ঢাকা, রবিবার   ১৮ আগস্ট ২০১৯, || ভাদ্র ৩ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

বাজেটকে উৎপাদনশীল উপায়ে ব্যবহার করতে হবে: এফ এইচ আনসারী

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১২:৫৮ ২৪ মে ২০১৮ | আপডেট: ১১:৩০ ২৮ মে ২০১৮

কৃষি বাজেট নিয়ে সাক্ষাৎকারে এসিআই এগ্রি বিজনেস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কৃষি গবেষক এফ এইচ আনসারী। ছবি একুশে টিভি অনলাইন।

কৃষি বাজেট নিয়ে সাক্ষাৎকারে এসিআই এগ্রি বিজনেস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কৃষি গবেষক এফ এইচ আনসারী। ছবি একুশে টিভি অনলাইন।

আসছে জুন মাসে ২০১৮-’১৯ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করা হবে। নির্বাচনের বছরের বাজেট হওয়ায় সব মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রাক বাজেট আলোচনা। কৃষিখাতের এবারের বাজেট কেমন হতে পারে বা কেমন হওয়া উচিত-তা নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছে বিস্তর। কৃষিখাতের বাজেট ভাবনা এবং সামগ্রিক কৃষি খাত নিয়ে ইটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন এসিআই এগ্রি বিজনেস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কৃষি গবেষক এফ এইচ আনসারী। তার কথায় উঠে এসেছে কৃষিতে তরুণদের সম্ভাবনা, এই সেক্টরে প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইটের সফল ব্যবহারসহ নানা দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইনের সহ-সম্পাদক শাওন সোলায়মান

ইটিভি অনলাইনঃ সামনে বাজেট আসছে। এই বাজেটে কৃষি খাতের জন্য কেমন বরাদ্দ রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

এফ এইচ আনসারীঃ কৃষি খাত সংশ্লিষ্টরা সবসময়ই এই সময়টাতে বাজেট ঘোষণার দিকে বিশেষ নজর রাখেন। যেহেতু আমরা কৃষি প্রধান দেশ, তাই কৃষিকে বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে এমনটাই আশা আমাদের। কৃষকেরা সবসময়ই এমন বিশ্বাসে থাকেন যে, সরকার তাদের জন্য কিছু করছে এবং করবে। তো কৃষকদের সেই বিশ্বাস এবং আস্থার বহিঃপ্রকাশ বাজেটে হবে এমনটা আমরা সবাই চাই।

পাশাপাশি কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আর প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে বাজেটে বিশেষ সুবিধা থাকা লাগবে।

ইটিভি অনলাইনঃ বাজেটের কার্যকারিতা নিয়ে সবসময়ই আলোচনা হয়। ঘোষিত বাজেটের কতটুকু ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় বলে আপনি মনে করেন?

এফ এইচ আনসারীঃ একটা বিষয় আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের দেশের বাজেট কিন্তু খুব একটা বড় না। আমরা ইচ্ছে করলেই যে আবার এই বাজেটের পরিমাণ অনেক বাড়িয়ে ফেলতে পারব এমনও কিন্তু না। তাই বিদ্যমান যে বাজেট আছে তা যদি প্রোডাক্টিভওয়েতে (উৎপাদনশীল উপায়ে) ব্যবহার করতে পারি তাহলে ভালো কিছু করা সম্ভব।

আমাদেরকে দেখতে হবে যে, আমাদের জন্য এই যে এক হাজার কোটি টাকার বাজেট আছে, বা বারশ’ কোটি টাকা বা নয়শ’ কোটি টাকা যেটাই হোক, সেটা কীভাবে ব্যবহার করলে ‘কস্ট অব প্রোডাকশন’ (উৎপাদন ব্যয়) কমে আসে। আমরা সারে ভর্তুকি দেখিয়েছি যে, ফিল্ড ক্রম (জমি শস্য), সবজি এবং যেসব ফসল উৎপাদনের পর পশু খাদ্যে ব্যবহৃত হয় সেসব জায়গাতে আমাদের কিছুটা সাশ্রয় হচ্ছে। সেইসঙ্গে আমরা জানি যে, ডিজেলে আমরা কিছুটা ভর্তুকি দিই। তাহলে তাতে আমরা দেখি যে, উৎপাদন ব্যয় কেজিতে এক থেকে দেড় টাকা কমছে। সেই সঙ্গে আমরা যদি ফসল ভালো দামে বিক্রি করতে পারি তাহলে এই উৎপাদন ব্যয়ও কোনো ব্যাপার না।

একটা উদাহরণ দিই, এখন যদি এক মণ চাল আমি এক হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারি তাহলে প্রতি কেজি চালের দাম আসে প্রায় ২৫ টাকা। আর যদি এই চালই আমি ১৬০০ টাকায় বিক্রি করতে পারি তাহলে দেখেন কত আসে। তাই বাজেটে বরাদ্দ করা অর্থ এমনভাবে আমাদের ব্যবহার করতে হবে যেন তা দিয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায় এবং সেই সঙ্গে ফসলের ভালো দাম পাওয়া যায়। 

ইটিভি অনলাইনঃ কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলেছেন আপনি। কেমন হতে পারে সেই ব্যবহার?

এফ এইচ আনসারীঃ আগে কৃষিকাজ হতো একেবারে অপ্রযুক্তিগত পদ্ধতিতে। এখন এখানে প্রযুক্তির অনেক ব্যবহার করা যায়। একটা উদাহরণ দিই। আমি যদি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখি যে, কখন কোন নির্দিষ্ট এলাকায় বৃষ্টি হবে, তাহলে সেই এলাকার কৃষকদের আমরা ওই সময়ে সেচ না দিতে বলতে পারি। এখন অনেক জায়গায়-ই প্রি-পেইড কার্ডে বিল পরিশোধ করে জমিতে সেচ দিতে হয়। এটা কৃষকদের খরচ বাড়ায়। আমি যদি প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বৃষ্টির পানিকেই সেচের কাজে লাগাই তাহলে কিন্তু তা কৃষকদের খরচ কমিয়ে দেবে। এভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষিক্ষেত্রে আরও বাড়ানো যেতে পারে। এর জন্য দেশের শিক্ষিত যুবকদের কৃষিকাজের সঙ্গে আরও জড়িত করতে হবে। 

ইটিভি অনলাইনঃ বাংলাদেশের এখন নিজস্ব স্যাটেলাইট আছে বঙ্গবন্ধু-১। কৃষি ক্ষেত্রে এর ব্যবহারে কোনো সুফল আসা সম্ভব কি না?

এফ এইচ আনসারীঃ আমি এখনও সঠিক জানি না যে, এই স্যাটেলাইট দিয়ে সরকারের কৃষিক্ষেত্রে কাজ করানোর কোনো পরিকল্পনা আছে কী-না। তবে সরকার চাইলে এটা করতে পারে। আমাদের এসিআই এগ্রি বিজনেস কিন্তু এমনটা করেছে। নেদারল্যান্ডসের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে। এই চুক্তির ফলে তাদের একটি স্যাটেলাইটের সেবা নিয়ে থাকি আমরা। এই স্যাটেলাইটটি প্রতি ১০ দিনে একবার বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করে। এখান থেকে কিন্তু আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। বিগত প্রায় ২৬ বছরের স্যাটেলাইট তথ্য আছে আমাদের কাছে। আমরা এই তথ্যগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সঙ্গে বিনিময় করব। এ লক্ষ্যে কাজ চলছে।

ইটিভি অনলাইনঃ আপনি শিক্ষিত যুবকদের কৃষি কাজে জড়িত হওয়ার কথা বলছেন। তাদের জন্য এই খাত কতটুকু সম্ভাবনাময়? শিক্ষিত তরুণদের বেশিরভাগেরই লক্ষ্য থাকে বিসিএস বা ব্যাংকে চাকরি। সেখানে কৃষি খাত তাদের মধ্যে কতটা আগ্রহ তৈরি করতে পারবে?

এফ এইচ আনসারীঃ প্রতি বছর আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে কম করে হলেও চার থেকে পাঁচ লাখ গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে। সবাই তো আর সরকারি চাকরি পাচ্ছে না। তো বাকিরা তো প্রাইভেট সেক্টরে কাজ করছে। আর তারা ভালোও করছে।

এই ছেলেমেয়েদেরকে কৃষিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। স্বকর্মসংস্থানের যোগানও দেবে এই কাজ। ইতোমধ্যে কৃষিতে অন্তত এক লাখ ডিলার (পরিবেশক) আছে যারা তরুণ ও যুবক। তারা পড়ালেখার পর এই খাতে এসেছে। আমাদের এসিআই’তেও অনেক কর্মী আছেন যারা কৃষি খাতে কাজ করছেন। তাই তাদের ক্যারিয়ারের জন্যও খুব ভালো আর সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে কৃষি।

ইটিভি অনলাইনঃ একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আমরা বলে থাকি যে, কৃষিতে আমাদের অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছি। তারপরেও আমাদের কৃষিজাত পণ্যের দামের এত উর্ধ্বগতি কেন? বিশেষ করে চাল-সবজির দামে বেশ উর্ধ্বগতি দেখা গেছে। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

এফ এইচ আনসারীঃ দেখুন, আমরা কৃষিতে উন্নতি সাধন করেছি এটা ঠিক। আগের যেকোনো সময়ের থেকে আমাদের এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বেশি। তারপরও কিছু পণ্য এবং খাদ্যশস্য আমরা এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করি। চালও কিন্তু আমরা আমদানি করে থাকি।

অনেক সময় বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়েও দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়। চাল মজুদও করা হয়। এ বিষয়গুলোর সমাধান হলে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

ইটিভি অনলাইনঃ প্রায়ই একটা অভিযোগ শোনা যায় যে, কৃষিখাতে গবেষণার পরিধি খুবই কম। এটিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আর প্রাইভেট খাত এ বিষয়ে কী অবদান রাখতে পারে?

এফ এইচ আনসারীঃ এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে গবেষণার পরিধি আসলেই অনেক কম। শুধু কৃষিখাতেই না বরং সবখাতেই। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় খুবই সীমিত পরিসরে কিছু গবেষণা হয়। তবে সেসব গবেষণায়ও অর্থ বরাদ্দ থাকে খুবই নগন্য। যিনি বা যারা গবেষণা করছেন তাদের বেতনাদি আর অফিস এসবের পিছনেই অর্থ চলে যায়। এভাবে তো গবেষণা হতে পারে না। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ড (অর্থ) থাকতে হবে। প্রয়োজনে ভালো করে যাচাই বাছাই করে সত্যিকার অর্থে যারা গবেষণা করছে বা করতে চায় সরকার শুধু তাদের ফান্ডিং করতে পারে।

আর প্রাইভেট খাতের কথা যদি বলেন, তাহলে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। যেমন আমাদের এসিআইয়ের বেশ বড় একটি আরএন্ডডি (রিসার্ড এন্ড ডেভেলপমেন্ট) বিভাগ আছে। এখানে কৃষিখাতের নতুন সব বিষয় নিয়ে আমরা গবেষণা করি। তবে মনে রাখতে হবে যে, প্রাইভেট খাতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তাই মূল উদ্যোগটা সরকারের পক্ষ থেকেই নিতে হবে। তবে পরিস্থিতি আগের তুলনায় যথেষ্ট উন্নত হয়েছে। সামনে আরও হবে। আর এভাবেই এক সময় দেশের কৃষিখাত আরও এগিয়ে যাবে এমন স্বপ্ন আমরা এসিআই দেখি।

//এস এইচ এস// এআর

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি