ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২৪ অক্টোবর ২০১৯, || কার্তিক ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

আমাজনে আগুন: কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পৃথিবী?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৩:০৯ ২৪ আগস্ট ২০১৯ | আপডেট: ১৩:১১ ২৪ আগস্ট ২০১৯

দিন দিন পুড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর ফুসফুস। গত আট মাসে ৭৫ হাজার বারেরও বেশি এ আমাজনে আগুন লাগে। তবে গেল সপ্তাহে লাগা আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে না আসায় বিষয়টি নিয়ে পুরো বিশ্বই এখন সরব হয়েছে। বলছে নানান কথা, জড়িয়ে পড়ছে সমালোচনা ও তর্কে। এক দিকে পুড়ছে আমাজন আর অন্য দিকে বিশ্ব নেতাদের তর্ক যেন থামছেই না। এর মধ্যে পরিবেশবিদ ও গবেষকরা গবেষণা করছে এ আগুনের ফলে পৃথিবীর ক্ষতির পরিমানটা কতটুকু। 

দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন নদের পাশে প্রায় ৫৫ লাখ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে উঠেছে সুবিশাল রেইন ফরেস্ট আমাজন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা অক্সিজেনের ২০ শতাংশেরই উৎপত্তি আমাজনে। গবেষকদের মতে এই বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। সে কারণে একে ডাকা হয়ে থাকে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ নামে। কিন্তু ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত এ আমাজন আজ বিপন্ন প্রায়। আগুনের লেলিহান শিখা ক্রমশ গ্রাস করছে ওই চিরহরিৎ বনভূমিকে। গত তিন সপ্তাহ ধরে জঙ্গলটিতে জ্বলতে থাকা আগুনে এরই মধ্যেই পুড়ে গেছে ৭ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা।

পৃথিবীর সবচেয়ে জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর এই অরণ্যে ২৫ লাখের বেশি পতঙ্গের প্রজাতি, ৪০ হাজারের বেশি গাছের প্রজাতি, দু’হাজার পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রজাতি এবং ২ হাজার ২০০ প্রজাতির মাছের বাস। বিভিন্ন নাম না জানা মানব গোষ্ঠীর বাসস্থান। আগুনে পুড়ে যাচ্ছে তারাও।

এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আগুনে পুড়ছে আমাজন। ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্স (ইনপে) ২০১৩ সাল থেকে আমাজন জঙ্গলে আগুন লাগা নিয়ে গবেষণা করছে। চলতি বছর আমাজন রেইন ফরেস্টে ৭২ হাজার ৮৪৩টি দাবানলের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

গত বছরের এই সময়ের তুলনায় যা ৮৩ শতাংশ বেশি এবং ২০১৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। এই প্রকোপ আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে বলে দাবি ইনপে-র। মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে তারা জানিয়েছে রেকর্ড হারে পুড়ছে আমাজন জঙ্গল। ইতোমধ্যে ব্রাজিলের রোন্ডানিয়া, অ্যামাজোনাস, পারা, মাতো গ্রোসো অঞ্চলের কিছু অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে।

আগুনের কারণে কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছে সূর্যের মুখ। এমনকি দুই হাজার ৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ব্রাজিলের সাও পাওলোর দুপুরের আকাশ যেন ‘রাতের চেয়েও অন্ধকার’ হয়ে উঠেছে আগুনের ধোঁয়ায়। ব্রাজিলের রোরাইমা প্রদেশ থেকে পেরুর আকাশেও হানা দিয়েছে ধোঁয়া।

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার উপগ্রহ চিত্রেও ধরা পড়েছে আমাজনে ঘটতে থাকা ৯ হাজার ৫০৭টি নতুন দাবানলের চিত্র। আমাজনের আগুনের ওপর নজর রাখছে নাসা। আগুনের তীব্রতার ছবিও পাঠাচ্ছে নাসার একাধিক স্যাটেলাইট। তবে আগুনের থেকেও বিজ্ঞানীদের বেশি ভাবাচ্ছে আগুন থেকে সৃষ্টি হওয়া ধোঁয়া।

আমাজনের প্রায় ৬০ শতাংশ অবস্থিত ব্রাজিলে। বারবার এমন অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তও হচ্ছে ব্রাজিলের উত্তরাংশের রাজ্যগুলো। বিশেষ করে উত্তরাংশের চারটি রাজ্যে গত চার বছরে আগুন লাগার হার বেড়েছে ব্যাপকভাবে। পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, আমাজনে লাগা আগুনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোরাইমা, একর, রন্ডোনিয়া ও আমাজোনাস চারটি প্রদেশ।

গত চার বছরে রোরাইমাতে ১৪১, একরে ১৩৮, রন্ডোনিয়ায় ১১৫ ও আমাজোনাসে ৮১ শতাংশ আগুন লাগার হার বেড়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণের প্রদেশ মাতো গ্রোসো দো সালে আগুন লাগার হার বেড়েছে প্রায় ১১৪ শতাংশ। অগ্নিকাণ্ডের কারণে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় প্রদেশ আমাজোনাসে এরই মধ্যে জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছে।

বারবার এমন অগ্নিকাণ্ডের কারণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপরও। আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বনাঞ্চলে। শুধু আমাজনেই নয়, বনাঞ্চল ছাড়িয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছড়িয়ে পড়েছে অন্য প্রদেশগুলোতেও। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস অ্যাটমোসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (কামস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমাজনের আগুনের এ ধোঁয়া সুদূর আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্তও বিস্তৃত পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজন মহাবনে সম্প্রতি যে আগুন লেগেছে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামাচ্ছে ব্রাজিল। দেশটির রাষ্ট্রপতি সম্প্রতি এমন একটি আদেশ জারি করেছেন। আমাজনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রাজিল কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না বিশ্বব্যাপি এমন অভিযোগ ওঠে। এরপরই সেনাবাহিনী নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় ব্রাজিল।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে আগুন নিয়ে আলোচনা হলেও তা নেভানের জন্য কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি। তবে এ কাজে প্রথম এগিয়ে আসে বলিভিয়া। খবর বিবিসি’র।

বলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ইভো মোরালেস আগেই সাহায্যের কথা বলেছিলেন ব্রাজিলকে। কিন্তু তখনও সেভাবে টনক নড়েনি ব্রাজিল সরকারের। দাবানলের ছড়িয়ে পড়া রুখতে সুপার ট্যাঙ্কার বোয়িং বিমান ৭৪৭-৪০০ ভাড়া করার কথা ঘোষণা দিয়েছেন ইভো। গতকাল শুক্রবার থেকে আগুন আয়ত্বে আনতে আকাশ পথে ঐ ট্যাঙ্কার নিয়ে অভিযানও শুরু হয়েছে।

বলিভিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট আলভারো গার্সিয়া জানিয়েছেন, দেড় লাখ লিটার পানি বা অগ্নি নির্বাপক নিয়ে উড্ডয়নে সক্ষম এই সুপারট্যাংকার বোয়িং বিমান। এই বিমান থেকে পুড়তে থাকা আমাজনে পানি ঢালা হবে। তার আগে বিমানবাহিনীর বিমান গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আসবে। এরপরই পানি নিয়ে উড়াল দেবে সুপার ট্যাংকার বোয়িং বিমান।

এমএস/
 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি