ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৯ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

শোকাবহ ৭ আগস্ট

জাতির পিতার মৃত্যু নেই

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৭:৪০ ৭ আগস্ট ২০১৮ | আপডেট: ১৭:১১ ৯ আগস্ট ২০১৮

১৫ ই আগস্ট বাঙালির ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ দিন— ‘জাতীয় শোক দিবস’। ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট প্রত্যুষে ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত দেশি-বিদেশি মহলের ষড়যন্ত্রে একদল ঘৃণ্য খুনি কর্তৃক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সংঘটিত হয় মানবজাতির ইতিহাসের এক চরম, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। এর নির্মম শিকার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 


ঘাতকের নিষ্ঠুর বুলেট বিদীর্ণ করে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের দেহও। নিষ্পাপ শিশু রাসেলসহ রেহাই পাননি বঙ্গবন্ধু পরিবারের উপস্থিত কোনো সদস্যই। বিদেশে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান শুধু বঙ্গবন্ধুর দুকন্যা শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) ও শেখ রেহানা। সেদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়ক দিয়ে প্রবাহিত রক্তস্রোতে বাংলায় যেন সৃষ্টি হয় নতুন এক লোহিত সাগর। বাঙালির জীবনে রচিত হয় ‘গ্রিক ট্র্যাজেডি’র আরেক উপাখ্যান।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও এর জনগণের সার্বিক কল্যাণে বঙ্গবন্ধুর জীবন ছিল উত্সর্গীকৃত। এ প্রশ্নে অন্য সবকিছু ছিল তার কাছে তুচ্ছ। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর একটি একান্ত সাক্ষাত্কার গ্রহণ করেছিলেন। এটি একটি মূল্যবান দলিল। এ থেকে বঙ্গবন্ধুর জীবন-আদর্শ সম্বন্ধে অনেক স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার উদ্দেশ্যে যখন তার সেলের পাশে কবর খনন করা হয়, তখন তার মনের অবস্থা কিরূপ হয়েছিল বা স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের কথা মনে হয়েছিল কি-না, ডেভিড ফ্রস্টের এই প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর উত্তর ছিল, ‘আমার প্রথম চিন্তা আমার দেশের জন্য। আমার আত্মীয়-স্বজনদের চাইতেও আমার ভালোবাসা আমার দেশের জন্য। আমার যা কিছু দুঃখভোগ, সে তো আমার দেশেরই জন্য। আপনি তো দেখেছেন, আমাকে তারা (সাধারণ মানুষ) কী গভীরভাবে ভালোবাসে।’

অপর এক প্রশ্নে ফ্রস্ট যখন জানতে চাইলেন কোন দিনটিকে বঙ্গবন্ধু জীবনের ‘সবচাইতে সুখের দিন’ বলে গণ্য করেন। কোনোরূপ চিন্তা ছাড়াই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সবচাইতে সুখের দিন।’

বাঙালি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বিক মুক্তির প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু এতটাই নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন যে, নিজের জন্মদিন পর্যন্ত তিনি কোনোদিন পালন করেননি। শোষিত-নিপীড়িত-নির্যাতিত বাঙালির একজন হিসেবে তিনি সব সময় নিজেকে দেখেছেন এবং বাঙালি জাতির মুক্তির মধ্যেই নিহিত ছিল তার জন্মদিনের আনন্দ। তাই কারাবন্দি থাকা অবস্থায় ১৯৬৭ সালের ১৭ই মার্চ তার ৪৭তম জন্মবার্ষিকীর দিনে বঙ্গবন্ধু তার দিনপঞ্জিতে লেখেন, ‘আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই ... খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস! দেখে হাসলাম’ (কারাগারের রোজনামচা)।

১৯৭১ সালের ১৭ই মার্চ এক বিদেশি সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর নিকট তার জন্মদিন উদযাপন প্রসঙ্গ তুললে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘দেখেছেন তো, চতুর্দিকে আমার মানুষ কী অসহায়, তাদের কত যন্ত্রণাবোধ, আমার জন্মদিন- বা কী মৃত্যুদিন- বা কী।’

বঙ্গবন্ধু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ‘ত্যাগের মাধ্যমে আদর্শের জয় হয়’ (কারাগারের রোজনামচা)। ত্যাগের মহিমা সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধুর কথা, ‘যেকোন মহত্ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাই’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।

বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু তার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় ত্যাগ করেছেন, আর ক্ষুধা-দারিদ্র্য-দুর্নীতি ও অশিক্ষামুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তার জীবনের স্বপ্ন।

এস এ করিম তার Sheikh Mujib : Triumph and Tragedy গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুকে ‘a tragic hero’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বাঙালির ইতিহাসে সত্যিই তিনি ‘ট্র্যাজিক হিরো’। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ এক ও অবিচ্ছেদ্য সত্তা। স্বাধীন বাংলাদেশ তার অমর কীর্তি। রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্ব আর মানুষের ভালোবাসার মাঝে বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, চির অম্লান। তিনি জাতির পিতা। তার মহান আদর্শ বাঙালির সোপান। জাতির পিতার কোনো মৃত্যু নেই। মৃত্যুঞ্জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি