ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ১৭ জুন ২০২১, || আষাঢ় ২ ১৪২৮

বিশ্ব কাব্য বৈঠকে বাংলা কবিতা

মিলটন রহমান

প্রকাশিত : ২১:০৯, ৮ জুন ২০২১ | আপডেট: ২১:২০, ৮ জুন ২০২১

গ্রন্থভূক্ত কবিতা ছিয়ানব্বই ভাষার। তা থেকে পাঠ হলো বারটি ভাষার কবিতা। বলছি পাঁচ জুন শনিবারের কথা। বহু ভাষা বহু বর্ণের মানুষের বসবাস লন্ডনের ব্যস্ত হেকনি কাউন্সিলে। সে অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের ছিয়ানব্বই ভাষা থেকে নির্বাচিত কবিতা এবং তার ইংরেজি অনুবাদ নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ ‘সোয়ার্ল অব ওয়ার্ড/সোয়ার্ল অব ওয়ার্ল্ড‘। সম্পাদক কবি স্টীফেন ওয়াটস। প্রকাশ করেছে পিয়ার আর্ট গ্যালারি। গ্রন্থটির প্রকাশনা এবং প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হয়েছে ৪ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত নানান অনুষ্ঠান। তারই অংশ ছিলো পিয়ার গ্যালারি সম্মুখে ৫ জুন। সেদিন বারটি ভাষার কবিতা উপস্থাপন করা হলো অনুবাদসহ।

প্রায় দেড় বছরের করোনা ঘোর কাটিয়ে বিপুল সংখ্যক কবি ও শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে। পিয়ার গ্যালারি সম্মুখে ফুল-লতাগুল্মের মধ্যে সাজানো মঞ্চ রোদের সাথে যেনো খিল খিল করে হেসে উঠছিলো। সপ্রতিভ কবি ও অনুবাদকদের একের পর এক উপস্থাপনা যেনো সে আনন্দ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিলো। লক্ষীপ্রসাদ দেবকোটা যখন নেপালী ভাষায় কবিতা পাঠ করছিলেন মনে হলো তিনি চর্যাপদ থেকে কোন একটি পদ আবৃত্তি করছিলেন। অনুবাদ ছাড়াই কবিতাটা বুঝা গেলো। তার ছন্দ আর পাঠের ভঙ্গিতে কবিতার রূপ আরো বেড়ে গেলো। মাইকেল হাট যখন কবিতাটির অনুবাদ ‘মুনা ইন হার সলিটিউড‘ পাঠ করলেন তখন উপস্থিত সবার কাছেই তা আর অধরা ছিলোনা, সেকথা সবার মুখের উজ্জলতাই বলে দিয়েছিলো। ফার্সি কবিতা যখন পাঠ করলেন জিবা কারবাসি। কবিতা পাঠের সময় আত্মার যে গভীর সম্মিলন তা যেনো সেই পাঠে এবং তার অঙ্গভঙ্গিতে স্পষ্ট হয়ে উঠলো। চুলে গুঁজে আসা ডাউস গোলাপ যেনো কবিতার কথায় নৃত্য করছিলো। 

স্টীফেন ওয়াটসের অনুবাদে ‘লেসগি/ডান্স‘ শুনার পর কবিতাটির মেজাজের সাথে পরিচয় হতে সময় লাগলো না। অমরজিত চন্দন যখন পাঞ্জাবি কবিতা পাঠ করলেন আহা নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসলো আমাদের। নিজের কবিতা যখন ইংরেজি অনুবাদে পাঠ করলেন তিনি, তখন ভিন্ন ভাষীরা কবিকে করতালিতে জানালেন অভিবাদন। আলেমু তেবেজ ইথিউপিয়ান উপভাষা আমহারিক ভাষার কবিতা যখন পাঠ করলেন তার অন্তর্গত ভাবটা অনুমান করা গেলো। তবে তার অনুবাদ ‘গৃটিংস টু দা পিপল অব ইউরোপ‘ যখন ক্রীস বেখেট পাঠ করলেন তখন বুঝতে অসুবিধা হলো না পূর্ব পুরুষের উত্তরাধিকার বহনের ইঙ্গিত। সেই সাথে উঠে আসে এক উদার জমিন। বলছে, ‘কেউ যদি তোমার ডান চোয়ালে লেগে ঘুমায় তাকে বাম চোয়ালেও ঘুমাতে দাও। কেউ যদি তোমার কোট পরতে চাই তাকে পেন্টটাও পরতে দাও।‘ কি অনন্য মানবিক আবেদন। আমার কবিতা ‘অনুরাগ‘ পাঠ করার আগে একটু ভুমিকা দেয়ায় বুঝা গেলো উপস্থিত প্রায় সকলেই পাঠ শুনার জন্য কান খাড়া করলেন। পাঠের পর করতালি পেলেও বুঝতে পারলাম অনুবাদ শুনার জন্য তাঁদের অপেক্ষা। 

কবি ফারাহ্ নাজ অনুবাদ পাঠ করার পূর্বে কিছুটা ভূমিকা দিলেন। পাঠ করলেন কবিতার অনুবাদ। এবার করতালিতে ‘পেয়েছি আমি তাকে পেয়েছি‘ ভাব দেখা গেলো সবার চোখে। অনুষ্ঠান শেষেও কেউ কেউ প্রসংশা করেছেন। সুইজারল্যান্ডে কিছু কিছু এলাকায় ইটালীয়ান ভাষার প্রচলন রয়েছে। যাকে বলা হয় সুইস ইটালিয়ান ভাষা। সেই ভাষার কবিতা পাঠ করলেন জর্জিও ওরেল। আবেদন মেজাজে এলে বসলো, তবে লরেন বিয়াঙ্কনি লিডারের অনুবাদ শুনার পর মনে হলো একটি মেটাফোরিক কবিতা শুনলাম। এক তরুণীর স্কাটের নীচ দিয়ে একটি নদী প্রবাহিত হওয়ার যে দৃশ্য চিত্রায়িত হলো তাতে, একজন কবিতার পাঠক হিসেবে কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যেই থেকেছি। 

স্টীফেন ওয়াটসের কবিতা ‘এ ভেরী লিটেল লাইট‘ যখন শুনছিলাম তখন বেঁচে থাকার প্রবল ইচ্ছে এবং লোভ জেগে উঠলো। সার্বিয়ান কবিতা পাঠ করলেন বেঙ্কু মিলজকভিক। এস ডি কার্টিজের কন্ঠে কবিতাটির অনুবাদ জানালো একটি রাত আর এই ভ্র²ান্ডের মধ্যকার বিরাজমান তুলনা। আলজেরিয়ার ফ্র্যান্স ভাষার কবিতা পাঠ করেছেন এনা গ্রেকি। অনুবাদক ক্রিস্টিনা ভিটি‘র কন্ঠে কবিতাটি শুনার পর স্মৃতি ভারাতুর একটি ইমেজ চোখে ভেসে উঠলো। যার আবেদন অত্যন্ত তী² এবং অনন্ত। বোলগেরিয়ান কবিতা ও তার অনুবাদ পাঠ করেছেন ক্রীস্টিনা কোনেভা। ‘লন্ডন‘ শিরোনামের কবিতাটা একটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিলো চলমান মহামারী ঘিরে। সেই প্রশ্ন, আমরা কি আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবো? আইরিশ কবিতা পাঠ করেছেন নোয়ালা নি ধমনীল। অনুবাদ পাঠ করেছেন কাউমিন মেক জিওলা লেইথ। ‘দি লর্দান লাইট‘ শিরোনামের কবিতাটির পাঠ শুনার সাথে সাতে যেনো প্রকৃতির গান শুনলাম। সবশেষ কবিতা পাঠ করেছিলেন জেন ডোরান। তিনি লোরকার কবিতা ‘ফার্স্ট গজল অফ আনফরসেন লাভ‘ কবিতাটি মূল ভাষা স্পেনিস এবং ইংরেজিতে অনুবাদ পাঠ করেন। ৫ জুন ছিলো লোরকার জন্মদিন। ফলে কবিতাটি আমাদের বেশি করে লোরকাকে মনে করিয়ে দিলো। 

অনুষ্ঠানে কবি ও অনুবাদকদের হাতে ‘সোয়ার্ল অফ দা ওয়ার্ড/ সোয়ার্ল অব দা ওয়ার্ল্ড‘ তুলে দেয়া হয়েছে। ছিয়ানব্বই ভাষার কবিতা এতে স্থান পেয়েছে। মূলত হেকনি এবং এর আশেপাশের এলাকায় যারা বসবাস করে তাদের ভাষার কবিতা এখানে স্থান পেয়েছে। চোখ বুলিয়ে দেখলাম অসামান্য একটি কাজ এটি। ভাষা মানুষের শিল্প-সংস্কৃতিকে কিভাবে পরিপূর্ণ রূপ দিতে পারে তারই স্বরূপ উন্মোচনে এই কাব্য প্রয়াস। তাতে বাংলা ভাষার কবিতা হিশেবে স্থান পেয়েছে আমার কবিতা। এ সুযোগ প্রাপ্তি বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষার জন্য সম্মাণের এবং বিশেষ অর্জন বলে মনে করি। কবি ফারাহ্ নাজের অনুবাদে কবিতাটি সকল ভাষাভাষীর কাছে পৌঁছেছে। সেই সাথে বাকি যেসব ভাষার কবিতা এ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে সেগুলো পাঠের পর আবারো মনে হলো কবিতার ভাষা এক, এর অন্তর্গত সুর অভিন্ন।

এসি
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি