ঢাকা, শুক্রবার   ০৫ জুন ২০২৬

৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস

জলবায়ু ঝঁকি মোকাবিলায় কার্বন ক্রেডিট ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল

প্রকাশিত : ১৯:৪২, ৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৯:৫৩, ৫ জুন ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

প্রতি বছর ৫ জুন জাতিসংঘের উদ্যেগে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয় পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব যখন ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, খরা, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি, তখন পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন একটি মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে কার্বন ক্রেডিট।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের শিল্পায়নের ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তির আওতায় এসব দেশ ও প্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে অথবা অন্য দেশ থেকে কার্বন ক্রেডিট কিনে পরিবেশগত দায় পূরণ করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কৃষি ও বনজ সম্পদ সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।

কার্বন ক্রেডিট কী?

কার্বন ক্রেডিট হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, যেখানে এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) সমপরিমাণ গ্রীনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো বা শোষণের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি কার্বন ক্রেডিট প্রদান করা হয়। যেসব দেশ, প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প কার্বন নিঃসরণ কমাতে কিংবা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন শোষণ করতে সক্ষম হয়, তারা আন্তর্জাতিক বাজারে এসব কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করতে পারে। ফলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক লাভও অর্জিত হয়।

কৃষি খাতে কার্বন ক্রেডিটের সুযোগ:

বিশ্বব্যাপী কৃষি খাতকে এখন কার্বন শোষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাটিতে জৈব পদার্থ বৃদ্ধি, কৃষি-বনায়ন, সবুজ সার ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণ, কম চাষাবাদ প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কার্বন মাটিতে ধারণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ কৃষক সরাসরি কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে টেকসই কৃষি প্রযুক্তি প্রয়োগ করা গেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন সংরক্ষণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কৃষকরা ভবিষ্যতে কার্বন ক্রেডিটভিত্তিক আয় অর্জনের সুযোগ পেতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ধানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, জৈব সার ব্যবহার এবং কৃষি-বনায়ন সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় কার্বন ক্রেডিট উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে।

২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা:

বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের উদ্যোগে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং সবুজায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ প্রতিবছর গড়ে ২০ থেকে ২৫ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম। সে হিসেবে ২৫ কোটি গাছ পরিণত বয়সে পৌঁছালে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডল থেকে অপসারণ করা সম্ভব হবে।

এই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি—বনাঞ্চল বৃদ্ধি পাবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে,মাটির ক্ষয়রোধ হবে, ফল ও কাঠ উৎপাদন বাড়বে, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গড়ে উঠবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে কার্বন পরিমাপ, তথ্য সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত যাচাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য কোটি কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ খুলে দিতে পারে।

বৈশ্বিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান:

বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী (Voluntary) এবং বাধ্যতামূলক (Compliance) কার্বন বাজারে প্রতিবছর বিলিয়ন ডলারের লেনদেন হচ্ছে। আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ বন সংরক্ষণ ও কৃষিভিত্তিক কার্বন প্রকল্পের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় করছে।

বাংলাদেশে সুন্দরবন, উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি, কৃষি-বনায়ন এবং বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

করণীয়:

কার্বন ক্রেডিট থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের জন্য বাংলাদেশকে এখনই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে: 

  • জাতীয় কার্বন ক্রেডিট নীতিমালা প্রণয়ন 
  • কৃষি ও বন খাতে কার্বন হিসাবের ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি
  • আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কার্বন যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা
  •  কৃষকদের কার্বনবান্ধব কৃষি প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ প্রদান
  • সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে বৃহৎ কার্বন প্রকল্প বাস্তবায়ন 
  • আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর কৌশল গ্রহণ 

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তা হলো প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কৃষি ও বনজ সম্পদকে কেন্দ্র করে কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করতে পারবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মহাপরিকল্পনা শুধু একটি পরিবেশবান্ধব কর্মসূচিই নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ গঠনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার একটি দূরদর্শী উদ্যোগ। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতি গঠনে মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

লেখক: কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল ,কৃষি সাংবাদিক 

এমআর// 


** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।
Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি