ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৫ জুন ২০২১, || জ্যৈষ্ঠ ৩১ ১৪২৮

করোনায় নয়, অসংক্রামক রোগেই মৃত্যু বেশি

আজাদুল আদনান

প্রকাশিত : ২২:২৭, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

প্রায় তিন বছর ধরে বুকের ব্যথায় ভুগছেন মনিরুজ্জামান। প্রথমদিকে সাধারণ চিকিৎসা নিলেও গত বছরের শেষের দিকে তা ভয়ানকভাবে বেড়ে যায়। উপায়ন্তর না দেখে ৬১ বছর বয়সী পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত এই সাব ইন্সপেক্টর গত নভেম্বরে ভর্তি হন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে। সেখানে প্রথমে স্বাভাবিক চিকিৎসা হলেও পরবর্তীতে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে নেয়া হয় আইসিইউতে। 

দশদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রসহ পুরো একমাস ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর মৃত্যুর কাছ থেকে আপাতত ফিরেছেন মনিরুজ্জামান। কিন্তু মাস খানেক পর আবারও বেড়েছে সেই ব্যথা। চিকিৎসাকরা পাঠিয়েছেন রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। এখানে এসে করোনার ঝুঁকি নিয়েই অন্যান্য রোগীর মতোই চিকিৎসকদের অপেক্ষায় হাসপাতলের এক কোণে বসে আছেন তিনি। 

জানতে চাইলে সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রথম দিকে ব্যথাটাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতাম না। কিন্তু পরে তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অনেক ওষুধ খেয়েছি কিন্তু তেমন কোনও কাজে আসছে না। রাজারবাগে আইসিইউতে থেকে অনেকটা সুস্থ হয়ে ফিরলেও ব্যথাটা আবারও বেড়েছে। তাই এখানে এসেছি। কিন্তু যেভাবে ব্যথা বাড়ছে, তাতে মনে হয় আর বাঁচা হবে না। আর একেকটা ইনজেকশন ও ওষুধের যা দাম, তাতে আমি পারলেও অনেক অস্বচ্ছল পরিবারই পথে বসতে বাধ্য।’

পাশেই কোনোমতো শ্বাস নিচ্ছেন মানিকগঞ্জ থেকে আসা রইছ উদ্দিন। ৪৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি বেঁচে ফিরবেন কিনা তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। ডাক্তার এসে দেখেও গেছেন, দিয়েছেন পরীক্ষা। কিন্তু অবস্থা যা, তাতে সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবেন কী-না তা নিয়ে নিজেই শঙ্কায় রইছ উদ্দিন। 

অটো ভ্যান চালক হওয়ায় খুবই অর্থ সংকটে পড়েছেন তিনি। অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বুকের বামপাশে ব্যথা অনুভব করেন। কাশি দিলে বুকটা যেন ভেঙে পড়ে তার। এর আগেও কয়েকবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল রইছ উদ্দিনের। প্রতিবারই চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রচুর অর্থ খরচ হলেও মেলেনি পুরোপুরি সুস্থতা। তাই, এসেছেন এই হাসপাতালে। 

মনিরুজ্জামান ও রইছ উদ্দিনের মতো অসংখ্য হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভিড় করছেন হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে। অনেকে হাসপাতালে নেয়ার পথে কিংবা নেয়ার পরপরই চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। ফলে দীর্ঘ হচ্ছে হৃদরোগ, ক্যান্সারসহ অসংক্রামক সব রোগে মৃত্যুর মিছিল। 

চিকিৎসকরা বলছেন, গোটা পৃথিবী মহামারি করোনায় যখন ধুঁকছে, তখন আরেকটি দুর্যোগে প্রতিদিন বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন অসংক্রামক রোগে। এমনকি চলমান মহামারিতে প্রতিদিন যত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন তার চেয়ে বেশি প্রাণ ঝরছে এই রোগে। এছাড়া প্রতিবছর প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে, যার ২২ শতাংশই হয় অকালমৃত্যু। 

মহামারি করোনায় প্রাণ হারাদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগে ভুগছিলেন। অতিরিক্ত তেল-চর্বি, চিনিযুক্ত খাবার, অলসতা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, সময়মতো খাবার না খাওয়া, জাংকফুড, ধূমপান, অ্যালকোহল পান, দূষণ, মানসিক চাপ, এবং অস্বাভিক জীবনযাপন এই রোগের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

চিকিৎসকরা বলছেন, যদি কারও ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন থাকে তাদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। আবার ফাস্টফুড খেলে হার্ট অ্যাটাক বেশি হয়। বর্তমান পৃথিবীতে যত লোক সংক্রামক রোগে মারা যায়, তার চেয়ে বেশি মারা যায় অসংক্রামক রোগে। কয়েকগুণে হারায় কর্মক্ষমতা। 

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেক বেশি। সম্প্রতি তা আরও বেড়েছে ভয়াবহ রূপে। ২০১৯ সালের এক গবেষণায়ে দেখা গেছে, দেশের ৬০ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনওভাবে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত। তবে দেশে কিডনি, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে কত সংখ্যক মানুষ ভুগছেন তার নির্দিষ্ট তথ্য হালনাগাদ নেই। 

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের মধ্যে ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের অসংক্রামক রোগের কারণে অকালমৃত্যু ২৫ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করেছে। আর এজন্য সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশপাশি দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দিকেও নজর দিতে হবে। 

জানতে চাইলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিটউ ও হাসপাতালের হৃদরোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার একুশে টেলিভিশন অনলাইনকে বলেন, ‘বর্তমান কোভিড-১৯ এর প্রভাব বেশি পড়লেও করোনা পূর্ববর্তী সময়ে অসংক্রামক রোগের গুরুত্ব বেশি ছিল।’

তিনি বলেন, ‘অসংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হৃদরোগ। প্রধাণত হৃদরোগ দুই ধরণের হয়ে থাকে। একটি জন্মগত, অন্যটি জন্মের পরে। জন্মগত হৃদরোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের হার্টের ছিদ্র এবং বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্রের অস্বাভাবিকতাই দায়ী। এটি জন্মগতভাবে আসে এবং একজনের থেকে অন্যজনে ছড়ায় না। আর যেটা নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই তা হলো- হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ। যাতে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। এটি এতোই মহামারি বা এতটাই ক্ষতিকর কিংবা এতোই ঝুঁকিপূর্ণ যে, ৫০ শতাংশ রোগী হাসপাতালে আসার আগেই মারা যান।’ 

ডা. প্রদীপ কুমার বলেন, ‘যাদের ডায়াবেটিস, প্রেসার, রক্তের কোলেস্টরেলে চর্বির পরিমাণ বেশি, অতিরিক্ত ওজন, কায়িক পরিশ্রম না করা, ধুমপান বা তামাক সেবন এবং যাদের পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস আছে তারাও ঝুঁকিতে।’  

এ চিকিৎসক বলেন, ‘আমাদের এ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্তদের মধ্যে মারা যান ৫ শতাংশ রোগী। প্রতিদিন যদি দুইশ রোগী ভর্তি হন তাহলে ১০ জন রোগী মারা যান শুধু হৃদরোগজনিত কারণে। শুধু এ হাসপাতালেই যদি এ অবস্থা হয় তাহলে পুরো বাংলাদেশে দিনে কত রোগী মারা যায় তা এখান থেকে স্পষ্ট। প্রতিদিন গোটা বাংলাদেশ যত হৃদরোগের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, তার ৫ শতাংশ রোগী মারা যান।’ 

অর্থাৎ চলমান বৈশ্বিক মহামারি করোনার চেয়ে বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, তথা অসংক্রামক রোগে। যদিও বর্তমানে করোনায় মৃত্যুটা বেশি ফলোআপ হচ্ছে- যোগ করেন তিনি।

এনএস/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি