ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ১৭:৫২:১০

Ekushey Television Ltd.
পাট পণ্য মেলার আকর্ষণ

মাত্র এক টাকায় ‘পাট চা’

রিজাউল করিম

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১১:৪৭ পিএম, ৯ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০২:১৪ পিএম, ২৯ মার্চ ২০১৮ বৃহস্পতিবার

সোনালি আঁশ খ্যাত পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট পাট বাংলাদেশের মাটিতে-ই জন্মে।এক সময়ে এটি ছিল পৃথিবীর একমাত্র অর্থকরি ফসল। নানামুখী কূটকৌশলে তা হারাতে বসেছিল। যড়যন্ত্রের নীলনকশায় বাংলার পাট দিয়ে লাবভান হচ্ছিল অন্যদেশ। কিন্তু সরকারের নানামুখী উদ্যোগে তা আবার ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে।

বাংলার শহর-গ্রাম, চায়ের দোকান, ফুটপাত থেকে শুরু করে অফিস-আদালত পাটের এমন গৌরবময় কথামালার শেষ নেই। নেই তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনায় ক্লান্তি। তবে আলোচনায় শরীরে ক্লান্তি না আসলেও গলায় খুশখুশি ঠিক-ই শুরু হয়। তখন এক কাপ চা বড় জরুরি হয়ে পড়ে আলোচকদের। ভয় নেই, যেহেতু পাট নিয়ে আলোচনা; গলা ঠিক রাখতে পাটেই পাবেন তার সামাধান। নিজ দেশের গবেষণায় তৈরি হওয়া পাটের চায়ে-ই পাবেন গলা খুশখুশি বন্ধের মতো পূর্ণ চায়ের তৃপ্তি। এ তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে আপনার খরচ পড়বে এক টাকারও কম। যা পাওয়া যাচ্ছে এবারের পাট পণ্য মেলায়।

পাটের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে এ খাতের নতুন সম্ভাবনা জাগাতে বিশ্ববাজারে পাটজাত পণ্যে বৈচিত্র্য ও বাজার সম্প্রসারণের লক্ষে রাজধানী বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জুট ডাইভাসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এর উদ্যোগে  চলছে পাট পণ্যের মেলা। মঙ্গলবারে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত। মেলায় ১২০টি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। যেখানে ২৩২ রকমের বহুমুখী পাটপণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করা হচ্ছে।

প্রদর্শীত এ পণ্যগুলোর মধ্যে আগন্তুকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করছে পাট পাতার তৈরি চা। সুদৃশ্য দুটি প্যাকেটে এ চা বিক্রি হচ্ছে। আগন্তুকদের অনেকেই তা কিনে নিচ্ছে। কেউ আবার বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের জুটস্টলের ক্যান্টিনে থাকা এ পাটের গরম চায়ের স্বাধও নিচ্ছে। স্বাধ যাচাইয়ের জন্য যা দেওয়া হচ্ছে বিনামূ্ল্যে। ভালো লাগলে যে কেউ কিনতে পারছেন ৫০ টাকা ও ১০০ টাকায় বড়-ছোট মানের যেকোন প্যাকেট।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর থেকে বেসরকারি চাকরিজীবী হারুন এসেছিলেন মেলায়। তিনি বলেন, আমি মেলায় এসেছি ঘুরতে। মেলায় অনেক পাট পণ্য দেখলাম। যার প্রাই সবই আগে দেখেছি। কিন্তু পাটের তৈরি চা এর আগে দেখিনি। এবার দেখলাম। এক কাপ খেয়েও নিলাম। স্বাধে বোঝা যাচ্ছে এটা পাটের পাতা দিয়ে-ই তৈরি। শুনলাম এটি শরীরের বেশ কয়েকটি রোগের হাত থেকে রক্ষা করবে। তাই দুই প্যাকেট কিনে নিলাম।

স্টলটিতে রাজধানীর মালিবাগ থেকে আসা রহিমা আফরোজ রিমকি বলেন, যে কোনো জিনিস প্রথমে আসলে তার প্রতি অনেকেই নাক ছিটকায়। যেমন নতুন যখন দেশে পোল্ট্রি মুরগী আসলো, অনেকে না খেয়ে-ই উল্টা-পাল্টা মন্তব্য করেছে। কিন্তু এখন তারা ঠিক-ই খায়। এখন পোল্ট্রি বন্ধ হয়ে গেলে অনেকের মাংস খাওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, আবার আমরা এখন যে চা খাচ্ছি, সেটা কি প্রথম-ই এমন খেয়েছি; খায়নি। এখন যেমন প্রতিটি বাড়ীতে চা আপ্যায়নের অন্যতম উপকরণ। তেমনি একদিন আসবে পাট পাতার তৈরি চা সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠবে। তাই আমি এক দেখাতেই কিনে নিলাম এক প্যাকেট। ভালো হলে তো পরে আরো কিনবো।

স্টলে থাকা বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের মার্কেটিং বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার এসকে রহমাতুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ ও জার্মান যৌথ অর্থায়নে গবেষণার মাধ্যমে এ পাট চা উদ্ভাবন করা হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ছাড়পত্রও পেয়েছি। খুব শিগগিরই এটা বাজারেও পাওয়া যাবে।

আমরা মূলত পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সম্মত পণ্য তৈরিতে নজর দিয়েছি। স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনায় বাংলাদেশের পাট চা এক অন্যন্য আবিষ্কার। আর পরিবেশের কথা চিন্তা করে পলিথিনের মতো দেখতে পাটের তৈরি পলিব্যাগ বিশ্বের নজর কেড়েছে। এ দু’টি বাংলাদেশের গবেষণার নতুন ফসল।           

জানা গেছে, সোনালি আঁশকে বাঁচিয়ে রাখতে এর পণ্য বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে পাট পাতার ‘সবুজ চা’ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করতে কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। এ চায়ে ভেষজ গুণ থাকায় বিদেশে চাহিদা আছে। এর মধ্যেই ২০০ কেজি পাটের চা জার্মানিতে রফতানি করা হয়েছে। আরও ৩ হাজার কেজি রফতানির আদেশ পাওয়া গেছে। সব ঠিক থাকলে এ বছরই স্থানীয় বাজারে চা বাজারজাত করা হবে।

বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসিমুল গনি  বলেন, ১৯৯৩ সালের দিকে তারা এটি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করেছিলেন। তারপর দীর্ঘ দিনের পরীক্ষা নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা হয়েছে পাট পাতার গুণাগুণ এবং সেটা চা হিসেবে পান করার সময় যথাযথ থাকে কি-না এসব নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীরা।

পাটের পাতা থেকে চা বানানোর প্রক্রিয়ার বিবরণ দিয়ে ড. নাসিমুল গনি বলেন, ফুল আসার আগেই পাট গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করতে হবে। পরে সে পাতা সূর্যের আলোতে শুকোতে সাইজ মতো গুঁড়ো করে নিতে হবে। এরপর মধু বা চিনি দিয়ে এ চা পান করা যাবে। আবার এগুলো ছাড়াও পান করা যাবে। পাট শাকের সব ভেষজ গুণাগুণও পাট পাতা থেকে তৈরি হওয়া চায়েও থাকবে।

পাট গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক মাইনুল হক বলেন, তোষা পাটের পাতা থেকে তৈরি করা চা সুস্বাদু হবে। কিন্তু দুধ মিশিয়ে এ চা খাওয়া যাবে না। তার মতে এটি গ্রিন টির বিকল্প হবে এবং গুণাগুণের কারণেই এটি দ্রুতই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, ওয়ার্ছি অ্যাকুয়া এগ্রো টেক নামক একটি প্রতিষ্ঠান পাটের পাতা দিয়ে তৈরি অর্গানিক চা রপ্তানি ও বাজারজাতকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও বিজেএমসির উপদেষ্টা এইচ এম ইসমাইল খান বলেন, আপাতত তারা এ চায়ের নাম দিয়েছেন মিরাকল অর্গানিক গ্রিন টি। তবে নাম চূড়ান্ত হবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্টের জন্য করা আবেদন অনুমোদনের পর। ভোক্তাদের প্রতি কাপ চায়ের জন্য খরচ পড়বে এক টাকারও কম।

এইচএম ইসমাইল খান আরো বলেন, গত ১৪-১৭ ফেব্রুয়ারি জার্মানির নুরেমবার্গে বায়ো ফেয়ার নামে অর্গানিক পণ্যের মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইন্টারট্রপ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ‘পাটের চা’ প্রদর্শন করে। এতে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ৩ হাজার কেজি চা রফতানি আদেশ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত বছর পর্যন্ত ২০০ কেজি রফতানি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় বাজারে চা সরবরাহের উদ্দেশ্যে জামালপুরের সরিষাবাড়িতে একটি কারখানা ভিত্তি স্থাপন করেছে বিজেএমসি। এ মৌসুমে পাতার সংগ্রহের ওপর ভিত্তি করে বছরের শেষ দিকে বাজারে পাটের পানীয় ছাড়া যাবে বলে আশা করছি।

এক নজরে পাট চায়ের গুণাগুণ: ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, হৃদরোগ, রক্তচাপ, কোলেস্টরল, লিভার সুরক্ষা ও জীবাণু সংক্রমণ রোধে পাটের চা বেশ কার্যকরী। এ চা ডায়বেটিক রোগীর রক্তে শর্করা বেড়ে যাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে ও রোগীর বার্ধক্যজনিত অন্ধত্ব ও অন্য সব জটিল রোগের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। পাটের চায়ে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে, যা মানবদেহের দুর্বল কোষে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে দেয় না। এতে ক্যান্সারের সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া রাসায়নিক বিষক্রিয়ার কারণে লিভার ড্যামেজ ও এবং জন্ডিস প্রতিরোধে সক্ষম এই চা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করতে বয়োবৃদ্ধদের সাহায্য করে। এছাড়া আলসার ও ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও কার্যকর পাটের চা।

আরকে/টিকে



© ২০১৮ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি