স্কুলে যাওয়ার কথা বলে সীমান্তে ৩ স্কুলছাত্রী, যেভাবে উদ্ধার
প্রকাশিত : ১৬:১৬, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্কুলে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তিন কিশোরী। গন্তব্য স্কুল নয়, শেষ পর্যন্ত তারা ছুটে যায় সীমান্তের পথে। পাবনা থেকে নাটোর, নাটোর থেকে রংপুর, এরপর কুড়িগ্রাম। উদ্দেশ্য ছিল সীমান্ত পাড়ি দেওয়া। অচেনা শহরে রাত কাটানোর জায়গা খুঁজতে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে তারা। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের নজরে পড়ায় উদ্ধার হয় তিন স্কুলছাত্রী।
পরিবারের গচ্ছিত প্রায় এক লাখ টাকা নিয়ে তাদের একজন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল বলেও পরিবারের দাবি।
ঘটনাটি শুধু তিন কিশোরীর নিখোঁজ হওয়া কিংবা পুলিশের তৎপরতায় উদ্ধারের নয়। এর আড়ালে উঠে এসেছে কিশোর বয়সের অভিমান, পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক আচরণ, পড়ালেখা ও বিদ্যালয়কেন্দ্রিক চাপ, বন্ধুত্বের প্রভাব এবং অনলাইন কনটেন্টের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এক নতুন প্রজন্মের নানা সংকট।
রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘটে এ ঘটনা। সোমবার দুপুরে তিন কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে পাবনা সদর থানা পুলিশ।
তিনজনই পাবনা সদর উপজেলার চর আশুতোষপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একজন অষ্টম শ্রেণির এবং দু’জন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় তাদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। দু’জন পরস্পরের আত্মীয়ও।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিন কিশোরীর একজন দীর্ঘদিন ধরে নিজের চেহারা ও চোখের সমস্যা নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভ ও অভিমান তৈরি হয়। একপর্যায়ে বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়ার চিন্তা করতে থাকে সে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও ও বিনোদনমূলক কনটেন্ট দেখার পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীতদল বিটিএসের প্রতিও ওই কিশোরীর আগ্রহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সীমান্ত এলাকা দিয়ে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায় সে দুই সহপাঠীকে। বন্ধুত্বের টানে তারাও ওই পরিকল্পনায় যুক্ত হয়।
এখানেই সামনে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিশোর বয়সে পরিবার, বিদ্যালয় ও সামাজিক পরিবেশ থেকে পাওয়া আচরণ তাদের মানসিকতায় কতটা প্রভাব ফেলে? পড়ালেখার চাপ, বিদ্যালয়ের শাসন কিংবা পারিবারিক প্রত্যাশার সঙ্গে তাদের নিজস্ব চাওয়া-পাওয়ার কতটা সমন্বয় রয়েছে? এসব বিষয়ে অভিভাবক ও শিক্ষকদের সঙ্গে তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল কি না—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রোববার সকাল ১০টার দিকে তিনজন বিদ্যালয়ে এসে একত্র হয়। কিন্তু ক্লাসে না গিয়ে অটোরিকশায় করে চলে যায় পাবনা শহরের অনন্ত মোড় এলাকায়। সেখান থেকে আরেকটি অটোরিকশায় পাবনা বাস টার্মিনাল। এরপর বাসে নাটোর। নাটোর থেকে রংপুর। সেখান থেকে কুড়িগ্রাম। একের পর এক যানবাহন বদলে তিন কিশোরী যখন কুড়িগ্রামে পৌঁছায়, তখন তারা নিজেদের পরিচিত পরিবেশ থেকে অনেক দূরে।
পরিবারের দাবি, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাদের একজন গচ্ছিত প্রায় এক লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার আগে কুড়িগ্রাম বাস টার্মিনালে পৌঁছে তারা রাত কাটানোর জন্য থাকার জায়গা খুঁজতে থাকে। কিন্তু অপরিচিত শহরে কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে—তা জানা ছিল না তাদের।
খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়ে একটি অপরিচিত মহল্লায়। সেখানেই ঘটে মোড় পরিবর্তন। মহল্লায় তিন কিশোরীর গতিবিধি দেখে সন্দেহ হয় স্থানীয় এক পুলিশ কর্মকর্তার পরিবারের। সেখানে বসবাস করেন কুড়িগ্রাম সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাজউদ্দিন। তার স্ত্রী তিন কিশোরীর সঙ্গে কথা বলেন। কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হওয়ায় তাদের নিজের বাড়িতে নিয়ে যান তিনি।
তাদের খাবার দেওয়া হয়, বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়। পরে বিষয়টি এসআই তাজউদ্দিনকে জানানো হলে তিনি কৌশলে কিশোরীদের কাছ থেকে পরিবারের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় তাদের পরিবারের সঙ্গে। বিষয়টি জানানো হয় সংশ্লিষ্ট পুলিশকেও।
এদিকে পাবনায় তখন উৎকণ্ঠায় তিন পরিবার। মেয়েরা বাড়িতে ফেরেনি। খোঁজাখুঁজি করেও সন্ধান না পেয়ে পাবনা সদর থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন পরিবারের সদস্যরা।
একই বিদ্যালয়ের তিন নাবালিকা একসঙ্গে নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধারে তৎপর হয় পাবনা জেলা পুলিশ। পরে কুড়িগ্রাম সদর থানার এসআই তাজউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়।
কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের সহযোগিতায় নিরাপদে উদ্ধার করা হয় তিন কিশোরীকে। সোমবার দুপুরে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পাবনা সদর থানার ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, তিন কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক জিডি করা হয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে পুলিশ কাজ করে। কুড়িগ্রাম সদর থানার একজন উপপরিদর্শকের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় তিন কিশোরীকে নিরাপদে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিন কিশোরী ফিরে এসেছে—এটাই আপাতত পরিবারের সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বরং শুরু হয়েছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের।
একজন কিশোরীর অভিমান কীভাবে বাড়তে বাড়তে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছালো? দুই সহপাঠী কেন সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হলো? পরিবার কি তাদের পরিবর্তিত আচরণ বুঝতে পেরেছিল? বিদ্যালয়ে তারা কেমন ছিল? পড়ালেখা ও শাসনের চাপ তাদের ওপর কতটা ছিল? আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন বিনোদন তাদের চিন্তাভাবনায় কতটা প্রভাব ফেলছে?
তিন কিশোরীর কুড়িগ্রাম যাত্রা হয়তো শেষ পর্যন্ত বিপদে গড়ায়নি। কিন্তু অচেনা সীমান্তের পথে তিন নাবালিকার এমন যাত্রা পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের জন্য একটি সতর্ক সংকেত রেখে গেছে, কিশোর-কিশোরীদের শুধু শাসন নয়, তাদের কথা শোনারও প্রয়োজন আছে।
এএইচ
আরও পড়ুন










