ঢাকা, বুধবার   ২০ নভেম্বর ২০১৯, || অগ্রাহায়ণ ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

ভ্রমণপ্রেমী ব্রিটিশ তরুণী ন্যান্সি বাংলাদেশে  

প্রকাশিত : ২২:১৯ ২৭ জানুয়ারি ২০১৯

ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা/তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা/ও সে যে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে দেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা/এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি/সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত গানটিতে বাংলার আবহমান গ্রামীণ সৌন্দর্য আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। সত্যিই এমন মায়া মমতাময় চিত্র আর অপরূপ সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে। আর হয়তো এ কারণেই ব্রিটিশ নাগরিক এলিস ন্যান্সি টেইলর (২৮) বাংলাদেশে ছুটে এসেছেন।

ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারের রাইট রবিনসন কলেজের সাবেক শিক্ষক এই নারী ঘুরে বেড়ান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। প্রকৃতি, মানুষ আর বৈচিত্র্যের আহ্বানে। কখনও সড়কপথে তার বাহন সাইকেল আবার কখনও নদীপথে রাবারের ভেলায়। ভ্রমণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে যোগ দেন ম্যারাথনে। এবার তার ইচ্ছা নদীপথে বাংলাদেশের গ্রাম জনপদ দেখার।

গত মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে আসেন ন্যান্সি। বাংলাদেশি বন্ধু রাসেলের সঙ্গে যান নীলফামারীর ডিমলার নদী বেষ্টিত গ্রামগুলোতে। রাসেলের পরিকল্পনাতেই নদীপথে বাংলাদেশকে রাবারের ভেলায় চড়ে দেখার পরিকল্পনা করেন তিনি। বন্ধু রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে দুটি রাবারের ভেলায় নীলফামারীর ডিমলা থেকে পাঁচ দিনে নৌপথে বৈঠা চালিয়ে গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্রে আসেন। নীলফামারীর তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্ট থেকে যাত্রা করেন ন্যান্সি ও বন্ধু রাসেল। গ্রাম আর চরে নেমে সাধারণ মানুষের ঘরে বিশ্রাম নেন এই পথে আসার সময়। মঙ্গলবার তিস্তা নদী পরিভ্রমণ শেষে ঢুকে পড়েন গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র নদে। ব্রহ্মপুত্র নদ ধরে চলে আসেন গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি বন্দরে।

গাইবান্ধায় এসে রাসেলের ভেলা ফেটে যাওয়ায় দুঃসাহসী এই অভিযাত্রার সমাপ্তি ঘটে। রাতে গাইবান্ধার একটি রেস্টহাউসে উঠেন তারা। বন্ধু রাসেল ঢাকায় ফিরে যেতে চাইলেও অভিযাত্রার ছন্দপতন টানতে নারাজ অদম্য সাহসিকা এলিস ন্যান্সি। একাই ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা পাড়ি দিয়ে কুয়াকাটা যাওয়ার পরিকল্পনায় অটল থাকেন তিনি।

ব্রিটিশ তরুণী এলিস ন্যান্সি জানান, রাসেলের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব বহু দিনের। তারা একসঙ্গে ঘুরেছেন ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকার অনেক দেশে। কিলিমানজাদারো পাহাড়ে, আমাজান ফরেস্টে, ব্রাজিলে কিংবা গভীর সমুদ্রে।

ভ্রমণ প্রসঙ্গে ন্যান্সি টেইলর বলেন, আমরা দুজন দুটি ভেলায় যাত্রা করেছিলাম। রাসেলের ভেলাটি ফেটে যাওয়ায় সে যেতে পারছে না। কিন্তু এই সুযোগ আমি ছাড়তে চাই না। আমরা এ রকম চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসি। নদীপথে যেতে যেতে গত পাঁচ দিনে বাংলাদেশের মানুষের অতিথিপরায়ণ মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

ন্যান্সি আরও বলেন, এতো সুন্দর নদী আর প্রকৃতি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি। নিস্তব্ধ চরে অতিথি পাখির ঝাঁক তার মন কেড়েছে। যাত্রাপথে যেখানেই বিশ্রাম বা রাত যাপনের জন্য ক্যাম্প করেছি সেখানেই মানুষ আমাদের সাদরে গ্রহণ করেছে। ভাষা না জানলেও চরের নারীরা তাকে জড়িয়ে ধরে তাদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছে। সবচেয়ে ভালো খাবার রান্না করে খাইয়েছে। ফিরে আসার সময় কেউ কেউ চোখের পানিও ফেলে। মানুষ এত ভালো হয় কী করে!

মাহফুজুর আহমেদ রাসেল জানান, ইংল্যাল্ডে পড়তে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয় হয় ন্যান্সির। কাজ করে টাকা জোগাড় করে বন, পাহাড়, বরফের প্রান্তর, সমুদ্র, নদী দেখার জন্য এই ঝুঁকিপূর্ণ উন্মাদনা প্রথম দিকে তার কাছে অদ্ভুত মনে হতো। কিন্তু এক সময় তিনিও ভিড়ে যান সেই দলে। দুই বছর আগে দেশে ফিরে ঢাকার ছেলে রাসেল খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় নিজের আবাস গড়ে তোলেন। বন, পাহাড় ছাড়া এখন তার কিছুই ভালো লাগে না। মাহফুজ দেশে ফিরলেও যোগাযোগ নষ্ট হয়নি।

রাসেল বলেন, কথা বলার সময় ন্যান্সি বারবার একটি ম্যাপ দেখছিলেন। বারবার বলছিলেন, বল তো পুরো বাংলাদেশ নদী দিয়ে ঘুরতে কত সময় লাগবে। ন্যান্সি আরও বলেন, ‘ম্যাপ দেখে আমরা দক্ষিণ দিকে রওনা হয়েছিলাম। যত সময় লাগুক, যত কষ্ট হোক, ইচ্ছে ছিল সব কটি নদী কিভাবে এক হয়ে সাগরে মেলে সেটি দেখার। সেখান থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার। পথে কত সৌন্দর্য আর মানুষের সঙ্গে দেখা হবে। তাই আমি হাল ছাড়িনি। এবার যদি না হয়, আবার ফিরে আসব। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি। তোমাদের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও উন্নত সংস্কৃতির কথা আমি জানি।

তিনি বলেন, ন্যান্সি এখন আমাকে ছাড়াই একা নদীতে নেমেছে। আমার মন ভীষণ খারাপ। কারণ শুধু প্রকৃতির কাছে যাওয়ার লোভে কোনো ব্যক্তিগত জীবন গড়ে তুলিনি। শুধু ভেলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় দুই বছরের পরিকল্পনার সঙ্গে আমার থাকা হলো না।

 

এসএইচ/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি