ঢাকা, মঙ্গলবার   ২৩ জুলাই ২০১৯, || শ্রাবণ ৮ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

অধ্যক্ষের নির্দেশেই নুসরাতকে হত্যা

প্রকাশিত : ১৩:৩০ ১৪ এপ্রিল ২০১৯

ফেনীর সোনাগাজী মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করে। এ হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১৩ জনের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে ২ জন নারী জড়িত রয়েছে। জড়িত এসব ব্যক্তির মধ্যে এ পর্যন্ত সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এসব তথ্য জানিয়ে  বলেছে, দুটি কারণে নুসরাতকে হত্যা করা হয়েছে। প্রথমত, যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে মামলা করা দ্বিতীয়ত, শাহাদাত হোসেন শামীমের প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

রাফি হত্যা মামলার অন্যতম আসামি নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম ও মাকসুদ আলমকে গ্রেপ্তারের পর এই হত্যার কারণ এবং পরিকল্পনা সম্পর্কে  এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

দুপুরে রাজধানীর পিবিআই সদর দপ্তরে সংস্থার প্রধান পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার প্রেস ব্রিফিংয়ে রাফি হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

পিবিআই সদর দপ্তরে সংস্থার প্রধান পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার জানান, গত (৪ এপ্রিল) অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে ফেনী কারাগারে দেখা করে কয়েকজন। তাদের মধ্যে ছিল মাদরাসার ছাত্রলীগের কথিত সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন, হেফজখানার ইনচার্জ হাফেজ আবদুল কাদের। সেখানে সিরাজ তাদের ‘একটা কিছু করে’ রাফিকে ‘শায়েস্তা করার’ এবং ‘থামিয়ে দেওয়ার’ নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পরই শামীম ও নূর উদ্দিন রাফির ওপর হামলার পরিকল্পনা করে।

ছাত্রাবাসে আগের রাতে পরিকল্পনা :

বনজ কুমার বলেন, সিরাজের নির্দেশ অনুযায়ী ৫ এপ্রিল রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে মাদরাসার হোস্টেলে একটি বৈঠক করে পাঁচজন। বৈঠকে নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন ও হাফেজ আব্দুল কাদের ছিল।

আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, মাদরাসার অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ায় পুরো ‘আলেম সমাজ হেয়’ হচ্ছে বলে তারা রাফির ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। শামীমের প্রেমের প্রস্তাব রাফি একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করার কারণে সে ক্ষিপ্ত ছিল। ওই বৈঠকেই রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনা করে তারা। শামীমই রাফিকে পুড়িয়ে দেওয়ার ধারণা দেয়। কিভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে, সেই বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে তারা আরও পাঁচজনকে তাদের পরিকল্পনার কথা জানায়। যাদের মধ্যে দু’জন মেয়ে ছিল। তাদের একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সংগ্রহের জন্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, শাহাদাত হোসেন শামীমের কাছে তিনটি বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহ করে মেয়েটি। পরিকল্পনার পরদিন অর্থাৎ ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার আগেই বোরকা পরে শামীমসহ তিন পুরুষ শিক্ষার্থী সাইক্লোন শেল্টার কাম মাদরাসা ভবনের ছাদে টয়লেটে লুকিয়ে থাকে। এরপর পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে আরেকটি মেয়ে রাফিকে বলে, ছাদে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই খবর শুনেই রাফি ছাদে যায়।

যেভাবে হত্যাকাণ্ড : আটক আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ঘটনার বিবরণ জানান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা শুরুর আগে থেকেই ওই মাদরাসায় ঢুকে পড়ে হত্যাকারীরা। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিল তারা। চার হত্যাকারীর মধ্যে যে মেয়েটি ছিল সেই মেয়েই বাকি তিনজনকে বোরকা ও কেরোসিন এনে দেয়। দুই মেয়েই মাদরাসার ছাত্রী। ক্লাসের আগে (সকাল ৭টা) পলিথিনে কেরোসিন ও বোরকা নিয়ে মাদরাসায় ঢোকে। আর চম্পা বা শম্পা নামের একটি মেয়ে (পঞ্চম জন) পরীক্ষার হলে গিয়ে রাফিকে বলে তার বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে। এই কথা শুনে রাফি ছাদে যায়। রাফি ছাদে যাওয়ার পরই তারা টয়লেট থেকে বের হয়ে তাকে ঘিরে ধরে। এরপর তাকে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়। কথা না শোনায় রাফির হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া চারজন এবং নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে আসা চম্পা অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর সবার সামনে দিয়েই মাদরাসার মূল ফটক হয়ে পালিয়ে যায়। নূর উদ্দিন ও হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন আগে থেকেই ফটকে পাহারা দিচ্ছিল। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর সবাই গাঢাকা দেয়।

‘এই হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীরা শিক্ষার্থী। ছাদে একজন মেয়ে ছিল বলে জানা গেছে। হল থেকে রাফিকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায় আরেকটি মেয়ে। এই দুই মেয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। বাকিরা ছেলে। ছাদে শামীম ছিল। বাকিদের ব্যাপারে তথ্য যাচাই এবং গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। কোনো সম্পৃক্ততা যার আছে তাকেই আসামি করা হবে। রাফি মুমূর্ষ অবস্থায় ওস্তাদ শব্দটি উচ্চারণ করে। মাদরাসা বা হেফজখানার শিক্ষকদের ওস্তাদও বলা হয়।’

হত্যাকাণ্ডে জড়িত দুটি মেয়েকে শনাক্ত করা যায়নি বলে পিবিআই জানিয়েছে। তবে উম্মে সুলতানা পপি নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সে অধ্যক্ষ সিরাজের ভায়রার মেয়ে। তবে পপি হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না সেটা নিশ্চিত করেনি পিবিআই।

 

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পলাতক আসামি হাফেজ আব্দুল কাদের ও নির্দেশদাতা অধ্যক্ষ সিরাজের কারণেই সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় রাফির ওপর নিপীড়ন এবং হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাদের অনুসারী ছাত্ররা তাদের ওস্তাদ বলে জানে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রটি আরো জানায়, হত্যার সময় যে নারী তাদের বোরকা ও কেরোসিন দিয়েছিল সে শামীমের ঘনিষ্ঠ। সে পরিকল্পনায় সরাসরি যুক্ত হয়। এখন তাকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

পিবিআই জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শামীমকে নিয়ে অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

প্রসঙ্গত, মৃত্যুর আগে রাফি যেভাবে তাঁর ওপর হামলার বর্ণনা দিয়েছিল, পিবিআইয়ের তদন্তে তেমন তথ্যই উঠে আসছে।

গ্রেপ্তার যারা : পিবিআই জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত জড়িত যে ১৩ জনের তথ্য পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলো এস এম সিরাজ উদদৌলা, তার সহযোগী নূর উদ্দিন ও শামীম, কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, জোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন ও  প্রভাষক আফছার উদ্দিন।

কেআই/

© ২০১৯ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি