বরেন্দ্র অঞ্চলে দ্রুত কমছে ভূগর্ভস্থ পানি, বাড়ছে মরুকরণের শঙ্কা
প্রকাশিত : ১৮:২৬, ৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৮:৩৭, ৬ জুলাই ২০২৬
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি ক্রমেই গভীর পানি সংকটের মুখে পড়ছে। একসময় যে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ভর করেই এই অঞ্চলে কৃষিতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছিল, এখন সেই পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ থেকেও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পানির স্তর ২০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে গেছে। এর প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও পড়ছে।
নিরাপদ খাবার পানির জন্য অনেক গ্রামবাসীকে কয়েক শ মিটার দূরে যেতে হচ্ছে। সেচের পানির সংকটে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে।
কয়েক দশকের ব্যবধানে নাটকীয় পরিবর্তন
বরেন্দ্র অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপাত কম এবং অনিয়মিত। আশির দশকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে এ অঞ্চলে সেচের সুযোগ বাড়ায়। এর ফলে আগে যেখানে কৃষি ছিল অনিশ্চিত, সেখানে বোরো ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজির চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নামছে।
কী বলছে তথ্য?
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা নেমে যায় ৩৫ ফুটে। ২০০৪ সালে ৫১ ফুট এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে পৌঁছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটেরও নিচে নেমে গেছে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুটের বেশি গভীরেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ব্র্যাক, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশের বেশি এলাকা ইতোমধ্যে পানি সংকটের আওতায়। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই দশকের মধ্যে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা
পরিস্থিতির অবনতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার গত বছর রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করে। এছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এবং এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সরকারি হিসাবে এসব এলাকার মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার। সেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে পানি সংকটের প্রভাব ভোগ করছে।
পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, এসব এলাকায় খাবার পানির প্রয়োজন ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। নতুন নলকূপ স্থাপনেও বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে বাস্তবে অনেক এলাকাতেই এখনো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
পানির সংকটে বিপাকে গ্রামবাসী
কৃষির পাশাপাশি নিরাপদ পানির সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামে শত শত গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন ১ হাজার ৪০০ ফুট পর্যন্ত খনন করেও গ্রামের অনেক স্থানে পর্যাপ্ত পানির স্তর খুঁজে পায়নি।
কৃষকের বাড়তি খরচ, কমছে লাভ
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের ব্যয়ও বেড়েছে। রাজশাহীর কৃষক শব্দরানী জানান, আগে এক ঘণ্টা সেচ দিতে ৯০ টাকা খরচ হতো, এখন একই কাজে ১২০ টাকা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে সার ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন আগের তুলনায় কমে গেছে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে ব্যক্তিমালিকানার নলকূপ
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী বরেন্দ্র অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ পরিচালনার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ব্যক্তিমালিকানায় বিপুলসংখ্যক শ্যালো ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, তিন জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল এবং প্রায় চার হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। পানি উত্তোলনের সক্ষমতার দিক থেকে এগুলো প্রায় ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমতুল্য।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এলাকায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি নলকূপ থাকার কথা। এর মধ্যে বিএমডিএ পরিচালনা করছে প্রায় আট হাজার ৪০০টি। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজারে পৌঁছে গেছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বেরসকারি সংস্থা ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী একুশে টেলিবিশনকে বলেন, শুধু নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পানিসাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, টেকসই কৃষি পদ্ধতি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছিল। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার সেটি বাস্তবায়ন করলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
এএইচ










