ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ আগস্ট ২০১৯, || ভাদ্র ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

বল্টু_সমাচার_৮

প্রকাশিত : ১০:৪৮ ৩০ মে ২০১৯

বেশ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মিরপুরের বেড়িবাঁধ এলাকাটা বেশ খোলামেলা। তাই বাতাসের তোড়ে সব কিছুই মনে হলো উড়ে যাচ্ছে। জরিনা তার শাড়ি সামলাতে ব্যস্ত। মোবাইল গুঁতোতে গুঁতোতে একটু উৎকণ্ঠিত স্বরে বল্টু জরিনাকে বললো,

: ওয়েদারের ভাবসাব দেখে এই এলাকার সব উবার বন্ধ করে দিয়েছে মনে হয়। চলো, আমরা একটা সিএনজি ঠিক করি!

জরিনা একটু রাগত স্বরে বললো,

: আমি আগেই নিষেধ করেছিলাম! আকাশ কাল হয়ে আসছিলো। দরকার হলে আরেকদিন ছবি তোলা যাবে। কোন কথাই শুনলেন না। অযথাই কষ্ট করে এতো দূর আসলাম। ধ্যাত!

বল্টুর সব প্ল্যান মাঠে মারা গেছে! অপরাধী চেহারা নিয়ে একটা সিএনজির দিকে এগিয়ে গেল।

অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা ক্যামেরা কিনেছে বল্টু। দাম একটু বেশিই পড়েছে। নগদ বায়ান্ন হাজার চলে গেল। ডিজিটাল ভার্সনের ক্যামেরা। অটো অপশনে ছবি তোলার সহজ ব্যবস্থা আছে। শাটার স্পিড, অ্যাপারচার এসব নিয়ে আপাতত মাথা না ঘামালেও চলবে।

উদ্দেশ্য, জরিনাকে নিয়ে নানা জায়গায় ছবি তুলতে যাবে। ছবি তোলা হবে। একসঙ্গে ঘোরাঘুরির সুযোগও পাওয়া যাবে। তার জানা আছে, মেয়েরা ছবি তোলার সুযোগ পেলে পাগল হয়ে যায়।

এক ঢিলে দুই পাখি।

কিন্তু প্রথম দিনেই বৃষ্টি সব গুবলেট করে দিলো। অনেক পটিয়ে জরিনাকে রাজী করিয়ে মিরপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় নিয়ে এসেছে। এটা প্রেমিক প্রেমিকাদের জন্য মোটামুটি রেজিস্ট্রার্ড জায়গা।

জরিনা কিছুতেই আসবে না।

ক্যামেরা আর ছবি তোলার কথা বলে কনভিন্স করা গেছে। শেষ পর্যন্ত, মেকআপ নিয়ে সুন্দর একটা লাল রঙা শাড়ি পরেছে।

তারপর উবারে চড়ে এখানে আসা।

বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্ট সফল।

সিএনজিতে উঠে বসতে না বসতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। চিকন রডের খাঁচার ভেতরে থাকা সত্ত্বেও বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে, জরিনার বাঁ পাশটা প্রায় ভিজেই গেল বোধ হয়। বল্টু তার বাম হাতটা ওর কাঁধের ওপর দিয়ে কোমরের উপর রাখলো। এক ঝটকায় জরিনা বল্টুর হাতটা সরিয়ে দিল। ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলো,

: এসব কি ভাইয়া! সরে বসেন তো! এরকম করলে কিন্তু আমি নেমে যাবো! বল্টু সাথে সাথেই হাত সরিয়ে নিয়ে একটু সরে বসলো।

সিএনজি চালক ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দেখার চেষ্টা করছে।

বল্টুর মাথা ঘুরছে। জরিনার কাছ থেকে এতোটা তীব্র প্রতিক্রিয়া আশা করেনি সে।

বমি বমি ভাব হচ্ছে। কোন রকমে বললো,

: আরে ধুর বোকা মেয়ে! তুমিতো ভিজে যাচ্ছিলে। আমি ওটাই বুঝতে চাচ্ছিলাম।

: এটা বোঝার জন্য এরকম করতে হবে!

বুঝে কি করবেন আপনি? বৃষ্টি ঠেকিয়ে দেবেন? আমি কিন্তু এরকম গা ঘেঁষাঘেঁষি একদম পছন্দ করি না!

জরিনার কথাগুলো শুনে বল্টু একদম ঠাণ্ডা মেরে গেল। ভেতরে ভেতরে খুব রাগ হচ্ছে।

ভাবছে,

: ক্লাসমেটদের সঙ্গে যখন মটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াস, তখন গা ঘেঁষাঘেঁষি হয় না!

কোমর জড়িয়ে ধরে বসে থাকিস। এসব ভাব তখন কোথায় থাকে!

বায়ান্ন হাজার টাকার ইনভেস্টমেন্টই লস!

পরিস্থিতি ম্যানেজ করার জন্য বল্টু ড্রাইভারকে একটু ধমকের সুরে বললো,

: এই ড্রাইভার! পর্দা কোথায়? পর্দা থাকলেতো বৃষ্টিতে ভিজতে হতো না!

চালাতে চালাতেই ড্রাইভার জবাব দিলো,

: আপনের মতো প্যাসেঞ্জাররাই পর্দা ছিঁড়া ফালাইছে। লাগানের টাইম পাই নাই। এহন চুপ কইরা বইসা থাকেন!

তার কথা বলার ভঙ্গিতে বল্টু রেগে গেল।

বললো,

: ফাইজলামির জায়গা পাও না! এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো! ভাড়া পাবে অর্ধেক!

ঘ্যাচ করে ব্রেক কষার শব্দ। সিএনজি থেমে গেল। বিশাল দেহের ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে বল্টুর দিকে তাকিয়ে বললো,

: নামেন! আইসা চড় দেন! গাড়ি আর যাইবো না!

আতংকে বল্টুর গলা শুকিয়ে গেল।

জরিনা বল্টুর হাত চেপে ধরলো। ফিসফিসিয়ে বললো,

: একদম চুপ করে থাকেন! ব্যাটার সাইজ দেখেছেন! আপনি ছোটখাটো মানুষ।

কি দরকার, ঝামেলা করার?

জরিনা একটু অনুনয়ের সুরে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বললো,

: মামা, প্লীজ, গাড়ি চালানতো! বৃষ্টির মধ্যে কোথায় নামবো?

কি জানি, কি মনে করে ড্রাইভার আবার তার সিটে এসে বসলো। বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে।

সিএনজি চলছে।

বল্টু একটু অভিমানের সুরে জরিনাকে বললো,

: আমাকে ছোটখাটো বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছো? আগেও দেখেছি, সুযোগ পেলেই তুমি আমার হাইট নিয়ে অ্যাটাক করো!

জরিনা এবার বিব্রত।

নরম কণ্ঠে বললো,

: হাইট নিয়ে আপনার এতো কমপ্লেক্স কেন ভাইয়া! নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাইট কতো ছিলো? ফুটবল ঈশ্বর ম্যারাডোনা, ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন টেন্ডুলকারের হাইট কতো?

তারা যদি বিশ্ব শাসন করতে পারে, আপনি খাটো কিসে!

শুনে মন ভালো হয়ে যাবার কথা।

কিন্তু কাজ হলো না।

বল্টু্র মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেল।

ভাবলো,

: আমাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য পৃথিবীর সব বাটুলদের নাম মুখস্থ করে রেখেছিস! আমার বোঝাবুঝি শেষ! এখন থেকে আমিও নিজেকে গুটিয়ে নেবো!

কিন্তু ক্ষোভে দুঃখে কিছুই বলতে পারলো না।

নামার সময় সিএনজি চালক উপদেশের সুরে বললো,

: আফায় ঠিক কইছে! এহন থাইক্যা নিজের সাইজ বুইজ্যা চইলেন!

বল্টু্ পাথর হয়ে গেল।

জরিনাদের কাণ্ড-জ্ঞানহীন কথাবার্তায় এভাবেই বল্টুভাইদের কতো কথা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে, কে জানে! আহা...!

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বসুধা বিল্ডার্স লি.।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি