ঢাকা, মঙ্গলবার   ১২ নভেম্বর ২০১৯, || কার্তিক ২৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ইন্টারনেট থেকে কি সব তথ্য মুছে ফেলা সম্ভব?

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২২:৫০ ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

'ভবিষ্যতে ইন্টারনেটে সবাই অন্তত ১৫ মিনিটের জন্য হলেও বেনামী হবে।' সম্প্রতি এমনই এক মন্তব্য করেন বিখ্যাত চিত্র শিল্পী ব্যাঙ্কসি। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে, ইন্টারনেটের এই যুগে আজকাল মানুষ যেভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে কোথায় ছুটি কাটাতে যাবে সে সম্পর্কেও অনলাইনে পোস্ট করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে, তখন কি আসলে এভাবে ক্ষণিক সময়ের জন্য হলেও সবার পক্ষে বেনামী হওয়া সম্ভব?

এই মন্তব্যটিও অ্যান্ডি ওয়ারহলের 'ফিফটিন মিনিটস অব ফেম' লাইনটির মতো অনেক ধরণের অর্থবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন আলোচক এবং সমালোচকরা।

তবে ২১ শতকে কোন কিছু গোপন রাখা যে রীতিমতো কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে -এ বিষয়টি সেই বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।

এ বিষয়ে অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ভিক্টর মায়ের-শোয়েনবের্গের বলেন, "বর্তমানে আমাদের কাছে অনেক ধরণের ডিজিটাল ডিভাইস রয়েছে যাতে অনেক ধরণের সেন্সর বসানো থাকে। এই সেন্সরগুলো আমাদের সম্পর্কে অনেক বেশি তথ্য ধারণ করতে পারে।"

আর এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ক্যারিয়ারবিল্ডার নামে একটি নিয়োগ সংস্থার জরিপ মতে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৭০ ভাগ কোম্পানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশ্লেষণ করে চাকরি প্রার্থীদের বাছাই করে। আর ৪৮% কোম্পানি তাদের বর্তমান কর্মকর্তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কর্মকাণ্ডে নজর রাখে।

এছাড়া, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলে খোঁজ-খবর করতে পারে।

এরই মধ্যে বিভিন্ন ধরণের কোম্পানি, ক্রেতাদের ক্রয় অভ্যাস, রাজনৈতিক মতাদর্শের মডেল তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে। অনেক সময় এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তারও সহায়তা নেয়া হয়।

এ থেকে বাঁচার একটি উপায় হচ্ছে- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রোফাইল ডিলিট বা মুছে ফেলা। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির পর অনেকেই এ কাজটি করেছিলেন। ওই ঘটনায় ৮ কোটি ৭০ লাখের মতো মানুষের ফেসবুকের তথ্য রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের সুবিধার জন্য গোপনে ব্যবহার করা হয়েছিলো।

ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার অন্যতম একটি উপায় যদিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ডিলিট করা। কিন্তু এর ফলে অন্যান্য কোম্পানির হাতে থাকা তথ্য মুছে ফেলার ক্ষেত্রে এটি তেমন কোন কাজে আসবে না। তবে সৌভাগ্যবশত, বিশ্বের অনেক দেশে এ বিষয়ে সহায়তার জন্য আইন রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ তথ্য সুরক্ষা নীতি বা (GDPR) অনুযায়ী, "রাইট টু বি ফরগটেন বা বিস্মৃত হওয়ার অধিকার" রয়েছে- অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি চাইলে তার নিজের ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলতে পারেন।

যুক্তরাজ্যে এ বিষয়টি দেখে থাকে তথ্য কমিশনারের কার্যালয়। বিবিসি-কে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছর নিজের সব তথ্য সার্চ ইঞ্জিন থেকে মুছে ফেলার ৫৪১টি আবেদন জমা পড়েছে। যে সংখ্যা এর আগের বছর ছিলো ৪২৫টি এবং ২০১৬-১৭ সালে ছিলো ৩০৩টি।

তবে ব্রিটিশ তথ্য কমিশনারের কার্যালয় (আইসিও) দাবি করে, এই প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও বেশি। কারণ, ওই সব আবেদনের বিষয়েই তালিকায় উল্লেখ করা হয়, যেগুলোর তথ্য মুছে ফেলতে অসম্মতি জানানোর পর এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়।

আইসিও'র কর্মকর্তা সুজান গর্ডন বলেন, এটা আসলে পরিষ্কারভাবে বলা যায় না। "কেউ যদি মনে করে যে কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকা তার সম্পর্কিত কোন তথ্য আর কাজে লাগবে না, তখন সে তার ওই তথ্য মুছে ফেলার অধিকারকে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে জিডিপিআর।"

"যাই হোক এই অধিকার আসলে শর্তহীন নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে এটি অন্য কোন বা কারো অধিকার ও স্বার্থ বিরোধী কিনা সেটারও ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা।"

"বিস্মৃত হওয়ার অধিকার" ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে শুরু করে ২০১৪ সালে এবং এর ফলে ব্যাপক হারে তথ্য মুছে ফেলার আবেদন আসতে শুরু করে। সর্ব প্রথম এ ধরণের আবেদন করেন সাবেক এক রাজনীতিবিদ যিনি পুনঃনির্বাচন করতে চেয়েছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ছিলো। কিন্তু এধরণের সব আবেদন অনুমোদিত হয়নি।

এক্ষেত্রে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলো যাদের টাকা রয়েছে তারা নিজেদের সহায়তায় বিশেষজ্ঞ ভাড়া করে।

এই সুনাম প্রতিরক্ষা বা 'রেপুটেশন ডিফেন্স' নিয়ে পুরো একটি শিল্পখাত তৈরি হয়েছে। অনেক ফার্ম রয়েছে যারা টাকার বিনিময়ে তথ্য মুছে ফেলার জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রযুক্তি প্রস্তুত রয়েছে। আর উদাহরণস্বরূপ, এরা সার্চ ইঞ্জিন থেকে খারাপ সংবাদ মুছে ফেলার কাজও করে।

এ ধরণের একটি প্রতিষ্ঠান, ডিফেন্স ডিফেন্ডার ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায় যে, তাদের কাছে অন্তত ১০ লাখ গ্রাহক রয়েছে যাদের মধ্যে রয়েছেন ধনী ব্যক্তি, পেশাজীবী এবং প্রধান নির্বাহীরা। প্রতিষ্ঠানটির একেকটি প্যাকেজ সেবার জন্য ৫ হাজার পাউন্ড বা সাড়ে ৫ হাজার ডলার নিয়ে থাকে।

এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের গ্রাহকদের তথ্য খোঁজার ফল গুগল সার্চে পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য নিজস্ব সফটওয়্যার ব্যবহার করে। আর এর ফলে গুগলে অনুসন্ধান করলে ওই গ্রাহকদের সম্পর্কিত নেতিবাচক তথ্য কম আর ইতিবাচক তথ্য বেশি থাকে।

"এই প্রযুক্তি, অনুসন্ধান করার ফলাফলে ওয়েবসাইটগুলোকে ক্রমানুসারে সাজাতে, গুগল কি ধরণের তথ্যের উপর গুরুত্ব দেয় তার উপর ফোকাস করে," বলেন মহাব্যবস্থাপক টনি ম্যাকক্রিস্টাল।

"সাধারণত দুটি বিষয়কে গুগল গুরুত্ব দিয়ে থাকে, একটি ওয়েব অ্যাসেটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও কর্তৃত্ব এবং অপরটি হচ্ছে, তথ্য অনুসন্ধানের ফলের সাথে ব্যবহারকারীরা কিভাবে সংশ্লিষ্ট হয় তা গুগল যেভাবে লক্ষ্য করে সেটি।"

"আমরা গুগলকে দেখাতে চাই যে, আমরা যে সাইটগুলোর উন্নতি করতে চাই সেগুলো নিয়ে মানুষের অনেক বেশি আগ্রহ রয়েছে এবং এগুলো বেশ সচলও বটে। তা সে আমাদের তৈরি করা নতুন কোন ওয়েবসাইটই হোক কিংবা এরইমধ্যে গুগলের সার্চে ইঞ্জিনে থাকা যেকোন ওয়েবসাইটই হোক না কেন। আর যে সাইটগুলো বাতিল করতে চাই সেগুলো সম্পর্কে আসলেই মানুষের তেমন কোন আগ্রহ থাকে না।"

নিজেদের তৈরি করা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১২ মাসের সময় সীমা নির্ধারণ করেছে এই ফার্ম বা প্রতিষ্ঠানগুলো।

"এটা উল্লেখযোগ্য ভাবে কার্যকর," তিনি বলেন। "৯২% মানুষই গুগলের প্রথম পাতাটি কখনো না দেখে চলে যায় না। আর ৯৯% এরও বেশি মানুষ কখনো গুগলের দ্বিতীয় পাতার পরে আর দেখে না।"

অধ্যাপক মায়ের শোয়েনবের্গের বলেন, এ ধরণের সুনাম রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান গুলো যদি আসলেই কার্যকর হয় তাহলে "এটা বোঝা কঠিন যে এর থেকে কেন শুধু বিত্তবানরাই লাভবান হবে, সাধারণ মানুষ কেন কোন সুবিধা পাবে না।"

তাহলে আমরা কি আসলেই কখনও অনলাইনের উপাত্ত থেকে বের হয়ে আসতে পারবো না?

"সাধারণভাবে বলতে গেলে, না," বলেন ডিলিট-মি প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী রব শ্যাভেল। এই প্রতিষ্ঠানটি অনলাইন সবার জন্য উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার, তথ্য কেনা-বেচাকারী এবং সার্চ ওয়েবসাইট থেকে মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলতে কাজ করে।

"ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারকারী সকল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের পরিচালনা পদ্ধতি পরিবর্তন করতে বাধ্য না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি কারও সব ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলা সম্ভব নয়।"

"ভোক্তার ব্যক্তিগত তথ্য কিভাবে সংগ্রহ, বিনিময় এবং বিক্রি হবে সে সম্পর্কে বলার মতো অধিকার প্রতিষ্ঠায় শক্ত কোন আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমানে বিদ্যমান গোপনীয়তার ভারসাম্যের অভাবকে কখনোই সামনে আনা যাবে না।" সূত্র- বিবিসি।

এনএস/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি