ঢাকা, শুক্রবার   ২২ জানুয়ারি ২০২১, || মাঘ ৯ ১৪২৭

শ্রীমঙ্গলে নষ্ট হওয়ার পথে বোরো ফসল: দিশে হারা কৃষক

বিকুল চক্রববর্তী, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: 

প্রকাশিত : ১৯:১৪, ১২ এপ্রিল ২০২০

বৃষ্টি না হওয়ায় মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরের বুরো ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। এদিকে কাজে আসছেনা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কৃষকদের জন্য নির্মান করা রাবার ড্যাম্প। হীন স্বার্থে কষকদের পানি না দিয়ে ফিসারী ও বিলে মাছ চাষীদের স্বার্থে বিকল্প পথে পানি দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন কৃষকরা। এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে লিখিত  অভিযোগও করেছেন কৃষকরা। 

কৃষকদের এ অভিযোগের খবর পেয়ে শুক্রবার হাইল হাওরের শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের উত্তরশূর এলাকায় সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শত শত একর বুরো ধানের মাঠে মাটি হা করে আছে পানির জন্য। এসময় ধান ক্ষেতেপাশে অবস্থান করা কৃষকদের মানষিক ভাবে ভেঙ্গে পড়তে দেখা যায়। কৃষকের আর্তনাদ দেখে মনে হয়েছে এ যেন কৃষকের বুকের মধ্যে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এখন ধান পাকার সময় কিন্তু অধিকাংশ জমিতে ধানের শীষই আসেনি। অনেক অংশে গাছের অগ্রভাগ মরে গেছে। এ সময় কৃষক  নেপাল বৈদ্য জানান, সহসা  কয়েক দফা বৃষ্টি না হলে এবছর তাদের না খেয়ে মরতে হবে। অনেক টাকা খরচ করে বুরো ক্ষেত করেছেন। এখণ খরায় সব শেষ হয়ে  যাবে। তারা বলেন, প্রায় বছরই খড়ায় বুরো ফসলের সময় তারা পানির জন্য ফসল হারান। তাই তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েক বছর আগে সরকার বিলাস নদীর উপর রাবার ড্যাম্প স্থাপন করে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়ন, আশিদ্রোন ইউনিয়ন ও ভুনবীর ইউনিয়নের কৃষকদের এই সময়ে পানি দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ বছর অন্য সবাইকে পানি দিলেও শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের অংশে পানি না দেয়ায় শত শত একর জমি পানির অভাবে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, পানি সেচ  ব্যবস্থানায় প্রযুক্তি ও সহজ করতে সরকার ৫ বছর আগে হাওরের অদূরে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে একটি রাবার ড্যাম্প নির্মাণ করে। প্রথম কয়েক বছর এ থেকে সুফল পেলেও এই ড্যাম এখন এ অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকদের দীর্ঘশ্বাসের কারন হয়ে দাড়িছে। 

ড্যাম্প নির্মাণের পর পানি ব্যবস্থাপনার শৃংখলা আনতে লংলা নদী সমবায় সমিতি নামে একটি সমিতি গড়ে তোলা হয়। ভুনবীর ইউপি চেয়ারম্যান চেরাগ আলী এই সমিতির সভাপতি আর স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া এর সাধারণ সম্পাদক । স্থানীয় কৃষক নেপাল বৈদ্য আরো জানান, এখানে সাড়ে ৪ একর জমিতে তিনি এবার বোরো লাগিয়েছেন। কিন্তু পানির অভাবে এখন পর্যন্ত প্রায় দুই একর জমির ফসল পুড়ে গেছে। 

অপর কৃষক ওমর আলী অভিযোগ করেন, বোরোর ফসলের এই পানি পাশের ব্র্যাক মাছের খামারে বিক্রি করছে সমিতি। সামনে করোনা থেকে খাদ্য সংকট দেখা দিলে এই ফসলে পরিবার পরিজন নিয়ে দুবেলা খেয়ে পড়ে বেচে থাকতে পারতেন। ফসল নষ্ট হলে এখন তো বউ ছেলে নিয়ে পথে বসতে হবে তাদের। তিনি জানান, ৭ একর জমিতে এবার বোরো চাষ করে বিপাকে পড়েছেন । বিগত এক মাস ধরে  রাবার ড্যাম্পের পাম্প  ম্যানের কাছে তিনি ধর্ণা দিয়ে পানি পাচ্ছে না। ধানের চারায় এসময় ফুল এসেছে আর সেই সময়ে পানির অভাবে চারা শুকিয়ে ধুসর বর্ণ ধারণ করছে। তিনি বলেন, এই ফসল ঘরে তুলতে না পারলে তাদের না খেয়ে থাকতে হবে।  একই এলাকার কৃষক ইন্নান মিয়া জানান, ৩ একর জমিতে এবার বোরোব আবাদ করেছেন। জমি তৈরী, বীজ, চারা রোপন, সার ও পরিচর্যা করে এ পযর্ন্ত চারা বড় করতে সব খরচ করে ফেলেছেন। সরকার থেকে কোন সহায়তাও পাওয়া যায়নি। এখন পানির অভাবে এই শস্য ঘরে তুলতে না পারলে পরিজন নিয়ে অভুক্ত থাকতে হবে। 

এইক অবস্থা এই এলাকার রহমত আলী, মিন্টু বৈদ্য, মাঃ মইনুদ্দিন, ছবির মিয়া, মংগল মিয়া, ফয়জুল্লাহ, ওমর মিয়াসহ আরোও অনেক প্রান্তিক কৃষকের। তারা জানান, ড্যাম্পে অপর অংশে বিলাসের পাড়ে ফসল কম এমন জমিতে ও বিভিন্ন ফিসারীতে পর্যাপ্ত পানি দেয়া হয়েছে। অথচ কৃষিকাজের জন্য নির্মিত সরকারী এই ড্যাম্পের পানি থেকে কৃষকরাই বঞ্চিত হচ্ছেন। উক্ত বিষয়ে গত ৯ এপ্রিল স্থানীয় কৃষকগণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বরাবর সেখাসে পানি সেচের দাবীতে একটি লিখিত আবেদন করেন।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি সদস্য দুদু মিয়া বলেন, আশিদ্রোন, উত্তরসূর ও ভূনবীর এলাকায় এই ড্যাম্পের পানি বন্টন করা হয়। কিন্তু এবার খরার কারনে গোপলা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে। একই সাথে চারিদিকে পানির চাহিদা বেড় যাওয়ায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন ২-১ দিনের মধ্যে এ সমস্যা কেটে যাবে। ড্যাম্প অপারেটর সুরুক মিয়াও একই ভাবে ছড়ায় পানির স্রোত কম বলে জানান। তিনি বলেন, পানির জন্য এতদিন কেউ তার কাছে আসেনি। এখন খরার কবলে পড়ে সব জায়গা থেকে পানির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা এসেছেন। সাবাই এক সাথ আসায় সাময়িক এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। ড্যাম্পের পানি মাছের খামারে বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে সুরুক মিয়া বলেন, আগে দিয়েছি এখন বন্ধ। তিনি জানান, সমিতির সদস্যরা পানির মূল্য হিসেবে কেয়ার প্রতি আধামন করে ধান দেয়ার কথা, কিন্তু বেশীর ভাগ কৃষক তাও দেন না। ড্যাম্পের রক্ষনাবেক্ষনে রশিদ মূলে ব্র্যাক ফিসারীতে ৩০ হাজার টাকায় কিছু পানি বিক্রি করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, কৃষকরা খরচ দিতে হবে তাই তারা আগে পানি নিতে আসেননি। তারা মনে করেছিলেন বৃষ্টি হলে পানি লাগবেনা। এখন বৃষ্টি হয়নি তারা এসেছেন পানি নিতে। তার পরও তারা নিয়ম অনুযায়ী টাকা দিতে নারাজ। গত বছরের দুই হাজার টাকা এখনও তারা দেননি। এবছর তিন দিন আগে ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। তাদের পানির বাঁধ ছাড়া আছে। পানি যাচ্ছে তবে কম। ছড়ায় স্রোত বাড়লে বেশি যাবে।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াসমিন শনিবার দুপুরে বলেন, ‘এবার তো বৃষ্টি নেই। ফলে বিলাসের উৎসমূখে পানি কম আসছে। তাছাড়া ড্যাম্প থেকে উত্তরসূর পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার পথে প্রপার কোন ড্রেন নেই। অনেক স্থানে সংস্কার অভাবে ড্রেন মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে পানি যেতে অনেকটা সময় লাগে। তিনি বলেন, ইউপি সদস্য দুদু মিয়া ও ড্যাম্পের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা সুরুক মিয়াকে বলে দিয়েছেন, যতদ্রুত সম্ভব পানি প্রবাহের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ক্ষতিগ্রস্থ জমিতে সেচের পানি দেয়ার জন্য। এছাড়া বিলাসে দিকে যে সমস্ত জমিতে আবাদ নেই অথচ পানি চলে যাচ্ছে তা বন্ধ করতে বলেছি। তিনি জানান এবার শ্রীমঙ্গলে ৯ হাজার ৪শ’ ১২ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়েছে।  এর মধ্যে হাওরে তিন হাজার হেক্টর। যার বেশির ভাগ পানি সংকটে পড়েছে। তবে শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের উত্তর উত্তরশূর অংশে বেশ ক্ষতি হয়েছে সহসা বৃষ্টি ও ড্যামেপর পানি আসলে এখনও অনেক জমিতে আশানুরুপ ফসল পাওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।

আরকে//
 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি