ঢাকা, শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯, || ভাদ্র ৯ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

শার্শায় চিকিৎসকের অবহেলায় প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ

মো. জামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ১০:৫১ ১৬ জুলাই ২০১৯ | আপডেট: ১০:৫২ ১৬ জুলাই ২০১৯

যশোরের শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া-সাতমাইলে রুবা ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় হীরা বেগম (২৪) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে হীরা বেগম মারা যান। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ওই ক্লিনিকে চিকিৎসকের অবহেলায় ৪ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।

রোগীর স্বজনেরা বলছেন, ক্লিনিকে ভর্তি হওয়ার পর তিন দিন রোগী যন্ত্রণায় ছটফট করলেও চিকিৎসক সিজার বা অন্যত্র রেফার্ড না করে প্রসূতিকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। রোগীর মৃত্যুর পর শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠিয়ে দায় উদ্ধার হওয়ার চেষ্টা করছে বলে তাদের অভিযোগ।

মারা যাওয়া হিরা বেগমের স্বামী কবির হোসেন জানান, গত শনিবার তার স্ত্রীর প্রসব বেদনা উঠলে তার স্বজনেরা রুবা ক্লিনিকে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টার পর চিকিৎসক আহসান হাবীব রানা জানান, এখনও সময় হয়নি। নরমাল ডেলিভারি হবে, অপেক্ষা করুন। এর মধ্যে প্রসব বেদনা কমে যায়। রোববার রাত থেকে রোগী প্রসব বেদনায় ছটফট শুরু করলে ডা. রানা ঘুমের ওষুধ দিয়ে রোগীকে ঘুম পাড়িয়ে রাখেন। গতকাল সোমবার রাত ৮টায় আবারো ছটফট করতে করতে হিরা বেগম মারা যায়। এ সময় ডা. রানা তড়িঘড়ি করে উন্নত চিকিৎরার জন্য শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যেতে বলেন স্বজনদের। দ্রুত সেখানে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাক্তার পরিতোস কুমার ধর জানান, রোগী অনেক আগেই মারা গেছে।

এ ব্যাপারে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাক্তার পরিতোস কুমার ধর এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রোগী রাত ৮টার আগেই মারা গেছেন এবং পেটের বাচ্চা ২ দিন আগেই মারা গেছে।

এর আগে ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এই ক্লিনিকে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় ঝিকরগাছার শিমুলিয়া গ্রামের সুকুমার দাস (৪০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে। তার হাঁটুতে অস্ত্র পাচার করার পর থেকে রক্ত বন্ধ করতে পারেনি ডাক্তার ও তার ডাক্তার ছেলে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান সুকুমার। আর ডাক্তার বলেন, ওর হার্টের রোগ ছিল। তাই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছে। এর পর একই সালের ১৫ জুন ডাক্তারের ভুল অপারেশনে মারা যায় একই উপজেলার খাসখালি গ্রামের শিমুল (৩০) নামে এক যুবক। ৪ দিন আগে শিমুলকে তার পায়ের গ্যাংগ্রিন অপারেশনের এই ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। শিমুলকে অপারেশনের জন্য ডা. রানা তার একজন ওয়ার্ডবয়কে দিয়ে অজ্ঞান করানোর ইনজেকশন দিয়ে অপারেশন করেন। তারপর থেকে শিমুলের আর জ্ঞান ফেরেনি। এ ঘটনা জানাজানির আগেই ভয় দেখিয়ে ক্লিনিক থেকে তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর পর ২০১৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর এই ক্লিনিকে ডাক্তারের অপচিকিৎসায় শার্শা উপজেলার সামটা গ্রামের আলমগীর ড্রাইভারের স্ত্রী আয়েশা বেগম (২৭) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। ডাক্তার রানা ও তার স্ত্রী ডাক্তার জেরিন আফরোজ দিনভর রোগীকে ভুল চিকিৎসা দিতে থাকে। এক পর্যায়ে রাতে রোগীর অবস্থার অবনতি হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। এসময় তড়িঘড়ি করে স্বজনদের ডেকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন ডাক্তার। ততক্ষণে রোগী মারা যায়।

স্থানীয় সংবাদ কর্মীরা জানান, এর আগেও এ ক্লিনিকে বাগআঁচড়া ইউনিয়ন বিয়ে রেজিস্টার হাফিজুর রহমানের স্ত্রীর প্রসাব বেদনা উঠলে এ ক্লিনিকের ডাক্তারদের অপচিকিৎসায় মারা যায়।

এ ব্যাপারে রুবা ক্লিনিকের চিকিৎসক ডা. আহসান হাবীব রানার মোবাইলে জানার চেষ্টা করলে তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি।

এ ব্যাপারে বাগআঁচড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই আব্দুর রহিম হাওলাদার জানান, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোনও অভিযোগ করেনি। অভিযোগ দিলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এলাকার লোকজন জানান, বাগআঁচড়া বাজারে ছোট বড় প্রায় ১৫টি ক্লিনিক অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে এবং এসব ক্লিনিক চলছে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মোটা অংকের মাসোহারা দিয়ে। গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার থেকে শুরু করে এমবিবিএস বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা এসব ক্লিনিকের মালিক। ফলে সাধারণ মানুষ টাকা খরচ করেও উপযুক্ত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নাম সর্বস্ব এসব ক্লিনিকে বছরে অর্থ বাণিজ্য হয় লাখ লাখ টাকা। বাংলাদেশ সরকারের দি মেডিকেল প্রাকটিস এন্ড প্রাইভেট ক্লিনিক ল্যাবরেটরিজ রেজুলেশন অডিন্যন্স ১৯৮২ মোতাবেক বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে যেসব জনবল, চিকিৎসা যন্ত্রাংশ এবং পরিবেশ বজায় রাখার কথা এসব ক্লিনিকে তার লেশমাত্র নেই। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০ বেডের জন্য অনুমতি থাকলেও কোনও কোনও ক্লিনিকে ৩০ বেড, কোনটি আবার ৫০ থেকে ৬০ বেডের যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব ক্লিনিকগুলোর অপারেশন থিয়েটারগুলোর অবস্থা আরো শোচনীয়। অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত অক্সিজেন ব্ল্যাড ও আলোর ব্যবস্থা নেই। অথচ সেখানেই চলছে বড় বড় অপারেশন। এসব ক্লিনিকে অপারেশনগুলো করা হয় নির্ধারিত চুক্তিতে। তাই অপারেশন করা রোগীদেরকে নিজেদের দোকান থেকে অত্যন্ত  নিম্নমানের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। ফলে ওই সব রোগী ক্লিনিক ত্যাগ করলেও পরবর্তীকালে নানা জটিলতায় ভুগে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।               

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি