খুলছে সেন্টমার্টিন, বাড়ছে পর্যটক; পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ
প্রকাশিত : ২১:২৫, ৪ নভেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ নয় মাসের বিরতি শেষে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন। পর্যটন চালুর খবরে দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁগুলো। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্ত দ্বীপটির ভঙ্গুর পরিবেশের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদেরা।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) থেকে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট হয়ে সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে। এবারের মৌসুমে দৈনিক পর্যটকের অনুমোদিত সংখ্যা দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যটন মৌসুমের শুরু থেকেই দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
সরকারি এ সিদ্ধান্তে পর্যটননির্ভর স্থানীয় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা তৈরি হলেও পরিবেশগত প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুপেয় পানির সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামোর উন্নয়ন না হলে দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
পর্যটন মৌসুম শুরুর আগে দ্বীপের বিভিন্ন আবাসিক প্রতিষ্ঠানে চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের কাজ। হোটেল, মোটেল ও কটেজগুলো পর্যটকদের থাকার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। রেস্তোরাঁগুলো খাবারের আয়োজন প্রস্তুত করছে। দোকানিরাও নতুন করে পণ্য সংগ্রহ করছেন।
দীর্ঘ সময় পর্যটন বন্ধ থাকায় দ্বীপের অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। নতুন মৌসুমে সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। তবে কক্সবাজার থেকে দ্বীপে যাতায়াতের দূরত্ব বেশি হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এতে পর্যটকদের আগ্রহ ও ব্যবসার সম্ভাবনা কতটা প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এবার পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট ব্যবহার করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত কারণে টেকনাফ থেকে আগের মতো পর্যটক পরিবহন চালু নেই।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম চলবে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে তিন হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। ভ্রমণের জন্য অনলাইন নিবন্ধন ও কিউআর কোডভিত্তিক অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দ্বীপে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিবেশ সুরক্ষায় পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু নিয়মও কার্যকর করা হচ্ছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধ। সৈকতে উচ্চ শব্দে গান বাজানো, পরিবেশের ক্ষতি করে এমন আলোকসজ্জা এবং খোলা জায়গায় বারবিকিউ আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ছেঁড়াদ্বীপে পর্যটকদের যাতায়াতও সীমিত রাখা হবে। তবে এসব নিয়ম বাস্তবায়নে কার্যকর নজরদারি কতটা থাকবে, তা নিয়ে পরিবেশকর্মীদের সংশয় রয়েছে।
সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দ্বীপে স্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত ভূমির পরিমাণ ২ দশমিক ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই গবেষণায় উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রবালপ্রাচীরের প্রায় ২৫ শতাংশ ক্ষয়ের তথ্য পাওয়া যায়।
অন্যদিকে পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময়ে দ্বীপের সামুদ্রিক পরিবেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে। ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দ্বীপের ১০৭টি স্থানের পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করে পরিচালিত একটি গবেষণার ফল প্রকাশিত হয় গত ২৯ মে।
গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটন বন্ধ থাকাকালে সমুদ্রের পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়েছিল। পর্যটন বন্ধের আগে প্রতি লিটার পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা ছিল ৬ থেকে ৬ দশমিক ৬ মিলিগ্রাম। পরবর্তী সময়ে তা বেড়ে ৭ দশমিক ১ থেকে ৭ দশমিক ৪ মিলিগ্রামে পৌঁছায়। পানির পিএইচ মানেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
তবে গবেষকেরা বলছেন, পানির গুণগত মানের পরিবর্তনের পেছনে শুধু পর্যটন বন্ধের প্রভাব নয়; তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, লবণাক্ততা ও নাফ নদীর পানিপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষণায় দ্বীপের পূর্বাঞ্চলের নমুনাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই পর্যটন বন্ধের সঙ্গে পানির মানের উন্নতির সম্পর্ক থাকলেও একে একমাত্র কারণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সেন্টমার্টিনের পরিবেশগত সমস্যার অন্যতম প্রধান কারণ অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেট ও অন্যান্য আবর্জনার পরিমাণও বাড়বে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও অপসারণ করা না হলে সমুদ্র, সৈকত ও প্রবালপ্রাচীর দূষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বীপে সুপেয় পানির উৎস সীমিত। ফলে পর্যটকের বাড়তি চাপ স্থানীয় পানিসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। হোটেল ও রেস্তোরাঁর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা যথাযথ না হলে অপরিশোধিত বর্জ্য সমুদ্রে মিশে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে।
এ ছাড়া পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, নৌযানের শব্দ ও আলো এবং প্রবালের ওপর মানুষের পদচারণা সামুদ্রিক প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করতে পারে। কচ্ছপ, পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্রও মানুষের উপস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘদিন পর্যটন বন্ধ থাকায় দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, দোকান ও নৌপরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত মানুষের আয় কমে যায়। নতুন মৌসুমে পর্যটন চালু হওয়ায় তাঁদের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
সেন্টমার্টিনের কটেজ মালিক নুরুল আবছার বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় প্রায় সব কটেজের মালিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেক কটেজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। সেগুলো সংস্কার করতে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। দ্বীপে বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। অধিকাংশ কটেজে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, আর জ্বালানির দামও তুলনামূলক বেশি।
তবে দীর্ঘ বিরতির পর পর্যটকেরা দ্বীপে আসতে শুরু করায় তাঁরা আশাবাদী। পর্যটকদের আগমনে দ্বীপ আবারও প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
জাহাজ মালিকদের সংগঠন সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (স্কোয়াব) সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১ নভেম্বর থেকেই পর্যটন চালুর কথা থাকলেও প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন না হওয়ায় জাহাজ চলাচল শুরু করা যায়নি। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে নির্ধারিত সময়েই নৌযান চলাচল শুরু হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সেন্টমার্টিন দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ হওয়ায় এর পরিবেশগত গুরুত্ব অনেক বেশি। কিন্তু পর্যটকদের একটি বড় অংশ দ্বীপটির প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নন। তাঁদের অসতর্ক আচরণ পরিবেশের ক্ষতি করছে।
তাঁর মতে, পর্যটকদের চলাচল সীমিত থাকায় দ্বীপের পরিবেশ কিছুটা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু পর্যটকের চাপ সামলানোর মতো অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করেই সংখ্যা বাড়ানো এবং রাতযাপনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রামের প্রধান সমন্বয়কারী মুনিরা পারভীন রুবা বলেন, সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকের সংখ্যা নির্ধারণের আগে দ্বীপের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। দৈনিক পর্যটক দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাতযাপনের সুযোগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো পর্যাপ্ত কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় বেলা ২০০৯ সালে জনস্বার্থে মামলা করে। মামলায় অবৈধ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও বাণিজ্যিক স্থাপনা অপসারণ এবং প্রবালসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। ২০১১ সালে এ বিষয়ে হাইকোর্ট গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। তবে এরপরও অপরিকল্পিত স্থাপনা, পর্যটনের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ও পরিবেশগত বিধি লঙ্ঘনের ঝুঁকি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মুনিরা পারভীন রুবার মতে, পর্যটক বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশগত ধারণক্ষমতা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। বাড়তি পর্যটকের কারণে বর্জ্য বৃদ্ধি, সুপেয় পানির ওপর চাপ, অপরিশোধিত পয়োবর্জ্য সমুদ্রে মিশে যাওয়া এবং প্রবালপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। নৌযানের শব্দ ও আলো এবং সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের উপস্থিতিও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি।
তিনি বলেন, পর্যটন বন্ধ রাখা বা স্থানীয় মানুষের জীবিকা উপেক্ষা করা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটকদের বর্জ্য সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা ও নিষ্কাশনের জন্য প্রশাসনের প্রস্তুতি রয়েছে। এ কাজে দুটি বেসরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। দ্বীপের পরিবেশের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এমএইচ
আরও পড়ুন










