ঢাকা, রবিবার   ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

বাবাকে মনে করে...

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ২১:৪৪, ১৭ জুন ২০১৮ | আপডেট: ১৪:৪৬, ১৯ জুলাই ২০১৮

আমার বাবা আজিজ আহমেদের একটি সাইকেল ছিল।সেই সাইকেলের সামনের রডে কাঠ দিয়ে ছোট একটি সিট বানিয়েছিলেন।ওই ছোট সিটে আমাকে বসিয়ে তিনি সাইকেল চালাতেন।সিটে বসে যখন হ্যান্ডেল ধরতেন মাঝখানে ছোট্ট আমি বসা থাকতাম।বাবার বিশাল বুক জুড়ে আমি,দুই বাহু দিয়ে আটকানো,কঠিন নিরাপত্তা।বাবা জোরে সাইকেলের প্যাডেল মারতেন,চলতো দূরন্ত গতিতে।আমি বলে উঠতাম আরো জোরে,আরো জোরে।খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিল থেকে বিআইডিসি রোড দিয়ে সাইকেল চলে যেতো চিত্রালী মোড় পর্যন্ত,কখনো বা নতুন রাস্তার মোড়।আবার ঘুরে প্লাটিনাম মোড়।বাবার নাকের নিঃশ্বাসে আমার মাথার চুল উড়তো,শরীরের উত্তাপ ওম দিতো মুরগির ছানার মতো।

আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না।মানুষ হিসেবে ছিলেন একটু ভিতু প্রকৃতির,নিরীহ গোবেচারা।সবসময় গ্যাঞ্জাম এড়িয়ে চলতেন।তবে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে মনে প্রাণে সমর্থন করতেন।একাত্তরের ২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে তিনি খুলনা থেকে পালিয়ে বিক্রমপুর গ্রামের বাড়ি চলে যান।যুদ্ধের ৯ মাস আমাদের ৭ ভাই-বোনকে নিয়ে অনেক কষ্ট করে জীবনযাপন করেছেন,কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে। তবুও চাকরিতে যোগ দেননি ক্রিসেন্ট জুট মিলের অফিস থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় কর্তৃপক্ষ চিঠি পাঠিয়েছিল,চাকরিতে যোগ না দিলে চাকরিচ্যুত করা পদক্ষেপের কথা জানিয়ে। বাবা পাকিস্তান সরকারের হুমকিতে সায় দেননি।একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর বাবা খুলনায় চাকরিতে যোগ দিতে যান।গিয়ে দেখেন কলনিতে তার বাসার সব আসবাবপত্র লুট হয়ে গেছে।চাকরির পয়সা থেকে তিনি তিনটি দোকান করেছিলেন,একটি কাপড়ের,একটি টেইলারিং এবং একটি মুদি দোকান।চারজন কর্মচারি তা চালাতো।চাকরির বেতন এবং ব্যবসার এই টাকা দিয়ে বাবার সংসার খুব সাচ্ছন্দেই চলতো।তার সেই দোকানগুলো লুট করে পরে আগুন দিয়ে পুড়ে ছাই করে দেয়া হয়েছে।বাবার সব হারানোর কষ্ট থেকে আমার মুক্তিযোদ্ধা এক চাচাতো ভাই কোত্থেকে এক থলি স্বর্ণালংকার এনে কাঁধের অস্ত্র নামিয়ে বাবাকে বলেছিলেন,কাকা এগুলো আপনার সব হারানোর কিছুটা প্রতিদান।বাবা একটু গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন,কোথা থেকে পেয়েছো।উত্তর ছিল বিহারীদের কাছ থেকে।ওরাইতো লুটপাট করেছে। বাবা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন যারা আমার সব নিয়েছে তারা যে এরাই এটাতো আমি নিশ্চিত নয়।আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাই তার পিকআপ ভ্যানে করে সেগুলো সব ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।এসব কথা আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকেশোনা।মুক্তিযুদ্ধের ৯মাস চাকরিতে যোগ না দেয়ায় বাবাকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি প্রশংসাপত্র দেয়া হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর বাবা আর আগের অবস্থানে যেতে পারেননি।কষ্ট করে চলতে হয়েছে।তবুও হতাশ হতে দেখা যায়নি কখনো। চেষ্টা করেছেন চাকরির ফাঁকে ফাঁকে ছোটখাটো ব্যবসা করে আমাদের পড়া লেখার খরচ চালানো ও সংসারটা একটু ভালো রাখার।কখনো দামী জামা-কাপড় পড়তেন না।ঈদে আমাদের হিসেব করে জামা দেয়া হতো।৫৭ বছরে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর খুলনা থেকে সোজা গ্রামে চলে যান।বাকি জীবন গ্রামেই কাটিয়ে গেছেন।আর আমরা ভাই বোনরা সব শহরে।ঈদের ছুটিতে সবাই মিলে বাড়ি যেতাম।সে এক অন্যরকম আনন্দ।এখন যেতে হয়না।বাবা,মা বেঁচে নেই। ২০০২ সালে আমাদের সবাইকে ফেলে না ফেরার দেশে চলে যান বাবা। আজ বাবা দিবস ও ঈদের ছুটিতে বড় মনে পড়ছে বাবাকে।

বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ্য বার্তা সম্পাদক রাশেদ আহমেদ

//এস এইচ এস//


Ekushey Television Ltd.

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি