সোহেল রানাসহ ৮ জনের রায় আজ
প্রকাশিত : ১০:৪৮, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আলোচিত সাভারের রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির রায় আজ।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বি এম তারিকুল কবীর এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন।
গত ১৬ আগস্ট মামলাটির রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেছিলেন আদালত। তবে নির্ধারিত সময়ে রায় প্রস্তুত না হওয়ায় আদালত রায় ঘোষণার তারিখ পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর নতুন দিন ধার্য করেন।
এ মামলায় সোহেল রানার সঙ্গে অন্য আসামিরা হলেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে ভবন মালিক সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রায় ঘোষণার দিন তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হবে। এ ছাড়া মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক রয়েছেন। জামিনে থাকা অপর আসামিদেরও আদালতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
মামলার বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক ও মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর আদালত তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেন।
রানা প্লাজা ধস বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনা হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত বহুল আলোচিত রানা প্লাজা ভবনটি ধসে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষ। নিহতদের অধিকাংশই ছিলেন ওই ভবনে থাকা পোশাক কারখানার শ্রমিক। এ ঘটনায় আহত হন আরও বহু শ্রমিক ও কর্মচারী।
ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার পর রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে নকশা অনুমোদন, ভবনের কাঠামো পরিবর্তন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করে।
দুদকের অনুসন্ধানের পর নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে প্রাথমিকভাবে ভবনটির মালিক সোহেল রানাকে ওই মামলায় আসামি করা হয়নি। কারণ, ভবনটি তার বাবা আবদুল খালেকের নামে ছিল। পরবর্তী সময়ে তদন্তে ভবনটির নির্মাণ, অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর অধিকতর তদন্ত শেষে তাকে মামলায় আসামি করা হয়।
২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্ত শেষে সোহেল রানা, তার বাবা-মাসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক। পরবর্তী সময়ে মামলার অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে অব্যাহতি দেয়া হয় এবং ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা ও মায়ের মৃত্যু হলে তাদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ফলে বর্তমানে আট আসামির বিরুদ্ধে মামলাটির বিচার শেষ হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘রানা প্লাজা’নামে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা থেকে নকশা অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ওই ভবনের ওপর আরও চারটি তলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়। অর্থাৎ, ভবনটির মূল অনুমোদিত কাঠামোর বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ভবনটি মূলত শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে নির্মাণের অনুমোদন পেলেও পরবর্তী সময়ে সেখানে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়। ভবনের নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। এসব অনিয়মের কারণে ভবনটির নিরাপত্তা ও কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২০ জন সাক্ষী উপস্থাপনের অনুমতি পেলেও তাদের মধ্যে ১৯ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্যগ্রহণ, জেরা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার পর্যায়ে আসে।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার মধ্যে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে করা এ মামলাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভবনটির নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং সেখানে পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে এ মামলায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
দীর্ঘ ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি প্রক্রিয়ার পর আজ এ মামলার রায় ঘোষণাকে ঘিরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। রায় ঘোষণার মাধ্যমে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এমএইচ
আরও পড়ুন










