Ekushey Television Ltd.

ইরান-মার্কিন বাকযুদ্ধ ও তার পরিণতি

প্রকাশিত : ১২:১৭ ১৫ মে ২০১৯

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব.)

তেলে জলে কখনো মিশে না। বাংলায় প্রচলিত এই কথাটি ইরান-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনিবার্য হয়ে ওঠেছে। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু হওয়া সাপে নেউলে সম্পর্কের একটা জোড়াতালি দিতে পেরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের অব্যবহিত পূর্বের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ বছর আমেরিকার সব প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন ইরানের খোমেনীপন্থি সরকারকে উৎখাত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেটি যতদিন না হচ্ছে ততদিন নিদেনপক্ষে ঠেকিয়ে রাখতে চাইছে যাতে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে।

রিজিম পরিবর্তনের সব পুরানো ফন্দি-ফিকির চালিয়ে যখন ইরানের বেলায় সেটা অসম্ভব মনে হয়েছে তখন সমসাময়িক কালের শান্তিপ্রিয় প্রেসিডেন্ট বলে পরিচিত বারাক ওবামাও ২০১২ সালে হুমকি দিয়েছিলেন প্রয়োজনে সামরিক অভিযান চালানো হবে, যেমনটি এখন দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে।

তখন খবর বেরিয়েছিল ইরান অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে যাচ্ছে। সুতরাং আমেরিকা এবারের মতো তখনও যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে বাহরাইনে অবস্থিত পঞ্চম নৌবহরের অতিরিক্ত আরেকটি বিমানবাহী যুদ্ধ জাহাজ হরমুজ প্রণালীর দিকে পাঠায়।

তবে বারাক ওবামা অনেক সতর্ক ছিল, যাতে ইরাক আক্রমণের মতো মিথ্যা অজুহাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে যেন দ্বিতীয়বার নাস্তানাবুদ না হতে হয়। মার্কিন সমর নায়কদের লক্ষ্য ছিল যেকোনো উস্কানিমূলক পন্থায় ইরানকে একবার আগ্রাসী ভূমিকায় নিতে পারলেই আমেরিকা তার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে।

কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়াসহ অনেক পাল্টা হুমকি দিলেও আগ বাড়িয়ে কোনো আগ্রাসী ভূমিকায় যায়নি। তাই সে সময়ে বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসন হয়তো বুঝেছেন ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে যত সহজে উৎখাত করা সম্ভব হয়েছে সে রকম কিছু ইরানের বেলায় সম্ভব হবে না।

ইরাক আর ইরান এক কথা নয়, আকাশ জমিন ফারাক। ইরাক থেকে প্রায় চারগুণ লোকসংখ্যা ইরানে। জাতীয়ভাবে ইরাকের জনগণ ছিল শিয়া, সুন্নি, কুর্দি এই তিন ভাগে বিভক্ত। ইরানের বেলায় ঠিক এর বিপরীত, জাতীয় বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। তারপর ২০০৩ সালে অন্যায়ভাবে ও মিথ্যা অজুহাতে মার্কিন সেনারা ইরাকে সামরিক অভিযান চালালে ইরাকের পক্ষে কেউ এগিয়ে আসেনি।

কিন্তু ইরানের বেলায় সে রকম হবে না। প্রথমত ইরান নিজেই প্রত্যাখাত করার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। আক্রান্ত হলে ইরান থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে দূরপাল্লার মিসাইলের আঘাতে ইসরাইল একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। একইসঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং গাজার হামাস সমানতালে ইসরাইলের ওপর রকেট মারতে থাকবে।

তারপর চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের বহুমাত্রিক সম্পর্কের কারণে সামরিক অভিযান পরিচালনায় জাতিসংঘের ম্যান্ডেট নেওয়া আমেরিকার পক্ষে কখনো সম্ভব হবে না। ইরাকের বেলায় সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে এনেমি উইদিন (Enemy within) ছিল শক্তিশালী, সে রকম ফোর্স ইরানের অভ্যন্তরে আমেরিকা তৈরি করতে পারেনি।

বহুবছর ধরে অনেক চেষ্টা করেও ইরানের ভেতর থেকে ভেনিজুয়েলার মতো একজন জুয়ান গোয়াইডো আমেরিকা খুঁজে পায়নি। সুতরাং সব ভেবে-চিন্তে বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১২ সালের পর থেকে প্রায় দুই-তিন বছর ব্যাপক ভিত্তিক আলাপ-আলোচনা এবং মাল্টিট্র্যাক কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানিকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকা ইরানের সঙ্গে এই মর্মে সমঝোতায় পৌঁছায় যে, আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নিবে এবং তার বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিদর্শনের জন্য সব সময় খুলে দেওয়া হবে।

একইসঙ্গে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যক্রম একটা পর্যায়ের পরে আর চালাবে না। তাতে সব পক্ষ মোটামুটি নিশ্চিত হয় এই চুক্তি মেনে চললে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। ২০১৫ সালে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য প্লাস জার্মানি ইরানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেটি এখন জয়েন্ট কম্প্রেহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCOPA) নামে পরিচিত।

আমেরিকাসহ অন্যান্য স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো চুক্তিতে অঙ্গীকার করে ইরান শর্ত মেনে চললে তারাও সকলে ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে সরে আসবে। চুক্তিতে উল্লেখ আছে এর দ্বারা ইরানের কনভেনশনাল অস্ত্রের উন্নতি ও আধুনিকায়নে কোনো বিধি-নিষেধ থাকবে না।

এটা নিয়েই গোল বাধায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং আমেরিকা ডিপ স্টেট খ্যাত শক্তিশালী ইহুদি লবিস্ট গোষ্ঠী। আমেরিকার ডেমোক্র্যাটদের চাইতে রিপাবলিকানদের ওপর কট্টর ইহুদিবাদীদের প্রভাব অনেক বেশি। বারাক ওবামা কর্তৃক চুক্তি স্বাক্ষরের সময়ই রিপাবলিকান দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় ২০১৬ সালের নির্বাচনে তাদের দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে চুক্তি বাতিল করা হবে। যে কথা সেই কাজ।

রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় চুক্তি থেকে আমেরিকা নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের ঘোষণা দেয়। যদিও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে, ইরান ২০১৫ সালের চুক্তি সম্পূর্ণভাবেই মেনে চলছে, কোনো ব্যত্যয় নেই এবং শর্ত ভঙ্গও করেনি।

রাশিয়া, চীন তো আছেই, তার সঙ্গে ইউরোপের তিন রাষ্ট্র যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি সকলেই আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেয় এবং ঘোষণা দেয় তারা চুক্তিতে বহাল থাকবে এবং প্রত্যাশা করে ইরান চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখবে। জার্মানি, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীনের পক্ষ থেকে পারমাণবিক চুক্তি বহাল রাখার কথা এখনো বলা হলেও ওইসব দেশের কোম্পানিগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারছে না।

চীন, ভারত ও ইউরোপের অনেক দেশই ইরান থেকে তেল রপ্তানি কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে ইরান ঘোষণা দিয়েছে চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো যদি তেল রপ্তানিসহ পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য বহাল না রাখে তাহলে ইরানও আংশিকভাবে পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাবে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ নতুন করে শুরু করবে।

এটাকে কেন্দ্র করেই আবার চরম বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড বাহিনীকে আমেরিকা সন্ত্রাসী বাহিনী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ায় বেজায় খেপেছে ইরানের কট্টরপন্থী অংশ। ইরান পাল্টা হুমকি দিয়েছে তাদের তেল রপ্তানি যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিবে।

এর বিপরীতে আমেরিকার যুদ্ধংদেহী নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বিশাল রণতরী আব্রাহাম লিংকনকে হরমুজ প্রণালীর দিকে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। তাছাড়া এলিট ফোর্স মেরিন কোরের জন্য উভচর যানসহ বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়ে আরেকটি আধুনিক যুদ্ধ জাহাজ আর্লিংটন যোগ দিবে আব্রাহাম লিংকনের সঙ্গে।

পেন্টাগন সূত্রে খবর বেরিয়েছে, তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে ইরান কোনো না কোনোভাবে একটা তড়িত সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক বোমারু বিমান বি-৫২ সহ সকল শক্তি নিয়ে প্রস্তুত। উভয়পক্ষে টান টান উত্তেজনা। তাই ভেনিজুয়েলা, উত্তর কোরিয়া, ইয়েমেন, লিবিয়া ছেড়ে বিশ্বের দৃষ্টি এখন হরমুজ প্রণালীর দিকে।

যুদ্ধ নিশ্চিত একথা কেউ এখনো বলছে না। আবার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না। যুদ্ধ হবে কি হবে না তার বিশ্লেষণে বহুমাত্রিক ফ্যাক্টর আছে। ইরান আগ বাড়িয়ে আগ্রাসী ভূমিকায় যাবে বলে মনে হয় না। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ শুরু করবে পুরোদমে। তাতে আমেরিকার ইহুদী লবি কি করবে সেটাই দেখার বিষয়।

বেশির ভাগ বিশ্লেষকের ধারণা, ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে যদি মনে হয় জনসমর্থন কমে যাওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হতে পারবে না, তাহলে যুদ্ধের আশঙ্কা বহুলাংশে বেড়ে যাবে। ২০০৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে ২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাত করার কৃতিত্বের কারণে মার্কিনবাসী জর্জ ডাব্লিউ বুশকে বিপুল ভোটে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছিল, যেখানে ২০০০ সালে প্রথম বুশ জয়ী হয়েছিলেন কোনোভাবে টেনে-টুনে।

তবে হরমুজ প্রণালী যুদ্ধক্ষেত্র হলে সারাবিশ্বে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। হরমুজ প্রণালী পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মোহনা বা সংযোগস্থল, যার পূর্ব পাড়ে ইরানের বন্দর আব্বাস, আর পশ্চিম পাড়ে ওমানের ডোবো বন্দর। মোহনা পয়েন্টে প্রণালী ১২ মাইল চওড়া, যার মধ্যে শিপিং করিডোর মাত্র ৬ মাইল এবং যার বেশির ভাগই আবার ইরানের পাড় ঘেঁষে প্রবাহিত।

হরমুজ প্রণালীর মোহনা পেরিয়ে পারস্য উপসাগর পড়েছে আরব সাগরে। হরমুজ প্রণালীর উত্তরে প্রায় ৬০০ মাইল দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে বিস্ত‍ৃত পারস্য উপসাগর ইরানকে আরব বিশ্ব থেকে আলাদা করেছে। পারস্য উপসাগরের পূর্ব পাড়ে ইরান, আর পশ্চিম পাড় ঘেঁষে আছে ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, সৌদি আরব এবং সর্ব উত্তরে ইরাক।

বিশ্বের প্রায় ২০ ভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মোট প্রয়োজনের ১৭ ভাগ জ্বালানি তেলের সরবরাহ এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। দৈনিক প্রায় ১৭ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়।

তাই বিশ্বের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বাধাহীন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। বিশ্ব রিজার্ভের ৫৭ ভাগ অপরিশোধিত তেল এবং ৪৫ ভাগ গ্যাস রয়েছে এই পারস্য উপসাগরীয় দেশসমূহের কাছে।

শুধুমাত্র ইরানেই বিশ্ব রিজার্ভের ১১.১ ভাগ তেল ও ১৫.৩ ভাগ গ্যাস মজুদ আছে। তাই স্বল্প সময়ের জন্যেও যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকে তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে নেমে আসবে এক মহাবিপর্যয়।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

Sikder52@gmail.com

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি