ঢাকা, রবিবার   ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, || আশ্বিন ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

বিএসটিআইয়ের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্ট হাইকোর্ট

প্রকাশিত : ২১:১০ ২১ মে ২০১৯

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের (এনএফএসএল) পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলায় উল্টো প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিএসটিআইয়ের ভূমিকা। সংস্থাটির কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তষ প্রকাশ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালত হাইকোর্ট।

বিএসটিআইয়ের আইনজীবী সরকার এম আর হাসানকে উদ্দেশ্য করে আদালত বলেছে, নিজেরা করেন না, আবার অন্যের পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আপনারা কেন এত দিনেও পরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে পারলেন না, জানতে চান আদালত।

পরে এনএফএসএল’র প্রধান শাহনীলা ফেরদৌসীর বক্তব্য শুনে মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ বিএসটিআই এর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বিএসটিআইয়ের আইনজীবীকে বিচারক বলেন, “আপনারা কাজ করার দায়িত্ব নিয়েছেন কিন্তু দায়িত্ব পালন করছেন না। আপনাদের পরীক্ষায় সত্য উদঘাটন হচ্ছে না কেন? শুধু এসি রুমে বসে থাকবেন, তা হবে না। আন্তর্জাতিক পরীক্ষায় পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু আপনারা পারছেন না কেন?”

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে এদিন আদালতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম। আর বিএসটিআইয়ের পক্ষে ছিলেন সরকার এম আর হাসান (মামুন)।

রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল হেলেনা বেগম চায় না। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক পরে সাংবাদিকদের বলেন, জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগারের প্রধান অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী এদিনে আদালতের তলবে হাজির হয়েছিলেন। তিনি তদের পরীক্ষার প্রতিবেদন হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করেছেন এবং নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।

“তাদের জরিপ ও পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিএসটিআইয়ের ভূমিকা নিয়েই আদালত অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

পাশাপাশি আদালত বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আগামী ২৩ জুনের মধ্যে সারাদেশ থেকে দুধ, দুগ্ধজাত খাদ্যপণ্য ও পশুখাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে।”

দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে কী পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক ও সীসা মেশানো রয়েছে, গেল ১৫ মে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে সে বিষয়ে তালিকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আর্থিক সহায়তায় গো খাদ্য, দুধ, দই ও বাজারে থাকা প্যাকেটের পাস্তুরিত দুধ নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় নিরাপদ খাদ্য গবেষণাগার (এনএফএসএল) একটি জরিপ চালায়।

ওই জরিপের জন্য দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গরুর দুধের ৯৬টি নমুনা সংগ্রহ করে এনএফএসএল। ঢাকাসহ তিন জেলার ছয়টি উপজেলাসহ ১৮টি স্থান থেকে দুধের পাশাপাশি অন্যান্য নমুনাও সংগ্রহ করা হয়। গরুর দুধ ও গোখাদ্য সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা হয়।

এনএফএসএল ঢাকা শহরের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দোকান ও আশপাশের উপজেলার দোকান থেকে দই সংগ্রহ করে। বিভিন্ন সুপার স্টোর থেকে সংগ্রহ করা হয় বাজারে প্রচলিত প্রায় সব ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত তরল দুধ এবং আমদানি করা প্যাকেট দুধ।

গোখাদ্যের ৩০টি নমুনা পরীক্ষা করে কীটনাশক (দুটি নমুনায়), ক্রোমিয়াম (১৬টি নমুনায়), টেট্রাসাইক্লিন (২২টি নমুনায়), এনরোফ্লোক্সাসিন (২৬টি নমুনায়), সিপ্রোসিন (৩০টি নমুনায়) এবং আফলাটক্সিন (চারটি নমুনায়) গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়ার কথা জানায় এনএফএসএল।

গরুর দুধের ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯ শতাংশ দুধে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশক, ১৩ শতাংশে টেট্রাসাইক্লিন, ১৫ শতাংশে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া যায় ওই গবেষণায়। সেই সঙ্গে ৯৬ শতাংশ দুধে পাওয়া যায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।

প্যাকেটের দুধের ৩১টি নমুনা পরীক্ষা করে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি হারে টেট্রাসাইক্লিন পাওয়ার কথা জানায় এনএফএসএল। সেই সঙ্গে ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ দুধের নমুনায় বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া পাওয়ার কথা বলা হয় প্রতিবেদনে।

দইয়ের ৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করে একটিতে সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়ার কথা জানায় এনএফএসএল। ৫১ শতাংশ নমুনায় পাওয়া যায় বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া।

শাহনীলা ফেরদৌসী তাদের এই প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর বিএসটিআইয়ের আইনজীবী বলেন, এই প্রতিবেদন যে সত্য- তা প্রমাণ করার সুযোগ কোথায়।

“তারা তো অন্য কোনো ল্যাবে যাচাই করেনি। তারা নমুনা সংগ্রহ করেছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার থেকে। কিন্তু পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও যশোরেই সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদিত হয়। সেখান থেকে তারা কোনো নমুনা সংগহ না করে ঢালাওভাবে বলে দিল দুধে এইসব রয়েছে।”

আদালত তখন বলে, অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী অভিযুক্ত নন, তাকে আদালতে ডাকা হয়েছে সহযোগিতার জন্য।

এনএফএল এর জরিপ ও পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় বিএসটিআইএয়ের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বলেন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাব আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠিত। এ প্রতিষ্ঠান তার পদ্ধতিতে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য পণ্য ও পশুখাদ্য পরীক্ষা করেছে।

এরপর আদালত শাহনীলা ফেরদৌসীর বক্তব্য শুনতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৫ সাল থেকে তারা এই গবেষণা করে আসছেন। এসব গবেষণার ফলাফল ফুড অ্যা্ন্ড অ্যাগ্রিকালচার অরগানাইজেশান আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ করে।

“আমাদের ল্যাবের মান অনেক দেশের চেয়েই উন্নত। আমাদের পরীক্ষার ফলাফল ঠিক আছে কি না তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাচাই করা হয়। পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রকাশ করা হয়। এই পরীক্ষার ক্ষেত্রেও সেটা করা হয়েছে।

“এখানে শুধুই তিনটি জেলা নয়, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের পণ্য রয়েছে। যেমন মিল্কভিটা, প্রাণ, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, স্বপ্ন অর্গানিক, আফতাব ডেইরি মিল্ক, ঈগলু ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের পণ্য সারাদেশেই পাওয়া যায়। সুতরাং বিএসটিআইয়ের দাবি যথাযথ নয়।”

 

আই// এসএইচ/

 

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি