ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৬ জানুয়ারি ২০২১, || মাঘ ১২ ১৪২৭

স্বপ্নভঙ্গ এবং জারিফ

সাজেদুর আবেদীন শান্ত

প্রকাশিত : ১৯:৫৯, ৯ জানুয়ারি ২০২১ | আপডেট: ২০:০১, ৯ জানুয়ারি ২০২১

লেখক

লেখক

এইতো কিছু দিন আগেই জেএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পেলো জারিফ। এই অজপাড়া গাঁয়ে এমন রেজাল্ট আগে কেউ করেনি। তাই চারিদিকে তার রেজাল্টের কথা ছড়িয়ে গেছে। এর মধ্যেই দুই বছর পেরিয়ে গেলো, টেরই পাওয়া গেলো না। এবার সে এসএসসি পরীক্ষা দিলো। পরীক্ষা অবশ্য খুব ভালো হয়েছে জারিফের। 

খুব ছোটবেলাতেই বাবা মারা যায় জারিফের। তারপর তার মা অনেক কষ্ট করে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জারিফকে লেখাপড়া করায়। জারিফের সে কথা অজানা নয়। তাই সে দুষ্টুমি করলেও পড়ালেখা ভালোভাবে করে। জারিফের স্বপ্ন একটাই, সে বড় হয়ে বড় কিছু হতে চায়। কি হতে হবে- তা সে জানে না! শুধু জানে তাকে বড় কিছু হতে হবে। মাকে সুখে শান্তিতে রাখতে হবে। মায়ের কষ্টের দাম কিছু হলেও দিতে হবে। 

আজ জারিফের রেজাল্ট দিবে। সে সকালে উঠেই মাকে বললো- দেখো মা, আজ তোমার ছেলে ভালো কিছু করবে। মা মুচকি হেসে বললো- জানি, ‘আমার ছেলে ভালো কিছুই করবে’। তার মাও আস্বস্ত হলো, কারণ সে জানে তার ছেলে ভালো রেজাল্ট করবেই। 

সকালের খাবার খেতে গিয়ে জারিফ দেখলো তার খাবার গলা দিয়ে নামছে না। অস্থিরতায়, নাকি ভয়ে? তা জানা গেলো না। জারিফ ঠিক মতো খেতে পারলো না। সে খাবার রেখে উঠে বাইরে গেলো বন্ধুদের সাথে খেলতে। খেলা শেষে দুপুরে ফিরে এসে গোসল দিয়ে খাবার খায়। কিন্তু সকালের মতোই সে খেতে পারলো না। সময় যতো এগুতে লাগলো তার অস্থিরতা ততোই বাড়তে লাগলো। 

রেজাল্ট দিবে দুপুর ২টায়। জারিফ নির্ধারিত সময়ের আগেই স্কুলে গেলো। ঠিক আধা ঘণ্টা পর রেজাল্ট প্রকাশ করা হলো। স্কুলের নোটিশ বোর্ডে রেজাল্ট শিট টাঙানো হলো। রেজাল্ট দেখেই তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। যেন পুরো পৃথিবী স্থবির হয়ে গেলো মুহূর্তের মধ্যেই। জারিফের নিরব কান্না যেন আর কোনও বাধা মানে না। 

জারিফ ফেল করেছে! কিন্তু কেন এমন হলো- সে জানে না। বারবার মনে হতে লাগলো- এমন তো হওয়ার কথা নয়। এই রেজাল্টের কথা মা-কেই বা বলবে কি করে? যে ছেলে আজ সকালে তার মাকে আস্বস্ত করে এসেছে, তাকে এই রেজাল্টের কথা বলবেই বা কি করে? সে ভাবতে লাগলো- তবে কি সে ব্যর্থ, তবে কি সে নষ্টদের অধিকারে গেছে? তার মায়ের স্বপ্ন কী সে ছেলে হয়ে পূরণ করতে পারবে না? 

এসব ভাবতে ভাবতে তার মায়ের হাসি মুখ তার কল্পনার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সে মাথা নিচু করে নিরবে বেরিয়ে এলো স্কুল থেকে। তার মনে হতে লাগলো- তার বেঁচে থাকার কোনও অধিকার নেই। যে ছেলে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না, তার মরাই উচিৎ। সে হাঁটতে থাকলো অজানা গন্তব্যে। জারিফ আর বাড়ি ফেরে না। 

এদিকে জারিফের মা জারিফকে খুঁজছে, কিন্তু কোথাও জারিফকে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যা নেমে এলো। রাত হলো। জারিফকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মা হাতে একটি মাটির কুপি নিয়ে খুঁজতে লাগলো। জারিফের মা হন্যে হয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে গ্রামের এ পাড়া থেকে ওই পাড়া। কিন্তু জারিফের কোনও হদিস মিলছে না। 
জারিফের মা ভাবতে থাকে- স্বামীকে সে হারিয়েছে অনেক আগেই, তবে কি এবার সন্তানকেও? ভাবতে ভাবতে রাত ভোর হয়ে গেলো। ঊষা লগ্নে আলো ফুটলো। জারিফের মা দেখতে পেলো দূরে ব্রিজের পাশে বট গাছের ডালে দড়িতে কে যেন ঝুলছে। দেখে মনে হলো- তার কলিজার টুকরো জারিফের মতো….!

লেখক- লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী।

এনএস/


Ekushey Television Ltd.

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি