ঢাকা, রবিবার   ১২ জুলাই ২০২৬

কার্বনের দায় অন্যের, ক্ষতির বোঝা বাংলাদেশের: জলবায়ু বাজেট কী যথেষ্ট?

পবন আহমেদ

প্রকাশিত : ২১:৩৬, ১২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২১:৩৭, ১২ জুলাই ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

পৃথিবীর মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য। তবু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন অভিঘাত বহন করছে এই বদ্বীপ। নদীভাঙন, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও তাপপ্রবাহে প্রতিবছর দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা জাতীয় আয়ের (জিডিপি) প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশের সমান। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সরকারি বরাদ্দ এখনো জিডিপির এক শতাংশেরও কম। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আলাদা একটি জলবায়ু বাজেট নয়—রাষ্ট্রের পুরো বাজেটকেই জলবায়ু সহনশীলভাবে পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।

রাজবাড়ীর পদ্মাপাড়ে সানোয়ারা বেগমের জীবনের গল্প যেন নদীভাঙনেরই ইতিহাস। বিয়ের পর থেকে নয়বার বাড়ি হারিয়েছেন তিনি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই নারী এখন আর নতুন করে ঘর তোলার স্বপ্নও দেখেন না।

সানোয়ারা বেগম বলেন, ‘এখন বয়স হয়ে গেছে। নতুন জায়গা কিনে আবার ঘর করার মতো সামর্থ্যও নেই।’

একই নদীর পাড়ে বসবাস উত্তম হালদারের। চার বছর ধরে প্রতিটি বর্ষা তাঁর কাছে আতঙ্কের নাম। নদী কখন যে ঘর গিলে ফেলবে, সেই শঙ্কায় কাটে প্রতিটি দিন।

উত্তম হালদারের ভাষায়, ‘বর্ষা এলেই ভয় লাগে। মনে হয়, এবার হয়তো বাড়িটা আর থাকবে না। স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত কিছুটা নিরাপত্তা পেতাম।’

উত্তম বা সানোয়ারা একা নন। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা অসংখ্য গ্রামের মানুষের কাছে প্রতিটি বর্ষাই নতুন অনিশ্চয়তার নাম।

জলবায়ুর অভিঘাত এখন সারা দেশের বাস্তবতা

বাংলাদেশের জলবায়ু সংকট কেবল নদীভাঙনে সীমাবদ্ধ নয়। উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, উপকূলে লবণাক্ততার বিস্তার, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ে ভূমিধস এবং রাজধানীতে তীব্র তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলই ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মুখে।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সাতক্ষীরার উপকূল থেকে কুড়িগ্রামের চর—প্রকৃতির পরিবর্তিত আচরণ মানুষের জীবিকা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে দেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

শুধু গ্রাম নয়, উত্তপ্ত হচ্ছে শহরও

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন রাজধানী ঢাকাতেও স্পষ্ট। দ্রুত নগরায়ণ, কংক্রিটের বিস্তার, সবুজের সংকোচন এবং দূষণের কারণে শহরটি ক্রমেই 'আরবান হিট আইল্যান্ড'-এ পরিণত হচ্ছে। ফলে গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ও তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।

বাজেট বনাম বাস্তবতা

প্রতি বছর সরকার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে জলবায়ু মোকাবিলায় বরাদ্দ দিয়ে থাকে। মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয়ের পরিকল্পনা করা হয়, যা ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

গত অর্থবছরে জলবায়ু বাজেটের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪১ হাজার ২০৮ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট বাজেট প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা হওয়ায় জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ প্রায় ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ক্ষতি মোকাবিলায় এই বরাদ্দ কি যথেষ্ট?

পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত একুশে টেলিভিশনকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বাজেটে নীতিগতভাবেই এই বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।’।

লেখক ও জলবায়ু গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, বাজেটের বরাদ্দ তাদের প্রয়োজন বিবেচনা করেই ব্যয় করতে হবে। প্রতিটি জাতীয় বাজেটকে জলবায়ু সংবেদনশীল হতে হবে।"

শুধু দুর্যোগ নয়, অভিযোজনেও বিনিয়োগ প্রয়োজন

সংশ্লিষ্টদের মতে, গত কয়েক বছরের জলবায়ু বাজেটের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা অন্যান্য আকস্মিক দুর্যোগ-পরবর্তী অবকাঠামো পুনর্গঠনে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ পানি, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় অভিযোজন সক্ষমতায় বিনিয়োগ তুলনামূলক কম।

এএইচ


Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি