ঢাকা, রবিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২২

মোহনার শহরে কবিতারা ঢেউ খেলে

রকিবুল হাসান

প্রকাশিত : ১৯:২০, ২৪ নভেম্বর ২০২২

‘চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’র আমন্ত্রণে চাঁদপুরে গিয়েছিলাম, ১৯ নভেম্বর। যাবার টান ছিল আগে থেকেই, যেন ডাকাতিয়া নদীর স্রোত খুব করে টানছিল। এর সুনির্দিষ্ট কয়েকটি কারণ আছে। প্রথম কারণ মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর চাঁদপুরের পবিত্র মাটিকে স্পর্শ করা। কারণ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ নং সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। কুষ্টিয়া ৮ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমার বাড়ি কুষ্টিয়া। যে কারণে তাঁর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। এই প্রগাঢ় শ্রদ্ধবোধ থেকেই তাঁর সঙ্গে একবার দেখাও করেছিলাম। দ্বিতীয় কারণ চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। তৃতীয় কারণ ডাকাতিয়া, পদ্মা ও মেঘনা ত্রি-নদীর মোহনা।

সবকিছু মিলে চাঁদপুর আমাকে খুব করে টানছিল। চাঁদপুর তো বেশি দূরে নয়, তারপরও যাওয়া হয়ে ওঠেনি আমার। না গেলেও এখানকার কিছু মানুষ আমার অন্তরের, আমার আত্মার, আমার ভালোবাসার। যাদের সঙ্গে কখনোই চাক্ষুস সাক্ষাৎ আমার ঘটেনি। কিন্তু তাদের দেখার ব্যাকুল আকুলতা আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল আগে থেকেই। এর প্রধানতম কারণ সাহিত্যচর্চা। চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির সভাপতি কবি নুরুন্নাহার মুন্নি, মহাপরিচালক কবি রফিকুজ্জামান রণি ও নির্বাহী পরিচালক কবি আইরিন সুলতানা লিমা এঁরা কবে কবে কীভাবে আমার অন্তরের আপনজন হয়ে গেছে, বুঝিনি। কিন্তু এটুকু বুঝেছি তারা আমার অন্তরের মানুষ, আপনজন। তাদের কবিতা আমাকে মুগ্ধ করে। তাদের কবিতার নিয়মিত পাঠক আমি।

চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি আমাকে গবেষণা সাহিত্যে ‘চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ২০২২’ প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায়, আমি আনন্দিত হই এবং সানন্দচিত্তে চাঁদপুরে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। এটি আরো গভীর আনন্দ ও আবেগের হয়ে ওঠে যখন জানতে পারি একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক ও জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বন্ধু মনি হায়দার পুরস্কার-অনুষ্ঠানে প্রধান ও বিশেষ অতিথি হয়ে যাবেন। আরো ভালো লেগে যায়, যখন জানতে পারি অনুষ্ঠানে দেখা হবে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি হেনরী স্বপন, কথাসাহিত্যিক পলাশ মজুমদার, প্রাবন্ধিক পীযূষ কান্তি বড়ুয়া, অনুবাদক-কবি মাসুদুল হক, শিশুসাহিত্যিক হুমায়ুর কবীর ঢালী, কারুশিল্পে সমীরণ চন্দ্র দত্ত ও
সাংগঠনিক সুমা ভৌমিকসহ চাঁদপুরের অসংখ্য কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে। এদের অনেকেই আমার ঘনিষ্ঠজন-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ। প্রবল এক আবেগ অনুভব করছিলাম চাঁদপুরে যাবার, সেই অবেগকে আরো তাড়িত করেছেন আমার পরম স্নেহভাজন কবি-প্রাবন্ধিক অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। তিনি আমার সহকর্মীও। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। 

এসব আবেগ এখানে আড়াল করতে চাই না। আমি জানি, এ পুরস্কারের যোগ্য আমি নই। অনেক বেশি যোগ্য গবেষক রয়েছেন, এটা আমি শ্রদ্ধাচিত্তে মানি ও স্বীকার করি। কিন্তু চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি আমাকে ‘চর্যাপদ সাহিত্য পুরস্কার’-র জন্য বিবেচনা কওে যে সম্মান ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন, তা উপেক্ষা করার মতো শক্তি আমার ছিল না। বরং অনেক খুশিচিত্তে তা গ্রহণে সম্মত হই। ১৯ নভেম্বর ঢাকা থেকে ভোর ছয়টায় প্রিয়ভাজন অধ্যাপক-কবি মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সঙ্গে রওয়ানা দিয়ে পথ চলতে চলতে একবারও ভাবিনি কতোটা সম্মান কতোটা ভালোবাসা কতোটা আন্তরিকতা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে অবারিত দিগন্ত বিস্তৃত যে সবুজ দেখেছি তাতে চোখ ভরে গিয়েছে, মন ভরে গিয়েছে।

আবার একই সঙ্গে নদীর সংকুচিত হয়ে আসা দেখে, মরণ নিশ্বাঃস অনুভব করে কষ্টও পেয়েছি। অনুষ্ঠানের বেশ আগেই পৌঁছেছিলাম চাঁদপুরে। কবি সজীব মোহাম্মদ আরিফের আন্তরিক সঙ্গ যারপরনাই আমাদের মুগ্ধ করে। পুরনো রেলস্টেশন, ইলিশের বিশাল ঘাট, আর ত্রি-নদীর মোহনা মনে প্রাণে ঢেউ হয়ে ওঠে অশেষ আনন্দে। প্রশ্নও তৈরি হয়েছে পুরনো রেলস্টেশনের জীর্ণ অবস্থা দেখে। মোহনায় পানি ছুঁই ছুঁই পাথরে দাঁড়াতেই মনে হয় যেন কবিতারা ঢেউ খেলে ভেসে যাচ্ছে দূর দিগন্তে শব্দশৈলীতে তৃষ্ণার্ত প্রেমে। তখন কবি প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, কবি সজীব মোহাম্মদ আরিফ ও আমি সেলফি খেলায় মেতে উঠি ঢেউ খেলাদের মতো নিবিড়তায়।

একাডেমির মহাপরিচালক কবি রফিকুজ্জামান রণির সঙ্গে প্রথম দেখা হতেই আনন্দে এক চিৎকার দিয়ে ওঠে আমার নাম ধরে ‘রকিব ভাই’ আমার কর্ণকুহরে ও মনে এখনো তা আনন্দলহরী হয়ে ভাসছে, অনুভব করছি। রোটারী ক্লাবে অনুষ্ঠান। হলরুমে ঢুকতেই সভাপতি কবি নুরুন্নহার মুন্নি আনন্দ উচ্ছ্বাসে কাছে ছুটে এলেন। কবি শিউলী মজুমদার, দুখাই মুহাম্মদ, জয়ন্তী ভৌমিক, নন্দিতা দাশ সহ আরো অনেকেই। একটু পরেই এলেন সারামুখে হাসির আভা ছড়িয়ে কবি আইরিন সুলতানা লিমা। সবাই এমন
আন্তরিকতায় এতো ভালোবাসায় আমাকে গ্রহণ করলেন, আমার ভেতরে তা আনন্দ-অশ্রæ হয়ে নদীর গভীর স্রোতের মতো বয়ে গেলো নীরবে, সবার অলক্ষ্যে। আমি মুগ্ধ হলাম। আমি আপ্লুত হলাম। 

আমার একবারও একটুও মনে হলো না, আমি এই প্রথম চাঁদপুরে এসেছি। একবারও মনে হলো না এই মানুষগুলোকে প্রথম দেখছি। মনে হলো এরা সবাই আমার বহু কালের বহু আপন-বহুকাল ধরে আমাদের ভালোবাসাবাসি। কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক যখন সুসজ্জিত হলরুমে ঢুকলেন, তখন অপার্থিব এক আলোয় ভরে উঠলো পুরো হলরুম। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানাই, সম্মান জানাই, নিজেরাও সম্মানিত হই। অনুষ্ঠান শুরু হয় হাওয়াইয়ান গিটারের নান্দনিক সুরে। গিটার বাজান জনপ্রশাসন
পদকপ্রাপ্ত ও চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা সম্মাননা প্রাপ্ত গিটারিস্ট দিলীপ ঘোষ। সঙ্গে কবিতা আবৃত্তি ও আলোচনায় মনোমুগ্ধকর ছিল অনুষ্ঠান। কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, কথাসাহিত্যিক মনি হয়দার, কবি নুরুন্নাহার মুন্নি, সাংবাদিক গিয়াসউদ্দি মিলন, কবি আইরিন সুলতানা লিমাসহ প্রায় সবার আলোচনা ছিল অসাধারণ। হাসি আর সাবলীলতার আলোকচ্ছটায় সাধারণভাবে উপস্থাপন করে অসাধারণ ব্যঞ্জনা তৈরি করেন একাডেমির মহাপরিচালক কবি রফিকুজ্জামান রণি। পুরস্কারপ্রাপ্তদের সংক্ষিপ্ত
জীবনী ও সাহিত্যকর্ম পাঠ অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। আমার জন্য খুবই আনন্দের মুহূর্ত হয়ে ওঠে যখন চাঁদপুরের প্রিয়মুখ কবি আইরিন সুলতানা লিমা ও কবি নন্দিতা দাশ আমাকে উত্তরীয় পরিয়ে দিলেন, সেই মুহূর্ত আমার অন্তর-মানসে উজ্জ্বল আভা হয়ে থাকবে, বহুদিন। 

আমার জন্য পরম এক মাহেন্দ্রক্ষণ হয়ে এলো যখন আমি বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের জীবনসঙ্গী একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য থাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের হাত থেকে চর্যাপদ সাহিত্য পুরস্কার গ্রহণ করি, এমন গর্বিত ও আলোকিত মুহূর্ত কল্পনাতেও মেলানো কঠিন। তখন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের পাশে দাঁড়ানো জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার, কবি নুরুন্নাহার মুন্নি ও বিভিন্ন গুণীজন। সেদিন যে আলো আমার বুক ভরে দিয়েছে, মন ভরে দিয়েছে, তা আমার চিরকালের গর্ব হয়ে থাকবে। আসলে, ভালোবাসার চেয়ে ভালো কিছু নেই, সুন্দরের অধিক সুন্দর। চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমির কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

এসি
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি