ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২০:১৫:১৬

Ekushey Television Ltd.

একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর সন্দ্বীপ শত্রুমুক্ত হয় 

কাজী ইফতেখারুল আলম তারেক

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ০৭:২১ পিএম, ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৩:৩০ পিএম, ৬ ডিসেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে মুক্তিকামী বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে শুরু করে। ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্থানি সামরিক বাহিনী ঘুমন্ত বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা ঘটে।         

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাঙালির আবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্থানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম। এর আগে ২৫ মার্চের কালো রাতে পাকিস্থানী সামরিক বাহিনী ঢাকায় অজস্র সাধারণ মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, পুলিশ ও ই.পি.আরকে হত্যা করে। সেই রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়।

চট্টগ্ৰামেৱ কালুৱঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পর সারাদেশে শুরু হয়ে যায় পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালির সশস্ত্র সংগ্রাম। আন্দোলন সংগ্রামের ঢেউ ছড়িয়ে পরে চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে। সেদিন শত শত মুক্তিকামী উৎসুক জনতা অংশ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পরে মুক্তিযুদ্ধে।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও তার ১৩ দিন পূর্বে সন্দ্বীপ থানা দখলের মধ্য দিয়ে ৩ ডিসেম্বর সন্দ্বীপকে শত্রুমুক্ত হয়। থানায় উড়ানো হয় বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা।  

                                        মুক্তিযোদ্ধা হেদায়তুল ইসলাম মিন্টু

’৭১ এর রণাঙ্গনের বীরযোদ্ধা সন্দ্বীপ থানা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা হেদায়তুল ইসলাম মিন্টু জানিয়েছেন শত্রু মুক্ত হওয়ার স্মৃতিকথা ।

হেদায়তুল ইসলাম মিন্টু জানান, ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চের সন্দ্বীপ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আমরা সর্বপ্রথম সন্দ্বীপ টাউনের কোর্ট প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। এই সময় কমান্ডার রফিকুল ইসলাম, মো. মশিউর রহমান জগলু, আলী হায়দার চৌধুরী, মাহবুবুল আলম সহ অনেকে সেদিন উপস্থিত ছিল।

পতাকা উত্তোলনের পর আমরা আওয়ামী মুসলিম লীগ ও প্রশাসনের রোষানলে পরি। এই অবস্থা থেকে রেহাই পেতে আমরা কয়েকদিন গা-ডাকা দিয়ে থাকি। 

তিনি বলেন, ‘৭১ এর ১০ মে সন্দ্বীপ আসে পাকিস্থানি বাহিনী। সন্দ্বীপে এসেই তারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সন্দ্বীপের আহবায়ক জাহেদুর রহিম মোক্তারকে গুলি করে হত্যা করে। হত্যা করে চন্দ্রকুমার, দুইজন পালকিবাহক ও একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীকে। এছাড়া অনেকগুলো ঘরবাড়ি লুটপাট ও আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।     

দুইদিন পর পাকবাহিনী সন্দ্বীপ থেকে চলে গেলেও এরপর আসে মিলিশিয়া বাহিনী। তারা স্থানীয়  রাজাকারের সহায়তায় অত্যাচার অব্যাহত রাখে। সন্দ্বীপে মুক্তিযুদ্ধের ছোঁয়া একটু দেরিতে লাগলেও পাকবাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচার অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে। এসব দেখে লোকজন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আসতে শুরু করে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে দুইজন সেনাবাহিনীর অফিসারের হাতে হরিশপুর ইউনিয়নের ঠাকুর বাড়ির পাশে তিনি প্রশিক্ষণ নেন।

হেদায়তুল ইসলাম আরও জানান, সন্দ্বীপ থানার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শাহাজান (মগধরা), সুদাংশু লাল দাস (হরিশপুর), আজিজ উল্ল্যা প্রকাশ আজিজ ডাক্তার (মাইটভাঙ্গা), শফিউল্লা (সারিকাইত), মাইটভাঙ্গা শিবের বাড়ির অমিয় কর্মকার, কাজী সুফিয়ান (সারিকাইত), ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের শামসুল আলম খাদেম ও জয়নাল চৌধুরীসহ কয়েকজনের অনুপ্রেরণায় সন্দ্বীপ থেকে ১১ জন প্রশিক্ষণের জন্য ভারত যান। ভারত থেকে তারা ট্রেনিং নিয়ে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা সন্দ্বীপে আসেন। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মাস্টার মো. শাহাজানের খামার বাড়ি, ভূইয়া সেরাং বাড়ি, রুহুল মেম্বারের বাড়ি, মুছাপুর বৈদ্যের স্কুল, চান্দের গো স্কুল, কাটগড় গিয়াস চৌধুরী বাড়ি, মাওলা মিয়ার বাড়ি ও স্লুইচ গেটের পাশে, সাউথ সন্দ্বীপ হাই স্কুল,বাটাজোড়া ইউনিয়নের নাগেশ্বর মাস্টারের শ্বশুর বাড়ি, হরিশপুর সিএন্ডবি গোডাউন, সারিকাইত ইউনিয়নের দর্জি বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নেন।

রফিকুল ইসলাম, মাহাবুব আলম, এবিএম ছিদ্দিকুর রহমান,শ্যামল কান্তি দাস, মো. ইব্রাহীম, মো. কামাল পাশা, মো. মশিউর রহমান জগলু, মৃণাল কান্তি, নাজমুল হোসেন বাবুল, আলী হায়দার চৌধুরী বাবলু তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। তাদের নেতৃত্বে ৬৩৫ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তখন পরিকল্পনা হয় থানা আক্রমণ করে দখল নিতে হবে। কীভাবে থানা আক্রমণ করা হবে এই মর্মে একাত্তরের ১ অক্টোবর দিবাগত রাতে আলি হায়দার চৌধুরী বাবলুর বাড়িতে পরিকল্পনা করা হয়। এরপর আমরা ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে সন্দ্বীপ থানার তিনপাশে অবস্থান করি। সংকেত আসলে আক্রমণ শুরু হবে। কিন্তু সংকেত দেওয়ার পর গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে বিস্ফোরণ হয়নি। ফলে মূল পরিকল্পনা সফল না হলেও আক্রমণ করা হয় টিন্ডটি অফিসে। তার পাশেই সেন্ট্রাল ব্যাংকের ৩ তলায় অবস্থান নেওয়া মিলিশিয়া বাহিনীর সাথে প্রায় ৩ ঘণ্টা সম্মুখ যুদ্ধ হয়। সন্দ্বীপ থেকে বাইরে যোগাযোগ বন্ধ করতেই আমরা টিন্ডটির যন্ত্রপাতি সরিয়ে ফেলি।

অপারেশন পুরোপুরি সফল না হওয়ায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ চলতে থাকে। ১ ডিসেম্বর কমান্ডার রফিকুল ইসলাম ও মাইটভাঙ্গার আজিজ উল্ল্যা থানা আক্রমণের জন্য রেকি করেন। রেকির পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বর সকাল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন এলাকা হতে এসে থানার আশপাশে অবস্থান নিতে শুরু করে। সুযোগ বুঝেই শুরু হয় আক্রমণ। পাকবাহিনী অসতর্ক থাকায় এবং বিএলএফ, এফএফ (ফ্রন্ট ফাইটার) এর যৌথ আক্রমণে থানা পুলিশ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মিলিশিয়া বাহিনীর সৈন্যরাও আত্মসমর্পণ করে। ওসিকে অপসারণ করে নতুন করে থানার দায়িত্ব দেওয়া হয় ডেপুটি কমান্ডার মাহাবুবুল আলমের ছোট ভাই নাজমুল হোসেন বাবুলকে।  

এসি    

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি