ঢাকা, মঙ্গলবার   ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, || ফাল্গুন ৬ ১৪২৬

Ekushey Television Ltd.

একজন বৃদ্ধাশ্রম বাসিন্দার প্রার্থনা

আমার সন্তানরা যেন কখনও বৃদ্ধ না হয়

একুশে টেলিভিশন

প্রকাশিত : ১৫:১৫ ২২ জানুয়ারি ২০১৮ | আপডেট: ১৫:১৭ ২২ জানুয়ারি ২০১৮

‘জীবনটা মোর সোনার খাঁচায় রইল না’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচিত ছন্দের সঙ্গে মিলে যায় দেশের বিভিন্ন বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রিত মানুষগুলোর জীবনে। কোন একদিন হয়ত এরা সবাই ছিল কোন না কোন পরিবারের প্রধান ব্যক্তি। সময়ের বিবর্তনে আজ তারা সেই পরিবারের কাছেই বোঝা। যে মানুষগুলো অন্ধের যষ্ঠির মত আলো দিয়েছেন পরিবারের সবাইকে ছাপিয়ে এ সমাজকে। আজ  তাদের অনেকেই তাদের পরিবারের কাছে বোঝা।  মুখে তাদের অনিচ্ছাকৃত হাসি লেগে থাকলেও অতীতের স্মৃতি মনে করে বুকের মাঝে যেন  তাদের হাউমাউ  করা কান্নার ঢেউ।

এই সমাজ ব্যবস্থা একজন মানুষকে শেষ বয়সে এসে অবহেলায় মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয় তেমনটায় জানা যায় একজন বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দার কাছ থেকেই। বৃদ্ধাশ্রমগুলো না দেখলে হয়ত বোঝাই যাবে না কিভাবে কাটে একজন বৃদ্ধাশ্রমের মানুষের সময়গুলো। যাদের অবসর জীবনে স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনীদের নিয়ে সময় কাটানোর কথা তারা এখন কর্মহীন জীবন নিয়ে বসে বসে জীবনের ইতির অপেক্ষা করছেন।

তেমনই, দেশের অন্যান্য বৃদ্ধাশ্রমগুলোর মতো রাজধানীর আগারগাঁও এ অবস্থিত ব্যক্তি মালিকানায় পরিচালিত প্রবীণ নিবাস বৃদ্ধাশ্রম। কোন সংগঠন কিংবা সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই শুধু আশ্রিত লোকগুলোর পরিবারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়েই পরিচালনা করা হয় আশ্রমটি। সর্বমোট ৩৬ জন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা  রয়েছেন। তাদের জন্য একজন মালিক/তত্বাবধায়ক রয়েছেন।

আশ্রমের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই তিনি আশ্রমটি পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে তিনি ছাড়াও দুই জন লোক রয়েছেন যার মধ্যে একজন রান্নার কাজ করেন ও একজন অন্যান্য কাজ করে থাকেন। মানবিক কারণেই আশ্রমটি পরিচালনা করেন বলেও জানান তিনি।

পরেই তিনি পরিচয় করিয়ে দেন আশ্রমের জৈষ্ঠ বৃদ্ধের সঙ্গে।  নাম জানতে চাইলে প্রথমে ইতস্থতাবোধ করলেও পরে নাম প্রকাশ করেন এ প্রতিবেদকের কাছে তবে শর্ত হলো গণমাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে না। কারণ হিসেবে জানালেন, তাতে তাদের ছেলে-মেয়েদের সম্মানের হানি ঘটতে পারে।

এরপরই জীবন সর্ম্পকে জানতে চাইলে বলতে শুরু করলেন তার অতীতের কথা। ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন রহিম সাহেব (ছদ্মনাম)। ১৯৩০ সালে রাজশাহী শহরের অদূরে কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করার কারণে ছোট থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে গিয়ে কৃষি কাজ করতে হতো তাকে।

সাত ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ১১তম ও ভাইদের মধ্যে ষষ্ঠ। কৃষক পরিবার হওয়ায় অর্থ কষ্ট লেগেই থাকতো সংসারে। ভাই বোনদের মধ্যে অত্যন্ত মেধাবী ও লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছা থাকায় স্থানীয় পাঠশালায় ভর্তি করে দেন তার শিক্ষানুরাগী পিতা। পর্যায়ক্রমে মেট্রিক (এসএসসি) ও  ইন্টারমিডিয়েটে  (এইচএসসি) ভাল ফল করায় অর্থ কষ্টের মধ্যে দিয়েও পিতা-মাতা ও ভাই-বোন চাইতো রহিম সাহেবের লেখাপড়া চলতে থাকুক। একপর্যায়ে পরাশোনা শেষ করে সরকারি উচ্চ পদে চাকরিতেও যোগ দান করেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। চাকরি পেয়ে ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়ার পর শুনতে পান তার বাবা বেশ কিছু দিন কালা জ্বরে ভুগে মাত্র পাঁচ দিন আগেই মারা গেছেন। রহিম সাহেব চাকরির সুবাদে ঢাকাতেই থাকতে শুরু করে আর মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে মাকে দেখে আসেন। হঠাৎ একদিন খবর আসে তার মায়ের খুব অসুখ। পরদিন বাড়িতে গিয়েও শেষ বারের মত মাকে দেখতে পারলেন না তিনি। শুনলেন গতকালই তার মা মারা গেছেন। তার আসার খবর না পেয়ে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা তার মায়ের লাশ দাফন করেছে।

এবার ঢাকায় এসে কাজে মন দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশে যুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধ চলাকালীন ঢাকাতেই ছিলেন। সরকারি চাকরির কারণে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ তিনি পাননি।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর পর ঢাকার এক মেয়েকে বিয়ে করেন তিনি। পরের বছর তাদের কোল জুড়ে আসে এক ছেলে সন্তান। তিন বছর পর তাদের সংসারে আসে নতুন এক কন্যা সন্তান। এরপরই ঢাকার বনানী এলাকাতে নিজের নামে জমি কিনে বাড়ি করেন রহিম সাহেব। এছাড়াও শহরের নামি দামি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন ছেলে-মেয়েদের। সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ইতালি প্রবাসী এক বাংলাদেশি ছেলের  সঙ্গে। বিয়ের পর মেয়েকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার পর মাত্র দুইবার বাংলাদেশে এসেছিল তারা দুজন। দেশে ছেলেও সরকারি অনেক উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন। উচ্চ বংশ দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন ছেলেকে। তাদের কোল জোড়ে এসেছে একটি ছেলে সন্তান।

গেল দুই বছর আগে রহিম সাহেবের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তাকে এ বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে হয়। অনেক অনুরোধের পর জানালেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকার কারণ। বললেন, বনানী এলাকার বাড়িটা ছেলে ও ছেলের বৌ জোর করে লিখে নিয়েছেন। তিন তলা ভবনের এক তলায় তারা থাকেন আর অন্য দুটি তলা ভাড়া দেওয়া হয়। আমি থাকলে তো তারা এত টাকা ভাড়া পাবে না তাই আমাকে এখানে রেখে গেছেন। বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন রহিম সাহেব। চোখ মুছতে মুছতে বললেন আমি সব সময় দোয়া করি আমার সন্তানরা যেন কখনোই বৃদ্ধ না হয় তাহলে তারা এত কষ্ট সহ্য করতে পারবে না। কান্নার কারণে আর কিছুই যেন বলতে পারছিলেন না তিনি। তখন তার ভাইদের কথা জানতে চাইলে জানান, তার সবচেয়ে ছোট ভাই পাঁচ বছর আগে গত হয়েছেন। তার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের তেমন ভাল সম্পর্ক নেই। অনেকে হয়ত আমাকে চিনতেও পারবে না। বলেই হাউমাউ করে কেঁদে জড়িয়ে ধরলো। কিছুক্ষণ বাদেই নিজের কক্ষের দিকে হাটতে শুরু করলেন। রহিম সাহেবের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে ‘ ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার... আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম’লাইনটি।

আরআ/এসএইচ

 

 

New Bangla Dubbing TV Series Mu
New Bangla Dubbing TV Series Mu

© ২০২০ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। একুশে-টেলিভিশন | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি