ঢাকা, সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ১৬:০৫:৫৪

Ekushey Television Ltd.
‘চলন্ত রাস্তা’ মডেল

দূষণ ও যানজটমুক্ত নগরী হবে ঢাকা

তবিবুর রহমান

প্রকাশিত : ০৫:৪৭ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ০৯:১৭ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০১৮ রবিবার

আবু সাইয়ীদের চলন্ত রাস্তা মডেল

আবু সাইয়ীদের চলন্ত রাস্তা মডেল

বর্তমান পৃথিবীর বড় সমস্যা যানজট ও বায়ুদূষণ। রাজধানী ঢাকায় যানজটের কারণে প্রতিদিন ১২ লাখ কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। বছরে অপচয় হচ্ছে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। যানজটে বসে থাকতে থাকতে মানসিক যন্ত্রণা বাড়ছে যাত্রীদের, যার প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তি ও কর্জজীবনে।

এক সমীক্ষা বলছে, বর্তমানে ঢাকায় যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সালে নাকি তা ৪ কিলোমিটারে দাঁড়াবে! সাধারণত মানুষ প্রতি ঘন্টায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতে পারে। অর্থাৎ আমাদের যানবাহনের গতি হাঁটার গতির চেয়েও কমে যাবে মাত্র ৭ বছরের মধ্যেই।

এছাড়া বায়ু দূষণ বা পরিবেশ বিপর্যয় তো রয়েছেই। রাজধানীতে বায়ুদূষণের মূল কারণ জ্বালানী তেলে চালিত মোটরযান। বায়ুদূষণ ও যানজট নিরসনের উপায় বের করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও উদ্ভাবক আবু সাইয়ীদ। ‘চলন্ত রাস্তা’ নামে একটি উপস্থাপন করেছেন তিনি। যা রাজাধনীতে স্থাপন করা হলে রোধ হবে বায়ু দূষণ। মুক্তি পাওয়া যাবে যানজট থেকে। চলন্ত রাস্তার জন্য আলাদা সড়ক বা জায়গার দরকার হবে না। বর্তমান সড়কের ২০ ফুট ওপরেই এটি স্থাপন করা সম্ভব হবে।

‘চলন্ত সিঁড়ি’ বা বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরে থাকা বিকল্প রাস্তার আদলে তৈরি হবে এটি। এ রাস্তায় কোনো গাড়ি চলবে না। মানুষ দাঁড়ালেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজে যেতে পারবে। ‘চলন্ত রাস্তা’ ১ কিলোমিটারে বহন করতে পারবে ৫ লাখ যাত্রী।

ঢাকার ৪০০ কিলোমিটার রাস্তায় ১ ঘণ্টায় ২০ লাখ যাত্রী বহন করতে পারবে। রেললাইনের আদলে তৈরি করা হয়েছে ‘চলন্ত রাস্তা’র মডেল।

মিরপুর শাইনপুকুর অ্যাপার্টমেন্টে (রাইনখোলা-মিরপুর) গত মঙ্গলবার ‘চলন্ত রাস্তা’ মেকানিক্যাল মডেল উপস্থাপন করেন আবু সাইয়ীদ । কিছু শিশু চড়িয়ে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ২ বার ১৫ মিটার পথ চালিয়ে দেখানো হয়। এ মেকানিক্যাল মডেল ২২ অক্টোবর পর্যন্ত উপস্থাপন করা হবে।

এ বিষয়ে একুশে টিভি অনলাইনের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয় ‘চলন্ত রাস্তা’ মডেলের উদ্ভাবক আবু সাইয়ীদের। তিনি জানান, তিনি ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ‘চলন্ত রাস্তা’ নিয়ে কাজ শুরু করেন। এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পে ব্যয় করেছেন ২০ লাখ টাকা। এই মডেল সড়কে স্থাপন করা হলে কোনো প্রকার যানজট থাকবে না। এমন চলন্ত রাস্তা পৃথিবীর অন্য কোন দেশে নেই বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে সরকারে সঙ্গে কোনো আলোচনা করছেন কি না জানতে চাইলে সাইয়ীদ বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আলোচনা না হলেও ইতোমধ্যে সরকারের অনেক নীতিনির্ধারকরা এটা নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তারা বলেছেন, নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনা করে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

কোন ভাবনা থেকে আপনি চলন্ত রাস্তার মডেল উপস্থাপন করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমে বলবো ঢাকা শহরে যে পরিমাণ যানজট এ থেকে আমরা সবাই মুক্তি পেতে চাই। আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকা শহরে যানজট নিরসন। এছাড়া এটি যেহেতু বিদ্যুতের সাহায্যে চলবে সেহেতু পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্তি পাবে ঢাকাবাসী।

‘চলন্ত রাস্তা’ ব্যবহারের পদ্ধতি

বর্তমান সড়কেই চলন্ত রাস্তা দু’ভাবে স্থাপিত হতে পারে। সড়কের মাঝ বরাবর অথবা দু’পাশ বরাবর। চলন্ত রাস্তার ধারণাগত মডেল প্রদর্শনিতে সড়কের দু’পাশ বরাবর চলন্ত রাস্তা স্থাপন করা হয়েছে।

মাঝ বরাবর অথবা দু’পাশ বরাবর যেখানেই স্থাপিত হোক না কেন চলন্ত রাস্তা একজিসটিং সড়কের ২০ ফুট উপরে স্থাপিত হবে। 

যদি সড়কের মাঝ বরাবর স্থাপন করা হয় তাহলে, ৬ ফুট প্রস্থের পাশাপাশি দুটি চলন্ত রাস্তা স্থাপিত হবে। একটি রাস্তা অপরটির বিপরিত দিকের গতিতে চলবে। দুই রাস্তার দুই দিকে আনুমানিক ৮ ফুট প্রস্থের ২টি প্লাটফর্ম থাকবে।

প্রতিটি রাস্তায় ২টি রেল লাইনের উপরে ৭২ ইঞ্চি বাই ৩০ ইঞ্চি একেরপর এক পাটাতন স্থাপিত হবে। এপাশ ওপাশ মিলে চলন্ত রাস্তার দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ৫০ কিলোমিটার যাই হোক না কেন, চলন্ত রাস্তা এক অখন্ড যান হিসেবে চলমান থাকবে।

শহরের ভেতরে চলাচলের জন্য একটি চলন্ত রাস্তার গতি নির্ধারন হতে পারে ২০ থেকে ৬০ কিলোমিটার ঘন্টায়। নির্ধারিত গতিতে চলন্ত রাস্তা ১ থেকে ৩ মিনিট চলার পর ৫ থেকে ১৫ সেকেন্ডের জন্য থামবে।

কোন এক শহরে কোন একটি চলন্ত রাস্তার কত গতি হবে এবং কত মিনিট পর কত সেকেন্ডের জন্য থামবে তা নির্ধারিত হবে সার্বিক বাস্তবতার উপর।

অর্থাৎ একটি শহরে বিভিন্ন চলন্ত রাস্তার জন্য বিভিন্ন গতি নির্ধারিত হতে পারে। একই শহরে একটি চলন্ত রাস্তার গতি হতে পারে ৫০ কিমি/ আওয়ার, আবার অন্য একটি চলন্ত রাস্তার গতি হতে পারে ঘন্টায় ২০ কিলোমিটার। 

রাস্তার প্রতিটি জাংশন স্বাভাবিক যান চলাচলে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই যান চলাচলকে সচল রাখতে ফ্লাইওভার ধারণায় জাংসনে উলম্ব বরাবর রাস্তাকে কয়েক স্তরে স্থাপন করতে হয়।

যাত্রীদের সুবিধার্থে একটি শহরে যদি শতাধিক চলন্ত রাস্তার রুট থাকলেও একই শেডের নিচ দিয়ে এক প্লাটফর্ম থেকে আরেক প্লাটফর্মের যাবার সুবিধা থাকবে। প্রচলিত কোন পরিবহন পদ্ধতিতে এমন সুবিধা নেই।

বৃষ্টিতেও ভোগান্তিমুক্ত চলাচল

একটি রুটের বাস বা ট্রেন থেকে নেমে অন্য একটি রুটের কোন বাস বা ট্রেনে উঠতে যাত্রীদের অনেক ঝক্কি পোহাতে হয়। বৃষ্টির দিন হলে তো ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। কিন্তু চলন্ত রাস্তার যাত্রীদের এই ঝক্কি পোহাতে হচ্ছে না। একটি শহরে স্থাপিত বিভিন্ন চলন্ত রাস্তা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে কিন্তু সকল রাস্তার প্লাটফর্ম একে অপরের সাথে যুক্ত থাকবে।

এতে যাত্রীরা এক রাস্তা থাকে নেমে প্লাটফর্ম ধরে অন্য রাস্তায় যেতে পারবে। অতি বর্ষণে শহরের রাস্তার কিছু অংশ ডুবেই যাক অথবা অন্যকোন কারণে নিচের রাস্তা বন্ধ থাকলেও চলন্ত রাস্তা ঠিকই চলবে তার আপন গতিতে।

ছোটবড় বিভিন্ন দৈর্ঘের আনুমানিক ৪০০ কিমি চলন্ত রাস্তা তৈরি করলেই ঢাকা শহরের ভেতর সকল স্থানেই যোগাযোগ করা সম্ভব।

চলন্ত রাস্তা স্থাপনের সুবিধাগুলো

১। শহর ট্র্যাফিকজ্যাম মুক্ত হবে। 

২। এই পদ্ধতি পরিবেশবান্ধব।

৩। বিদ্যুৎ তথাজ্বালানী খরচ কমবে।

৪। পরিবহণ খাতের বার্ষিক সার্বিক ব্যয় কমে আসবে।

৫। বাস্তবায়ন খরচ কম এবং সাধারণ কারিগরি দক্ষতায় বাস্তবায়ন সম্ভব। চলন্ত রস্তার প্লাটফর্মের নিচ দিয়ে ইলেক্টিক, টেলিফোন এবং বিভিন্ন তার বিররণের জন্য চেম্বার নির্মাণ করা সম্ভব।

‘চলন্ত রাস্তা’র নির্মাণ ব্যয়

ফ্লাইওভার, উড়ন্ত রাস্তা বা মেট্রো রেলের ব্যয়ের সাথে তুলনামূলক বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে যে চলন্ত রাস্তার স্থাপনা খরচ অনেক কম। এর প্রধান কারণ চলন্ত রাস্তার কারিগরি পদ্ধতির কারণে এর ওজন কম। একটি ফ্লাইওভার বা উড়ন্ত সড়কের উচ্চতা এবং এর উপর দিয়ে অনেক ভারি যান চলাচলের কারণে যে শক্তিশালী ভিতের উপর দাঁড় করাতে হয় তার চেয়ে কম বেশ কম শক্তিশালী ভিতের উপর চলন্ত রাস্তা স্থাপন করা সম্ভব। কারিগরি কারণে চলন্ত রাস্তার কম্পনও কম। সব মিলিয়ে উড়ন্ত সেতু বা রাস্তার মত ভারী নির্মাণে যাবার কোন কারণ নেই। 

মেয়র হানিফ, মগবাজার মৌচাক, মহাখালী, খিলগাঁও, মিরপুর এ্যারপোর্ট রোড এবং কুড়িল ফ্লাইওভার নির্মাণে খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৪ শত বিশ কোটি টাকা। এই ৬টি ফ্লাইওভারের দৈর্ঘ্য ২৩.৫৫ কিলোমিটার। ঢাকা এলিভেটর এক্সপ্রেস, ঢাকা আশুলিয়া, যাত্রাবাড়ি-কাঁচপুর, আজিম্পুর-গাবতলি ৪টি এলিভেটর এক্সপ্রেসের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ১২ কোটি যার দৈর্ঘ ৯১.৫ কিলোমিটার।

ওভারব্রিজ বা এলিভেটর এক্সপ্রেস চলাচলের জন্য একটি কাঠামো। এর উপর দিয়ে চলাচলের জন্য প্রয়োজন হাজার হাজার গাড়ী আর যার মূল্য লক্ষ কোটি টাকা। আর উত্তরা থেকে মিরপুর হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার নব্বই কোটি টাকা। এর সাথে যুক্ত হবে হাজার হাজার কোটি টাকার যানবাহন। চলন্ত রাস্তা একাধারে রাস্তা ও বাহন।

উত্তরা থেকে মতিঝিল ২০.১০ কিলোমিটার মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।  এর দশ ভাগের এক ভাগ খরচে চলন্ত রাস্তা নির্মাণ করা সম্ভব বলে জানান আবু সাইয়ীদ।

বিদ্যুৎ বা জ্বালানী খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচ

একটি যান্ত্রিক যানে বিদ্যুৎ বা জ্বালানী খরচ নির্ভর করে ধারণ ক্ষমতা বা ওজন, গতি এবং বিভিন্ন কারিগরি সুযোগসুবিধার উপর। বিভিন্ন মোটরযানে ভারী কাঠামো চলমান রাখতে অনেক শক্তি ক্ষয় হয়। একটি বাসের গড় ওজন ৭০০০ কেজি, ৪০ জন যাত্রী অর্থাৎ ২৬০০ কেজি বহন করে। চলন্ত রাস্তায় ছাদ ও মূল কাঠামো স্থির থাকবে এবং শুধুমাত্র নিচের পাটাতন, কিছু যন্ত্রাংশ, গ্রিল ও প্লাস্টিকের দেয়াল ও চেয়ার চলন্ত থাকবে, যার ওজন একই আয়তনের যান্ত্রিক যানের চাইতে অনেক কম হওয়ার কারণে চলন্ত রাস্তা পরিচালনায় জ্বালানী বা বিদ্যুৎ খরচ অনেকটা কম হবে।

এ ছাড়া আমরা জানি একই ওজনের একটি যান পিচের রাস্তার উপর দিয়ে চলাচল করতে যে শক্তি ক্ষয় হয়, মসৃণতার কারণে তার চাইতে কম শক্তি খরচ হয় রেল লাইনের উপর দিয়ে চলাচল করতে। চলন্ত রাস্তা লোহার লাইনের উপর দিয়ে চলাচল এবং এর চাকা লোহার হবার কারণে এতে জ্বালানী বা বিদ্যুৎ খরচ কম হবে। বর্তমান মোটরযানে বিবিধ স্বয়ংক্রিয় সুবিধা প্রদানের কারণে তা পরিচালনায় জ্বালানী খরচ হয়ে থাকে। চলন্ত রাস্তা প্রকল্পটি যেহেতু বিদ্যুৎ চালিত হবে তাই এই প্রকল্পে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যহত রাখতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে আলাদা একটি বিদ্যুৎ ষ্টেশন স্থাপন করা যেতে পারে। চলন্ত রাস্তার ছাদ স্থির, তাই সহজেই সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে অনেকটা বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যেতে পারে।

চলন্ত রাস্তার কারিগরি জটিলতা কম হবার কারণে এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম হবে। যন্ত্রাংশ বলতে ইলেকট্রিক মোটর, ভেরিয়েবল স্পীড ড্রাইভার, কিছু ম্যাগনেটিক সিস্টেম, বেল্ট, পুলি, পিনিয়াম, ব্রেক প্যাড ইতাদি ছাড়া তেমন কিছুই নয়। যে কোন যান্ত্রিক ত্রুটি মোকাবেলায় ১টি সিরিজ সব সময়ের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। কোন একটি সিরিজের কোন একটি ক্ষুদ্র অংশেও যদি যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয় তাহলে ঐ সিরিজ বন্ধ রেখে সংরক্ষিত সিরিজ চালু করা হবে। পাটাতন, চাকা বা অন্যকোন যন্ত্রাংশ জনিত ত্রুটি দ্রুত সমাধানের জন্য প্লাটফর্মে সর্বাধিক ১ কিমি দূরত্বের মধ্যে পাটাতন, চাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশ সংরক্ষণ করা হবে। যা জরুরি প্রয়োজন মেটাবে।

টিআর/ এআর

 



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি