সড়ক দুর্ঘটনায় একজন মানুষের মৃত্যুতে থেমে যায় একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন। কোনো পরিবার হারায় উপার্জনক্ষম সদস্য, কোনো শিশু হারায় তার অভিভাবক, আবার কোনো পরিবারকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয় প্রিয়জন হারানোর ক্ষত। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক জটিলতা ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েন। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সমাজ ও অর্থনীতিতে।

দুর্ঘটনার পর হতাহত ব্যক্তিদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তদন্ত ও দায়দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, সড়কে প্রাণহানি এখনো একটি বড় জাতীয় উদ্বেগ। বিপুলসংখ্যক দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত মানুষের হিসাবের পাশাপাশি শিশুদের প্রাণহানির ঘটনাও সড়ক নিরাপত্তার দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা জনমনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের জবাবদিহি কোথায়? বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও কেন সাধারণ মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়ে উঠছে না? সড়কে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, কিন্তু সেই মিছিল থামাতে কার্যকর পরিবর্তন কতটা দৃশ্যমান প্রশ্নটি এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসছে।

ঐ.মিষ্টি//


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি