ঢাকা, বৃহস্পতিবার   ২২ আগস্ট ২০১৯, || ভাদ্র ৭ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

হুমু, হিমু ও আমি

প্রকাশিত : ১০:১৬ ২৭ মার্চ ২০১৯

এক.

ভাবলাম জনতার বিশাল ঢল নামার আগেই ‘নুহাশ পল্লী’ বেড়িয়ে যাই। হুমায়ুন আহমেদ ব্যতিক্রমধর্মী অনেক ব্যাপারেই, আগামী ক’সপ্তাহ এ নিয়ে অনেক লেখালেখিই হবে, সুতরাং আমি ওদিকে যাচ্ছি না। নুহাশ পল্লীর সুদৃশ্য এবং সুখকর পুষ্প, বৃক্ষ, ভেষজ, ওষধি এবং পাখী, জলপদ্ম আফীম ছড়ানো আঙ্গিনায় অভিভূত হয়ে থমকে দাড়ালাম। হঠাৎ করেই যেন নীল পাঞ্জাবী, সাদা পাজামা, চটিজুতো পায়ে চশমাধারী এক ব্যক্তির আবির্ভাব। সন্ধ্যা হব হব, গাছগাছালীতে গোধূলী লগ্নটা একটু ভারী হয়ে আসছে। চমকানোভাব না কাটতেই বললাম হুমায়ুন আপনি? এখানে? কেমন করে? নিউইয়র্কে তাহলে তেমন কিছু ঘটেনি? সত্যিই বাচালেন, বাংলাদেশে তো বলছে সুনামি হবার উপক্রম আপনাকে হারানোর ভাবনায়। এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলেই তাকালাম হুমায়ুনের দিকে। স্মিত হাসি লেগে আছে, কিন্তু কথা বলছে না। দীঘশ্বার্স ফেলে বলল ‘জাম্পু ভাই’ ক’দিন পর দেখা। আপনি শুনলাম অনেকদিন দেশ ছাড়া। এখনো আপনি আপনি করছেন আমাকে। বললাম জন-নন্দিত, স্বদেশ স্বীকৃতি ধারক একাধারে বহুগুন সম¦লিত হুমায়ুন আহমদকে আপনি না বললে অস্বস্তি লাগবে। আপনি সবসময়ই যেন শব্দের ছুরি চালান। যাকগে, আপনার ক’টা কবিতা ‘হে প্রভু’ আর ‘তোমাকে’ শীর্ষক পড়েছি- চমৎকার আর ‘অবিনশ্বর’ সাহিত্য পত্রিকায়, যা কিনা দুর্লভ। এ কথা শুনলেই লজ্জা পেতে হবে, হুমায়ুন যেন দুষ্ট এক বালককে রেশমী মেঠাই ধরিয়ে দিচ্ছেন। হিমুর মতো করে আমি দুষ্টু, রেশমী গায়ে মাখালাম না। বললাম আমি কিন্তু তোমার বেশ ক’টা সত্যি বলতে কি সব ক’টা বই পড়েছি।

আতকে ওঠার ভঙ্গীতে হুমায়ুন রললো ‘সে কি! কেন? সত্যি?’ বললাম দুটো কারনে’ সুনীল গঙ্গোপধ্যায় এর বই ধরতেই ইচ্ছে করে না, তাই বিকল্প ব্যবস্থা যাকে বলে Plan B হিসেবে আপনার লেখায় ধরা খেয়েছি- এটা নেশাকতামূলক বলা যেতে পারে। কি জন্য পরে বলছি। কিন্তু সুনীল বন্ধু বলেই বলছিনা, ওতো দারুন লেখে। আপনার অনীহার কারনটা কি? বই এর মেলা, অন্য সময়ে বই দোকানে দেখি হি’হি’ করা হাসি দেয়া মেয়েগুলো ‘সুনীলদা কই,’ ‘সুনীলদা দেন, ’নতুন সুনীলদা চাই- এক কেলেংকারী হৈ, চৈ, দেখে ভাবলাম এ মেয়েরা যা পড়ে হন্যে হয়ে , নিশ্চয় সস্তা, বস্তা, রাস্তাপচাঁ মাল। তাই।’ ‘বলেন কি, আপনার হয়ে আমি মেয়েদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ হুমায়ুন, ছোট গল্প লিখছেন অথচ শেষ হইয়াও হইলো না শেষ definition ভুলে গেলেন। আরে তারপর তো সুনীল, সুনীল আর সুনীল- ভূবনে অন্য কোন তারকা, রং কিছুই রইলো না ‘ একটু রহস্য খোলাসা করলে বান্দা আরেকটা ছোট উপন্যাস বা বড় গল্প ফেঁদে ফেলবে, আসন্ন একুশে মেলার সন্মানে এবং ক’টা প্রকাশনার সম¥ানীর বসানো প্রত্যাশায়।’ ‘ও হ্যাঁ,  সুনীল গঙ্গোপধ্যায় যে এ ধরনের বই লিখতে চাইবেন ভাবিনি। ক’বছর আগে পড়লাম তার ‘সেই সময়।’

আমি ইতিহাস আশ্রিত লেখা পড়তে সদা উন্মুখ। কি পারসেন্টেজে ইতিহাস আর কল্পনার মিশ্রন, কতটা বস্তুনিষ্ঠ ও সময়কাল সমাজ নিষ্ঠার সাথে আবহ হিসেবে উপস্থাপিত হয় তাই নির্ধারন করবে গ্রহনযোগ্যতা এবং পাঠকের আপ্লুতা। সুনীলবাবুর লেখা আমাকে গভীরভাবেই আপ্লুত করে- ইংরেজীতে বলব his writings whelm me overwhelm    শব্দটায় যে ‘উল্টে পড়া’ imbalance এর ছবি আসে আমি তাতে নেই। যা বলছিলাম আকাশ এখন সুনীল, নির্মেঘ !!

যাকগে, নুহাশপল্লীর বহমান বাতাসে খানিকটা আদ্রতা গাঢ় হয়ে গায়ে লাগছে। আলো কমে গিয়ে একটা মায়াবী আবহ অনুভবে আসছে। ঘনায়মান ‘কনে দেখা আলো’। হুমায়ুন আপনি ব্যবহার করেছেন ‘কন্যা সুন্দর আলো’  দু’টো ইদানিংকার বইতে, তাইনা -কোন উত্তর নেই। তাকালাম পেছনে, এদিক সেদিক - কেউ কোথাও নেই! এ কি ধরনের ব্যাপার, কথা নেই, বার্তা নেই, বাইবাই, পরে দেখা হবে, না বলেই উধাও। অনেক আলোচনা তো রয়েই গেল।

দুই.

নুহাশপল্লীর এই দৃশ্য, ঘটনা আলাপচারিতার প্রায় চার দিন পূর্বে, উত্তরায় এ্যাপার্টমেন্টে বসে কম্প্যুটার ইন্টারনেট-ইমেইল করছিলাম। মাঝেমধ্যেই সংবাদ চ্যানেলে তাজা খবর এসে যাচ্ছে। সবচাইতে শোকবহনকারী ন্যু’ইয়র্কে হুমায়ুন আহমদের তিরোধান শীর্ষক বুলেটিন বুলেটের মতো অনেকের হৃদয়ভেদ করেছে। বন্ধুবান্ধবদের সাথে কথাবার্তায় একটা সমবেত শূন্যতাবোধে সবাই বেশ নিরব। যে যার মতো করেই স্মরন করছে এই অসাধারন মানুষটার কথা। বিরল প্রতিভার সাথে মিশেছে এক সহজাত, নিরহংকার এক ব্যক্তিত্ব। পাঠকদের হৃদয়ে যে বিশাল আর ব্যাপক আসন পেয়েছেন  সেটা আমাকে আশ্চর্য্য করছে না ততটা, যতটা বিস্মিত করেছে সবসময় যে এই বিপুল সন্মাননায় হারিয়ে যাননি। সাধারন মানুষের সাধারন- জীবন, প্রতিদিনের পাঁচালীতে অলৌকিক, আলো ফেলেছেন। ফেমাস হলেন, কিন্তু ‘সেলিব্রেটি’ না। প্রথমটা গুনের সন্মননা। পরেরটা কুবেরদের উন্মাদনা। না, হুমায়ুন আহমদ মানুষদের কাছের লোকই রয়ে গেলেন।

নিউইয়র্ক থেকে বৃহস্পতিবার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে, শেষ যাত্রার প্রস্তুতিতে ঢাকা এলেন এবং খানিকটা জটবাধানো ঘটনাবলীর দ্রæত সমাধানে মঙ্গলবার নুহাশপল্লীর একান্ত নিজস্ব প্রাঙ্গনে অন্তিম শয্যায় শায়িত হলেন।

এ ক‘দিনের দুঃসহ প্রতীক্ষাকালে ইন্টারনেটে একটা লেখার চেষ্টা করেছিলাম-কিছুটা trending ধরনের, দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনা, কথাবার্তা সেভাবেই, একমত, দ্বিমত, তৃতীয়মত নিয়েই সাজানো। আমি বলব এক ধরনের কথা বা ভাষার ভিডিও-চলমান ভাষ্য।

দুটো প্রধান বিষয় যা অনেক সময়ই পরিবারে প্রচন্ড বিপর্যয়ে, শোকে অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেহেতু হুমায়ুন আহমদ সার্বক্ষনিক দৃষ্টির মোড়কে বাধা, তাই এই অস্থিরতা অনিশ্চয়তাও সবার দ্বারপ্রান্তে, মন ছুয়ে ভাবনা ব্যাকুল করেছে। লিখেছিলাম ইংরেজীতে তাই তুলে দিচ্ছি।

The theme I refer to the unfolding journey of Humu over thousands of miles seeking that legendary answer to `how much land one requires?’ conundrum. Humu told his tearful spouse moments before his passing away what he wanted for himself and also told her to find his writing bag an almost finished manuscript (In fact, there would be the discovery of al least 18 novellas in his name).

Humu himself is the anti-hero in absentia of this ms. titled` Aami Humu Opaar Thekey Bolchi’. Basic thread of his personal travels through family,

relatives, friends publishers and peer writers, reading public, cultural activists get reflected in this Himu as he would be heard and read to say ` I am one-name brand and after my death, I will be the mega brand generically called Kamdhenu and this would be the start of a series of everything as Kamdhenu’.

*********

In another story that is taking shape Humu reminds me that he met me in 1973 the year he got married and the year before his Nandito Naroke saw the light of the day. At that time I was serving as Deputy Secretary to the Government and handling Agreements and Treaties from the Ministry of Finance. Now Himu recalled some details that still amazes me.

 

And in this anecdotal story I make some scathing comments about the characters that abound and familiar like old wine in new bottles and some `jadukhela’, `adha bhowtik’ ad-sub, para normal events-now apparently scaled up as a magical realism- an oxymoron, the worst that there can be. Fantasy like `Himu aebong akti Russian pari’, that I just read, has some rare comments that Himu could not respond to. All this and more are in the pipeline. This reference here is an evidence that I am perhaps one of the first to have a take on Humu before he hits the ground.

 

Internet reports coming in thick and fast about the decision of brutal, cancellation of the decision that was , I thought, pretty logical and clear- Humu’s expressed wish takes precedence over the convenience of his `agonito pathakbrindo’. Hmm.  The division in the family, but his wife, not even the mother, and certainly not the brothers, have any right to dissent. Nuhash Palli can afford a chaya Dhaka, pakhi daka, santi-ghono angina/ prngan/ kone for him to lie in.

 

But being a brand name is not easy to live with and is certainly difficult to die for.

 

Humu is rich enough to pay for his grave site and state- owned graveyards gratis plot is the kind of honour Humu would rather not have. Maybe some unclaimed Himu-type corpses could be interred with that saved price. Humu would love that.

 

He lives in our heart- good and let him repose where he most wished in life, and in death. May be if his bipul, gunamugdha following stay the course, who knows we may see a new Mela, carnival, utshab, Nandanik Likhon and such like dedicated to Nushash Palli`s Humu Shah. I am sure the band of this brand peddler would like nothing else more. And as I guess there are 18 more Humu books unpublished for grabs.

 

No decision as yet on BIRDEM cold to the earth’s warmth-where?

23/07/12 ///12.17 pm/// Dhaka time 6.06 pm. Monday

তিন.

সেজন্যই নুহাশপল্লীর নিবিড়তায় এসে ক’টা কথা বলে যাব বলে ভেবেছি। এবং অপ্রত্যাশিতভাবে কথোপকথনের সুযোগ হলো, প্রথম পর্বে। বলছিলাম কোথাও কেউ নেই কিন্তু একটা কথা নিয়ে ভাবছিলাম। হুমুকে জিজ্ঞাস  করব ১৯৭৩ সনে তোমার সাথে দেখা হয়েছে, স্মৃতিশক্তির ধোঁয়াটে ভাব আমার সত্তর বছর বয়সে হবে এটাই স্বাভাবিক ।

হঠাৎ করেই শুনলাম ‘সরি জাম্পু ভাই’। জীবনটা কোনক্রমেই যেন মসৃন যাত্রায় শোভিত না হয়। একটু টালমাটালে পড়ে গেলাম, যাহোক, সব ঠিক আছে এখন। আপনিই তো সেবার বললেন time is often out of joints এবং  ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ ’দুটো মিলিয়ে কাজ করলে জীবনটা সহজ হতে পারে।’ ‘আমি বলেছি, মানে, কখন, কোথায়, হুমু তোমার সাথে কথা হলো আর আমি মনে করতে পারছি না।’

‘ঠিক চল্লিশ বছর আগে এক বন্ধু আমাকে নিয়ে গেল আপনার অফিসে- সচিবালয়ে, অর্থমন্ত্রনালয়ে তার ঘনিষ্ঠ আত্বীয়ের পেনশনের দীর্ঘসূত্রিতার এক অবর্ননীয় ঘটনা আপনাকে বললো। হাসিখুশি মানুষ কতটা গম্ভীর হয়ে যেতে পারে দেখলাম। ব্যক্তিগত সহকারীকে ডেকে নিজের লেখা বন্ধুর দেয়া নাম, তথ্যাদি তাকে দিয়ে বললেন খোজ নিয়ে আসতে কোথায় কার কাছে এ কেসটা। বললেন বিষয়টা তার সরাসরি আওতাধীন নয়, সেটা সমস্যা নয়। এর মধ্যে আমার সচিবালয়ে পাফপেস্ট্রী দারুন ভালো লাগে, তাও এসে গেল, আপনি যদ্দুর মনে পড়ছে  ক’দিন আগেই টোকিও থেকে বিমান ফ্লাইট উদে¦াধন সফর করে এসেছেন, তারই গপ্পো চললো। কিছুক্ষন পরে ব্যাক্তিগত সহকারী এক প্রবীন ভদ্রলোককে নথিপত্র নিয়ে হাজির।জানালেন সেকশন প্রধান চূড়ান্ত না-দাবী সনদ বিলম্বিত হচ্ছে কারন AGB থেকে কাগজপত্র আসেনি। তখনকার দিনের সি.এস.পি উপসচিব- কঠিন শীতলভাবে বললেন এক- কাগজপত্র কি পাননি একে জানিয়ে দিন, AGB কে আজকে তাগিতপত্র special messenger  এ পাঠাবেন। দুই- ঠিক সাতদিন আপনার চিঠি তৈরী থাকবে আশা করছি। তিন- আমি চাইনা আপনার বস, আমার কলীগকে এ ব্যাপারে বলতে হয়। 

আর শেষ কথাটা আমি অনেককেই-আমার সহকর্মী প্রবীন ও নবীনদের বলে থাকি- জীবনে কতগুলো principles কে মূল্য দিবেন। তারমধ্যে আমি দুটোকে ফলো করার চেষ্টা করি। নিজের শিক্ষকদের প্রাইমারী থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত অত্যন্ত সন্মানের সাথে সম্ভ্রমের সাথে ব্যবহার করা যত উচুঁতেই যান না কেন আর দুই, অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীদের কোন ধরনের হয়রানি বা ন্যুনতম কষ্ট না হয় দেখবেন, কারন আপনি, আমিও ঐ পথে যাব। মৃত্যুর মত অমোঘ-আমার এই কথা আজো মনে আছে। ‘বুঝলাম, হুমু তোমার বন্ধুর কাজটা কি হয়েছিলো; ‘হ্যা, দু’তিন সপ্তাহেই ব্যাপারটা নিষ্পত্তি হয়।’

হুমু, তেমার বেশ ক’টা লেখাই হিমু এবং মিসির আলী বইগুলোতে আধাভৌতিক, অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী সবাইকে চমকে দেয়।‘পোকা’ গল্পটাও মনে পড়ছে। তোমার চরিত্র অংকনে ‘রুপবতী’ শব্দটি বারংবার ব্যবহার হয়েছে। ফ্যান্টাসী ম্যাজিক রিয়ালিজম তুমি বলেছো তোমার নভেলে, বড় গল্পে এসে যায়। যাদুকরী ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রচিত্রনে ‘হঠাৎ চমক’ কেন যেন বুদ্ধদের মতই অদৃশ্য হয়ে যায়। চরিত্র যেমন জাকির ভাই থেকে যায়, কিন্তুু কাহিনী, ঘটনা বোধকরি আমি যতটা মনে করছি, ঠিক মনে থাকেনা। যাদু খেলায় তোমার উৎসাহ ছিল স্কুল, ছোট বেলায়।

কি করি জাম্পু ভাই। লেখার সময় জ্যামিতিক নিয়মে মাপঝোপ করা সম্ভব কি? হঠাৎ হঠাৎ দৃশ্য পাল্টে যায়, এসে যায়, কলমবন্দী হয়। তোমার রুমালী উপন্যাস আমার কাছে ব্যতিক্রমধর্মী ও হদয়গ্রাহী মনে হয়েছে। তোমার ভ্যাগাবন্ড, পাগলাটে, চরিত্রে আধ্যাতিক এমনকি সহজাত ধর্মীয় বিশ্বাস, সৎকাজ প্রায়ঃশই প্রাধান্য পেয়েছে। আমার মনে হয় তুমি নিজেকে একটু একটু করে এ চরিত্রের  অরন্যে মিশিয়ে দিয়েছ। আমরা সবাই খুজে বেড়াই, কি খুজছি জিজ্ঞাস করলে আমি বলব সেটাই তো খুজছি!

হুমুকে ক’টা প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিলো যখন থেকে শুনলাম ন্যু’ইয়র্কে ক্যান্সার চিকিৎসা করাচ্ছে। তখন হুমায়ুন আহমদ যে আমার সাথে দেখা হয়েছে সেটা আমার স্মরনে নেই। ১৯৭২ এ ‘নন্দিত নরকে’ শুরু হলো তার যাত্রা- ৪০ বছের এ আকাশ ছুয়ে যাচ্ছে তার খ্যাতি - একডাকে এপার ওপার বাংলা তো বটেই, বিশ্বের বাঙ্গালী সমাজ যেখানেই ছড়িয়ে আছে, তিনি পরিচিত অভিনন্দিত ও প্রীতিসিক্ত-প্রশ্নটা একটু রূঢ় হতে যাচ্ছে- বাংলাদেশে সাধারন মানুষ যে দুঃসহ সমস্যা রিড়ম্বনা ও বঞ্চনায় বিপর্যস্ত হয়ে যাচ্ছে, তাঁর কন্ঠস্বর কি ধ্বনিত হতে পারত না। আমি কারো বিরুদ্ধে বা দায়ী করে বলার কথা বলছি না। সমস্যা জর্জরিত অসহায় মানুষের দুঃখের কথা তুলে ধরা কি সম্ভব হতো না? গল্প, নাটক শুধুমাত্র ফ্যান্টাসি হতে পারে জীবন তো নয়? এই একই দুঃখ আমার নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নিয়ে। শান্তি পুরষ্কার কি তাকে দেশের অশান্তির করাল ছায়া দর্শনে বিভ্রান্তির সৃস্টি করেছে। অর্থনীতি নোবেল পুরষ্কার পেলে গ্রামীন ব্যাংক এবং তার অন্যান্য অর্থকরী উদ্যোগ শুধুমাত্র কাঞ্চন প্রাপ্তিতে সীমাবদ্ধ হলে অবাক হতাম না। তিনি জনগনের কথা বলতে শুরু করলেন রাজনৈতিক দল গঠনের অভিপ্রায়ে-দেশের প্রধানমন্ত্রী হবার সম্ভবনায়। কিন্তু গনমানুষের জীবন সমস্যা নিয়ে কোন সময়েই, কোন মঞ্চেই, দেশে বা বিদেশে কোন কথা বলেন নি। গ্রামীন ব্যাংক, ক্ষুদ্রঋন ব্যবসা বানিজ্যিক সংস্থা স্থাপন ব্যতিরিকে আমাদের নোবেল বিজয়ী সাধারন মানুষকে স্বীকৃতি দেননি। তাই আমি অবাক হইনা যখন তার বিদেশ সাহায্যপুষ্ট এবং বিদেশীদের তুষ্ট করার উদ্যোগ এর স্বর্নরথ সরকারের কতগুলো অনিবার্য প্রশ্নঘাতে ধরাশায়ী হলো। দেশের মানুষ ছুটে এলো না, তার কর্দমাক্ত সন্মান ও শরীরকে বাঁচাতে। তিনি ছুটলেন বিদেশ- যেখানে বাংলাদেশের মত ক্ষুদ্র দেশকে  অদৃশ্য শাসনের মারনাস্ত্র পাওয়া যায়। অন্য কোন নোবেল বিজয়ী দেশকে আন্তর্জাতিক ভাবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যস্ত থাকেন আমার জানা নেই। সরকার আইন মাফিক গ্রামীন ব্যাংক পরিচালনা করছেন, তাতে গ্রামীন ব্যাংক ধ্বংস হয়ে যাবে, এ তো রাষ্ট্রদ্রোহীতা না হলেও রাষ্টবিরোধীতা তো বটেই। তিনি প্রয়াত হলে নিশ্চয়ই হুমু এক আধাভৌতিক, অব্সেস্ড্ চরিত্র- মরনোত্তর ইউনুস জি.বি.এম.ডি. নামক বই লিখতে পারতেন।

যাকগে, হুমায়ুন আহমদকে দু’নম্বর প্রশ্ন করার ইচ্ছা ছিল তার ’দেয়াল বই সম্পর্কে’। বইটি প্রকাশ হয়েছে কিনা, জানিনা। তবে মাননীয় উচ্চ আদালতে স¦প্রনোদিত আদেশাজ্ঞা যা জারী হয়েছে খবরে প্রকাশিত তথ্যাবলী ভিত্তিতে, তা হলো হুমায়ুন আহমেদকে বস্তুনিষ্ঠ চরিত্রায়নের নির্দেশদান। লেখক এই সময়ে ক্যান্সার চিকিৎসায় বিরতি দিয়ে ক’সপ্তাহের জন্য ন্যু’ইয়র্র্ক থেকে দেশে এসেছিলেন, সেই সময়েই শুনানী, নির্দেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের সরকারী ইতিহাস গ্রন্থের অনেক ক’টা ভল্যুম তার বাড়িতে পৌছে দেয়া হয়েছিলো। যদ্দুর জানা আছে ক’দিন পরেই তিনি নিউইয়র্কে ফিরে চিকিৎসাধীন হন এবং অল্প কদিন পরেই ইহলোক ত্যাগ করেন। মার্কিন ডক্টরদের ‘কশাস অপটিমিজম’ ঠিক কাজে লাগেনি। তার দেশে ফেরা হলো না জীবন নিয়ে, জীবনীশক্তি নিয়ে।

‘দেয়াল বই’ এর ব্যাপারে মাননীয় উচ্চ আদালতের মত ও নির্দেশ সম্পর্কে তার কোন উক্তি বা তার চরিত্রায়নের কোন ব্যাখ্যা দিয়েছেন কিনা হুমায়ুন আহমেদ জানা নেই। নাগরিকদের মৌলিক অধিকারে শিল্প, সাহিত্য, সুর, লেখনী ও অন্যান্য কলা সাধনা ও প্রকাশনার অবাধ বিচরন বোধকরি শাসনতন্ত্র ও আইন সিদ্ধ। চরিত্রহনন, কুৎসিত ধ্যান-ধারনা বা ব্যক্তিগত অবমাননা অবশ্যই বর্জনীয়। সেই মাপে তার ‘দেয়াল’ কতটা উৎরাবে আমাদের জানা নেই। তবে সরকারী ভাষ্য এবং সৃজনমূলক  রচনা ও চরিত্রায়ন কখনোই এক নিক্তিতে ওজন করা যায় না বা হয় না বা সম্ভব না। হুমুকে জিজ্ঞাস করার ইচ্ছা ছিলো যে শিল্পী, লেখকদের এই অধিকার রক্ষাকল্পে, তিনি কি কোন ভূমিকা গ্রহন করার ভাবনায় ছিলেন? এবং জনগননন্দিত ও অবিতর্কিত ব্যক্তিত্¦ এবং সৃজনশক্তির অন্যতম ধারক হিসেবে তার সুচিন্তিত মত দেশ ও দশের জন্য শুধু নয়, আমাদের বুদ্ধিজীবি, নীতিনির্ধারক ও শাসনযন্ত্রের বিভিন্ন শাখার জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গদের চিন্তায় স্বচ্ছতা ও অমলিনতা দানে এবং বিশেষ করে ভবিষ্যতের ইতিহাসের পাতা উজ্জ্বল করতে ও আগামী প্রজন্মের পদচারনা বুদ্ধিদীপ্ত ও মনন আলোকিত করতে অত্যন্ত  প্রয়োজন ছিল। নিশ্চয়ই এই অমূল্য আলোকবর্তিকা ধারন করার মানুষ তার যাত্রা শুরু করেছে দেশের কল্যানকর শুভলগ্নে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব।

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি