ঢাকা, শুক্রবার   ২২ মে ২০২৬

শিশু ধর্ষণ ও হত্যা

১০০ নারী খুন করতে চাওয়া সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর কথা মনে আছে?

জাহিদ আল আসাদ

প্রকাশিত : ০০:২১, ২২ মে ২০২৬ | আপডেট: ০০:৩৫, ২২ মে ২০২৬

Ekushey Television Ltd.

পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত সোহেল রানা ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দেশজুড়ে শুধু দাবি করা হয় — দ্রুত বিচার হোক, হ্যাং দ্যা রেপিস্ট। প্রতিটি আলোচিত ঘটনার পর একই কথা। তারপর কী হয়েছে? 

আপনাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই সেই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ও রেপিস্ট রসু খাঁর কথা। ১১ নারী ধর্ষণ ও খুনের দায়ে তাকে আজ থেকে ১ যুগ আগে ফাঁসির দন্ড দেয়া হলেও তার ফাঁসি আজও কার্যকর হয়নি। 
চাঁদপুরের রসু খাঁ ২০০৭ থেকে একের পর এক নারী ধর্ষণ ও হত্যা করেন। ২০০৯ সালে গ্রেপ্তারের পর আদালতে ১১ জন হত্যার কথা স্বীকার করেন। ২০১৫ সালে প্রথম মৃত্যুদণ্ড, ২০১৮ সালে দ্বিতীয়মামলায় মৃত্যুদণ্ড এবং ২০২৪ সালে হাইকোর্টে তা বহাল রাখা হয়। কিন্তু আজ ২০২৬ সাল — ফাঁসি এখনো কার্যকর হয়নি। আসামিপক্ষ আপিল বিভাগে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এর মানে আরও বছরের পর বছর অপেক্ষা। একজন খুনিকে ফাঁসির দণ্ড দেয়ার ১ দশক পরও তার গলায় ফাঁসির দড়ি যখন উঠেনা, তখন অনেক 'পোটেনশিয়াল রেপিস্ট' এতে শক্তি পায়! তখন বিচার প্রত্যাশীরা ভাবে, ''দেশে রায় কার্যকর করার এ কেমন দীর্ঘসূত্রিতা!''

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু গণমাধ্যমে প্রকাশিত ধর্ষণের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩২৯ — অর্থাৎ প্রতি ৯ ঘণ্টায় অন্তত একটি ধর্ষণ। ২০২৫ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও বেড়েছে। 
এদিকে, ২০২০ সালে দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের পর ধর্ষণে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়।  তার আগে ২০০০ থেকে ২০২০ — এই দুই দশকে নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে লাখের বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। রায় হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশেরও কম মামলায়। ধর্ষণ মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে হাতে গোনা — যেমন ২০২৩ সালে নোয়াখালীর মুন্নী হত্যা মামলা।

এদিকে আজ ১০ বছরেও বেশি সময় ঝুলে আছে তনু হত্যা মামলা। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে সিআইডি, সবশেষ পিবিআই তদন্ত করছে। নয় বছরেও আসামি চিহ্নিত হয়নি। সর্বশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিলে ১০ বছর পর প্রথম আসামি গ্রেপ্তার। তাও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঈদের দিন ব্যক্তিগতভাবে তনু মামলার অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন, তারপর এই গ্রেপ্তার।  

মনে আছে, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এর ভাইরাল ভিডিওর কথা?
২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে একলাশপুরে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও একমাস পর ভাইরাল হলে সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২০২১ সালে রায়ে দেলোয়ারসহ ১৩ আসামিকে মাত্র ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই রায়ও দেশে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আমাদের মনে এখনো দগদগে হয়ে আছে মাগুরায় তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৮ বছরের আছিয়া আক্তাররের হত্যা ও ধর্ষণের কথা।


মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও দীর্ঘসূত্রতাই ধর্ষণ বাড়ার অন্যতম কারণের একটি। যদি রেপিস্টকে জনসমক্ষে ফাঁসি দিয়ে রায় কার্যকর করা হতো, তবে অন্য দশটা পোটেনশিয়াল রেপিস্টের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠতো। আইন বিশেষজ্ঞ জ্যোতির্ময় বড়ুয়া গণমাধ্যমে বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের আইন থাকলেও তার প্রভাব সামান্যই...।

তনু, আছিয়া, বেগমগঞ্জের সেই নারী কিংবা আজকের ছোট্ট রামিসা — এমন শত শত রক্তাক্ত লাশ আমাদের বিচারহীনতা কিংবা দীর্ঘসূত্রিতার দিকে আঙ্গুল তুলে একরাশ ঘৃণা নিয়ে পৃথিবী ছেড়েছে৷ আর তাদের হত্যাকারীরা এখনো পৃথিবীর আলো-বাতাস ভোগ করছে! রামিসার মতো প্রতিটি নাম একটি ব্যর্থতার দলিল। আইন আছে, আদালত আছে, মৃত্যুদণ্ডের বিধান আছে — কিন্তু ফাঁসির দড়ি ঝুলছে না। যতদিন ফাঁসির আদেশ আর ফাঁসি কার্যকরের মাঝের এই শূন্যতা থাকবে, ততদিন রামিসারা নিরাপদ হবে না। আমাদের মেয়েরা নিরাপদ হবে না।


** লেখার মতামত লেখকের। একুশে টেলিভিশনের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে লেখকের মতামতের মিল নাও থাকতে পারে।
Ekushey Television Ltd.

© ২০২৬ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি