কামালের অবৈধ সম্পদ ও দুর্নীতির খোঁজে মাঠে দুদক
প্রকাশিত : ১৭:৩৩, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দরে শুল্কফাঁকি ও সিন্ডিকেট চক্রের আলোচিত নাম কামাল হোসেন। সাধারণ এক রিচার্জ ব্যবসায়ী থেকে কয়েক বছরে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার রূপকথাকেও হার মানানো সেই উত্থান নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে।
প্রথম পর্বের সংবাদ প্রকাশের পর এবার কামালের অবৈধ সম্পদ ও আয়ের উৎস খুঁজতে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে নামার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সম্প্রতি কামালের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়ার পর প্রাথমিক তদন্ত শুরু হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন দুদক প্রধান কার্যালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
এদিকে, প্রথম পর্বের সংবাদ প্রকাশের পর বেনাপোলজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সংবাদের পোস্টে স্থানীয় বাসিন্দারা কমেন্ট করে কামালের বিষয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছেন।
অভিযোগের কেন্দ্রে যা আছে: দুদকে জমা পড়া অভিযোগপত্র ও আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, কামালের আয়ের প্রধান উৎস শুল্কফাঁকি, সোনা চোরাচালান এবং ‘সাংবাদিকতা’র আড়ালে চাঁদাবাজি।
ভুয়া সনদে সাংবাদিকতা: অভিযোগ উঠেছে, কামাল বর্তমানে নাভারণ কলেজে বিএ (রোল নং: ২০-০-২৩-৯২৫-০০৫) পড়ুয়া ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও ভুয়া সনদ ব্যবহার করে সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছেন। এই পরিচয়কে তিনি কাস্টমস কর্মকর্তা ও আমদানিকারকদের ভয় দেখিয়ে ‘মাসোহারা’ আদায়ের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।
চোরাচালান সিন্ডিকেট: কন্টিনেন্টাল কুরিয়ার সার্ভিসের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে সোনা ও অবৈধ পণ্য পাচারের সিন্ডিকেট চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি চন্দনকাঠ পাচারের দায়ে বিজিবির করা মামলাও রয়েছে তার নামে।
বেনামি সম্পদের পাহাড়: দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, কামালের সম্পদ কেবল বেনাপোলে সীমাবদ্ধ নয়। দিঘীরপাড়ে ৩ তলা আলিশান বাড়ি ছাড়াও যশোর শহরের আরবপুর ও পুলিশ লাইন এলাকায় একাধিক বহুতল ভবন এবং ফ্ল্যাট রয়েছে তার। নিজের আইনি দায় এড়াতে এই বিপুল পরিমাণ জমি ও সম্পদ তিনি স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে কিনেছেন বলে জানা গেছে।
শুল্কফাঁকি ও তদবির বাণিজ্য: বেনাপোল কাস্টম হাউসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে কামাল গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি কাস্টমসে আটকে যাওয়া একটি পার্টসের চালান অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ছাড় করানোর চেষ্টার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এর মাধ্যমে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
স্থানীয় এক সচেতন নাগরিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কামাল একসময় সামান্য রিচার্জের দোকান চালাতেন। আজ তার দামী প্রিমিও গাড়ি আর অঢেল সম্পদ। এই টাকা কি আকাশ থেকে পড়েছে? আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হোক।”
আমদানিকারক ইউনুস আলী জানান, গত ৬ ডিসেম্বর-২৪ (শুক্রবার) দুপুরে বেনাপোল ইমিগ্রেশন পরিদর্শন শেষে সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের নাম ভাঙিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী কামাল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলার নির্দেশ দেন। কামাল কাস্টম ও বন্দরের কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার ও অনৈতিক সুবিধা নিতে ভয়ভীতি দেখান বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া সে আমদানিকারকদের পণ্য খালাসের পূর্বে বিভিন্ন ইনফরমা দিয়ে হয়রানি করে অর্থ আদায় করে থাকে।
অভিযোগ ও তদন্ত বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আকতারুল ইসলাম বলেন, অভিযোগপত্র যাচাই-বাছাই কমিটির সিদ্ধান্তে পরবর্তী পদক্ষেপ গৃহীত হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তির অবৈধ সম্পদের তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্যাদিও দুদক খতিয়ে দেখবে। কামালের কল রেকর্ড এবং লেনদেনের উৎস খতিয়ে দেখলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
এমআর//
আরও পড়ুন










