ঢাকা, মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১, || ফাল্গুন ২৪ ১৪২৭

করোনায় ভিন্ন এক রমজান

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১০:২৪, ২৭ এপ্রিল ২০২০ | আপডেট: ১০:২৪, ২৭ এপ্রিল ২০২০

দেশে গত শনিবার থেকে শুরু হয়েছে রোজা। প্রতিবছর দেখা এমন দিনে দুপুর থেকেই ঢাকার ফুটপাতে ইফতারের পসরা সাজিয়ে শুরু হয় দোকানিদের হাঁকডাক। সন্ধ্যায় চলে ইফতারের আয়োজন ও ইফতার পার্টি। তারাবির নামাজে দেখা যায় উপচে পড়া মানুষের সমাগম। ফুটপাতে চলে কেনাবেচা। অথচ এবার সেই চিরচেনা হাঁকডাক আর শোনা যায়নি। রোজাদারদের ভিড়ও নেই কোথাও।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশবাসীকে ঘরে থাকার যে নির্দেশ সরকার দিয়েছে, এটাকে সফল করতে রমজানে ফুটপাতে বা দোকানে ইফতার সামগ্রী বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ঢাকার কোথাও ইফতার সামগ্রী নিয়ে রাস্তায়, ফুটপাতে বা দোকানে বসতে দেখা যায়নি কাউকে।

পাড়া-মহল্লায় সাধারণ যে কাঁচাবাজার বসে, দুপুরের পর থেকেই তাও পুলিশের সহায়তায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা উঠিয়ে দিয়েছে। মাইকিং করে বলে দেয়া হয়েছে যে, কেউ ইফতার সামগ্রী নিয়ে রাস্তায় বা ফুটপাতে বসতে পারবে না।

নিজেরা প্রস্তুতকৃত বা বাসায় তৈরি ইফতারি বিতরণ করতে পারলেও ইফতার পার্টি কোথাও করা যাবে না। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের নির্দেশনায় পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসন এ ঘোষণা দিয়েছে। ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইফতারের খাদ্যসামগ্রী তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও এ সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে বলে জানা গেছে।

হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভিড় নেই
প্রতিবছর প্রথম রমজান থেকেই রাজধানীর চকবাজার এলাকা জমে উঠতো ইফতারের জমজমাট হাট। বাহারী খাবার কিনতে দূরদুরান্তের মানুষজন ছুটে আসতো এখানে। বিক্রেতাদের কণ্ঠে শোনা যেতো বড় বাপের পোলায় খায় ঠোঙ্গা ভরে নিয়ে যায়। কিন্তু এবারের চিত্র পুরোই ভিন্ন। পাড়া-মহল্লার হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও ভিড় নেই।

মরণ ভাইরাস করোনায় থমকে গেছে ঢাকার ইফতারি আয়োজনের সেই ব্যস্ততা। নিরাপদে থাকতে ঘরে থাকা মানুষরা পার করছে ভিন্ন রকমের এক রমজান।

 

নেই ইফতার রাজনীতি
করোনা পরিস্থিতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে ইফতার রাজনীতিও। অনেকবছর ধরেই ইফতার পার্টি রাজনীতির আরেক অনুসঙ্গ হয়ে উঠেঠিল। কিন্তু এ বছর সব আয়োজন বন্ধ।

 

ফুটপাত ফাঁকা
এ বছর সরকারি নির্দেশনা মেনে ইফতারির বাজার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বসছে। কোন অবস্থায় নির্দিষ্ট দোকান ছাড়া ফুটপাতে ইফতারির বাজার বসতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ফুটপাতগুলো পুরোই ফাঁকা। সেই সঙ্গে প্রতিবছর এ সময় থেকেই বিক্রি শুরু হয় ফুটপাতের ঈদের কেনাকাটা। অথচ সবই যেনো এবার বন্ধ হয়ে গেছে।

মসজিদে নেই মুসল্লিদের আনাগোনা
করোনা মহামারির কারণে অন্যান্য বছর থেকে এবছরের রমজান মাস অনেকটা অন্যরকম কাটাচ্ছে মুসলিম উম্মাহ। এবার মসজিদগুলোতে দেখা যাচ্ছে না আগের মতো তারাবি নামাজ, জমজমাট আয়োজন করে ইফতার ও ইবাদাতের দৃশ্য।

রমজান মাসে সাধারণত যোহরের নামাজের ওয়াক্ত থেকেই মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। শুধু বড়রা নয়, কোরআন বুকে নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হয় মহল্লার ছেলে-মেয়েরাও। তারা কোরআন খতম করে এবং এর সওয়াবের আশায় ধর্মীয় নানা কাজে নিয়োজিত থাকে।

মাসটিতে বড়দের সঙ্গে মসজিদে ছোটদের ব্যাপক উপস্থিতি বেড়ে যায়। ফজরসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই তারা মসজিদে এসে জামাতের সঙ্গে আদায় করে। কিন্তু এবার মসজিদগুলোতে আর জমজমাট বা জাঁকজমকপূর্ণ ইবাদাতের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে না। শাব্দিক অর্থেই মসজিদগুলোতে দেখা যাচ্ছে নির্জীব একটি পরিবেশ। 

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পেশ ইমাম মুফতি এহসানুল হক বলেন, এবারের রমজানটা খুবই বেদনাদায়ক। অন্যান্য বছরে আমরা একত্রিতভাবে জামাত আদায় করতাম কিন্তু এবার পরিবেশ পরিস্থিতির কারণেই আমাদেরকে যার যার ঘরে নামাজ পরতে হচ্ছে।

প্রতিটি ঘরই এক একটি মসজিদ
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তারাবি নামাজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন মাত্র ১২ জন মুসল্লি। মসজিদে নামাজ আদায়, সম্মিলিত ইফতার ও কোরআন তেলাওয়াতের মতো ইবাদগুলো একসাথে করতে পারবেন না দেখে মন খারাপ করছেন কেউ কেউ। কিন্তু এজন্য মন খারাপ করে বসে থাকলে কি আর চলে। ঘরেই কোরআন পাঠ, তারাবি আদায়, তাসবিহ আদায়সহ সব ইবাদাত চালিয়ে যাচ্ছেন সবাই।

রমজান মাস দোয়া কবুলের মাস। অতএব, এ মাসে বেশি বেশি দোয়া করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা করোনা ভাইরাসের এই বিপদ থেকে যেন বিশ্ববাসীকে দ্রুত মুক্তিদান করেন সে জন্য সবাই তাদের ঘরে নিজেদের মত করে ইবাদত করছেন। বলতে গেলে এবার এক ভিন্ন রকম রমজান মাস পেয়েছে মানুষ। যা বিগত কয়েক দশকেও দেখেনি মানুষ।

শপিং মলে ভিড় নেই
প্রতিবছর রমজানের শুরুতেই ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে গণজমায়েত বন্ধে রাজধানীর সব দোকান, বাণিজ্য বিতান ও শপিং মল বন্ধ রয়েছে। তাই সেই সমাগমও নেই। 

নেই যানযট
পবিত্র রমজান মাসে নগরজীবনে ঘরে-বাইরে সবার ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সিয়াম সাধনার এই মাসে রোজাদাররা ঘরে বসে করতে চান ইফতার। প্রতিদিন কর্মব্যস্ততা কাটিয়ে ইফতারের সময় হওয়ার আগেই বাড়ি ফেরার তাগিদ থাকে তাদের। কিন্তু পূর্বের রমজানগুলোতে বড় বাধা ছিল যানজট। এতে নাকাল হতে হয়েছে ঢাকাবাসীকে। কিন্তু এবার রমজান মাসে যানজট নেই। ঘরে ফেরার তাগিদ নেই। ফলে সড়কগুলো সেই চিরোচেনা রুপে আর নেই।

সবমিলিয়ে অন্য রকম এক রমজান পেয়েছে মানুষ। যা বিগত কয়েক দশকে দেখেনি কেউ। তবে এই রমজানকে কেউ কেউ আর্শীবাদ হিসেবে দেখছেন। কারণ করোনার ভয়াবহ তাণ্ডবে বিপর্যস্ত পুরো পৃথিবী। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই চরম উৎকর্ষের যুগেও মানুষ ছোট্ট একটি ভাইরাসের সঙ্গে পেরে উঠছে না। ধর্মপ্রাণ মানুষেরা মনে করছেন, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই বাঁচাতে পারেন এই মহাবিপদ থেকে। 

এই মাসে মুসলিমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় সাওম (রোজা) পালন করছেন। সকল রকমের পাপ থেকে নিজেকে শুদ্ধ করার মাস এই রমজান। পবিত্র এই মাসের আর্শীবাদে পুরো বিশ্ব করোনা ভাইরাসের মহামারি থেকে মুক্তি পাবে, এমন আশা সবার।

এসএ/

 


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি